সবুজ বসনা

অলংকরণ: আরাফাত করিম

আতঙ্কে হাত থেকে ফোনের রিসিভার খসে পড়ল তার। টেলিফোন স্ট্যান্ড থেকে সভয়ে পিছিয়ে  এল সে। এবার ইরাজ বিব্রত ভঙ্গিতে একবার স্ত্রী রেবেকার দিকে আরেকবার হাজার মাইল দূর থেকে উড়ে এসে ওদের নির্বিবাদী জীবনে হঠাৎ ঢুকে পড়া সবুজ বসনা মেয়েটির দিকে তাকালো।

তখনো ঝুলে থাকা ফোনের রিসিভার থেকে শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশের নেত্রকোনা শহরের রেশমীর কান্নার মতো কণ্ঠ।

‘ভাইজান, ও ভাইজান আমার মেয়ে হিলমী ঠিকমতো পৌঁছেছে কি? কেমন আছে ও…’

একসময়ে রেশমীর গলা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে ওদের চারপাশে অখণ্ড স্তব্ধতা নেমে এল। রেশমীর কণ্ঠ থেমে যাওয়াতে ইরাজের দেহমন এক আশ্চর্য স্বস্থিতে ছেয়ে গেল। ইরাজের স্ত্রী রেবেকা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রিসিভার জায়গামত রাখল। তখনো রেবেকার শরীরে ঘিরে রাত পোশাক। এবার সে না কিশোরী, না যুবতী মেয়েটিকে দেখে নিয়ে স্বামী ইরাজের দিকে বড় বড় চোখ মেলে কাঠ কাঠ গলায় জানতে চাইল

‘মেয়েটিকে কোথা থেকে তুলে এনেছো?’

প্রায় মাঝ বয়সে পৌঁছা ইরাজ অপত্য স্নেহ চোখে মাখিয়ে মেয়েটিকে দেখে তোতলাতে তোতলাতে বলল

‘আমার হাতে বাংলায় লেখা প্ল্যাকার্ড দেখে ও নিজেই আমার কাছে  চলে আসলো আর…’

কথাটা ইরাজকে শেষ করতে না দিয়ে মাঝারি  গড়নের বুদ্ধিদীপ্ত মুখশ্রীর রেবেকা বিস্মিত গলায় বলে উঠল

‘ও তোমার দিকে চলে এল আর তুমিও কথাটি খরচ না করে ওকে গাড়িতে তুলে সাদরে বাড়িতে নিয়ে এলে!’

এবার ইরাজ একটু শক্তি নিয়ে উত্তর দিল

‘আরে না না, তা হবে কেন, আমি খেয়াল করে দেখলাম ওর পোশাকে সবুজ রং রয়েছে, তখন বুঝে গেলাম যে ওই–ই রেশমীর মেয়ে। তা ছাড়া তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, রেশমী কেমন আছে, ও বলল, ভালো।’

এবার ইরাজ আত্মপক্ষ সমর্থনে মেয়েটির দিকে ফিরে বিরক্তি নিয়েই জানতে চাইল

‘এই মেয়ে আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম না, তোমার মা রেশমী কেমন আছে, ও তোমাকে প্লেনে তুলে দিতে ঢাকায় এসেছিল কি না, তুমি মাথা নেড়ে সায় দিয়েছো। দাওনি?’

মেয়েটি যখন উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত, রেবেকা তখন জেরা করার আদলে ইরাজের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে

‘তুমি এই মেয়ের চুল দেখেছো? রেশমী ফোনে মেয়ের কি বর্ণনা দিয়েছিল মনে ছিল কি? জামাতে সবুজ রং ছাড়া অন্য কোনো কিছুইতো মিলছে না, তা ভালো করে তাকিয়ে দেখনি;  ঠিক তো।’

ইরাজ এবার সতর্ক চোখ মেলে স্নেহ নয়, সন্দেহ নিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাল। তারপর মনে হলো আপন মনে বলছে

‘আরে এর চুলতো খাটো!’

এবার রেবেকা অধৈর্য গলায় বলল, ‘হ্যাঁ এর শুধু চুল খাটোই নয়, এর গড়নও  হালকা পাতলা নয়। লম্বায় সে পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি হবে না।’

রেবেকা তারপর দাঁতে দাঁত ঘষে নিচু গলায় বলল, ‘শোন ইরাজ তুমি সত্যিকার অর্থে হাজার মাইল দূর থেকে দূর–আত্মীয় জ্ঞাতি বোনের চিল্লিয়ে বলা কথাগুলো মনেই রাখনি।’

এবার সে সবুজ বসনা মেয়েটির দিকে ফিরে জানতে চাইল, ‘এই মেয়ে এবার বলো তোমার মায়ের নামও কি রেশমী?’

