থম্পসনের ডায়েরি: পর্ব-৪

থম্পসনের ওয়ালমার্টছবি: লেখক

আমরা জুলিয়েটকে ফলো করে কয়েকটা পাশাপাশি বাড়ির সামনে গিয়ে থামলাম। ও কল করে আবার লোকেশন নিশ্চিত হয়ে নিল। গৃহকর্ত্রী বের হয়ে এসে আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। যেসব জায়গায় আরশোলার উপদ্রব আছে, সেসব দেখিয়ে দিলেন। আমরা ছবি, ভিডিওসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ করে নিলাম। ইন্সপেকশনের সময় মনে হচ্ছিল আমাদের দেশের কোন মফস্‌সল শহরের পুরোনো ডরমিটরির ঘরের ভেতরের ছবি তুলছি! ভঙ্গুর অবকাঠামো, পুরোনো দরজা-জানালা, রান্নাঘরের চুলা, চিমনি, তৈজসপত্র পরিষ্কারের কল-বেসিন, নিচের পাইপলাইন, রেফ্রিজারেটরের পেছনের দিকে, স্টোররুমে রাখা জিনিসপত্রসহ আরও যত দেখছিলাম কেমন যেন একটা গন্ধ পাচ্ছিলাম ঠিক যেমনটা প্রাচীন দিনের আসবাবপত্রে থাকে। তবে এমনটা আরশোলা যেখানে ডেরা গড়ে, সেখানেও পাওয়া যায়! কোনটা সঠিক, বলা মুশকিল। ইন্সপেকশনের কাজ শেষ। এবার বাড়ির মালিককে সমন জারি করার পালা। সেটা অফিসে ফিরে গিয়েই করতে হবে। অমুদা আমাদের নিয়ে বসবে। অফিশিয়াল সফটওয়্যারে কাজ করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ল্যাপটপ, ফোন দেওয়া হয়। আমরা ফোন তখনো পাইনি। কারণ, ইন্সপেকশনের সময় তোলা ছবি, ভিডিও ওতেই নেওয়া ভালো৷ আপাতত নিজেদের ব্যক্তিগত মুঠোফোন ব্যবহার করছি। অমুদার সঙ্গে হাউজিং ইন্সপেকশনের পরে কীভাবে ল্যাপটপে কাজ করতে হয়, তার আদ্যোপান্ত শিখতে শিখতে ওই দিনের মতো অফিসের কাজ শেষ হলো।

আরও পড়ুন

বাসা থেকে ফিরে আসার পথে ওই দিন থম্পসন শহরের ওয়ালমার্টে গেলাম কিছু কেনাকাটা সারতে। বলা বাহুল্য এটা আশপাশের দুর্গম অঞ্চলগুলোর একমাত্র ভরসা। কারণ, পরবর্তী ওয়ালমার্ট ৩৭৩ কিলোমিটার দূরের ফ্লিনফ্লন শহরে। এই ছোট্ট শহর ম্যানিটোভার পার্শ্ববর্তী প্রদেশ সাস্কাচুয়ানের সঙ্গে নিজ সীমারেখা ভাগাভাগি করেছে। ক্ষেত্র বিশেষে পরিস্থিতি এমন যে কিছু প্রতিষ্ঠানের এক অফিস ম্যানিটোভায় তো আরেকটি সাস্কাচুয়ানে! বুঝুন অবস্থা। থম্পসন থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ সোজা গাড়ি চালিয়ে যেতে হবে। বাস বা অন্য কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা নেই! নেহাত যদি যেতেই হয় তাহলে ব্যক্তিগত গাড়ি আছে এমন কাউকে অনুরোধ করে ব্যবস্থা করে নিতে হবে। প্রশ্ন হলো, যার গাড়ি নেই এবং যিনি শহরে নবাগত, তিনি কী করবেন? স্থানীয় লোকজনের উদ্যোগে ফেসবুকে রাইড শেয়ারিং করা যায় এমন পেজ রয়েছে, সেখানে রিকুয়েস্ট করা যায় কিন্তু কোনো নিশ্চিত ভরসা পাওয়ার মতো জায়গা বলা যায় না। অতএব ঘুরেফিরে আপনার ব্যক্তিগত গাড়ি না থাকলে বা নিজে ড্রাইভ করার অভিজ্ঞতা না থাকলে ম্যানিটোভার এসব দুর্গম অঞ্চল মরণফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়! দূরদূরান্তের অন্যান্য প্রদেশ থেকে মানুষজন কেউ পেশাগত কারণে, বা আমার মতো নতুন কর্মজীবনের খোঁজে, কেউ পি আর (পারমানেন্ট রেসিডেন্সশিপের) কোনো না কোনো স্ট্রিমে বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের উদ্দেশ্যেও পাড়ি জমান।

