আদিবাসী কালচারাল অফিসে রাতের খাবার খেয়ে সোজা চলে গেলাম পাহাড়ের দিকে। রাতের পোকামাকড় ধরার জন্য কিছু ফাঁদ তৈরি করব আমরা। পাহাড়ি এলাকায় যেসব পতঙ্গ পাওয়া যায়, তার সঙ্গে আমাদের নিজদের দেশের কোনো সামঞ্জস্য আছে কি না, তা দেখাই মূল উদ্দেশ্য। মাথায় বসানো সাফারি লাইটের আলোয় পাথুরে পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠছি তো উঠছিই। হাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল হৃৎকম্পের সংখ্যা। আশার কথা হলো, আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আদিবাসীদের একটি দল।

এভাবে ঘণ্টাখানেক আসার পর কিছুটা সমতল ভূমির মতো দেখা পেলাম। বলা হলো, এ জায়গাই ফাঁদ পাতার জন্য আদর্শ। আমরা দুটো গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যথাসময়ে কাজ শেষ করে আলো নিভিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। মাঝেমধ্যে পাহাড়ের ওপর থেকে অদ্ভুত রকমের ডাক ভেসে আসছিল। গা চমচমে পরিবেশ। আমাদের সঙ্গে থাকা বুনন গোত্রপ্রধান বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন কোনটা কোন প্রাণীর ডাক।

আমাদের স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, পাহাড়ে এমন কিছু করা যাবে না, যাতে বন্য প্রাণীরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়। বন্য জীবজন্তু কোনো কারণে ভয় পেলে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে আক্রমণ করে মানুষের ওপর। এ সতর্কবার্তা মাথায় রেখে সবাই ঘুটঘুটে অন্ধকারে বসে রইলাম।

এমনকি কোনো প্রকার উচ্চ স্বরের শব্দ ছাড়া। এরই মধ্যে দূরের উঁচু পাহাড়গুলোয় কিছু মিটিমিটি আলো দেখা যাচ্ছিল। জানলাম, ওদিকে বুনন গোত্রের বসতি। এভাবে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর আবার আলো জ্বালালাম।

দেখি আমাদের ফাঁদে বিভিন্ন ধরনের পোকা ধরা পড়েছে। এদের দেখে খুব পরিচিত মনে হলো। বেশির ভাগ আমাদের বাংলাদেশেও পাওয়া যায়। কিছু পোকামাকড় রেখে দিলাম নমুনা হিসাবে।

এদিনের মতো কাজ শেষে এবার পাহাড় থেকে নেমে আসার পালা। উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠায় এর মাঝে কয়েক ঘণ্টা সময় চলে গেছে বোঝাই গেল না। এবার রাতের ঘুমের পালা। সবাই মিলে চললাম নদীর ধারে আদিবাসীদের পরিচালিত নিনজি গেস্ট হাউসের দিকে। চমৎকার একটি জায়গায় গেস্ট হাউসটির অবস্থান। কেউ যদি কিছুদিন নিরিবিলিতে সময় কাটাতে চায়, এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। সত্যি বলতে, রাতের বেলায় তেমন আলাদা বলে কিছু মনে হয়নি।

বরং গহিন এলাকা বিধায় মনের ভেতর সারাক্ষণ একটা আতঙ্ক কাজ করেছিল। তবে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চোখ জুড়িয়ে গেল। বিশাল সব পর্বতঘেরা এক টুকরা সবুজ সমভূমি। প্রথমেই চোখ পড়ল লাল রঙের ফুলের থোকার দিকে, তারপর দূরের পাহাড়। আর একই সঙ্গে শুনতে পাচ্ছিলাম পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নামাসিয়া নদীর পানির কলকল শব্দ। সকালের নাশতা করে সবাই ঝটপট বেরিয়ে পড়লাম। এবারের গন্তব্য কানাকানা বো গোত্রপ্রধানের বাড়ি। সেখানে যাওয়ার জন্য পাহাড়ের পাশ ধরে ছোট রাস্তা রয়েছে।

সকালবেলার পাহাড়ের ঠান্ডা পরিবেশে হাঁটতে ভালোই লাগছিল। কিছু দূর পর পর চোখে পড়ছিল ওপর থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঝরনা। কখনোবা বিশাল আকারের ধসে পড়া পাথরের স্তূপ। এসব ছাপিয়ে আমরা বেলা ১১টার ভেতর চলে এলাম কানাকানা বো গোত্রপ্রধানের বাড়ি। এখানে আমাদের জন্য দুপুরের খাবার আয়োজন করা হয়েছে। দুপুরের খাবার খেয়ে মাছ ধরতে যাব আদিবাসী কায়দায়। তবে তার আগে চলল গাছের ডালপালা দিয়ে মাছ শিকারের কলাকৌশল। একজন প্রশিক্ষক লম্বা সময় নিয়ে আমাদের সব শিখিয়ে দিল।