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

এই প্রথম কথা শোনা গেল মেয়েটির। মাখনি রং প্যান্ট ও গলায় সবুজ সিল্কের স্কার্ফ ও এই দুই রঙের মিশ্রণে তৈরি পলক ডটের  কুর্তি বা ফতুয়া পরা রহস্যময়ী মেয়েটি সুন্দর বাংলা উচ্চারণে বলল, ‘আমার মা নেই’।

মেয়েটির উত্তর শুনে রেবেকা ও ইরাজ দুজনেই যেন ব্যথিত হলো, থমকে গেল। প্রথমত: ওর চমৎকার আমেরিকান উচ্চারণে ইংরেজি বলা ও দ্বিতীয়তো মা নেই কথাটা শুনে। রেবেকা নিজেকে সামলে নিয়ে কথা চালিয়ে গেল, ‘মা নেইতো কি হয়েছে তার নাম তো একটা ছিল ঠিক না? মানুষ বিখ্যাত, কি কুখ্যাত, যা–ই হোক নাম তার একটা ছিল। এবার বলো তার নাম রেশমী ছিল কি?’

মেয়েটি মুখে কিছু না বলে মাথা নেড়ে নেতিবাচক উত্তর দিল। এবার ইরাজ কড়া গলায় বলল, ‘আমি যখন জানতে চাইলাম, রেশমী কেমন আছে, তুমি বলেছিলে ভালো। কেন বলতো? তুমি তো রেশমীকে চেনই না’।

মেয়েটি এবার শান্ত ভঙ্গিতে শুদ্ধ উচ্চারণে ধীরে ধীরে বললো, ‘আমি জানতাম আপনি কিছু জিজ্ঞাসা করবেন, তাই অল্প কথায় কি উত্তর দেওয়া যায়, তাই ভেবে রেখেছিলাম।’

‘তুমি রেশমীকে চিনতে?’

‘না।’

রেবেকা ঝট করে উঠে গিয়েছিল, তেমনি চট করে ফিরে এল। ওর হাতে একটি আমেরিকান পাসপোর্ট। মেয়েটির পাসপোর্ট। এবার মেয়েটির আমেরিকান ইংরেজি জানার রহস্য জানা গেল। নিজের চেয়ারে বসে রেবেকা পাসপোর্টের পাতা খুলে স্পষ্ট উচ্চারণে পড়ে উঠল

‘নওশাবা আওয়াল’

এবার ইরাজ পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত গলায় বলে উঠল, ‘আরে এর পাসপোর্ট তো আমেরিকান! এই মেয়ের তো এ দেশে কোনো কিছুই অচেনা নয় তাইলে ও কেন হিলমীর জায়গায় চলে এল, বড় রহস্যময় ব্যাপার’

ইরাজ পাত্র দেখে খুশি খুশি মনে ফিরল। মাকে বলো, ‘বুঝলে মা ওকে সুদর্শন বললে কম বলা হবে। ওকে দেখলেই মন প্রফুল্ল হয়ে যায় আর ওর কথা শুনলে ওকে সবাই ভালোবাসবে, সম্মান করবে। ছোট্ট একটা সমস্যা অবশ্য আছে…’

পার্সপোর্ট খুঁটিয়ে পড়ে দেখা গেল এই মেয়ের বয়স আঠারোর ওপর। এই পাসপোর্টের সিল থেকে আরও জানা গেল চার মাস আগে সে নিউইয়র্কের জেএফকে এয়ারপোর্ট দিয়ে এই দেশ ছেড়েছিল আর আজকে জেএফকের সিল বলছে, ও আজই ফিরেছে।

ইরাজ চিন্তিত ব্যাকুল গলায় বলল, ‘তবে কি হিলমীকে ইমিগ্রেশন আটকে রেখেছে!’

