হাঙ্গেরিতে রবীন্দ্রনাথের সন্ধানে

লেক বালাতনের অপার সৌন্দর্যছবি: লেখকের পাঠানো

আমরা শিক্ষা ক্যাডারের তিন সহকর্মী—আমি, মো. আবু নাছির ও উৎপল কুমার (তাঁরা দুজন হাঙ্গেরি সরকারের বৃত্তি নিয়ে পিএইচডিতে অধ্যয়নরত) বুদাপেস্টের সেন্ট্রাল রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে রওনা দিলাম সেন্ট্রাল ইউরোপের সবচেয়ে বড় হ্রদ ‘লেক বালাতন’ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের তীব্র শীত সত্ত্বেও ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে নতুন জায়গা দেখার উত্তেজনার কাছে এই ঠান্ডা যেন ম্লান হয়ে যায়।

বুদাপেস্ট থেকে বালাতন রেলস্টেশনের দূরত্ব প্রায় দুই ঘণ্টা। ঘণ্টাখানেক যেতেই ট্রেনের জানালা দিয়ে লেকের প্রথম দেখা মিলল। লেকের ধারে তীব্র শীতে হলুদ হয়ে যাওয়া ঘাসের প্রান্তর পেরিয়ে দূরে তাকাতেই নৈসর্গিক দৃশ্য চোখের সামনে ফুটে উঠল।

সদ্য বরফগলা দিগন্তবিস্তৃত নীল জলরাশি, ওপারে পাহাড়ের হাতছানি, মেঘলা আকাশের নিচে সাদা কুয়াশার ছোপ ছোপ আবরণ—সব মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নময় পরিবেশ। তীব্র শীতের মাঝেও পাখিরা আপন মনে উড়ে বেড়াচ্ছে স্বচ্ছ জলের ওপর দিয়ে। তাদের দেখে মনে হয়, কতটা স্বাধীন তারা! নেই কোনো সামাজিক চাপ, নেই প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা, নেই হিংসা বা হানাহানি। যেন এক মুক্ত জীবনের গান গেয়ে তারা পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ উপভোগ করছে।

রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তির পাদদেশে আমরা তিন সহকর্মী
ছবি: লেখকের পাঠানো

প্রকৃতির এই খেয়ালি রূপ উপভোগ করতে করতে আমরা পৌঁছে গেলাম বালাতনফুরেদ স্টেশনে। নেমেই ম্যাপে ‘R Tagore’ লেখা দেখে চমকে উঠলাম। মনে প্রশ্ন জাগল, এখানে আমাদের কবিগুরুর নাম কীভাবে এল! এক অদ্ভুত উত্তেজনায় ভরে উঠল মন।

স্টেশন থেকে বাসে করে লেকের কাছাকাছি এসে নামলাম। দিগন্তজোড়া নীল জলরাশি দেখে মন ভরে গেল। বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছু ছবি তুললেও মন পড়ে ছিল সেই ‘R Tagore’ নামটার কাছে। আমরা লেকের পাশের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলাম, খুঁজতে লাগলাম সেই নামের মাহাত্ম্য। হঠাৎ সহকর্মী উৎপল কুমার চিৎকার করে বললেন, ‘স্যার, ওই দিকে দেখুন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবক্ষ মূর্তি!’

আমরা প্রায় দৌড়ে সেখানে গেলাম। এই দূর দেশে এসে নিজের ভাষার কবির স্মৃতিচিহ্ন দেখতে পাওয়া সত্যিই এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি। যেন স্বপ্ন বাস্তবে ধরা দিল। প্রিয় মানুষের উপস্থিতি পুরো ভ্রমণটাকে আরও অর্থবহ করে তুলল।

কবি যে রাস্তায় প্রাতর্ভ্রমণ করতেন, সেটির নামকরণ করা হয়েছে ‘টেগোর সেতানি’। তিনি সেখানে নিজ হাতে একটি লিনডেন গাছের চারা রোপণ করেন। গাছটি আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে
টেগোর সেতানির সামনে লেখক
ছবি: উৎপল কুমার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালের মে মাসে ইউরোপ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কলকাতা থেকে রওনা দেন। আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি নেপলস, রোম, সুইজারল্যান্ড, লন্ডন, অসলো, স্টকহোম, হামবুর্গ, ভিয়েনাসহ বিভিন্ন দেশ ঘুরে হাঙ্গেরিতে আসেন। এখানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করেন এবং চিকিৎসার জন্য লেক বালাতনের কাছে একটি হাসপাতালে ভর্তি হন।

কবি যে হোটেলে ছিলেন, সেটি এখন ‘হোটেল টেগোর’ নামে পরিচিত। ২২০ নম্বর কক্ষে তিনি অবস্থান করতেন। সেই কক্ষের জানালা দিয়ে লেকের অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করতেন। লেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, লেকের পাশে ভ্রমণপিপাসু মানুষের নিত্য আনাগোনা, লেকের মাঝে সামারের নরম রোদের আলোয় জলরাশির মাঝে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের বহিঃপ্রকাশ কবির মনে অনেক প্রশান্তি এনে দেয় এবং কবি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন

কবি যে রাস্তায় প্রাতর্ভ্রমণ করতেন, সেটির নামকরণ করা হয়েছে ‘টেগোর সেতানি’। তিনি সেখানে নিজ হাতে একটি লিনডেন গাছের চারা রোপণ করেন। গাছটি আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে একটি ফলকে ইংরেজি ও হাঙ্গেরীয় ভাষায় কবির উক্তি খোদাই করা আছে:

“When I am no longer on this earth, my tree,

Let the ever-renewed leaves of thy spring

Murmur to the wayfarer:

The poet did love while he lived.”

এই গাছের পাশেই কবির আবক্ষ মূর্তি। দূর দেশে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রাণের মানুষের উপস্থিতি যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের বিশ্বব্যাপী বিস্তারের সাক্ষ্য দেয়। একই সঙ্গে হাঙ্গেরির মানুষ ও সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক নিঃশব্দ প্রকাশ। আবক্ষ মূর্তির ফলকে লেখা আছে:

‘তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ,

তাই তব জীবনের রথ

পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার

বারংবার।’

আবক্ষ মূর্তির নীচে নামফলক
ছবি: লেখকের পাঠানো

লেক বালাতনের নীল জলের পাশে দাঁড়িয়ে তখন মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি হ্রদ দেখতে আসিনি। আমরা এসে পড়েছি ইতিহাস, সাহিত্য আর স্মৃতির এক অনন্য মিলনস্থলে। এই ভ্রমণ তাই নিছক ভ্রমণ নয়। এটি যেন নিজের শিকড়ের সঙ্গে, নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে, নতুন করে দেখা হওয়ার এক দিন।

*লেখক: সুব্রত মল্লিক, সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার, পিএইচডি শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার, যুক্তরাজ্য।

আরও পড়ুন
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]