থম্পসনের ডায়েরি

ডাউনটাউনের পথেছবি: লেখক

অফার লেটার সাইন করার পরপরই জানতাম, এমন এক জনপদে যাচ্ছি, যেটা বাকি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বসন্তকালে আশপাশের শহরে যখন ঝলমলে রোদ্দুর, তখন এখানে দিব্যি তুষার ঝরছে। আবার উইনিপেগে অক্টোবর মাসের ঝলমলে এক দিনে থম্পসনে আচমকা ভয়ংকর দমকা হাওয়াসহ নেমে আসে তুষারঝড়। এতটাই বেগতিক পরিস্থিতি যে বিদ্যুৎ–বিভ্রাটে পুরো শহর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল ১৪ ঘণ্টার বেশি সময়ের জন্য!

মানুষজন ভিডিও আপলোড করে ইনস্টাগ্রামে দিয়ে বলছে, ‘দিস ইস থম্পসন, দ্য সিটি অব উলফস্, দ্য মিস্ট্রি অব নর্থ।’ নেকড়ে বাঘের প্রসঙ্গটা পরে শোনাব।

স্পিরিট ওয়ে ভাস্কর্য
ছবি: লেখক

থম্পসনের পরের শহরের তো জগৎ–জোড়া খ্যাতি। চার্চিল, এর অপর নাম দ্য পোলার বিয়ার ক্যাপিটাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড, যার পাশেই রয়েছে সুবিশাল হাডসন বে। শ্বেতকায় ভাল্লুকের আবাসস্থল এই চার্চিল শহর। মূলত অক্টোবর থেকে নভেম্বরের দিকেই দর্শন পাওয়ার সুসময়। ফিরে আসি থম্পসনে। ম্যানিটোভা প্রদেশের উত্তর দিককার শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় শহর। লম্বা সময় ধরে এই শহর সুনামের চেয়ে দুর্নাম কুড়িয়েছে অঢেল (এখনো ফুরিয়ে গেছে, তা নয়!)। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের জন্য বেশ কিছু পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে এখানে। রাস্তায় সাধারণ মানুষের বেশে হাঁটতে বের হলে কোনো স্বাভাবিক জনগণের দেখা পান বা না পান, তাঁদের বেশ ঢুলু ঢুলু অবস্থায় দেখতে পাবেন। বেশ ভালো সংখ্যায় দেখবেন। মাঝেমধ্যে মনে হবে, শহরটা বোধ হয় তাঁদেরই! হুশ-বোধ থাকলে কাছাকাছি এসে হয় পয়সা চাইবেন, না হয় শুধু হাই বলে চলে যাবেন। কাজেই অত আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। রাতে বের হলে কী হয়, তা বলতে পারব না!

রাজধানী উইনিপেগ থেকে বাস, ট্রেন, প্লেনে চেপে পৌঁছে যাবেন। ট্রেনের যাত্রা একটু দীর্ঘই হয়। এক দিন পুরো কেটে যাবে পথ পাড়ি দিতে। বেশ আরামের হয় যদিও। আমার মতো ছাপোষা মানুষের জন্য সহজ মাধ্যম বাস। তবে নির্ঘুম রাত কাটিয়েই পৌঁছাতে হবে গন্তব্যে। পাক্কা সাড়ে ৯ ঘণ্টার পথ। পথে বেশ কিছু জায়গায় বিরতি দেওয়ার কারণেই অবশ্য দীর্ঘসূত্রতা হয়। যেদিন সকালে গিয়ে আমি পৌঁছাই, তখন ঘড়িতে সকাল ৬টা ২৩। একে তো বেশ ঠান্ডা, অন্যদিকে বাসস্ট্যান্ডকে ঠিক যাত্রীবান্ধব মনে হলো না মোটেও। সবাই কেমন যেন তাড়াহুড়া করে যাঁর যাঁর লাগেজ নামিয়ে নিয়ে গাড়ি খুঁজছেন। নামার সময় জানালা দিয়ে দেখলাম, বেশ কিছু ট্যাক্সি দাঁড়ানো আছে। অথচ নেমে নিজের লাগেজ বুঝে নিতে নিতেই সব হাওয়া! ঠান্ডায় জমে জবুথবু হয়ে যেতে যেতে চটজলদি ম্যাপ বের করে দেখে নিলাম, আনু ভাইয়ের কাজের জায়গাটা কোথায়। ওখান থেকে কাছেই থাকার কথা। ম্যাপ ফলো করে পৌঁছে তো গেলাম কিন্তু দেখি মূল দরজা বন্ধ। আর ভেতরেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। নিরুপায় হয়ে কল দিলাম ওনাকে। পরে জানতে পারলাম, ওনারা আপাতত বন্ধ করে রেখেছেন। সাতটার আগে খোলা হবে না। পরে জানিয়েছিলেন, ভোরে অধিকাংশ সময়ই মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা মাঝেমধ্যেই কোনো কারণ ছাড়াই ঢুকে পড়েন আর এটা–ওটা খুঁজে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। আনু ভাইয়া আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আবার ফিরবেন। আপাতত চাকরির প্রাথমিক অবস্থায় ওনাদের সঙ্গেই ডেরা গড়েছি।