নৈশব্দে ডুবে সবাই। রেবেকা ভাবছে অন্য কথা। নিউইয়র্কের বাইরে এক শহরে সেমিনারে ছিল বলে রেবেকা ইরাজের ভাগনি হিলমীকে এয়ারপোর্টে আনতে যেতে পারেনি। সেমিনারের আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে হিলমীর হাওয়ার হয়ে যাওয়ার কোথায় যেন একটা যোগসূত্র আছে মনে হচ্ছে। লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে রেবেকা অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছে। হিলমীকে আগামীকাল সকাল নয়টার আগেই জাতিসংঘ দপ্তরের ৭৭ নম্বর বিল্ডিংএ পৌঁছে দিতে হবে। হিলমী ডাক্তার। ও এসেছে জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক  কি এক সিম্পোজিয়ামে অংশ নিতে। এই প্রথম তার দেশের বাইরে পা রাখা। বোকা সে নয়। তবু হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যান্ড টেকনোলজি সেমিনার ফেরত রেবেকার মনে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল ভেবে যে হিলমী হিউম্যান ট্রাফিকারদের পাল্লায় পড়ল নাতো।

আকর্ষণীয় অবয়বের সুশ্রী মুখে চিন্তার ছাপ রেবেকাকে বিরাট ও বিশাল করে দিল। ওর বিশালত্ব চারপাশের সবকিছু, সবাইকে কেমন যেন সংকুচিত করে দেয়। ইরাজও কেমন সংকুচিত হয়ে বসে। গণিতবিদ ইরাজ অক্ষর নয় সংখ্যা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসে। সমাজের কথা, জীবনের গাঁথা অক্ষরে কীভাবে বিবৃত, তা সে কমই নাড়াচাড়া করে দেখেছে। এ বিষয়ে জানাশোনা তেমন তার নাই। তাই সে রেবেকার বক্তব্য শুনতে উদগ্রীব।

রেবেকা গভীর মনোযোগসহ মেয়েটিকে দেখতে দেখতে কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘এই মেয়ে তুমি আমেরিকান সিটিজেন তুমি এ দেশের সবই চেনো–জানো তারপরও কেন তুমি একজনের কাঁধে চেপে তার বাড়িতে চলে এসেছো?’

‘এয়ারপোর্টে আমার মায়ের এক আত্মীয়কে দেখে ভয় পেয়ে যাই, তাদের  চোখ এড়িয়ে তাড়াতাড়ি উনার কাছে চলে আসি’

‘মায়ের আত্মীয়কে দেখ ভয় পাইছো কেন?’

‘আমার সৎমায়ের বোন উনি, যদি উনারা জানেন আমি আমেরিকাতে, তবে আমার খুব বিপদ হবে’

রেবেকার উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন, ‘কিসের বিপদ, কেন বিপদ?’

‘আমার সৎমা যদি জানেন, আমি এখন আমেরিকাতে যেভাবেই হোক, উনি আমাকে ধরিয়ে নিয়ে যাবেন’

‘তুমি কোনো ক্রাইম করেছো নাকি?’

অলংকরণ: আরাফাত করিম

নম্রভাষী, মিষ্টি কণ্ঠের মেয়েটি এবার জেদি গলায় বললো

‘না না কোনো ক্রাইম করিনি। শুধু আমার সৎমায়ের এক আত্মীয়কে বিয়ে করতে চাইনি, আমার বাবাও

এই বিয়ে চাননি’

বলে মেয়েটি একটু থেমে আবার শুরু করল, ‘তবে আমার বাবা সাহস করে বিয়েটা মানা করতে পারেনি তাই আমাকে নারায়ণগঞ্জে ফুফুর বাড়ি বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে আমেরিকার প্লেনে তুলে দেয়’

রেবেকা গভীর শ্বাস ফেলে বলল, ‘তুমি যে নিজেকে বাঁচাতে এই লোকের সঙ্গে চলে এলে ভাবতে পার এর ভাগনী মেয়েটি যে বিদেশে প্রথম এসেছে, সে তার মামাকে না পেয়ে কি অসহায় ও নিরুপায় অবস্থায় কোথায় আছে, কে জানে’

নওশাবা নামের মেয়েটি ভীত ও ব্যথিত গলায় বলে চলল, ‘সত্যি বলতে আপনার হাতে প্ল্যাকার্ড আমি দেখিনি তবে অন্য দুজন লোককে দেখেছি তাদের হাতে হিলমী লেখা প্ল্যাকার্ড ছিল, তাদেরও পরনে  ছিল নীল শার্ট  ও কালো ট্রাউজার্স।’

