স্বপ্নের দেশে
সুইডেনে কাজলের দুই বছর হতে চলল, লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ও প্রায় শেষ হওয়ার পথে। ব্যবসাটা চলছে অনেক টানাপোড়েনের মধ্যে, কন্ট্রোল যেহেতু দেশি বড় ভাইদের হাতে, তাঁরা নিজেদের প্রয়োজনে কাজলকে ব্যবসার পথটা দেখিয়ে দিয়েছেন, বিনিময়ে তাঁরা সার্ভিস চার্জ অন্যদের তুলনায় কম দেবেন, কাজলের জন্য বিষয়টি কষ্টকর হলেও ভবিষ্যতে এই ব্যবসার কারণে সুইডেনে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ থাকায় সাময়িক কষ্টটা তিনি মেনে নিয়েছেন। এখনকার স্বপ্ন হচ্ছে এ দেশে পারমিশন পাওয়া। ব্যবসার কাগজপত্র দিয়ে এবার আবেদন করা হলো মাইগ্রেশন বোর্ডে। এ দেশে যাঁরা পারমিশন নিয়ে কাজ করেন, কোনো এক অজানা কারণে তারা দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের আবেদনপত্র ফেলে রাখে। বিজনেস ভিসা আবেদনের বিষয়ে তারা তাদের ওয়েব পেজে লিখে রেখেছে এক বছর সময় লাগবে, এর মানে হচ্ছে এক বছর পর তারা আবেদনপত্র দেখবে, যাচাই–বাছাই করবে, দরকার হলে তারা আরও কাগজপত্র চাইতে পারে। এটা শুধু বিজনেস ভিসা না, অন্যান্য ভিসার ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় আপেক্ষার কথা বলা আছে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এখানে অদ্ভুত একটি সমীকরণ আছে, একই ধরনের আবেদনপত্র, রেজাল্ট হয় ভিন্ন ভিন্ন, কেস অফিসাররা কীভাবে এটা করেন, হিসাব মেলানো কঠিন। কেউ ভিসা পাচ্ছে, আবার কেউ পাচ্ছে না। রিজেকশনে আপিল খুব একটা কাজে আসে না। এভাবেও বলা যায়, আমার দেশ, আমার ইচ্ছা কাকে আমি আসতে দেব, আর যে কাউকে না বলে দিতে পারি। এসব বিষয়ে দেশি মানুষকে দীর্ঘ সময় সমালোচনা করতে দেখেন কাজল। কিছু বিষয়ে কাজলের নিজেরও আপত্তি আছে। যেমন কাজলের বিজনেস ভিসা আবেদনে বলা ছিল ১২ মাস অপেক্ষার কথা, কিন্তু ১২ মাস অপেক্ষা করার পরও কোনো খবর নেই। শুধু আবেদনপত্র হাতে নিতে ১২ মাসের বেশি সময় লাগাটা অস্বাভাবিক। যদি ১৪–১৫ মাস পর আবেদনপত্রে ভিসা না মেলে, তবে আবেদনকারীর এত সময় যে নষ্ট হবে, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? কাজলের বিষয়টি যুক্তিসংগত মনে হয় না। ১২ মাস অতিক্রম হওয়ার পর কাজল মাইগ্রেশন বোর্ডে ফোন করে কেস অফিসারের ফোন নম্বর সংগ্রহ করেন। অফিসারকে অনেকবার ফোন করার পরও পাওয়া যায় না, তাঁরা আবার নির্দিষ্ট দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে শুধু এক ঘণ্টা ফোনে কথা বলেন। একদিন তাঁকে পাওয়া গেল। অফিসার বললেন, দেখুন, যদিও একটা নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষার জন্য উল্লেখ করা আছে, তারপরও আরও সময় লাগতে পারে। কাজল জিজ্ঞাসা করলেন, আনুমানিক আরও কত দিন লাগতে পারে? অফিসার বললেন, দু–তিন মাস। কাজলের অপেক্ষার দিন আরও বাড়ল। হবে কি হবে না? এই টেনশন এখন পরিবারের সবার মধ্যে লক্ষ করা গেল। তিন মাস পর কাজল আবার ফোন দিলেন, বৃদ্ধ মতো লোকটা ওপাশ থেকে কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারলেন না। এবার কাজল আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলে না, প্রথমত ১৪–১৫ মাসের মতো অপেক্ষায় আছে, তারপরও অফিসার কোনো নির্দিষ্ট টাইম বলছেন না, কবে রেজাল্ট হতে পারে। কাজল মাইগ্রেশন বোর্ডে একটা চিঠি পাঠালেন:
‘জনাব, আমি ১৫ মাস যাবৎ অপেক্ষা করছি আমার বিজনেস ভিসার ওপর সিদ্ধান্তের জন্য, আমার মনে হচ্ছে যিনি আমার ফাইল দেখছেন, তিনি আদতে কোনো কাজ করছেন না, ফোন করলে আমাকে একেক সময় একেক কথা বলেন, যা আমার কাছে স্বাভাবিক লাগছে না। এই অফিসারের ওপরে কেউ অবশ্যই আছেন, যিনি আমার এই অভিযোগ বা সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। আমি ব্যবসায় মনোযোগ দিতে পারছি না, দুশ্চিন্তায় দিন অতিবাহিত হচ্ছে। আমাকে ভিসা দেওয়া হবে কি হবে না, তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে এত লম্বা সময় ধরে অপেক্ষায় থাকাটা কঠিন কাজ, এসব কিছু বিবেচনা করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার বিজনেস ভিসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’
কাজলের চিঠি পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই উত্তর এল, মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি কেস অফিসারের ওপরের কোনো বস চিঠিটা পড়েছেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারকে দ্রুত এর সিদ্ধান্ত জানাতে বলেছেন। অফিসার এবার নিজেই কাজলকে ফোন করলেন এবং জানালেন সিদ্ধান্তটা দ্রুত পৌঁছানোর জন্য কাজল চাইলে তিনি ওই দিনেই ই–মেইলে পাঠাতে পারেন, কাজল সম্মতি দিলেন ই–মেইলে সিদ্ধান্ত পাঠানোর জন্য।
কিছুক্ষণের মধ্যে চিঠি এল; কিন্তু ওই চিঠিতে ভিসা দেওয়া হয়নি, উল্টো অনেক কাগজপত্র দিতে বলা হয়েছে, কিছু কাগজ আইনসম্মত ঠিক আছে কিন্তু এমন অনেক ডকুমেন্ট চাওয়া হয়েছে, যা মাইগ্রেশন বোর্ডের ইনফরমেশন অনুযায়ী কোথাও উল্লেখ নেই। কাজল বুঝতে পারলেন কেস অফিসার মেজাজ খারাপ করে অতিরিক্ত ডকুমেন্টস চাইছেন। সবকিছুর উত্তর দেওয়ার জন্য তিন সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। কাজল চিঠি পেয়ে কিছুটা হতাশ হয়ে যান, মনে হচ্ছিল অফিসার কোনোভাবেই বিজনেস ভিসা দিতে চাচ্ছেন না। তাই এত সব কাগজপত্র চেয়েছেন। ভিসা হোক বা না হোক, কাজল বিষয়টা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড়ে কাজ শুরু করলেন।
ডকুমেন্টের মধ্যে ছিল আগামী দুই বছরের জন্য কোম্পানির ব্যালান্স শিট বানানো, আগামী দুই বছরে কোম্পানির আর্থিক অবস্থার আগাম পরিসংখ্যানসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ডকুমেন্ট। বর্তমানে কোম্পানি থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে পুরো পরিবার কীভাবে চলছে সেটার বিস্তারিত বিবরণ জমা দিতে হবে। অর্থাৎ বাসা ভাড়া কত? খাবারের খরচ কত ইত্যাদি। এর বাইরে ১২–১৪টা থিয়োরি প্রশ্ন, যা আসলে ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক নয়। প্রশ্নগুলো অনেকটা এ রকম,
কাজল কেন সুইডেনে থাকতে চান?
পড়েছে এক রকম বিষয়, কাজ কেন অন্য ফিল্ডে করছেন?