পরদিন সকাল। বাসা থেকে ওয়ালমার্ট দেখা যায়। হাঁটাপথ, ভাবলাম যাই, একটা ঢুঁ মেরে সাময়িক প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি নিয়ে আসি। তবে রাস্তায় নেমে একটা বড়সড় ধাক্কা খেলাম! মনে হচ্ছিল, কোনো একটা ভুতুড়ে পাড়ায় চলে এসেছি। রাস্তাঘাট খাঁ খাঁ করছে। কোনো গাড়িঘোড়াও চোখে পড়ছে না। প্রথমে ভাবলাম, হয়তো এখানকার মানুষ একটু আরামপ্রিয়। ওই দিন ছিল রোববার সকাল। বাজার সেরে বের হওয়ার সময় রাস্তায় ঠিকঠাক মানুষজন দেখতে পাব। ওয়ালমার্টে বাজার করতে গিয়ে নর্থ সিডনি ওয়ালমার্টের কথা খুব মনে পড়ছে। না পড়ে উপায় কী? দুটো ওয়ালমার্টের আকার হুবহু এক। কানাডায় আমার প্রথম কাজের জায়গা। ওখানকার সাড়ে তিন বছরের কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বিস্তারিত বলেছি ‘কানাডার পথ ও রথের বৃত্তান্তে’। বাজার করার সময় এটাও মাথায় রাখতে হচ্ছিল যে বেশি ভারী যেন না হয়ে যায়। এখানকার হাঁটাপথেও যদি ট্যাক্সি করে যাতায়াত করতে হয়, তো পকেটে বাড়বে চাপ আর মাথায় পড়বে হাত। বের হয়েও রাস্তাঘাটে কোনো মানুষজন না দেখে কেমন যেন নিজেকে বেখাপ্পা লাগল। কিছু মানুষজন দূরে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু তাঁরা কেউই সুস্থ মস্তিষ্কের নন। বেশ ঢুলুনি খেয়ে হাঁটছেন। মনে হয় পড়েই যাবেন। কয়েকটা জায়গায় জটলা দেখা যাচ্ছে। তাঁরাও একই গোত্রের। এখন সকালের তুলনায় গাড়ির ব্যবহার কিছুটা বেড়েছে। তবে রাস্তায় বা আশপাশে কোথাও আমি ছাড়া আর কোনো মানুষ নেই, আর কারা আছেন, সেটা তো না বললেও আপনারা ইতিমধ্যেই ঠাওর করতে পেরেছেন। ভেবে দেখুন, একদিন ঘুমের অতলে তলিয়ে গিয়ে দেখলেন, আপনি এক জম্বি শহরে এসে পড়েছেন। সবদিকেই গা ছমছম করা আধপচা লাশ আপনার পিছু নিচ্ছে! যেদিকেই যেতে চাইছেন, মাথাভাঙা, ঘাড়ভাঙা, মুখ-চোখ কোঁচকানো জীবন্ত লাশ তাড়া করছে ফিরছে। যেদিকেই চোখ যায়, শুধু অদ্ভুত কিম্ভূতকিমাকার এই সব লাশের দেখা পাচ্ছেন! এমন দৃশ্য অবশ্য সিনেমার পর্দায় দেখেছেন। আমার কাছে থম্পসন শহরের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতাটা ছিল অনেকটা ওই রকম। ওহ! বলতে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, এর মধ্যে যখন বাজারের ভারী ব্যাগ নিয়ে যখন হেঁটে ফিরছিলাম, তখন একজন আমাকে এগিয়ে এসে বলল, ‘হাই, ডু ইউ হ্যাভ এ ডলার ওর টু?’ একে তো ঘেমেনেয়ে বেহাল, তারপর আবার উটকো ঝামেলা। প্রথমে কিঞ্চিৎ ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেও নিজেকে বেশ সামলে নিয়েই চটজলদি বললাম, ‘নো, সরি!’ প্রথম দিনের কাজ তো মোটামুটি সারা হলো। পরদিন থেকেই অফিস শুরু। রান্নাবান্নাও করতে হবে।