এবার ইরাজ ও রেবেকা দুজনের মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। মেয়েটি সত্যি বলছে নাকি মিথ্যা বলছে, বুঝতে পারছে না ওরা। হিলমীর মা রেশমী বলেছিল এই দেশ মানে আমেরিকাতে ইরাজ ছাড়া ওদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আর কেউ নেই। রেশমী বলেছিল ওর মেয়ে সবুজ জামা পরে থাকবে। ইরাজের পরনে কি রঙের জামা থাকবে, তা–ও সে বারবার জানতে চেয়েছিল। রেবেকার মনে হলো কেউ কি আড়ি পেতে রেশমীর কথা শুনে, সেই মতো ফাঁদ পেতে হিলমীকে আটক করল না তো। রেশমী এক পাগল মেয়ে। সে উচ্চস্বরে বারবার তার মেয়ে হিলমী কবে আমেরিকাতে যাচ্ছে, কত লম্বা সে, কি রঙের কাপড় তার পরনে থাকবে বলে যাচ্ছিল। তার উচ্চকণ্ঠের কথা অনেক দূর থেকেও লোকজন শুনতে পেয়েছে নিশ্চয়।

‘ভাইজান কোথায় আমার সবুজ বসনা মেয়েকে হারিয়ে ফেললে?’ দ্রুত হাতে রিসিভার তুলল নওশাবা। ও ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে শোনা গেল, ‘মামি আমি হিলমী!’

রেবেকা ইরাজ চিন্তায় ব্যাকুল।

রেশমী ইরাজের ফুফাতো বোন। ১০ কি ১১ বছর বয়সে মাকে হারায় সে। রেশমীর বাবা ওকে মামাহীন বাড়িতে মামির কাছে রেখে কোথায় চলে গেলেন আর ফিরে আসেননি কোনো দিন। ভদ্রলোক ব্যবসায়ী ছিলেন, একটি গোডাউন ছিল তার। লাপাত্তা হওয়ার আগে রেশমীর নামে গোডাউনের মালিকানা লিখে দিয়ে তার ভাড়ার টাকা যাতে রেশমী ও তার মামির নামে খোলা যৌথ একাউন্টে জমা হয় সে ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

বিধবা মামির কাছে যথেষ্ঠ আদরেই বড় হয়েছে রেশমী। ইরাজ তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তার মা চাইছিলেন ডাক্তারি পড়াতে । না পড়ে ইরাজ গণিত নিয়ে পড়ল। রেশমী যে বছর ওদের বাড়ি এল সে বছরই ইরাজ কলেজ শেষ করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেল। রেশমীকে দেখে ইরাজের মা বলেছিলেন, ‘থাক তুই ডাক্তারি পড়লি না তো, রেশমীকে আমি ডাক্তারি পড়াব। রেশমীর বাবা টাকাও দিয়ে গেছে কোন অসুবিধা হবে না, ওর ডাক্তারি পড়তে’।

ইরাজের মা শুধু বুঝতে পারেনি যে টাকা থাকলেই সব হওয়া যায় না। বিশেষ করে জ্ঞানবুদ্ধি ও নানা রকম দক্ষতা টাকা দিয়ে কেনা যায় না। টাকা থাকলেই রিজওয়ানা বন্যা বা রুনা লায়লা হওয়া যায় না। রেশমী ডাক্তারি বা অর্থনীতি কোন কিছুতেই আগ্রহী হলো না। লেখাপড়া ছাড়া বাকি অন্য সব কাজে ওর উৎসাহ ও আন্তরিকতার অভাব ছিল না। ফুলের চারার  যত্ন, সেলাইফোঁড়াই, নকশী কাজ, আচার ও নানা পদের নাশতা তৈরি ছিল ওর অন্তরের রং মেশানো কাজ। প্রাইভেট কোচিং করিয়েও মাধ্যমিকে ভালো ফল করানো গেল না। রেশমীর তাতে কোন ভাবান্তর হলো না। মন খারাপ হলো ইরাজের মায়ের।

ইরাজ ছুটিতে বাড়ি এসে চশমা পরা চোখ আরও বড় বড় করে বলল, ‘ঘরদুয়ার সাজানো, নিজেকে পরিপাটি ঝলমলে রাখতে পারিস আর পড়াশোনাটা  কেন ঝলমল করতে পারলি না’

