প্রবাসে প্রথম

যেদিন প্রথম সুইডেনে পা রাখে কাজল, ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছিল, মালমো থেকে এক সিনিয়র ভাই কাজলকে নিতে আসে রেলস্টেশনে। তিনি একটা ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হালকা বৃষ্টির মধ্যে সবুজ রঙের বাসে করে মালমো রোজেনগোর্ডের বাসায় পৌঁছায় কাজল। সুইডিশ সময় তখন দিনের চারটা বাজে, আর বাংলাদেশে রাত আটটা, বাংলাদেশের সঙ্গে ৪ ঘণ্টা সময়ের পার্থক্য। কাজল বাসায় পৌঁছে শুরুতে ঢাকায় ফোন করে নিরাপদে আসার খবর জানিয়ে দেয়। সুইডেনে এসে পৌঁছানোর পরও কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। বাসে আসতে আসতে চারপাশে চোখ বুলিয়ে মনে হলো, পরিকল্পিতভাবে সাজানো রাস্তাঘাট আর বাড়িঘর। এককথায় ছবির মতো সুন্দর। আরও একটা বিষয় কাজলের নজর কেড়েছে, ফ্লাইট কোপেনহেগেন নামার ১৫–২০ মিনিট আগেও আকাশে রোদ ছিল, হঠাৎ কেন জানি মেঘে ঢাকা আকাশ হাজির হলো। ফ্লাইট ল্যান্ড করার সময় মনে হচ্ছিল বিমান বুঝি পানিতে নামছে। আসলে সাগরের পাড়েই ডেনমার্কের কোপেনহেগেন।

এক–দুই দিন বেশ ঘুমে ঘুমে কাটল, এই বাসায় কাজল এবং তার সিনিয়র পরিচিত বড় ভাই ছাড়াও আরও দুজন বাংলাদেশি ছাত্র ভাড়া থাকে। বাসায় থাকার নিয়মকানুন জানা হলো। প্রতি সপ্তাহে একজনকে পুরো বাসা–বাথরুমসহ পরিষ্কার করতে হয়। রান্নাবান্না সবাই নিজেরটা নিজে করে। কাজল পরিচিত ভাইয়ের সঙ্গে রান্না শেয়ার করা শুরু করল। এখানে ছাত্ররা বেশি করে কেনে এবং খায় মুরগির রান, দামে কম, বেশি পরিমাণে কিনলে আরও কম দাম। দাম কম হওয়ার আরেকটা কারণ স্থানীয় সুইডিশ মানুষেরা হাড়সহ মাংস খুব একটা পছন্দ করে না। ছাত্ররা সবাই কমবেশি কাজে এবং পড়া নিয়ে ব্যাস্ত থাকে, একবার রান্না করে দুই–তিনবার খেতে হয়। ছাত্ররা পড়ার পাশাপাশি কাজ করে, যদিও সুইডিশ ভাষা জানা ছাড়া তেমন একটা ভালো কাজের সুযোগ নেই এখানে। বাংলাদেশি ছাত্ররা মূলত, বাংলাদেশি মালিকানায় ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে কাজ খোঁজে প্রথম এখানে এলে।

কাজল এক–দুই দিন সিনিয়র ভাইসহ কাজ খুঁজতে বের হয়, কাজের কোনো আশ্বাস মেলে না, কয়েক দিন পর লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুর হবে। তার আগে এখানে প্রশাসনিক ভবনের মাধ্যমে একটি অনুষ্ঠান হয়, যেখানে লেখার জন্য কাগজ–কলমসহ অনেক কিছু ফ্রিতে বিতরণ করা হয়। কাজল অবাক হয়ে দেখল কয়েকটি বুথে কনডমও বিতরণ করা হচ্ছে। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কাজল এখান থেকে সংগ্রহ করল। এখানে কোনো কিছু কিনতে গেলে বাংলাদেশের টাকার হিসাব মাথায় চলে আসত, এখানকার ১ টাকা বাংলাদেশের ১০ টাকার সমান। তবে মজার বিষয় হচ্ছে এখানে বাংলাদশের মতো হুটহাট জিনিসপত্রের দাম বাড়ে না, কাজল এমনও শুনেছে একটি গোটা মুরগি ২০ বছর আগেও ২০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন ২০ বছর পরেও ২০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