এ–জাতীয় প্রশ্ন আসলে কোনো আইন ফলো করে নয়, অফিসার মনে করেছেন তাই যোগ করে দিয়েছেন।
কাজলের পাশের অ্যাপার্টমেন্টে এক পরিচিত সুইডিশ স্টুডেন্ট ছিলেন, কাজল পুরো বিষয়টি তাঁকে জানালেন, তিনি আশ্বাস দিলেন ডকুমেন্টস তৈরি করার পর তিনি চেক করে দেবেন। ধীরে ধীরে কাজল সব কাগজপত্র তৈরি করে ফেললেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে সব জোগাড় হয়ে গেল। তারপর ওই সুইডিশ প্রতিবেশীসহ সেগুলো আরও পরিপাটি করে অফিসারের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলেন কাজল। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, যেদিন অফিসার সব ডকুমেন্টস হাতে পান, সেদিনই তিনি কাজলকে ফোন করেন এবং জানান তাঁদের পুরো পরিবারের জন্য বিজনেস ভিসা অনুমোদন করা হয়েছে। কাজল ভীষণ খুশি হন, আরও একটা স্বপ্ন পূরণের কাছাকাছি চলে আসেন কাজল। কাজটা বিজনেস হিসেবে করলেও মোটেও সহজ কাজ না, একটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে পরিবারটিকে। এখানে আরও একটা অসন্তুষ্টির বিষয় লক্ষ করা গেল, কাজলের ভিসা অনুমোদন করা হয়েছে যেদিন সিদ্ধান্ত হয়েছে সেদিন থেকে, তার মানে এই অপেক্ষায় থাকা ১৫ মাস তাঁরা কাউন্ট করেননি, বিজনেস ভিসার শর্ত অনুযায়ী ভিসা অনুমোদনের দিন থেকে ২ বছর পর স্থায়ী হওয়ার জন্য আবার আবেদন করতে হবে। অথচ বিজনেসের গত ১৫ মাস হিসাবে ধরলে আর ৯ মাস পরেই কাজল পরিবারসহ এখানে স্থায়ী হয়ে যেতে পারতেন, কী আর করা, যাঁদের দেশ তাঁদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত রায়। আরও দুই বছর এই বিজনেস চালিয়ে যেতে হবে।
কাজলের জন্য স্বস্তির বিষয় হচ্ছে সুইভেনে স্থায়ী হওয়া এখন কিছু সময়ের অপেক্ষামাত্র। স্ত্রী এবং একমাত্র মেয়ে শোভা যখন সুইডেনে আসে, তখন শোভার বয়স ছিল ৫ বছর। এখানে নিয়ম হচ্ছে স্কুলে ভর্তির জন্য প্রথমে বাসস্থান থেকে সবচেয়ে কাছের স্কুলে যোগাযোগ করতে হয়, সেখানে ভর্তির সুযোগ না হলে ওই এলাকার অন্যান্য স্কুলেও যোগাযোগ করা যায়। শোভাকে একদম কাছের স্কুলেই ভর্তি করা গেল। সুইডেনে বয়স সাত বছর হলে মূলত স্কুলে ক্লাস ওয়ান শুরু হয়। কিন্তু বাচ্চার বয়স এক বছর হলেই প্রি-স্কুলে পরিবার চাইলে দিতে পারবে। যেসব পরিবারে মা–বাবা দুজনে কাজ করেন, তাঁরাই সাধারণত বাচ্চাকে প্রি-স্কুলে রাখেন। এখানকার প্রি-স্কুলগুলো বাচ্চাদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখে। এখানে খেলার মাধ্যমে এবং বাস্তবসম্মত জিনিসপত্রের মাধ্যমে বাচ্চাদের স্বনির্ভর করে তোলে। খাবারের সময় শিক্ষক এবং শিশুরা একই টেবিলে বসে, সবার সামনে খাবার দেওয়া হয়; কিন্তু বাচ্চাকে খাইয়ে দেওয়া হয় না। বাচ্চাকে নিজ দায়িত্বে শিখতে হয় কীভাবে খাবার খেতে হয়। অনেক ইমিগ্র্যান্ট বাচ্চা আছে, যারা শুরুর দিকে এভাবে খায় না, বলতে গেলে ওই বাচ্চারা না খেয়েই সারা দিন থাকে, ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে তারপর খাওয়া শুরু করে, বাচ্চারা বিভিন্ন রকম খেলনা দিয়ে, সারা দিন স্কুলে খেলে, খেলা শেষে সেগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় আবার বাচ্চাদেরকেই সাজিয়ে রাখতে হয়। ডিসিপ্লিনে অভ্যস্ত হওয়া সুইডেনে অন্যতম বাধ্যতামূলক রুটিন।
