সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ ভিয়েতনাম: পর্ব-২

ছবি: লেখক

আগের পর্বের পরে...

হ্যানয় ভিয়েতনামের রাজধানী এবং দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এর ১,০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো সমৃদ্ধ ইতিহাস, ফরাসি ও চীনা সংস্কৃতির মিশ্রণ এবং চমৎকার স্থাপত্য এটিকে বিশেষভাবে পরিচিতি দিয়েছে। লোহিত নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই শহরটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী। এখানকার ব্যস্ত মোটরবাইকের স্রোত এবং বিশ্ববিখ্যাত স্ট্রিট ফুড এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেয়। একজন পর্যটকের চোখে হ্যানয়ের গল্প হল প্রাচীন ঐতিহ্য, লেকের ধারের প্রশান্তি এবং সরু রাস্তার প্রাণবন্ত জীবনের এক সুন্দর মিশ্রণ।

হ্যানয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

• প্রাচীন যুগ ও নামকরণ: এই অঞ্চলে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩,০০০ অব্দ থেকেই মানুষের বসবাস ছিল। ১০১০ সালে লি রাজবংশের প্রথম রাজা লি থাই তো এই শহরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝে একে রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন এবং এর নাম দেন ‘থাং লং’ যার অর্থ ‘উড়ন্ত ড্রাগন’। পরবর্তী সময়ে ১৮৩১ সালে এর নাম বদলে রাখা হয় ‘হা নোই’ বা হ্যানয়, যার অর্থ ‘নদীর ভেতরের শহর’

ছবি: লেখক

• সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মিশ্রণ: হ্যানয়ের সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিনের চীনা শাসন এবং পরবর্তীকালে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়। শহরের প্রাচীন মন্দিরগুলোতে চীনা কনফুসীয় দর্শনের প্রভাব এবং শহরের বিভিন্ন রাজপথে ফরাসি গথিক ধাঁচের দালানকোঠা ও ক্যাফে সংস্কৃতি এর প্রমাণ দেয়।

• স্বাধীনতার কেন্দ্রবিন্দু: বিশ শতকে ফরাসি শাসন এবং পরবর্তী সময়ে ভিয়েতনামের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হ্যানয় ছিল বিপ্লবের মূল কেন্দ্র। ১৯৪৫ সালে হো চি মিন এই শহরের বা দিন স্কয়ার থেকেই ভিয়েতনামের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

টেম্পল অব লিটারেচার ১০৭০ সালে কনফুসিয়াসের সম্মানে নির্মিত একটি মন্দির। এটি ছিল ভিয়েতনামের প্রথম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এর শান্ত পরিবেশ, সুন্দর উঠান এবং প্রাচীন কচ্ছপের মূর্তির পিঠে খোদাই করা প্রাচীন শিক্ষার্থীদের নামগুলো দারুণ ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

হ্যানয়ের প্রধান দর্শনীয় স্থান

হ্যানয় শহরের দর্শনীয় স্থানগুলোকে মূলত ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রাকৃতিক—এই কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।

ক) ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক নিদর্শন

• ইম্পেরিয়াল সিটাডেল অব থাং লং: এটি একটি ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। ১১ শতকে নির্মিত এই প্রাচীন দুর্গটি টানা ১৩ শতাব্দী ধরে ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল। এখানে প্রাচীন রাজকীয় ধ্বংসাবশেষের পাশাপাশি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত ভূগর্ভস্থ সামরিক বাংকার (D67) দেখার সুযোগ রয়েছে।

• হো চি মিনের সমাধি: বা দিন স্কয়ারে অবস্থিত এই বিশাল গ্রানাইটের তৈরি সমাধিটি ভিয়েতনামের জাতির জনক হো চি মিনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নির্মিত। এখানে তাঁর সংরক্ষিত দেহ সাধারণ মানুষের দেখার জন্য রাখা আছে।

• হোয়া লো প্রিজন: ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে ভিয়েতনামের স্বাধীনতাকামীদের বন্দী ও নির্যাতন করার জন্য এই কারাগার তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন যুদ্ধবন্দীদেরও এখানে রাখা হতো, যারা একে ঠাট্টা করে ‘হ্যানয় হিলটন’ বলত। বর্তমানে এটি একটি হাড়হিম করা জাদুঘর।