মাকে ইরাজ বলল, ‘মা ওর সেলাইয়ের নকশা, মাটিতে চারা তুলা, মজাদার নাশতা বানানো সব বন্ধ কর। পড়াশোনা করুক মন দিয়ে। কত মানুষ পয়সার অভাবে পড়তে পারে না আর ইনি সব সুযোগ–সুবিধা পেয়েও কাজে লাগাচ্ছেন না’।

সেলাই, রান্না, বাগান করা সব বাদ দিয়ে রেশমীকে পড়ায় সময় দিতে হলো। কোচিং তো ছিলই এবার গৃহশিক্ষক নিয়োগ করা হলো। তবে সব প্রয়াসকে তুড়ি মেরে উচ্চমাধ্যমিকেও রেশমী তেমন ভালো ফল করতে পারল না। ইরাজের মা দুঃখ পেলেন, হতাশ হলেন। তার ধারণা ছিল নিজের আপনজন কেউ ডাক্তার থাকলে ইরাজের বাবার রোগটা আগেই হয়তো ধরা পড়তো, তাকে হয়তো বাঁচানো যেত। তাই পরিবারে রেশমীকে উনি ডাক্তার হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন।

এবার রেশমীর বিয়ের আয়োজন শুরু হলো। দেখতে ফুটফুটে, মিষ্টভাষী, ঘরদুয়ার ছবির মত সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে পারা লক্ষ্মী মেয়ের পাত্রের অভাব হলো না।

দেখতে সুদর্শন, ধীমান, আইন পাস তার ওপর বিসিএস দিয়ে মুন্সেফ পদাধিকারী ছেলেটিকে আত্মীয়–বন্ধুরা সবাই দেখল এবং তারা সবাই পছন্দও করল। ছেলেটির বাবা মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে প্রাণ বাঁচাতে নৌকায় শীতলক্ষ্যা নদী পার হয়ে কেরানীগঞ্জে যাচ্ছিলেন। পাকিস্তানের সেনারা তীরে দাঁড়িয়ে নৌকাগুলোর দিকে ঝাকে ঝাকে গুলি চালায়। ওখানেই তার মৃত্যু হয়। মরদেহ খোঁজার কোনো উপায় ছিল না। গৃহবধূ মা যুদ্ধের পর স্কুল শিক্ষকতা করে একমাত্র ছেলেকে মানুষ করেন। শিক্ষিত, চরিত্রবান ছেলে তার।

এবার ছুটিতে ইরাজ এসে পাত্র দেখতে যাচ্ছে। ইরাজের পছন্দ হলেই রেশমী ও ছেলেটিকে মুখোমুখী করা হবে। যাওয়ার আগে ইরাজ রেশমীকে বলল

‘আমার পছন্দ হলেই তুই যাবি। এবার বলতো তোর কি কি জিনিস বা বিষয় অপছন্দ?’

ফুল সাজানোতে ব্যস্ত রেশমী লাজুক গলায় মৃদুস্বরে জানাল, ‘চোখে যেন চশমা না থাকে আর আর বেশী বুদ্ধিমান যেন না হয়।’

ইরাজ বিস্মিত হয়ে বলেছিল, ‘কমবুদ্ধি হলে ভালো হবে!’

রেশমী উত্তর দেয়নি।

ঘটনা হলো ছেলেটির খালা রেশমীর কলেজে পড়াতেন। একবার কি কাজে ছেলেটি খালার কাছে কলেজে এসেছিল। তখনি রেশমীকে দেখে তার ভালো লাগে। ছেলেটি যখন করিডোর দিয়ে খালার সঙ্গে যাচ্ছিল তখন রেশমী তাকে দেখে বলে উঠেছিল, ‘বাহ্ টিচারের ছেলেতো টিচারের মতোই সুন্দর!’

৩ দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

এক মেয়ে দুষ্টামি করে টিচারের কানে কথাটি পৌঁছে দেয়। একসময়ে টিচার রেশমীর মামির কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। রেশমী ভাবলো আপা যেমন সুন্দর নিশ্চয় তার বোনের ছেলেও তেমনি সুন্দর হবে। আপাও তার বোনের ছেলে যে কলেজে রেশমীকে দেখেছে ও পছন্দ করেছে তা গোপন রাখলেন।

ইরাজ পাত্র দেখে খুশি খুশি মনে ফিরল। মাকে বলো, ‘বুঝলে মা ওকে সুদর্শন বললে কম বলা হবে। ওকে দেখলেই মন প্রফুল্ল হয়ে যায় আর ওর কথা শুনলে ওকে সবাই ভালোবাসবে, সম্মান করবে। ছোট্ট একটা সমস্যা অবশ্য আছে…’

বলেই আড় চোখে রেশমীকে দেখল। ইরাজের মা উৎকণ্ঠা নিয়ে বললেন, ‘কী কী সমস্যা?’