একটি জাতি কীভাবে উন্নত হবে? তার শুরুটা দেখলেই বোঝা যায়।
এখানে প্রি-স্কুল বা পরবর্তী সময়ে যে স্কুলে বাচ্চারা পড়ালেখা করে, তার পুরোটাই ফ্রি বলা চলে, শুধু তা–ই নয়, যতক্ষণ বাচ্চারা স্কুলে থাকবে, ততক্ষণ তারা দিনে একাধিকবার খাবার পাবে। বাচ্চারা বেশির ভাগ সময় পানির পরিবর্তে দুধ পান করে। এখানে বাচ্চাদেরকে সব রকম পরিবেশ, আবহাওয়ার সঙ্গে অভ্যস্ত করতে, শিক্ষকেরা রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ের মধ্যেও বাইরে ঘুরতে নিয়ে যান, এঁদের পরিকল্পনায় সবকিছু সমন্বিত থাকে। কাজল লক্ষ করেছেন, শুধু স্কুলে নয়, সব পর্যায়ে এরা প্ল্যানিংয়ে খুব গুরুত্ব দেয়। যেকোনো ডেভেলপমেন্টের কাজে এরা সব স্টকহোল্ডারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে পরিকল্পনা করেন। দেখা গেছে এরা প্লানিংয়ে বেশি সময় দেয়, কাজ করার সময় তার চেয়ে কম লাগে যতটা না পরিকল্পনায় লাগে, যাতে কাজ করার পর মনে না হয় যে আহা, এইভাবে না করে ওভাবে করলে ভালো হতো। সুইডেনের অবকাঠামো দেখে মনে হয় না কোথাও কোনো ভুল আছে। দেশটি এমনভাবে সাজানো, যেন স্বপ্ন দেশের অবিকল ছবি। দেশের প্রতিটি অঞ্চল সমানভাবে ডেভেলপমেন্ট করা, নাগরিকেরা দেশের যেখানেই বসবাস করুক না কেন, সুযোগ–সুবিধা মিলবে সমানভাবে। সমাজে বৈষম্যের মাত্রা এত কম হওয়ার কারণে বেশির ভাগ মানুষ সুখী জীবনযাপন করেন। কাজল দেশ ছাড়ার আগে এমন একটা পরিবেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর এখন তা চোখের সামনে বাস্তব উদাহরণ।
কিন্তু নিজ দেশের প্রতি একধরনের দুর্বলতা আছে, যা বলে বোঝানো মুশকিল। দেশের হাজারো সমস্যা কোনো সন্দেহ নেই, তারপরও সেটা নিজের দেশ। এখানে নাগরিকত্ব হয়তো হবে; কিন্তু এটা কখনোই নিজের দেশ হবে না, কাজল চাইলেও একজন সুইডিশ মানুষের মতো জীবনযাপন করতে পারবেন না। সারা জীবন প্রবাসী হয়ে থাকতে হবে। লাভ শুধু উন্নত দেশের সুবিধাটুকু ভোগ করতে পারবেন। কাজলের মাঝেমধ্যে মনে হয়, ইশ্, যদি আমার দেশও একদম সুইডেনের মতো উন্নত হতো? কতই–না আনন্দের বিষয় হতো ব্যাপারটা। কাজল থাকেন সুইডেনে আর খবর পড়েন প্রথম আলোতে, বাংলাদেশ যখন ক্রিকেট খেলে, সেটা দেশে বা দেশের বাইরে, কখনো খেলা মিস করেন না, অনেক সময় সময়ের তারতম্যের কারণে মাঝরাতে উঠে খেলা দেখতে হয়। কীভাবে যেন অন্তরে ঘণ্টা বাজে, দেশের খেলা, দেখতে হবে, জিতে গেলে মনটা আনন্দে নাচে, উদ্যাপন শেষ হতে কয়েক দিন লেগে যায়।
এখানে চিকিৎসাব্যবস্থা সবার জন্য ফ্রি, পুরোটাই সরকারি। মজার বিষয় হচ্ছে, ডাক্তারদের আচার–আচরণ। কাজল নিজের দেশের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে অবাক হলেন, এখানে ডাক্তারের বুকিং টাইমে সেন্টারে উপস্থিত হওয়ার পর ডাক্তার নিজে এসে অপেক্ষায় থাকা রোগীকে নিজের রুমে নিয়ে যান, তারপর ডাক্তার নিজের পরিচয় দেন এবং অনুমতি চান চিকিৎসা করার জন্য। কল্পনা করা যায় এমন দৃশ্য আমাদের দেশে? এরপরের দৃশ্য আরও আন্তরিক, একবার এক সাদা বয়স্ক নারী ডাক্তার কাজলের পায়ের পাতা দুখানা