ক্লাস শুরু হলো, অনেক দেশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা এখানে পড়তে আসে, এই সাবজেক্টে এবার কাজল একমাত্র বাংলাদেশি। বেশি সংখ্যায় এসেছে চায়না থেকে। যে ভবনে ক্লাস হয় তার বিভিন্ন তলায় কফি মেশিন বসানো আছে, কয়েন প্রেস করে যখন–তখন কফি খাওয়া যায়। ক্লাসের মাঝখানে যখন লাঞ্চের সময় হয়, বেশির ভাগ ছাত্ররা দল বেঁধে কোথাও খেতে যায়, কাজল এত খরচ করে প্রতিদিন দুপরের খাবার খেতে চায় না, সে ব্যাগে কিছু শুকনা খাবার নিয়ে ক্লাসে আসত। বিকেলে বাসায় ফিরে ভারী খাবার খেত।

কয়েক দিন পর লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু। তার আগে এক অনুষ্ঠান হয়, যেখানে লেখার জন্য কাগজ–কলমসহ অনেক কিছু ফ্রিতে বিতরণ করা হয়। কাজল অবাক হয়ে দেখল কয়েকটি বুথে কনডমও বিতরণ করা হচ্ছে। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কাজল এখান থেকে সংগ্রহ করল।

ক্লাসের আগে–পরে কাজল নিজেই কাজ খোঁজা শুরু করল, কেউ বলে ফোন নম্বর রেখে যান, প্রয়োজনে ডাকব। আবার কেউ বলে মালিক নেই, পরে আসবেন। একদিন এক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে কাজের খোঁজে গেলে মালিক বলেন, আপনারা কেন যে হুটহাট করে এভাবে সুইডেনে চলে আসেন? কাজল একটু অবাক হলো, কাজ দিতে পরলে দেবেন, না দিলে নেই, কিন্তু আপনাদের সঙ্গে কেউ পরামর্শ করে সুইডেনে পড়তে আসবে নাকি? একটু একটু করে হতাশা বাড়তে লাগল। পরিবার দেশে, তাদের খরচ, এখানে নিজের খরচ, বাবা–মায়ের প্রত্যাশা, সব মিলিয়ে কাজল বেশ চাপে পড়ে গেল।

কাজল সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নয়, কাজকর্ম না পেলেও বছরখানেক থাকা–খাওয়ার খরচ সে চালাতে পারবে, এই বিশ্বাস আছে, সঙ্গে তিন লাখ টাকা সে নিয়ে এসেছে। এখন পড়ালেখার চাপ বাড়ছে। প্রতি মাসে একটি করে কোর্স শেষ করতে হয়। পাস করলে ক্রেডিট যোগ হবে। এক বছর পর পর্যাপ্ত ক্রেডিট জমা না হলে সুইডেনের ভিসা এক্টেনশন হবে না। এখানে পড়ার ধরন বাংলাদেশের তুলনায় পুরাই ভিন্ন। একাডেমিক রাইটিং এখনে শুরুতেই জানতে হয়। কাজলের জন্য বিষয়টা সহজ ছিল না। প্রথম একটা পরীক্ষা খারাপ হওয়ার পর কাজল রীতিমতো গবেষণা শুরু করে এবং কিছুদিনের মধ্যে এখানকার পরীক্ষা, সেমিনার, ইন্টারঅ্যাকটিভ পড়ালেখার বিষয়টি আয়ত্ত করে ফেলে।

দেশটি এত সুন্দর আর পরিপাটি, পুরো দেশের সৌন্দর্য প্রায় একই রকম দেখতে। কাজল আশপাশের দুই–একটা শহর দেখেছে, উন্নয়ন এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিটি শহরে একই রকম সুযোগ–সুবিধা পরিলক্ষিত হয়। এখানে উন্নত চিকিৎসা বা ভালো স্কুল–কলেজে পড়ার জন্য রাজধানী শহরে যেতে হয় না। সব শহরে প্রায় কাছাকাছি মানের স্কুল–কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় আছে। একটি দেশের উন্নত হওয়ার পেছনে এই বিষয়টা সবার আগে বিবেচনা করা প্রয়োজন যে দেশের নাগরিক যে শহরেই থাকুক না কেন? সে যেন তার শহরেই সেরা সুবিধাটা পায়, হউক সেটা স্বাস্থ্য বা শিক্ষাসেবা।

সুইডেনসহ আশপাশের আরও কিছু দেশ মিলে এটাকে বলা হয় স্কেনেভিয়ান, এই দেশগুলো আবার সমাজ কল্যাণমূলক দেশ । অর্থাৎ বিপদআপদে দেশগুলো নাগরিকদের পাশে থাকে বিভিন্ন রকম সুবিধাসহ। এখানে শান্তিতে থেকে কীভাবে উন্নত জীবন ভোগ করা যায়, তার গবেষণা চলে। এই ধরনের দেশগুলো তাদের রাষ্ট্রীয় আইনকানুন তৈরি করতে গিয়ে প্রথমে যা চিন্তা করে তা হচ্ছে মানুষের সর্বোচ্চ শান্তি কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।