আরও পড়ুন
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

এর বেশি আর কিছুই নয়। না হলে কেন এমন শহরে ডেরা গড়তে হবে? যখন উইনিপেগ থেকে রাতের বাসে উঠেছিলাম, যেটা ভোর সকালে এখানে নামিয়ে দিয়েছিল, পথে অনেক জায়গায় মনে হয়েছে অন্য কোনো দুনিয়ায় চলে যাচ্ছি। আশপাশে লোকালয় বলতে কিচ্ছু নেই! মনে মনে ভাবছিলাম এই বাস আমাকে কোন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নও মনে উঁকি দেয়নি যে তা নয়, যদি কোনো কারণে পথিমধ্যে গভীর রাতে বাস বিকল হয়ে পড়ে তাহলে উপায় কী? কারণ? কোনো নেটওয়ার্ক কাভারেজ নেই! ফোনে কল করবেন কাকে? এসব ক্ষেত্রে খুব সম্ভবত ড্রাইভারদের কাছে বিশেষ স্যাটেলাইট সুবিধা থাকে। তবে এটা আমার অনুমান মাত্র! পরবর্তী পর্বের কোন এক সময় পর্যায়ক্রমে এমন একটা অভিজ্ঞতার কথা শোনাব আপনাদের।

সকালে কাজে বের হওয়ার ঠিক আগে তোলা
ছবি: লেখক

বিষয়টা ধীরে ধীরে আরও পরিষ্কার হচ্ছিল, যখন শহরের রাস্তাঘাটে ব্যক্তিগত যানবাহন ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না। প্রথম পর্বে যেমনটা বলেছিলাম তার সঙ্গে হুবহু সাদৃশ্য খুঁজে পাই আজকের দিনের সল্পসময়ের ভ্রমণেও। ওয়ালমার্টের সামনাসামনি হাজির হওয়ার আগেই দূর থেকেই তেনাদের দেখতে পেলাম! কেউ কেউ হেলেদুলে, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলাফেরা করছেন কিংবা দলবদ্ধভাবে জটলা পাকিয়েছেন। ওয়ালমার্টের প্রবেশপথসহ আশপাশের পুরো জায়গাজুড়েই এদের সরব উপস্থিতি। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রকাশ্য সরগরম উপস্থিতি এবং রাস্তাঘাটে এদের অবাধ চলাফেরা এই শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বলতে হবে! ওয়ালমার্টে ঢুকেই বুঝতে পারলাম মেইন গেটের বেচারা সিকিউরিটি অফিসারের বারোটা বেজে চৌদ্দটা বেজে যায় প্রতিদিন এনাদের আজব সব কর্মকাণ্ড সামলাতে আর অভিযোগের সুরাহা করতে। এদের সেলফ চেক আউটটা আকারে ছোট। ওখানেও সারিবদ্ধভাবে লাইনে না দাঁড়িয়ে কেমন যেন বিশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন সম্মানিত জনসাধারণ। কেনাকাটা সারতে গিয়ে আরও কিছু বিষয় বুঝতে পারছি। প্রথমত, এই ওয়ালমার্টের আকার আকৃতি ঠিক কানাডায় আমার প্রথম কর্মস্থল নর্থ সিডনি ওয়ালমার্টের আদলে করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এখানে আশেপাশের শহর থেকে প্রচুর লোকজনের আগমন ঘটে; কারণ, ওদের ব্রেড সেকশনে আজ কোনো ব্রেড দেখতে পাইনি! প্রায় পুরোটাই ফাঁকা করে দিয়ে চলে গেছে। পরে কথোপকথনে শুনলাম, পাশের এক শহরে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেকেই সাময়িক সময়ের জন্য থম্পসনে স্থানান্তরিত হয়েছেন এবং তার প্রভাব ওদের বেকারি সেকশনে রাখা পাউরুটির হাল দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তৃতীয়ত, চুরিচামারি এই স্টোরের নিত্যদিনের ঘটনা। কোন ওয়ালমার্টের পজিশন