পাখির চোখে থম্পসন
ছবি: লেখক

এখন স্বাভাবিকভাবেই সবার মাথায় প্রশ্ন আসছে, থম্পসনের অবস্থা এমন হলো কেন? ইতিহাসের পাতায় থম্পসনের উৎপত্তি আমাদের ঠিক বিপরীতমুখী বার্তা দেয়। ১৯৫৬ সালে ম্যানিটোভা প্রভিন্সের কেন্দ্রস্থল উইনিপেগ থেকে ৭৬১ কিমি দূরের এক শহরে নিকেলের খনির খোঁজ পাওয়া যায়। খনি আবিষ্কারের সঙ্গে যে মার্কিন প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল, তার চেয়ারম্যান জন ফেয়ারফিল্ড থম্পসনের নামানুসারে এই শহরের নামকরণ হয়। শুধু খনির উৎপত্তিস্থল নয়; বরং পুরো শহরের গোড়াপত্তনেই চূড়ান্ত ভূমিকা ছিল এই মাইনিং কোম্পানির, যার নাম ইনকো মাইনিং কোম্পানি। এর পর থেকে বেশ লম্বা একটা সময় অতিক্রম করে উত্তরের কেন্দ্রস্থল হিসেবে নিজের পরিচয় পাকাপোক্ত করে ফেলে নিকেল নগরী। ১৯৬৭ সালে বাড়ন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল বিবেচনায় পৌরসভা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৭০ সালে রানি এলিজাবেথের কানাডা সফরকালীন সময়ে অর্জন করে নগরীর মর্যাদা। কালক্রমে ২০১৮ সালে বন্ধ হয়ে যায় এর গলনাগার ও পরিশোধনাগারের কার্যক্রম। শুধু খনিজ পদার্থ অপসারণ এবং পরবর্তী ধাপের কাজ অব্যাহত থাকে। ২০২১ সালে এর কার্যক্রম আরও এক দশক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে অপরিশোধিত নিকেল অপসারণের কাজ কিছুটা বৃহৎ পরিসরে শুরু করা হয়, যা এখনো চলমান রয়েছে। তবে ১৯৭০ সালে থম্পসন শহরে যে পরিবেশ বিরাজ করত, তার খণ্ডাংশও আজ অবশিষ্ট নেই। আর যখন নিকেল কোম্পানির কাজ শেষ হয়ে আসতে শুরু করল, তখন মূল কর্মসংস্থানের স্রোত অন্যদিকে বিশেষ করে রাজধানীতে বা অন্যান্য বড় শহরগুলোতে বাহিত হলো। কোনো শহরে জীবিকার অভাব হলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। তার ওপর সরকার এই শহরে স্থাপন করে মাদকাসক্ত পুনর্বাসনকেন্দ্র। বিভিন্ন শহর থেকে ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের এ সমস্ত কেন্দ্রগুলোতে এনে রাখা মানে এলাকায় যত্রতত্র তাঁরাই দাপিয়ে বেড়ানোও শুরু করেন। বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের পাচারের কার্যক্রমও বৃদ্ধি পায় এর সূত্র ধরে। থম্পসনের একসময়ের গৌরবোজ্জ্বল পরিচয় হারিয়ে যায় কালের করালগ্রাসে। (চলবে...)

‘কানাডার পথ ও রথের বৃত্তান্ত’—লেখকের দ্বিতীয় বই, যা পর্ব আকারে ‘কানাডার চাকরি বৃত্তান্ত’ শিরোনামে দূর পরবাসের পাতায় প্রকাশিত হয়েছে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]