এই দেশগুলোর উন্নত হওয়ার পেছনে আরও একটি বড় কারণ হচ্ছে এখানে শ্রেণিবৈষম্য একেবারে নেই বললেই চলে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ডাক্তার আর নার্সের বেতনে সামান্যই পার্থক্য থাকে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির প্রথম ধাপ স্কুলে চাকরি করা নাগরিকেরা ভালো বেতন পান সম্মানের সঙ্গে। একটা দেশ উন্নত করার জন্য এর চেয়ে ভালো পলিসি আর কী হতে পারে। যেকোনো পেশার নাগরিক চাইলে একটি গাড়ি এবং বাড়ির মালিক হতে পারে মোটামুটি মানের চাকরি করে।

অন্যভাবে চিন্তা করলে মনে হবে দেশ নাগরিকদের এত সুবিধা দিচ্ছে, কিন্তু বিনিময়ে নাগরিক দেশকে কী দিচ্ছে? দেশের প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে কর, যেটা বেশ বড় হারে এবং কঠোরভাবে নাগরিকদের কাছ থেকে আদায় করা হয়। বলা চলে একধরনের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা। রাস্ট্র মানুষের সুযোগ–সুবিধায় উন্নয়ন করে যাচ্ছে, নাগরিকেরা বিনিময়ে সঠিকভাবে কর প্রদান করছে। এত সব সমাজকল্যাণমূলক সুবিধার অপব্যাবহার হয় মাঝেমধ্যে। বিশেষ করে ইমিগ্রান্ট মানুষেরা কখনো কখনো এই সুবিধাগুলোর অপব্যাবহার করে। আর সরকার যখন সেটা বুঝতে পারে, তখন আইন পরিবর্তন করে সুযোগ–সুবিধা কমানোর চেষ্টা করে।

সুইডেনে কাজলের চার মাস হয়ে গেছে, এখনো কোনো কাজ পাওয়া যায়নি। কাজলের মাঝেমধ্যে মনে হয় সুইডেনে থাকা বোধ হয় সম্ভব হবে না। দেশে ফিরে যাওয়ার ভাবনাও মাথায় আসে। বাংলাদেশ থেকে পরিবার বলে ধৈর্য ধরতে। কাজল তার মাকে বলে এসেছে, দুই বছর থাকার পর দেশে ফিরে আসবে। মাকে বলা দুই বছর আসলে বলার জন্যই বলা, কাজলের ইচ্ছা হচ্ছে কোনো না কোনোভাবে সুইডেনে স্থায়ী হওয়া। আর এখন মনে হচ্ছে টিকে থাকাই বেশ কঠিন হবে। ভালো কোনো পথ পাওয়া যাচ্ছে না, যার ভিত্তিতে স্থায়ী হওয়ার আশা করা যায়।

কাজল মালমো শহরে থাকে, আর লুন্ড ইউনিভার্সিটি হচ্ছে তার পাশের শহরে। কাজল চেষ্টা করছে যদি লুন্ডে স্টুডেন্ট হাউজিংয়ে বাসা পাওয়া যায়, অনেকবার অনুরোধ করার পর ও কোনো রুম পাওয়া গেল না। এটা কাজলের একার সমস্যা নয়, এখানে রুম পেতে এক থেকে দেড় বছর লেগে যায়, পরিবারে ছোট বাচ্চা থাকলে কিছুটা জলদি আবাসন মেলে। বাচ্চার কথা বলার পর বাসা ভাড়ার কোম্পানি বলল, এক বছর লাগবে বাসা পেতে। বাংলাদেশে পরিবার আর থাকতে চাচ্ছে না। কিন্তু পরিবার নিয়ে আসতে গেলে প্রথমত আলাদা বাসা লাগবে। বাসা এবং অন্যান্য খরচ বহনের জন্য কিছু একটা কাজ পেতে হবে। মাথার ওপর বিশাল চাপ নিয়ে কাজলের দিন কাটছে। পড়ালেখা, ক্রেডিট অর্জনের প্রেশার তো প্রতি মাসেই লেগে আছে।