যদি মার্কেট বা শপিংমলের ভেতরে থাকে, সে ক্ষেত্রে কাস্টমারদের যাতায়াতের সুবিধার্থে দুটো প্রবেশপথ থাকে। ঠিক যেমনটা ছিল নর্থ সিডনিতে। এখানেও ছিল! কিন্তু পেছনেরটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং যত দূর সম্ভব পারমানেন্টলি। নর্থ সিডনিতেও মাঝেমধ্যে পেছনের দরজাটা সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হতো। বোঝাই যাচ্ছে তেনাদের দাপট শুধু বাইরের রাস্তাঘাটে সীমাবদ্ধ না, সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে। আজকের বাজার করার সময় কতটা সহনীয় পর্যায়ে বহন করতে পারব, সেটা বেশ খেয়াল রেখেই কাজ সেরেছি। তা না হলে ওই দিনের মতো বেহাল দশা হবে। অর্ধেক গিয়ে রাস্তায় ব্যাগ রেখে বিরতি নাও, আবার হাঁটো! যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে একমাত্র ভরসা ট্যাক্সি যাতে পা রাখলেই গচ্চা যাবে দশ ডলার! যত কাছে বা দূরেই যান না কেন। ফিরে এসে বাসায় এই সময়টায় নিজেকে অনেক নির্ভার লাগে। খুব সম্ভবত যারা কাজে যান সবারই মনের অভিপ্রায় একই রকম। চুলোতে পানি গরমে বসিয়ে দিলাম। সঙ্গে সদ্য ওয়ালমার্টের ইন্টারন্যাশনাল সেকশন থেকে নিয়ে আসা হাইড অ্যান্ড সিক এর বিস্কুট। জমজমাট একটা কম্বিনেশন! তবে বিস্কুট খাওয়ার প্রবণতা বেশি বেড়ে যাওয়ায় ফয়সাল ভাইয়ের কথা মতো সান্ধ্যকালীন জলখাবারের লিস্টে বাদামও যোগ করেছি। তিন রকম বাদাম (কাঠবাদাম, কাজু আর পেস্তা) একসঙ্গে মিশিয়ে খেয়ে দেখবেন! মনে হবে সপ্তম স্বর্গে পৌঁছে গেছেন! তবে ফয়সাল ভাই কী ধরনের বাদাম খান, সেটা জানা হয়নি। রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে নিতে হবে চটজলদি। রান্না নেই। ভাবছি ছোলার তরকারি করবো আলু, টমেটো দিয়ে। এতে পরশু দুপুরের মধ্যাহ্নভোজ পর্যন্ত চললেই হবে। আগেরবারের বাজারের সময় আলুর বস্তুা, চালের বস্তা দুটো দুই হাতে আনতে গিয়েই হালুয়া টাইট হাল হয়েছিল। বৃহস্পতিবার রাত হলেই টেনশন বাড়তে থাকে। কারণ, প্রতি শুক্রবার আমাদের পরীক্ষা থাকে। মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে যত দিন ট্রেনিং থাকবে, তত দিন বার সপ্তাহে বারোটা প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা থাকবে। মূল পরীক্ষায় লিখিত এবং মৌখিক দুটো অংশ থাকে। তবে লিখিত পরীক্ষা পরীক্ষার হলে সরাসরি না হয়ে এ ক্ষেত্রে আমাদের দুটো লিখিত রিপোর্ট জমা দিতে হয়। ট্রেনিং করতে এসে মনে হচ্ছে ইউনিভার্সিটির দুই বছরে কাটানো দিনগুলোতে ফিরে গেছি। সকাল থেকে ব্যাগ নিয়ে ক্লাস করতে ছোটাছুটি শুরু, ক্লাস শেষে বাসে প্রথমে সিডনির ডরচেস্টার স্ট্রিটের বাসস্ট্যান্ড, পরে পাঁচ নাম্বার বাসে দূরের নর্থ সিডনির পথে। চাকরি শেষ করে রাত ৯টা বিশের শেষ বাসে উঠে বাসায় ফিরতে ফিরতে সাড়ে ১০টা–১১টা। কখন যে পড়াশোনা করেছি আর কখন যে রান্নাবান্নার কাজ, মনে করতে গেলে মাথায় সব জট পাকিয়ে আসে! (চলমান)

আরও পড়ুন