‘একটু বোকা মনে হলো’।

‘যাহ বোকা হলে অতো কঠিন পরীক্ষা দিয়ে এত ভালো চাকরি পেল কীভাবে!’

‘বোকা নাহলে রেশমীকে একবার দেখতেও চাইল না। বলল শুনেছি খুব লক্ষ্মী।’

ইরাজের মায়ের মুখে গর্বের স্মিত হাসি ফুটে উঠল। এবার ইরাজ রেশমীর দিকে আলতো একটি প্যাকেট ছুড়ে দিয়ে বলল

‘দেখতো কী দিয়েছে তোকে?’

সহজ সরল রেশমী প্যাকেটটা খুলেই ছোট্ট একটি বই বার করল। নাম ‘নৈবদ্য’। মামি অর্থাৎ ইরাজের মা বইটা নিয়েই প্রথম পাতা খুলে জোড়ে পড়তে শুরু করলেন, ‘রেশমীকে না চিনিতেই…            শোভন’

ইরাজ জিজ্ঞাসা করল, ‘এর পরের লাইন কি জানিস রেশমী?’

রেশমী লজ্জা মাখা স্বরে বলে উঠল

‘না চিনিতেই  ভালোবেসেছি’।

ইরাজের মা নিজেই লজ্জা পেলেন। বইটা রেশমীর হাতে গছিয়ে দিয়ে উঠে গেলেন। ইরাজ অবাক গলায় বলে উঠল

‘আরে তুই দেখছি রবীন্দ্রনাথ পড়ে ফেলেছিস!’

‘রবীন্দ্রনাথ পড়িনি গান শুনেছি ভাইজান’

‘শোন ওই ছেলের চোখে চশমা আছে হু’।

‘থাকুক, তুমি বললে বোকা সে। তাতেই চলবে’

‘কি চলবে রে’

‘বুদ্ধিমান হলে আমার বোকামী নিয়ে হাসাহাসি করতো’।

মা-বাবাহীন রেশমীর অনেক ধূমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল। মা-বাবা নাই তো কি হয়েছে মামির কাছেই স্বামীসহ রেশমী প্রথম নাইওরী এল। গল্প আড্ডার এক সময়ে ইশারায় শোভনের চশমা নাই দেখিয়ে ইরাজকে কিল দেখিয়ে মুখ ঢেকে হাসিতে গড়িয়ে পড়ল। শোভন হেসে ইশারাতে ইরাজের কাছে রেশমীর হাসির কারণ জানতে চাইল। ইরাজ বলল, ‘আমি ওকে মিথ্যামিথ্যি তোমার চোখে চশমা আছে বলেছিলাম’

‘তো চশমা থাকলে অসুবিধা কি?’

‘আমার চোখে পাওয়ারফুল চশমা আর রেশমী পড়তে চাইতো না বলে চোখ লাল করে ওকে বকতাম তাই…’

শোভন তখন উৎফুল্ল গলায় বলে উঠলো

‘শুনুন ভাইয়া রেশমী এখন পড়তে শুরু করেছে। ‘নৈবদ্য’ থেকে কিছু কিছু মুখস্তও করেছে’

এবার রেশমী তার ঘন ও দীর্ঘ পাপড়ি ঘেরা চোখ বড় করে তর্জনি তুলে শোভনকে শাসিয়ে ঘর ছেড়ে পালালো।

মামি এবার গোডাউন ভাড়ার জমানো টাকা রেশমীর নামে একাউন্ট খুলে জমা রাখলেন এবং এরপর থেকে প্রতিমাসের ভাড়া রেশমীর একাউন্টে  জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন।

বিয়ের পরও রেশমী মামির সঙ্গে মায়ায় জড়িয়ে রইলো। শোভন বুদ্ধিমান সে স্ত্রীর মন বুঝতো। তাই ঘন ঘন রেশমীর মামি দর্শন হতো।

বিয়ের মাসতিনেক পর এক অবাক ঘটনা ঘটল। রেশমী এসে মামির হাতে একটি খাম দিল। ইরাজের মা অর্থাৎ রেশমীর মামি বললেন

‘এটা কি এতে কি আছে?’