মাছ শিকারের কৌশল শেখার পর এবার প্রয়োগ করে দেখানোর পালা। প্রশিক্ষকসহ কয়েকজন কানাকানা বো গোত্রের লোক আমাদের নিয়ে চলল নদীর পাশ ধরে। পাহাড়ি উঁচু–নিচু রাস্তা। পা ধরে আসছিল। কিন্তু থামার উপায় নেই। একপর্যায়ে একটি জলপ্রপাতের দেখা পেলাম। ভেবেছিলাম এটাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্থান। না, ভুল ভাঙল একটু পরেই। প্রশিক্ষক জানালেন আমাদের এখন এ জলপ্রপাত ধরে পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে হবে। এখনো বর্ষাকাল শুরু না হওয়ায় পানির তেমন স্রোত ছিল না। তবে পাথর খুব পিচ্ছিল, যা দেখে বোঝার উপায় নেই। তিনি আমাদের আরও একটি সতর্কবার্তা দিলেন।

পাহাড়ের ওপর প্রচুর মশা আছে, এমনকি আছে বিষধর সাপ। সাপের কথা শুনে সবাই একটু ভয় পেয়ে গেল। এ দেখে হেসে জানালেন, পাহাড়ে মানুষ আর প্রাণীর চমৎকার সহাবস্থান আছে। কেউ কারও ক্ষতি করে না। আমরা একটু হলেও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। তবে সতর্কতা হিসেবে গামবুট পরে নিতে বলা হলো। মোটা জিনসের সঙ্গে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা গামবুট। প্রায় আধা ঘণ্টা সময় পাহাড়ের ছড়া ধরে ওঠার পর একটা বিশাল পাথর দিয়ে আটকে পড়া পানির দেখা পেলাম। বলার আগেই বুঝে গেলাম এটাই আমাদের মাছ ধরার সেই জায়গা।

মানুষ মাছ ধরতে নদীতে না গিয়ে উল্টো পাহাড়ের ওপর উঠে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। ঘণ্টাখানেক চেষ্টার পর আমাদের ২০ জনের গ্রুপ অল্প কিছু চিংড়ি ধরতে পারল।

ওদিকে আমাদের প্রশিক্ষক একের পর বিভিন্ন ধরনের ছোট বড়–মাছ ধরেই চলেছে! মাছ ধরা শেষে আমরা সবাই আবার ফিরে এলাম। ইতিমধ্যে খিদেয় সবার অবস্থা বেশ কাহিল। কানাকানা বো গোত্রের সঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে সবাই ফিরে এলাম নিনজি গেস্ট হাউসে।

ব্যস্ত দিনের শেষে সবাই ক্লান্ত। ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাব। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না। দিনের বেলায় দেখেছিলাম, গেস্ট হাউসের পাশে নদীর ধারে ছাউনি দেওয়া একটা বসার জায়গা। অধ্যাপক সবাইকে ডেকে নিয়ে গেলেন সেখানে। সেখানে চা, কফিসহ সব ধরনের ড্রিংসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঠিক হলো, প্রত্যেকে তার নিজ নিজ ভাষার একটি করে গান ইউটিউব থেকে বাজিয়ে শোনাবে। এভাবে মাঝরাত অবধি বহুজাতিক তুমুল আড্ডা চলতেই লাগল। আমি রাত একটার দিকে ঘুমোতে চলে এলাম। দুই দিনে পাহাড়ি চড়াই-উতরাই পেরোতে গিয়ে শরীর একদম ক্লান্ত।

পরদিন সকাল বেলায় চললাম আদিবাসী হ্যান্ড ক্র্যাফট এডুকেশন সেন্টারে। আমাদের হাতেকলমে শেখানো হলো হ্যান্ড ক্র্যাফট কীভাবে বানাতে হয়। প্রশিক্ষক কানাকানা বো আদিবাসী গোত্রের মেয়ে। তবে তার বেশভূষা দেখে অবাক হলাম। ভাষা, চালচলন খুবই আধুনিক। কথা বলে জানলাম, কয়েক বছর আগে জাপান থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে এসেছে।

তাইওয়ানে আসার পর থেকেই নামাসিয়ার আদবাসীদের নিয়ে কাজ করছে। ইতিমধ্যে এই হ্যান্ড ক্র্যাফট প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি শাখা খোলা হয়েছে বেশ কয়েকটি শহরে। জানাল, আদিবাসী সংস্কৃতিকে সবার সঙ্গে পরিচয় করানো এবং একই সঙ্গে তাদের তৈরি জিনিসপত্র শহরাঞ্চলে জনপ্রিয় করাই তার উদ্দেশ্য।

দুপুরের খাবার খেয়ে সবাই চললাম বুনন আদবাসী গোত্রের দিকে। বুনন গোত্রের লোকেরা বাস করে পাহাড়ের চূড়ায়। ভাগ্য ভালো বলতে হবে। ওখানে যাওয়ার জন্য সুন্দর একটা রাস্তা আছে। তাই গাড়িতে বসেই যাচ্ছি। সেখানে আমাদের শেখানো হবে বন্য পশু শিকারের বিভিন্ন কলাকৌশল। তারপর তাদের সঙ্গে যাব সত্যিকারের পশু শিকারে। দেখলাম, বুননরা অন্য সব তাইওয়ানিজের মতো নয়। শারীরিক গঠন দেখতে বেশ শক্তিশালী।

