লুই চতুর্দশের গৌরবময় শাসন ও পতনের ইতিহাস।
১৪ অক্টোবর ২০২৫
প্যারিস ভ্রমণের তৃতীয় দিনে আমাদের যেতে হলো শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ‘ভার্সাই রাজপ্রাসাদ’, ইউরোপের ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন দর্শনে। এই প্রাসাদের অভ্যন্তরে শিশুদের স্টলার নিয়ে চলা সহজতর ছিল না বলে আমার মেয়ে ও ৪ মাসের রূপকথাকে হোটেলে রেখে সহধর্মিণী, জামাতা অনিতকে নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। আগেই অনিতের রাজপ্রাসাদের অভিজ্ঞতা আমাদের মুখ্য স্থানগুলো দেখতে সহায়ক ছিল।
অঁদ্রে লে নোত্রে কর্তৃক পরিকল্পিত ফরাসি রাজাদের ঐশ্বর্য, শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক চমৎকার প্রতিফলন এই প্রাসাদ। এটি ছিল আমার জীবনের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। সকালে আমরা প্যারিস শহর থেকে ট্রেনে চেপে ভার্সাই শহরের পথে রওনা হই। ট্রেনযাত্রাটি ছিল প্রায় ৩০ মিনিটের। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখা যাচ্ছিল সবুজ মাঠ আর নিস্তব্ধ ইউরোপীয় উপশহরের দৃশ্য। ভার্সাই স্টেশনে পৌঁছে প্রাসাদের দিকে হাঁটতে হাঁটতে দূর থেকেই দেখছিলাম সোনালি রঙের বিশাল গেট, যেন রাজকীয় আভিজাত্যের প্রতীক।
ভার্সালাইসের ইতিহাস
ইউরোপের ইতিহাসে এমন কিছু শাসকের নাম আছে, যাঁদের রাজত্ব একটি পুরো যুগকে সংজ্ঞায়িত করে। ফ্রান্সের রাজা লুই চতুর্দশ তেমনই এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। ১৬৩৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া লুই মাত্র ৪ চার বছর বয়সে, ১৬৪৩ সালে ফ্রান্সের সিংহাসনে আরোহণ করেন। শৈশবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ছিল তাঁর মা রানি অ্যান অব অস্ট্রিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী কার্ডিনাল মাজাঁরিনের হাতে। কিন্তু ১৬৬১ সালে মাজাঁরিনের মৃত্যুর পর দৃশ্যপট বদলে যায়। লুই নিজ হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করে ঘোষণা করেন, ‘রাষ্ট্র মানেই আমি।’ এই ঘোষণাই ইউরোপে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের এক শক্ত ভিত্তি স্থাপন করে।
ইউরোপের যেকোনো ঐতিহাসিক স্থাপত্য দেখতে চাইলেই পকেটের ইউরো গুনতে হবে। অনেক আগেই অনিত অনলাইনে বুকিং দিয়েছে রাজপ্রাসাদে ঢুকতে, যার প্রবেশমূল্য প্রতিজনে ২০ ইউরো (বাংলা টাকায় প্রায় ৩ হাজার)। মুঠোফোনে টিকিট দেখিয়ে পর্যটকদের সারিবদ্ধ লম্বা লাইন এবং মূল ফটকের কয়েক ধাপ সিকিউরিটি পার করে ভেতরে প্রবেশের পরই চোখে পড়ল বিশাল আঙিনা ও প্রাসাদের জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপত্য। তথ্যকেন্দ্র থেকে জানা গেল, প্রাসাদের ভেতরে ২০০টির বেশি ভাস্কর্য (Sculpture) ও ৫০টির বেশি ফোয়ারা (fountain) রয়েছে। প্রাসাদের প্রতিটি অংশে সোনালি অলংকরণ, মূর্তি ও রঙিন পাথরের কাজ।
ভার্সাই প্রাসাদের হল অব মিররস–এ (Hall of Mirrors) ঢুকে কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়াতে হলো। লম্বা হলঘরজুড়ে সারি সারি আয়না আর জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া আলো আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে পুরো জায়গাটাকে যেন অন্য এক সময়ে নিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, এই মেঝের ওপর দিয়েই একদিন রাজা-রানিরা হেঁটেছেন, দরবার বসেছে, ইতিহাস লেখা হয়েছে।
আয়নাগুলোর দিকে তাকালে নিজের প্রতিবিম্বের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিশে যাচ্ছিল অতীতের ছায়া। সোনালি কারুকাজ আর ঝাড়বাতির আলো চোখে পড়লেও, মনে বেশি দাগ কাটল এখানকার নীরবতা। এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও যেন ইতিহাস চুপচাপ কথা বলছিল।
হলঘরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মনে হলো,এই আয়নাগুলো শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, এরা সময়কে ধরে রেখেছে। এখানেই ১৯১৯ সালের ২৮ জুন, এই প্রাসাদের হল অব মিররস–এ অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (World War-I) সমাপ্তি ঘোষণা করা ভার্সাই চুক্তি ‘Treaty of Versailles’ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান। এই চুক্তির মাধ্যমেই জার্মানিকে যুদ্ধের দায় স্বীকার করতে ও ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়। এখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় বুকের ভেতর একধরনের ভারী অনুভূতি রয়ে গেল, যেন ইতিহাস আমাকে নীরবে বিদায় জানাল।
ফ্রান্সের রাজা লুই চতুর্দশ ‘সূর্যরাজা’ নামে পরিচিত এই শাসক ৭২ বছরের দীর্ঘ রাজত্বে ফ্রান্সকে যেমন ইউরোপের শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন, তেমনি তাঁর নীতিই ভবিষ্যতের ফরাসি বিপ্লবের বীজ বপন করেছিল। তাঁর শাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান নিদর্শন হলো ভার্সাই প্রাসাদ। তিনি প্যারিস থেকে রাজদরবার সরিয়ে প্রশাসন ও অভিজাত সমাজকে ভার্সাইয়ে কেন্দ্রীভূত করেন। সোনালি অলংকরণ, আয়নাঘেরা হলঘর ও সুবিশাল উদ্যানসমৃদ্ধ এই প্রাসাদ হয়ে ওঠে ফরাসি রাজশক্তির প্রতীক। একই সঙ্গে এটি ছিল অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল।
লুই চতুর্দশের শাসনকালে ফ্রান্সে শিল্প, সাহিত্য ও স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ সূচিত হয়। নাট্যকার মলিয়ের, সুরকার লুলি এবং বহু চিত্রশিল্পী ও স্থপতি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খ্যাতি অর্জন করেন। তবে ধর্মীয় ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কঠোর ও অনমনীয়। ১৬৮৫ সালে এডিক্ট অব নান্তেস (Edict of Nantes) বাতিলের মাধ্যমে প্রোটেস্ট্যান্ট হুগেনটদের ওপর নিপীড়ন শুরু হয়। এর ফলে বহু দক্ষ কারিগর ও ব্যবসায়ী দেশত্যাগ করেন, যা ফ্রান্সের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ইউরোপে ফরাসি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লুই চতুর্দশ একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন—৯ বছরের ডাচ্ যুদ্ধ এবং স্পেনীয় উত্তরাধিকার যুদ্ধ। প্রাথমিক সাফল্যের পর এসব যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের কোষাগার শূন্য করে দেয়। করের বোঝা বাড়তে থাকে সাধারণ মানুষের ওপর আর গ্রামাঞ্চলে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্য। শাসনের শেষ দশকে লুই চতুর্দশ আর সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী শাসক ছিলেন না। অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যাভাব এবং ধারাবাহিক মৃত্যুশোক তাঁর রাজত্বকে দুর্বল করে তোলে। রাজদরবারের বিলাসিতা ও জনগণের দুর্দশার ব্যবধান ক্রমেই বাড়তে থাকে।
শক্তিধর রাজা লুই চতুর্দশ, সূর্যরাজার অবসান ১৭১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর, ভার্সাই প্রাসাদেই ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যু হয় লুই চতুর্দশের। গ্যাংগ্রিনে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পর মাত্র পাঁচ বছর বয়সী প্রপৌত্র লুই পঞ্চদশ সিংহাসনে বসেন, যাঁর দুর্বল শাসন ভবিষ্যতে ফরাসি বিপ্লবের পথ সুগম করে। লুই চতুর্দশ ছিলেন একাধারে নির্মাতা ও ধ্বংসের পূর্বসূরি। তাঁর শাসন ফ্রান্সকে ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে এলেও, তাঁর নীতিই রাজতন্ত্রের ভিত দুর্বল করে দেয়। সূর্যরাজা অস্ত গেছেন বহু আগেই, কিন্তু তাঁর দীর্ঘ ছায়া আজও ইতিহাসের পাতায় স্পষ্ট।