‘খুলে দেখ তুমি’

খাম খুলে দেখেন তাতে এক চেক। চেকটায় মামির নামই লিখা। ভালো অংকের টাকার চেক। রেশমী কান্নাভেজা গলায় বলল

‘ডাক্তার হতে পারলে অসুখবিসুখে তোমার চিকিৎসা আমি করতে পারতাম, তা তো হচ্ছে না। তাই টাকাটা তোমার চিকিৎসার জন্য রেখে দিও’।

মামি বললেন, ‘রোগে ভুগে মরতে যেন না হয়। ঠিক আছে টাকাটা তোর সন্তানের জন্য রেখে দিব।’

স্বামীর উৎসাহে, শাশুড়ির আগ্রহ উদ্দীপনায় রেশমী বি এ পাস করল। কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষিকার চাকরি নিতে রেশমীকে শাশুড়ি উৎসাহিত করলেন। শিক্ষিকার কাজ থেকে অবসর নিয়ে শাশুড়ি রেশমীর সংসারে সমস্যা নয় সম্পদ হয়ে আসলেন। নিজে কম বয়সে বিধবা হয়ে হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজেছেন। তাই তার ইচ্ছা ছেলের বউ ঘরের বাইরে কোন কাজে যুক্ত থাকুক। প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজন যদি বলতো

‘ওর চাকরির কি দরকার, সংসারে অভাব তো নাই’

শাশুড়ি উত্তর দিয়েছিলেন

‘ওর চাকরি করার দরকার নাই, কথাটা ঠিক। তবে সমাজের ওকে দরকার আছে, ও যা শিখেছে, তা অন্যদের শিখাবে।’

একবার বিজয় দিবসে রেশমী তার ছোট প্রতিষ্ঠানের ছোট ছোট বাচ্চাদের কবিতা, ছড়া শিখিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। শাশুড়ির পরামর্শে তার এক ছাত্রী আবৃত্তি শিল্পী প্রজ্ঞা লাবণীকে অতিথি করে আনে ছোটদের হাতে উপহার তুলে দিতে। রেশমীর সে আয়োজন সবার মনে অন্য রকম আনন্দ ছড়িয়েছিল।

বদলির চাকরিতে শোভনকে অন্য শহরে যেতে হত। রেশমী শাশুড়ি সন্তানসহ ময়মনসিংহ শহরেই থেকে যেতো। মনে ক্ষিণ আশা যদি রেশমীর বাবা কখনো এখানে ফিরে আসে।  গোডাউনের আয়ে মজবুত একটি জিপ কেনা হলো। ওই জীপে ওরা সপ্তাহান্তে ঘুরতে বেড়াতে পারতো। কখনোসখনো শোভনের কর্মস্থলে যেত।

ইরাজ আর রেবেকার জীবন একত্রে বাঁধতে রেশমী ও শোভন সুন্দর ভূমিকা পালন করে। বিয়ের পর ইরাজ বৃত্তি নিয়ে আমেরিকা গেল। রেবেকা সঙ্গে গেল। তবে ইরাজের মা ময়মনসিংহের বাইরে যেতে রাজি হলেন না। রেশমীই তার দেখভাল করেছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মায়ের মৃতুর সময় ইরাজ দেশে এসেছিল।

ওর মেয়ে হিলমী বড় হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হলো। শোভন তখন ঢাকার  জেলা জজ। রেশমীও চাকরি ছেড়ে শাশুড়িকে নিয়ে শোভনের কাছে ঢাকায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে যখন তখনই দুর্যোগ নেমে এল। অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তের গুলিতে শোভন মারা গেল।

শোনা গেল কোন এক মন্ত্রীর খয়েরখার মামলার রায় তার বিরুদ্ধে যাওয়াতে সে প্রতাপশালী পক্ষ জজসাহেবের ওপর হলেন নাখোশ। সেই কারণে জজসাহেবকে তারা পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল। মামলার রায়ের আগের দিন মন্ত্রী নাকি জজ শোভনকে ফোন করেছিলেন। নীতিবান  জজ মন্ত্রীর ফোন ধরেনি। প্রাণ দিতে হলো অন্যায় আবদার না রাখার জন্য।

শোভনের মাও তারপর পরই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। রেশমী একাই জীবন টেনে নিয়ে চলল। ইরাজের তখন মনে হয়েছিল দেশে না থাকলে, অত বড় পদে না থাকলে শোভনকে হয়তো অন্যায্য অনুরোধ রাখার কথা কেউ বলতো না।