আরও পড়ুন
ছবি: লেখক

খ) সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য

• টেম্পল অব লিটারেচার: ১০৭০ সালে কনফুসিয়াসের সম্মানে নির্মিত মন্দিরটি ছিল ভিয়েতনামের প্রথম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এর শান্ত পরিবেশ, সুন্দর উঠান এবং প্রাচীন কচ্ছপের মূর্তির পিঠে খোদাই করা প্রাচীন শিক্ষার্থীদের নামগুলো দারুণ ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

• ওয়ান পিলার প্যাগোডা: ১০৪৯ সালে নির্মিত এই অনন্য বৌদ্ধমন্দিরটি একটিমাত্র পাথরের স্তম্ভের ওপর জলের মধ্যে পদ্মফুলের মতো ভেসে থাকার আকৃতিতে তৈরি করা হয়েছে, যা স্থাপত্যশিল্পের এক চমৎকার নিদর্শন।

• ত্রান কুওক প্যাগোডা: এটি হ্যানয়ের সবচেয়ে প্রাচীন প্যাগোডা। ওয়েস্ট লেকের তীরে অবস্থিত এই লাল রঙের বহুতল মন্দিরটি ষষ্ঠ শতকে নির্মিত হয়েছিল।

পর্যটকদের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হ্যানয় ট্রেন স্ট্রিট। এটি এমন একটি সরু আবাসিক গলি যার ঠিক মাঝখান দিয়ে প্রতিদিন ট্রেন চলাচল করে এবং ট্রেনের একদম গা ঘেঁষে ছোট ছোট ক্যাফে গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া পর্যটকেরা এখানে এসে বিখ্যাত ভিয়েতনামী কফি ও ঐতিহ্যবাহী ওয়াটার পাপেট থিয়েটার উপভোগ করেন।

গ) প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্থানীয় জীবনযাত্রা

• হোয়ান কিয়েম লেক ও এনগোক সন টেম্পল: হ্যানয় শহরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত এই লেকটিকে ‘ফেরত দেওয়া তরবারির হ্রদ’ বলা হয়। স্থানীয় লোকগাথা অনুযায়ী, রাজা লে লোই এক জাদুকরি তরবারি দিয়ে শত্রুদের পরাজিত করার পর এক বিশাল কচ্ছপের মাধ্যমে সেই তরবারিটি ঈশ্বরের কাছে ফেরত দিয়েছিলেন। হ্রদের মাঝখানের দ্বীপে অবস্থিত এনগোক সন টেম্পলে যেতে একটি সুন্দর লাল কাঠের ব্রিজ পার হতে হয়।

• হ্যানয় ওল্ড কোয়ার্টার: হ্যানয়ের প্রাণকেন্দ্র হলো এর ওল্ড কোয়ার্টার, যা ১৩ শতাব্দী থেকে ৩৬টি বাণিজ্যিক গলির একটি পরিকল্পিত রূপ। এই গলিগুলোর নামকরণ হয়েছে সেখানকার পণ্য অনুযায়ী, যেমন সিল্ক স্ট্রিট, সিলভার স্ট্রিট। এর পাশেই আছে বিখ্যাত হোয়ান কিয়েম লেক, যা ‘পুনরুদ্ধারকৃত তরবারির হ্রদ’ নামেও পরিচিত। লোককথা অনুসারে, রাজা লে লোই এক জাদুকরি কচ্ছপের কাছ থেকে তলোয়ার পেয়ে যুদ্ধ জয় করেন এবং পরে সেটি এই হ্রদেই ফেরত দেন। সরু গলি ও প্রাচীন ‘টিউব হাউস’ সমৃদ্ধ এই এলাকা হ্যানয়ের বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানকার ৩৬টি রাস্তার নামকরণ হয়েছিল প্রাচীনকালের নির্দিষ্ট ৩৬টি কারুশিল্প বা ব্যবসার (যেমন রেশম, তামা, রুপা) নামে। পর্যটকেরা এখানে ভিয়েতনামের বিখ্যাত স্ট্রিট ফুড ও ঐতিহ্যবাহী এগ কফি চেখে দেখতে ভিড় করেন।

ছবি: লেখক

• থাং লং ওয়াটার পাপেট থিয়েটার: পানির ওপর পুতুল নাচ ভিয়েতনামের একটি প্রাচীন লোকশিল্প। ঐতিহ্যবাহী লাইভ মিউজিকের তালে তালে পানির ওপর পুতুলের মাধ্যমে ভিয়েতনামের গ্রামীণ জীবন ও প্রাচীন লোকগাথা ফুটিয়ে তোলা হয় এখানে, যা পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