ভার্সাই প্রাসাদ বর্তমানে রাষ্ট্রীয় জাদুঘর—রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রতিটি কক্ষ যেন একেকটি শিল্পকর্ম। অপলক দৃষ্টিতে দেখলাম—রাজা ও রানির শয়নকক্ষ, রাজদরবার, নৃত্যকক্ষ ও রাজসভা—সবকিছুই সুন্দরভাবে সংরক্ষিত। প্রতিটি ঘরে রাজকীয় আসবাব, সোনালি কারুকাজ এবং বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম দেখা যায়। বিশেষ করে রাজা লুই ও রানি মেরি আঁতোয়ানেতের ব্যবহৃত জিনিসগুলো দেখতে পেয়ে ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। মিউজিয়ামের বিভিন্ন অংশে ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস, রাজপরিবারের বংশলতিকা এবং সেই সময়ের শিল্পসংস্কৃতি সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছিল।
ঐতিহাসিক এই রাজপ্রাসাদ দেখতে বছরে বিশ্বের ৭০-৮০ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন। প্রাসাদে ২ হাজার ৩০০টির বেশি কক্ষ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭০০টি কক্ষ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। মিউজিয়ামে চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, ঐতিহাসিক দলিল ও রাজপরিবারের ব্যক্তিগত সামগ্রী প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রাসাদের অন্যতম আকর্ষণ হলো, এর বিশাল রাজউদ্যান। শত শত কক্ষের মাত্র উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কক্ষ আমরা ৫ ঘণ্টায় দেখতে পেরেছি। সব কক্ষ দেখতে হলে ২–৪ দিন লেগে যাবে। রাজা লুই চতুর্দশের সময় এখানে ‘মিউজিক্যাল ফাংশন শো’ (Musical Fountain Show) অনুষ্ঠিত হতো, যা এখনো পর্যটকদের জন্য চালু আছে।
রাজপ্রাসাদের বাইরে রয়েছে প্রায় ৮০০ হেক্টর জায়গাজুড়ে বাগান, যা ইউরোপের অন্যতম সুন্দর রাজউদ্যান হিসেবে পরিচিত। বাগানের ভেতর রয়েছে অসংখ্য ফুলের বেড, লতাগুল্ম, পাথরের ভাস্কর্য এবং সুরেলা সংগীতের তালে নাচতে থাকা ফোয়ারা। রয়েছে একটি বড় কৃত্রিম হ্রদ (Grand Canal), এই কৃত্রিম হ্রদের (Grand Canal) চারপাশে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল যেন রূপকথার কোনো রাজ্যে এসে পড়েছি। বাগানের মধ্যে অনেক পর্যটক পিকনিক করছিলেন, কেউ ছবি তুলছিলেন, আবার কেউ ছোট নৌকা ভাড়া নিয়ে হ্রদে নৌভ্রমণ করছিলেন।
ইতিহাসের মূল্যায়ন
লুই চতুর্দশের পতন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা যত উজ্জ্বলই হোক, তা চিরস্থায়ী নয়। যিনি একদিন নিজেকে রাষ্ট্রের সমার্থক ভেবেছিলেন, তিনিই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখলেন, তাঁর গড়ে তোলা ঐশ্বর্যের ভিত ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। ভার্সাইয়ের ঝলমলে আয়নাঘর তখনো আলোয় ঝলমল করছিল, কিন্তু সেই আলো আর জনগণের চোখে আনন্দ আনতে পারেনি।
একজন রাজা যখন জনগণের কণ্ঠস্বর শুনতে ভুলে যান, তখন তাঁর প্রাসাদের দেয়াল যত উঁচুই হোক না কেন, ইতিহাসের বিচার থেকে তিনি রেহাই পান না। লুই চতুর্দশের জীবনের শেষ অধ্যায় তাই শুধু একজন রাজার বার্ধক্য নয়, এটি ছিল এক ব্যবস্থার ক্লান্তি, এক শাসনের নিঃশব্দ অবসান। তাঁর মৃত্যুর পর সূর্য অস্ত গিয়েছিল, কিন্তু রেখে গিয়েছিল দীর্ঘ ছায়া—ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, শূন্য কোষাগারের ভার আর এক অশান্ত ভবিষ্যতের পূর্বাভাস। সেই ছায়ার মধ্য দিয়েই ফ্রান্স একদিন এগিয়ে গিয়েছিল বিপ্লবের পথে।
লুই চতুর্দশের পতন তাই শুধু ইতিহাস নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। ক্ষমতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানবিকতায় বাঁধা থাকে। নচেৎ ইতিহাস নির্মমভাবে মনে করিয়ে দেয়, সূর্যও অস্ত যায়।
*লেখক: শাহ জালাল ফিরোজ, স্টুটগার্ট, জার্মানি
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]