এখন ইরাজের নিউইয়র্কের বাড়িতে সময় থমকে আছে। সবাই গভীর চিন্তায় মগ্ন। হিলমীর বদলে ভুল করে শাবা বা নওশাবা চলে এসেছে ইরাজের বাড়ি। নওশাবার ইরাজ ও রেবেকাকে খুব নিরাপদ এক আশ্রয় মনে হচ্ছে। নিজের এইটুকু বয়সে কত কি সে দেখল। ওর বাবা লায়ন নাকি রোটারির এক কাজে স্বপ্নের দেশ আমেরিকাতে এসে থেকে গিয়েছিল। বেআইনি থেকে যাওয়াতে দেশে যেতে পারেনি। প্রায় সাতবছর পর নিজের স্ত্রী ও ছোট্ট  মেয়ে নওশাবাকে আরেকজনের স্ত্রী সন্তান হিসাবে এদেশে আনিয়েছিল। কঠিন পরিশ্রম করে অনেক টাকা নওশাবার বাবা রোজগার করেছিল। তখন  পয়সার বিনিময়ে ওই লোক নওশাবা ও তার মাকে আমেরিকাতে এনে দিয়েছিল। কথা ছিল  চুক্তি অনুযায়ী পয়সা পাওয়ার পর আমেরিকাতে এসে লোকটি নওশাবার মাকে ডিভোর্স দেবে। সে ডিভোর্স আর কোনো দিন হয়নি। ওই লোকের সাথেই নওশাবার মা থেকে গেল। ছোট্ট নওশাবা প্রায় অচেনা তার নিজের বাবার কাছেই রইল।  মা ওকে আপদ ভেবে তার খোঁজও আর নেয়নি।

বাবাও বেআইনি ব্যক্তি থেকে আইনি নাগরিকত্ব পেল। দেশে গিয়ে একজন বিধবাকে বিয়ে করে আনলো। সৎমা ভালোই ছিল। তবে নওশাবা বড় হওয়া শুরু হতেই সৎমায়ের মাথায় অন্য চিন্তা ঢুকল। নওশাবার আমেরিকান পাসপোর্ট ওর ভালো বিয়ে তো হবেই। তার আগে সৎমায়ের এক দূরসম্পর্কের ভাইয়ের সঙ্গে নওশাবার একটি ‘কাগুজে বিয়ে’ দিতে চায়। যে বিয়ের সূত্রে ভাইটি এ দেশে আসবে। এই উদ্দেশ্য নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিল তারা। এদিকে নওশাবার বাবা জীবনের কাছে অনেক প্রতারণা সহ্য করেছেন এবার তিনি নিজের মেয়েকে নিয়ে কোনো জালিয়াতি করবেন না ঠিক করলেন। স্ত্রীকে মুখ ফুটে কিছু বললেন না। নিজে স্ত্রীকে নিয়ে রইলেন দেশে তবে মেয়েকে গোপনে আমেরিকাগামী প্লেনে তুলে দিয়েছিলেন। ভাগ্য নওশাবার বাবার সঙ্গে রহস্যময় এক খেলায় মত্ত। এবারও নওশাবা আরেক লুকোচুরি খেলায় জড়িয়ে পড়েছে। কোন এক অচেনা হিলমী ভেবে ওরা তাকে বাড়ি নিয়ে এসেছে।

এয়ারপোর্টে মায়ের আত্মীয় নাকি বান্ধবীকে না দেখলে এতক্ষণে অভ্যন্তরীণ  প্লেন ধরে দেশের আরেক প্রান্তে বাবার এক বোনের কাছে চলে যেত নওশাবা। বাবাই ব্যবস্থা করে রেখেছিল।

ইরাজ রেবেকার কাছে রেশমীর কোনো ফোন নম্বর নেই। আবার ফোন বেজে উঠল। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দুজন মানুষের নীরব ভুবন কেঁপে উঠল। ভয় পাচ্ছে দুজন। যদি রেশমীর মায়ের ফোন হয় ও জিজ্ঞাসা করবে

‘ভাইজান কোথায় আমার সবুজ বসনা মেয়েকে হারিয়ে ফেললে?’

দ্রুত হাতে রিসিভার তুলল নওশাবা। ও ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে শোনা গেল

‘মামি আমি হিলমী!’

নওশাবা রিসিভার রেবেকার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল ‘হিলমী’।

আরও পড়ুন