দেখলেই বোঝা যায় এরা শিকারি জাতি। চোখে–মুখে শক্তিমত্তার একটা ভাব ফুটে আছে। গোত্রপ্রধানের বাড়িতে আমাদের সবাইকে স্বাগত জানানো হলো তাদের নিজস্ব রীতি অনুযায়ী। ভাগ্য খারাপই বলতে হবে। শিকারের বিভিন্ন কৌশল শিখলেও কাজে লাগানোর কোনো সুযোগ এল না। বিকেলের দিকে চারপাশ সব ঠান্ডা কুয়াশায় ঢেকে গেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম শীতকালের দরুন পাহাড়ে আগেভাগেই ঘন কুয়াশা পড়েছে।

একটু পর জেনির কথায় আমার ভুল ভাঙল। জানাল, এটা মেঘ। আর আমরা আছি এই মুহূর্তে সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ১ হাজার ১২০ মিটার উঁচুতে। বুনন গোত্রপ্রধান অবশ্য আমাদের হতাশ করলেন না।

তাঁর আগের শিকার করা হরিণের মাংস দিয়ে রাতের খাবার আয়োজন করলেন। রাত যেমন বাড়ছিল, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা। আমরাও ফিরে আসার জন্য তৈরি হয়ে গেলাম। এরই মাঝে অধ্যাপক ঘোষণা দিলেন, আগামীকাল এমন একজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যিনি স্বচক্ষে সেংকুলকে দেখেছেন।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি আকাশ অন্ধকার। বৃষ্টি শুরু হতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। অচিন পাখি সেংকুল যিনি দেখেছেন, তাঁর আসার কথা ঠিক সকালের নাশতার পর। যেমনটি ভেবেছিলাম তা হয়নি। যিনি আসলেন তিনি বেশ হাসিখুশি মানুষ। সেংকুল নিয়ে অনেক গল্প বললেন।

জেনি তাঁর কথা আমাদের অনুবাদ করে শোনাচ্ছিল। জানলাম, এ অচিন পাখিকে অতি পবিত্র বলে বিবেচনা করা হলেও সাধারণ মানুষের জন্য তা আতঙ্কের। লাল রঙের এ পাখি হঠাৎ আকাশ থেকে লোকালয়ের কোনো একটি বাড়ির ওপর উড়ে আসে। তারপর ওই বাড়িকে ঘিরে কয়েকটি চক্কর দিয়ে আবার আকাশে মিলিয়ে যায়। তখন ধরে নেওয়া হয় ওই বাড়িতে কেউ একজন খুব শিগগির মারা যাবে।

আমরা সবাই তন্ময় হয়ে শুনছিলাম তাঁর কথা। এ যেন এক হারিয়ে যাওয়া অন্য জগতের গল্প। মেক্সিকোর শিক্ষার্থী ড্যানিয়েল প্রশ্ন করল,

-আপনি প্রথম কবে সেংকুল দেখেছিলেন?
তিনি উত্তর দিলেন,
-তখন বয়স বারোর কাছাকাছি। একদিন হঠাৎ লাল রঙের একটি অচেনা পাখি চাচার বাড়ির ওপর কয়েকটি চক্কর দিয়ে আকাশে মিলিয়ে গেল। এ দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। বাড়ি এসে তার মা-বাবার কাছে প্রথম ঘটনাটি বলি।

কিন্তু তাঁরা এ কথা কাউকে বলেননি। কিছুক্ষণ পর জানা গেল চাচা মারা গিয়েছে। পরে ধীরে ধীরে এ কথা সবার কাছে প্রচার হয়ে যায়।

আমি লক্ষ করলাম, তিনি যখন সেংকুলের কথা বলছেন, তখন মুখের অভিব্যক্তি পুরো বদলে যাচ্ছে। যেন এই মুহূর্তে তাঁর চোখে সব ভাসছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,
আপনি জীবনে যতবার দেখেছেন, ততবারই কি তা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে?
রহস্যমাখা হাসি দিয়ে বললেন,

-সেংকুল শত শত বছর ধরে মৃত্যুর বার্তা নিয়ে আসছে। তার কোনো দিন ভুল হয় না।
এ কথা শুনে সবাই একটু সময়ের জন্য হলেও চুপ হয়ে গেল। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। বৃষ্টির ফোঁটায় জানালার কাচ ভিজে গিয়েছে। দূরের পাহাড়গুলোকে দেখা যাচ্ছে না। চারদিকে সাদা অপার্থিব একটা আবরণ। কেমন যেন ভয় ভয় অনুভূতি।

  • লেখক: বদরুজ্জামান খোকন, পিএচডি গবেষক, মলিকুলার মেডিসিন, ন্যাশনাল হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, তাইওয়ান