সুইডেনে কোনো কিছু কিনতে গেলে বাংলাদেশের টাকার হিসাব মাথায় চলে আসত, এখানকার ১ টাকা বাংলাদেশের ১০ টাকার সমান। তবে মজার বিষয় হচ্ছে এখানে বাংলাদশের মতো হুটহাট জিনিসপত্রের দাম বাড়ে না, কাজল এমনও শুনেছে একটি গোটা মুরগি ২০ বছর আগেও ২০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন ২০ বছর পরেও ২০ টাকয় পাওয়া যাচ্ছে।

এক বাঙালি ভাইয়ের বাসায় দাওয়াতে একজনের দেখা, যিনি কোপেনহেগেনে ফার্নিচার ডেলিভারির কাজ করেন। উনি বললেন, উনি একাই কাজটা করেন কিন্তু একজন সহকর্মী থাকলে ভালো হয়। ভোর চারটায় ওনার গাড়িতে করে যেতে হবে, কাজ শেষে রাতে বাসায় ফিরে আসবে, কাজলকে দৈনিক মাত্র এক শ ডেনিস ক্রোনার দেবে। দুপুরে হালকাপাতলা নাশতা। টাকার অঙ্কে এবং পরিশ্রম আর সময়ের তুলনায় এটা খুবই নগণ্য অ্যামাউন্ট। কাজলকে কিছু একটা করতে হবে, তাই রাজি হয়ে গেল। কাজ করতে গিয়ে কাজল পুরাই অবাক, শহর থেকে পুরো একটি ট্রাক ফার্নিচার লোড করে শহরের বাইরে অন্য সিটিতে গিয়ে বাসায় বাসায় ডেলিভারি দিতে হয়, এক এক ফার্নিচার ৩০০ কেজি থেকে শুরু করে ৭০০–৮০০ কেজি ওজন। অনেক কষ্টের কাজ। দুজনে মিলে পুরো কাজ শেষ করতে হয়। এক মাসের কিছু বেশি সময় বহু কষ্টে ডেলিভারির কাজটি করে কাজল।

ঠিক ছয় মাসের মাথায় কাজলের একটি কাজ মেলে মালমোতে, তা–ও আবার অনেকের সুপারিশে, মোটামুটি সেলারিতে কাজটা ভালোই আশা জাগায়। এবার সিরিয়াসলি কাজ আর পড়া পাশাপাশি চলতে থাকে। লুন্ডে বাসা পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চলতে থাকে। আরও এক পরিবার এবং একজন ছাত্র মিলে তিন রুমের একটা বাসার ব্যবস্থা হয়। বাসায় ওঠা যাবে আরও দুই মাস পরে। কাজল এবার পরিবারের সুইডেনে নিয়ে আসার জন্য আবেদন করে। সাধারণত ২–৩ মাস সময় লাগে ভিসা পেতে। আস্তে আস্তে সময় ভালো হতে থাকে। এরই মধ্যে ভিসা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ক্রেডিটও হয়ে যায় কাজলের। পরিবারের ভিসা হয়ে যায়। বউ আর ৩ বছরের একমাত্র মেয়ের সুইডেনে আসার দিনক্ষণ ঠিক হয়। কাজল আট মাসের হতাশা, দুশ্চিন্তা কাটিয়ে এবার পরিবারকে কাছে পাওয়ার আশায় আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

পরিবার আসবে, আবার নতুন করে সংসার গোছাতে হবে। কাজল অল্প অল্প করে টুকিটাকি কেনাকাটা শুরু করে। নির্দিষ্ট তারিখে বউ–বাচ্চাকে নিয়ে আসতে কোপেনহেগেন এয়ারপোর্টে যায় কাজল। আট মাস পর দেখা হয় আপনজনের সঙ্গে, বউ–বাচ্চাকে কিছুক্ষণ আলিঙ্গন করে ধরে রাখে বুকে। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি, যার সঙ্গে হয়, সে ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না। তিন বছরের মেয়ে এয়ারপোর্টে কাজলকে দেখে একটু ইতস্তত করছিল কোলে আসতে, এটাই তার বাবা কি না, অনেক দিন পর দেখা। তা ছাড়া কাজল যখন সুইডেনে আসে, মেয়ে তুষি তখন আরও ছোট ছিল। কাজলের মনে পড়ে, তুষিকে ঘুমের মধ্যে রেখেই কাজল ঢাকা এয়ারপোর্টে গিয়েছিল, তা না হলো তুষি অনেক কান্না করত।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]  