• ইতিহাস এবং স্থাপত্যের মেলবন্ধন

শহরটির এক প্রান্তে রয়েছে ফরাসি আমলের স্থাপত্য যেমন সেন্ট জোসেফ ক্যাথেড্রাল এবং বিখ্যাত হ্যানয় অপেরা হাউস। অন্য প্রান্তে রয়েছে ভিয়েতনামের রাজনৈতিক কেন্দ্র বা দিন স্কয়ার, যেখানে ভিয়েতনামের মহান নেতা হো চি মিনের সমাধিস্থল অবস্থিত। এ ছাড়া ১০৭০ সালে নির্মিত ভিয়েতনামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ‘টেম্পল অফ লিটারেচার’ শহরের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক নিদর্শন।

• আধুনিক আকর্ষণ এবং স্থানীয় জীবন

বর্তমানে পর্যটকদের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হ্যানয় ট্রেন স্ট্রিট। এটি এমন একটি সরু আবাসিক গলি যার ঠিক মাঝখান দিয়ে প্রতিদিন ট্রেন চলাচল করে এবং ট্রেনের একদম গা ঘেঁষে ছোট ছোট ক্যাফে গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া পর্যটকরা এখানে এসে বিখ্যাত ভিয়েতনামী কফি ও ঐতিহ্যবাহী ওয়াটার পাপেট থিয়েটার উপভোগ করেন।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

হা লং বে

ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হা লং বে ভিয়েতনামের জনপ্রিয় প্রাকৃতিক বিস্ময়। পান্না সবুজ পানি আর হাজারো চুনাপাথরের পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ক্রুজ ট্রিপ করা প্রতিটি পর্যটকের জন্য একটি লাইফটাইম অভিজ্ঞতা।

হ্যানয় থেকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হা লং বে-এর একটি অংশ, ভিনহা লান হা বে ঘুরে দেখার জন্য জনপ্রিয় ১ দিনের ক্রুজ ট্যুর আছে। আমার সময় কম থাকায় আমি ট্যুরটি গ্রহণ করি, যার জন্য আমার খরচ হয় ৫০ ডলার। এই ট্যুরটি সাধারণত সকাল ৭টায় হ্যানয় ওল্ড কোয়ার্টার থেকে শুরু হয়ে রাত ৮টা ৩০ নাগাদ শেষ হয় এবং এতে জনপ্রতি প্রায় ৪৮ থেকে ৬০ মার্কিন ডলার খরচ পড়ে।

ছবি: লেখক

ট্যুরের মূল বিবরণ ও সময়সূচি

• সকাল ৭-৭টা ৩০: হ্যানয়ের হোটেল থেকে পিক-আপ এবং হাই ফং হয়ে ক্যাট বা দ্বীপের দিকে যাত্রা।

• বেলা ১১টা: ক্রুজে বোর্ডিং এবং লান হা বে-এর শান্ত ও সুন্দর সবুজ জলরাশির মাঝে যাত্রা শুরু।

• দুপুর ১২টা: ক্রুজের ভেতরে স্থানীয় সামুদ্রিক খাবার ও ভিয়েতনামী বুফে লাঞ্চ।

• বেলা ১টা-৩টা ৩০: কায়াকিং, সাঁতার কাটা, প্রাচীন কেভ বা গুহা অন্বেষণ এবং স্থানীয় ভাসমান গ্রাম পরিদর্শন।

• বেলা ৩টা ৩০-৪টা ৩০: সুডেকে রিলাক্সিং আফটারনুন টি এবং সূর্যাস্ত দেখার ছোট পার্টি, এরপর জেটির দিকে প্রত্যাবর্তন।

• বিকেল ৪টা ৩০-রাত ৮টা ৩০: বাসে করে পুনরায় হ্যানয়ে ফিরে আসা।

ট্যুরে যা যা অন্তর্ভুক্ত থাকে

• হ্যানয় থেকে রাউন্ড-ট্রিপ বাস ট্রান্সফার

• ক্রুজে দুপুরের খাবার (লাঞ্চ) ও ওয়েলকাম ড্রিংক

• ইংরেজি বলার মতো পেশাদার গাইড

• কায়াকিং এবং সাঁতার কাটার সুবিধা

• সাইটসিয়িং ও এন্ট্রান্স টিকিট।

হানয় শহরের প্রাণবন্ত নাগরিক জীবন, চমৎকার ট্রাফিক ও ক্যাফে কালচার এবং স্থানীয় মানুষদের আতিথেয়তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। সাগরের বুকে ক্রুজ শিপে কাটানো এই চমৎকার সময়টি ছিল নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি থেকে সম্পূর্ণ মুক্তির এক জাদুকরি মুহূর্ত।

আরও পড়ুন