ভোট ও কার্যকার গণতন্ত্র যেভাবে

প্রথম আলো ফাইল ছবি

গণতন্ত্র একটি শাসনব্যবস্থা, যার মাধ্যমে শাসক পরিবর্তন করা যায়। এই শাসক পরিবর্তনের প্রধান উপায় হলো ভোট। আর ভোট দেন জনগণ—যাঁদের বলে ভোটার। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে আবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনে ১২ কোটির বেশি নারী–পুরুষ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মাধ্যমে দেশ পেতে যাচ্ছে নতুন শাসক।

এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই নতুন শাসক কি কার্যকর গণতন্ত্র উপহার দিতে পারবেন? নাকি কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব ভোটারদেরই? তাহলে কি কার্যকর গণতন্ত্র কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না? না, আমাদের দেশে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন?

আমাদের বুঝতে হবে পশ্চিমা বিশ্বে গণতন্ত্র কীভাবে কাজ করে। বাস্তবতা হলো, আমরা পশ্চিমা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো অনুকরণ করেছি, কিন্তু তাদের সমাজব্যবস্থা, ব্যক্তি-রাষ্ট্র সম্পর্ক কিংবা নাগরিক চেতনার গভীরতা ঠিকভাবে বুঝিনি। পশ্চিমা বিশ্বে রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান। সেখানে ব্যক্তি স্বাধীনভাবে বসবাস করে। তার জীবনযাত্রা মূলত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে সে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে । তার চিন্তাজগৎ অন্যের দ্বারা খুব কমই প্রভাবিত হয়।

এ কারণেই পশ্চিমা দেশগুলোতে নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো মূলত রাষ্ট্রের নীতি, অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনের সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করে। সেখানে একজন এমপি নির্বাচিত হলে ব্যক্তিগত জীবনে তাৎক্ষণিক লাভ বা ক্ষতির বিষয়টি ভোটারের কাছে মুখ্য নয়। রাষ্ট্রের জন্য কোনটি ভালো—সেই বিবেচনাই সেখানে ভোটের প্রধান ভিত্তি।

অন্যদিকে আমাদের দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির সরাসরি ও কার্যকর সম্পর্ক খুবই দুর্বল। অধিকাংশ মানুষ এক ধরনের গোত্রতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে বসবাস করে। কোনো এলাকায় মণ্ডল গোষ্ঠী বা চৌধুরী পরিবারের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। গোষ্ঠীর প্রধান যেখানে ভোট দেন, গোষ্ঠীর সদস্যরাও প্রায় বাধ্য হয়েই সেখানে ভোট দেন। ব্যক্তি নিজে অনেক সময় জানেই না কেন সে নির্দিষ্ট একজন প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছে। এমনকি সচেতন ভোটার হয়েও গোষ্ঠীপতির নির্দেশ অমান্য করে ভোট দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারিবারিক রাজনীতি। বাবা যদি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের সমর্থক হন, তাহলে সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যরাও প্রায় স্বাভাবিকভাবেই সেই দলকেই ভোট দিয়ে থাকে। আরেকটি বড় বাধা হলো দারিদ্র্য। আমাদের দেশের একটি বড় অংশ গরিব, যাঁরা মিল-কারখানা, খেতখামারে কাজ করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা অনেক সময় শ্রমিকদের চিন্তা ও মতামত প্রভাবিত করতে সক্ষম হন।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

অন্যদিকে অনেক প্রার্থীই ধনী শ্রেণির প্রতিনিধি। অর্থ ও ক্ষমতার জোরে তাঁরা সমাজে প্রভাব বিস্তার করেন। ফলে সাধারণ মানুষ হঠাৎ করে স্বাধীনভাবে চিন্তা করে ভোট দেওয়ার সাহস বা সুযোগ পায় না। এই সব কারণেই আমাদের দেশে সঠিক নেতা নির্বাচন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

এখন প্রশ্ন হলো—এই সমস্যার কি কোনো সমাধান নেই? বাস্তবে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোও খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। রাজনীতিক দলের প্রধান এই সমস্যাগুলো বোঝেন । কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তারা অসহায়। কোনো নির্বাচনী এলাকায় এমন প্রার্থী আছেন, যিনি পাঁচবার নির্বাচিত হয়েছেন। কীভাবে তিনি বারবার নির্বাচিত হয়েছেন, সে আলোচনা আলাদা বিষয়। কিন্তু দলীয় প্রধান চাইলেও তাকে সহজে বাদ দিতে পারেন না। দীর্ঘদিন এমপি থাকার কারণে তিনি এলাকায় শক্ত আর্থিক ও সামাজিক ভিত্তি গড়ে তুলেছেন। ফলে তার পরিবর্তে আরও যোগ্য, সৎ ও দূরদর্শী কাউকে সামনে আনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি একসময় গোত্রপ্রধানের মতো শক্ত অবস্থানে পৌঁছে যান।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় আমার মনে হয়, কার্যকর গণতন্ত্রের পথে বাধা কাটিয়ে ওঠার একমাত্র উপায় হলো সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে সরে এসে প্রেসিডেনশিয়াল–ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। প্রেসিডেনশিয়াল–ব্যবস্থায় সংসদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত চরিত্র, সততা ও যোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এসব গুণ থাকলেই কেবল তিনি জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত হতে পারেন।

একবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে সংসদে হার-জিতের ওপর তার ক্ষমতা নির্ভর করে না। ফলে তিনি মেধাবী, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন এবং দীর্ঘমেয়াদি ভালো নীতি প্রণয়ন করতে সক্ষম হন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর একটি উদাহরণ হিসেবে জিয়াউর রহমানের শাসনকাল উল্লেখ করা যায়। প্রেসিডেন্ট ছিলেন বলেই তিনি দক্ষ ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় স্থান দিতে পেরেছিলেন এবং কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তার পক্ষে তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মন্ত্রিসভায় বহু যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এসব মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করে গেছেন। যার সুফল সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোগ করেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই জিয়াউর রহমান জনগণের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এই জনপ্রিয়তার মূল কারণ ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সততা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার আন্তরিক প্রচেষ্টা। তিনি শুধু ক্ষমতায় থাকার কথা ভাবেননি; বরং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সবাইকে নিয়ে চলার যে মানসিকতা, তা তাকে একজন গ্রহণযোগ্য জাতীয় নেতায় পরিণত করেছিল। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছিল।

আরও পড়ুন

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের সামনে প্রশ্নটি ভিন্ন। আজ যে শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান, সেই কাঠামোর মধ্যেই যদি আমরা দেশের জন্য একটি কার্যকর পরিবর্তন চাই, তাহলে হঠাৎ করে প্রেসিডেনশিয়াল–ব্যবস্থা চালু করার ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। এটি কোনো একক ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর ইচ্ছায় সম্ভব নয়; এর জন্য সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।

তবে পরিবর্তনের একটি পথ এখনো আমাদের হাতে রয়েছে—আর সেটি হলো ভোট। গণতন্ত্রে ভোটই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আমরা যদি ভয়, লোভ, গোত্রবাদ কিংবা পারিবারিক চাপের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারি। যদি সৎ, যোগ্য ও দূরদর্শী মানুষকে নির্বাচিত করতে পারি, তাহলে বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যেও গণতন্ত্র কার্যকর করা সম্ভব।

*লেখক: মো. শফিকুর রহমান, অ্যাডিলেড, অস্ট্রেলিয়া থেকে