এমনভাবে হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখলেন, যেন কোনো মা তাঁর বাচ্চার পা দুখানার যত্ন নিচ্ছেন। আরেকবার ৭–৮ ঘণ্টার মতো কাজল হাসপাতালে ছিলেন, একটি টেস্ট করার জন্য, ৩–৪ জন নার্স কী যে আতিথেয়তা দেখালেন, ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়, কখন কী খাবেন, ব্যথা পাচ্ছেন কি না? ওঁদের আচরণে রোগীর মন এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।
তবে কাজলের চোখে একটি বিষয় ভালো লাগেনি, এখানকার প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো হাঁচি, কাশি, জ্বরজাতীয় কোনো সমস্যাকে অসুস্থ মনে করে না, বলে এমনিতেই সেরে যাবে ৮–১০ দিন পর। পারতপক্ষে এখানকার ডাক্তার কোনো ধরনের ওষুধ দিতে চান না, মারাত্মক কোনো রোগ ধরা না পড়া পর্যন্ত। কিন্তু জটিল রোগীর বেলায় যদি তাঁরা রোগটি আবিষ্কার করতে পারেন তবে উন্নত চিকিৎসা হয়ে থাকে, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ দেশের আবহাওয়া অনেক ভালো হওয়ার কারণে মানুষ অসুস্থ কমই হয় বলা চলে।
সুইডেনের সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে সামার টাইম। মে থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো থাকে, সূর্যের দেখা মেলে, ফুলেফলে অদ্ভুত রূপে সেজে ওঠে পুরো সুইডেন। সুইডেনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এমনিতেই ছবির মতো সুন্দর। মানুষ সারা দেশ ঘুরে বেড়ান, পুরো দুই মাস সামারের বন্ধে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব বন্ধ থাকে। এই সময় এখানকার মানুষ রোদ উপভোগ করেন। সমুদ্রসৈকতগুলোতে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়, এই জাতি জীবন উপভোগ করতে জানে, এদের কাছে বর্তমানটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ভবিষ্যৎ নিয়ে এরা অতিরিক্ত ভিতু থাকে না, এরা আমাদের মতো ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে না, সেটা দিয়ে বর্তমানকে আরও ভালো কীভাবে ইনজয় করা যায়, সেটা চেষ্টা করে। কাজল সামারে পরিবারসহ ঘুরে বেড়ান যতটা সম্ভব। সামারে কয়লা পোড়ানো গ্রিল কাজলের খুব পছন্দের খাবার। নিজস্ব কমিউনিটির মধ্যে গ্রুপ করে কাজল এবং অন্যরা মাঝেমধ্যে গ্রিল পার্টির আয়োজন করেন।
শীতকাল হচ্ছে সুইডেনের সবচেয়ে খারাপ সময়, নভেম্বরে থেকে শুরু করে প্রায় মার্চ পর্যন্ত, সূর্য ওঠে না বললেই চলে। সকাল, সন্ধ্যা দেখতে একই রকম লাগে। মানসিকভাবে চাঙা থাকা খুবই কষ্টকর। এক মাসের মতো স্নো পড়ে, রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়, মাঝেমধ্যে ঝিরঝির বৃষ্টি নামে। সাবধানে গাড়ি চালাতে হয়। কখনো কখনো স্নো ঠান্ডা হয়ে আইচে রূপান্তরিত হয়, রাস্তায় খুব সাবধানে বিশেষ ধরনের জুতা পরে হাঁটতে হয়। অবশ্য এখানকার বাচ্চারা স্নো দিয়ে খেলতে পছন্দ করে, আবার অনেকে স্নো স্কেটিং করে।
কাজল নানান অস্থিরতা শেষে এখন পরিবারসহ স্থায়ীভাবে সুইডেনে বসবাস করার সুযোগ পাচ্ছেন। কাজলের মা–বাবা চান না কাজল এ দেশেই থেকে যাক। কিন্তু এত কষ্টের পর অন্তত সুইডিশ পাসপোর্টটি না নিলে কি হয়?
লেখক: মিজানুর রহমান