সূর্যাস্তের অপেক্ষা না করে আমরা ইফতারের জন্য ফিরার হালাল রেস্তোরাঁয় রওনা হলাম। সকালে আসার সময় আসসালামু আলাইকুম বলে লিফলেট দিয়ে দিয়েছিল ওরা। সান্তরিনি দ্বীপে কোনো মসজিদ নেই। তাই ঈদের দিন সকালে আমরা ঈদের নামাজ বাসায় পড়ে সেমাই, পরোটা, মিষ্টি খেলাম। কেইভ হাউসের ছোট্ট কিচেনে সবই আছে, আমরা লন্ডন থেকে ফ্রোজেন পরোটা নিয়ে এসেছিলাম। তাই একদম দেশি স্টাইলে ঈদের দিনের নাশতা।

আজ দুপুর ১২টায় ফিরার ওল্ড জেটি থেকে আমরা ভলকানো আর হট স্প্রিং প্রমোদতরি বুক করেছি। ভলকানো দ্বীপটি কেলডেরা অঞ্চলে এবং ভলকানোটি একটি অ্যাকটিভ ভলকানো। আগ্নেয়গিরির গরমের কারণে দ্বীপের পাশের পানির তাপমাত্রা একটু বেশি আর তাই এখানে অনেকেই এই উষ্ণ পানিতে সাঁতার কাটতে ভালোবাসেন।

আগ্নেয়গিরি ছাইয়ে অনেক সালফার থাকে, তাই দ্বীপের পাশের পানির রং সবুজ। ফিরার উঁচু পাহাড় থেকে নিচের সমুদ্রে নামার জেটিতে যেতে আছে আঁকাবাঁকা ৫৮৮টি সিঁড়ি। বিকল্প হচ্ছে কেবল কার অথবা ডংকি রাইড। আমরা কেবল কারে পাঁচ মিনিটেই নিচের জেটিতে নেমে গেলাম।

জাহাজে আমাদের পাশে বসেছিলেন দুই ফ্রেঞ্চ নারী। আলাপে জানলাম, তাঁরা মা ও মেয়ে। মেয়ে স্কুলশিক্ষক। হট স্প্রিংয়ের পাশে আসতেই তাঁর মেয়ে নেমে পড়লেন পানিতে সাঁতার কাটতে। ফেরার পর বললেন, প্রথম একটু ঠান্ডা লাগে, কিন্তু সাঁতার কেটে যত দ্বীপের কাছে যাওয়া যায় পানি তত গরম। বড় মেয়ে ইসরার খুব পানিতে নামার ইচ্ছে, কিন্তু আমাদের বাঙালি বাবা-মায়ের মন ভয়ে শেষ। বললাম, আরেকটু বড় ও সাঁতারে আরও এক্সপার্ট হলে আমরা আরেকবার নিয়ে আসব ভবিষ্যতে। অ্যাকটিভ ভলকানো দেখতে অনেক দূর পাহাড়ের উঁচুতে উঠতে হয়। আমরা নেমে হাঁটা শুরু করলাম। একটু পরপর বিশ্রামের ব্যবস্থা। আমাদের মধ্যে শুধু রিপুলই একদম চূড়ায় গিয়ে আগ্নেয়গিরির বুদ্‌বুদ দেখে এসেছে। বাকিরা রণে ভঙ্গ দিয়ে আগেই ফিরে এসেছি।

চার ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে আমরা প্রায় অর্ধেক পথ চলে এসেছি, তখন আমাদের গ্রিক গাইড জানালেন, ভলকানো আইল্যান্ডে আমরা একজন ট্যুরিস্ট ফেলে এসেছি। তাঁদের অফিসে তিনি ফোন করে জানিয়েছেন এবং আমাদের নৌকা দিনের শেষ হওয়ায় আমাদের ফেরত যেতে হবে তাঁকে আনতে। কেউই বিরক্ত না, আরও কিছু সময় আমরা নীল সাগরে ঘুরতে পারব বলে সবাই খুশি। ফেলে আসা পর্যটক যখন জাহাজে উঠলেন, তখন তাঁর ডিএসএলআর ক্যামেরা দেখিয়ে সবাই বলছে, আশা করি তুমি ভালো কিছু ছবি তুলতে পেরেছ।

