তিন পর্বের দ্বিতীয় পর্ব
এআই কি চিকিৎসকের জায়গা নেবে? ব্যাখ্যাযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আস্থার সংকট
ফারজানা ইয়াসমিন ট্রাস্টওয়ার্দি এআই গবেষক। ফেডারেটেড লার্নিং, ব্যাখ্যাযোগ্য এআই এবং অ্যালগরিদমিক ন্যায্যতা, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য তিন পর্বের দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন আজ
একটি পরিস্থিতি কল্পনা করুন: একজন রোগীর সিটি স্ক্যান দেখে একটি অত্যাধুনিক এআই সিস্টেম ৯২% নিশ্চয়তা দিয়ে বলছে, ‘এটি ক্যানসার’। কিন্তু যখন চিকিৎসক জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন বলছ? কোন বৈশিষ্ট্যগুলোর ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত?’ এআইটি নীরব থাকে। এটি শুধু একটি সংখ্যা বা ফলাফল দেয়, তার পেছনের যুক্তি নয়। চিকিৎসক কী করবেন? জীবন-মরণের সিদ্ধান্ত তিনি শুধু একটি রহস্যময় ‘ব্ল্যাক বক্স’-এর ওপর ভরসা করে নিতে পারবেন না। এটিই বর্তমান চিকিৎসা এআইয়ের সবচেয়ে বড় বাধা; আস্থার সংকট।
এই সংকট কাটানোর চাবিকাঠি হলো ‘এক্সপ্লেইনেবল এআই’ বা এক্সএআই (Explainable AI)। এক্সএআইয়ের লক্ষ্য হলো এআইয়ের সিদ্ধান্তকে মানুষের জন্য বোধগম্য ও পরীক্ষাযোগ্য করে তোলা। আমার গবেষণার একটি বড় অংশজুড়ে আছে এই চ্যালেঞ্জ। আমরা শুধু এআইকে সঠিক উত্তর দিতে শেখাই না, বরং তাকে যুক্তি দিয়ে তার উত্তর প্রমাণ করতে শেখাই। ধরুন, একটি এআই সিস্টেম বলল একজন গর্ভবতী মায়ের প্রি-একলাম্পসিয়া (গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ) হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এক্সএআই-সক্ষম সেই সিস্টেমটি সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ করবে: ‘কারণ, রোগীর রক্তচাপের এই প্রবণতা, প্রোটিনুরিয়ার এই মাত্রা এবং পূর্ববর্তী ইতিহাসের সঙ্গে উচ্চ-ঝুঁকি গ্রুপের মিল খুঁজে পাওয়া গেছে।’ এটি চিকিৎসককে তাঁর নিজস্ব মূল্যায়নের পাশাপাশি একটি তথ্যভিত্তিক, যুক্তিপূর্ণ দ্বিতীয় মত দেয়।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমি ও আমার সহযোগীরা ‘হাইব্রিড এক্সএআই’ (Hybrid XAI) ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে কাজ করছি, যেখানে নিয়মভিত্তিক যুক্তি (Rule-Based Reasoning) এবং নিউরাল নেটওয়ার্কের শক্তি একসঙ্গে কাজ করে। নিয়মভিত্তিক অংশটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলো (যেমন: ‘উচ্চ রক্তচাপ + প্রোটিনুরিয়া = প্রি-একলাম্পসিয়া সন্দেহ’) ধারণ করে। নিউরাল নেটওয়ার্ক অংশটি ডেটার জটিল, অদৃশ্য প্যাটার্ন খুঁজে বের করে। যখন এ দুইয়ের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত তৈরি হয়, তখন এআই শুধু একটি পূর্বাভাসই দেয় না, বরং বলতে পারে, ‘সিদ্ধান্তটি এসেছে এই চিকিৎসা নিয়ম এবং ডেটার এই অস্বাভাবিক প্যাটার্নের সমন্বয়ে।’ এটি এআইকে একটি ‘ব্ল্যাক বক্স’ থেকে একটি ‘আলোচনাযোগ্য সহযোগী’তে রূপান্তর করে।
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপাত কম, সেখানে এআই একটি শক্তিশালী সহায়ক হতে পারে। কিন্তু তার জন্য এআইকে হতে হবে চিকিৎসকের বুদ্ধিমান সাহায্যকারী, প্রতিযোগী নয়। চিকিৎসকের পরিশীলিত অভিজ্ঞতা ও অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে এআইয়ের গণনাশক্তির সমন্বয় ঘটানোই লক্ষ্য। যখন একজন চিকিৎসক এআইয়ের প্রস্তাবের পেছনের কারণ বুঝতে পারেন, তখন তিনি সেটিকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করতে, সংশোধন করতে বা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। এই ‘মানুষ-মেশিন সহযোগিতা’ চিকিৎসার গুণগত মান বৃদ্ধির চাবিকাঠি।
সুতরাং এআই কখনোই চিকিৎসকের জায়গা নেবে না। বরং একটি স্বচ্ছ, ব্যাখ্যাযোগ্য এবং আলোচনাযোগ্য এআই হবে আগামী দিনের চিকিৎসকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সহকারী। আমাদের গবেষণা সেই বিশ্বাসের সেতু নির্মাণের চেষ্টাই করছে। চলবে...
**আগামীকাল পড়ুন শেষ পর্ব: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘পক্ষপাত’: স্বাস্থ্যসেবায় এআই যখন বৈষম্যের হাতিয়ার
*লেখক: ফারজানা ইয়াসমিন, ট্রাস্টওয়ার্দি এআই গবেষক, মেশিন লার্নিং বিজ্ঞানী ও ২১তম আন্তর্জাতিক সিআইবিবি কনফারেন্সের (২০২৬) প্রোগ্রাম কমিটির সদস্য। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টালসা থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। গবেষণা সম্পর্কে জানতে ভিজিট করুন: https://farjana-yesmin.github.io