দেশের বাইরে পরিবার সঙ্গে থাকলে সাহস, শক্তি কিছুটা হলেও বাড়ে। তা ছাড়া একটা কথা আছে না, পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভাগ্যও ট্রাভেল করে। পরিবারকে কাছে পেয়ে কাজলের দুঃখকষ্ট অনেকটাই কমে গেছে, পড়ালেখা এবং কাজ দুটোই পুরোদমে চলছে। এমন অনেক সময় এসেছে যে সারা দিন কাজ করে শুধু রাতেই পড়ার সময় পাওয়া যেত, পরিবার কাছে থাকাতে খাবারের সমস্যা মিটে যায়, কাজলকে এখন আর সব সময় রান্না করতে হয় না। মেয়েটাকে বাসার কাছেই একটি স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এখানে পড়ালেখার তেমন কোনো খরচ দিতে হয় না, বরং স্কুল থেকে সারা দিন খাবারের ব্যবস্থা করা থাকে। আর চিকিৎসাও বলা যায় ফ্রি, শুধু ডাক্তার দেখাতে সামান্য একটা ফি নেয়। ওষুধ কিনতেও সুবিধা মেলে একটা নির্দিষ্ট অ্যামাউন্ট ক্রয়ের পর। ওই যে আগেই বলেছিলাম সমাজকল্যাণমূলক দেশ। জন্মের পর থেকেই বাচ্চারা একটা ভাতা পায় সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে ১ হাজার ২০০ ক্রোনারের মতো।

কার, কখন ভাগ্য খুলে যায় বা আল্লাহ ইশারা করেন বোঝা মুশকিল। একদিন কাজের মাঝখানে অনেক আগে এই দেশে আসা এক ব্যাবসায়ী বড় ভাই কাজলকে একটা কাজের কথা বলে, যেটা কি না চাইলে ব্যবসা আকারেও করা যাবে। এখানে কাজের আইন যেটা আছে বাইরের মানুষের জন্য তা এ রকম, কোনো স্টুডেন্ট যার মিনিমাম ৩০ ক্রেডিট করা আছে, সে চাইলে ফুলটাইম কাজের মাধ্যমে অথবা ব্যবসা খুলে সুইডেনের পারমান্যান্ট হওয়ার প্রসেস শুরু করতে পারে।

চাকরি পেয়ে স্থায়ী হতে গেলে ৪ বছর কাজের চুক্তিতে কাজ করে যেতে হবে। আর ব্যবসায়ী হয়ে স্থায়ী হওয়ার শর্ত হচ্ছে, দুই বছর সিরিয়াসলি ব্যবসা করতে পারলে এবং ওই ব্যবসা থেকে যে আয়রোজগার হবে তাতে পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে পারতে হবে। যে কাজটি ওই ভদ্রলোক অফার করেছিল, কাজল হিসাব করে দেখল, কাজল এবং তার বউ দুজনকেই কাজ করতে হবে, তারপর টেক্স প্রদান করে কোনোভাবে হয়তো সংসার চালানো যোতে পারে। কাজলের স্বপ্ন এ দেশে সেটেল হওয়া, টাকাপয়সা কামানোর চিন্তা বাদ দিয়ে কাজল স্থায়ী হওয়ার প্রসেসটায় বেশি গুরুত্ব দিল এবং পুরোনো কাজটা ছেড়ে দিয়ে নতুন ব্যবসাটা শুরু করে।

এবার সুইডেনে ওয়ার্ক পারমিট অ্যাপ্লাই করার একটা সুযোগ এল কাজলের। পথটা সহজ নয়। একটা নির্দিষ্ট অ্যামাউন্ট টেক্স দিতে হবে প্রতি মাসে। এই টেক্সের অঙ্কটা এমন হতে হবে যেন কর কাটার পর যা ইনকাম হয় তা দিয়ে পুরো পরিবারের ভরণপোষণ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সব খরচ বহন করা যায়। অর্থাৎ এই দুই বছর সরকারের কাছ থেকে কোনোরকম সাহায্য নেওয়া যাবে না।

পথটা কঠিন হলেও কাজল কঠিন পথটাই পাড়ি দিতে চায়। এবার শুরু হলো নিয়মিত কঠোর পরিশ্রম করা, মাঝেমধ্যে কাজলের বউ কাজে সাহায্য করে। আরেকটা স্বপ্নের শুরু হলো, যত কষ্টই হোক না কেন ব্যবসাটা করে যেতে হবে যতক্ষণ না স্থায়ী রেসিডেন্স পারমিট পাওয়া হয়। কারণ ফিরে যাওয়ার জন্য এখানে আসেনি কাজল।