ফেরার পথে এক গ্রিক পর্যটক থেকে খাবার নিলাম, তাঁরা চিপসের ওপর গ্রিক ফেটা চিজ দেন। খুব ইয়ামি হয়। মালিকের নাম দিমিত্রি। সারা দোকানে বিভিন্ন দেশের নোট লাগানো। জিজ্ঞেস করতে জানালেন যে তিনি যখন রেস্তোরাঁটি শুরু করেন, তখন আত্মীয়েরা আশীর্বাদস্বরূপ যে টাকা দিয়েছিলেন, তা তিনি দোকানে ক্লিপ করে রেখেছিলেন, তা দেখে বিভিন্ন দেশের পর্যটকেরা নিজের দেশের মুদ্রা (কারেন্সি) দেওয়া শুরু করেন, এখন তাঁর দোকানে পৃথিবীর ১০০-এর বেশি দেশের কারেন্সি আছে।

বাংলাদেশের টাকা খুঁজে পেলাম না, কিন্তু আমাদের কারও সঙ্গেই বাংলাদেশের টাকা নেই, থাকলে তা দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরলাম। ঈদের পোশাক পরে ছাদে কিছু ছবি তোলা হলো, পেছনে সান্তরিনির ট্রেডমার্ক নীল গম্বুজ। ইসরা ও ইনায়দা জাকুজিতে কিছু সময় কাটাল। এখানে এখনো গরম তেমন পড়েনি। তাই বেশিক্ষণ থাকার বায়না ধরল না। কারণ, পানি খুব যে গরম, তা নয়।

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর আমি আর রিপুল আরেকবার ইয়াতে গেলাম রাতের সান্তরিনি দেখতে। গাড়ি রেন্ট করার এ সুবিধা নিজের মতো করে ঘোরা যায়।

পরদিন সকালে আমরা রেড সৈকতে গেলাম। আগ্নেয়গিরির লাভার লাল ছাইয়ের কারণে বালু লাল। সাগরের নীল পানি আর নীলাকাশ সব একাকার হয়ে আছে। ঢালু পথে গাড়ি একদম সৈকতের কাছে নিয়ে এসেছি। ওঠার সময় দেখি, গাড়ি আর খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে পারছে না। গাড়ির এসি বন্ধ করে বড়দের নামিয়ে শুধু বাচ্চাদের নিয়ে একটানা ওপরে উঠতে হয়েছে। গাড়ির চাকা যখন পাহাড়ের বালুর রাস্তায় স্কিড করে পেছনে যাচ্ছিল, তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আগে জানলে গাড়ি ওপরে রেখে নিচের সৈকতে যেতাম।

দিবা-রিপুলদের জার্মানির ফিরতি ফ্লাইট দুপুরে, আমাদের লন্ডনের ফ্লাইট রাত আটটায়। ওদের বিমানবন্দরে নামিয়ে আমরা কামারি সৈকতে গেলাম। এই সৈকতের পাশে অনেক রেস্তোরাঁ। দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা সৈকতে গেলাম। সুন্দর গোছানো সৈকত। রঙিন সব ককটেলের মেনু নিয়ে একজন এলেন। বাহারি দুটি ককটেল অর্ডার দিয়ে বারবার বললাম, কোনো অ্যালকোহল যেন না দেন। গ্রিকরা সবাই ভালো ইংরেজি বলেন ও ফ্রেঞ্চদের মতো ইংরেজি বলতে বা শুনতে কোনো অনীহা নেই এবং সবাই খুব আন্তরিক।

অপরূপ সুন্দর এই দ্বীপে চমৎকার কয়েকটা দিন কাটল। নীল সমুদ্রসৈকতে পায়ের ছাপ ঢেউ মুছে দিলেও সুন্দর মুহূর্তগুলো স্মৃতির অ্যালবামে জমা থাকল চিরদিনের জন্য। বিদায় নীল সান্তরিনি।

*লেখক: শামীম আহমদ, কেন্ট, ইংল্যান্ড