গেটউইক থেকে ইজি জেটের ফ্লাইটে সান্তরিনির ফিরা বিমানবন্দরে পৌঁছাতে আমাদের লাগল চার ঘণ্টা। বাজেট এয়ারলাইনসে খাবার কিনে খেতে হয়। খাবার ট্রলি এলে তাই ইসরা আর ইনায়দার উৎসাহের সীমা নেই, তা খাওয়ার চেয়েও প্লেনে খাবার কেনার যে ব্যাপার থাকতে পারে, তা দেখে। আমি সুযোগমতো বলে দিলাম যে দেখো, বাংলাদেশে ছোট হোক বড় হোক, সব প্লেনে খাবার সব সময় ফ্রি। ইউরোপের বাজেট এয়ারলাইনস যে হারে কিপটামো করে, আর বেশি দিন নেই যখন প্লেনে ওয়াশরুম ব্যবহারের জন্যও এরা টাকা চাইবে।

ছোট এই দ্বীপ ভালো করে দেখার জন্য আগেই অনলাইনে একটি গাড়ি ভাড়া করেছিলাম। বিমানবন্দর থেকে যখন গাড়িটি বুঝে নিলাম, তখন ছোট মেয়ের জন্য চাইল্ড বুস্টার সিট দিতে বললে গ্রিক তরুণটি দেখলাম তেমন উৎসাহী না আবার লাগবে না, এটাও বলছে না। পরে তিন দিন আমরা গাড়ি চালিয়ে বুঝেছি যে ড্রাইভিং নিয়ে এত কড়াকড়ি নেই এখানে। পুরো দ্বীপে কোনো ট্রাফিক লাইট নেই! একদম সত্যি। জংশনে সব গাড়িই থেমে গিয়ে ‘আপনি আগে’, ‘না না, আপনি আগে’ ইশারা করতে থাকে। রাইট হ্যান্ড ড্রাইভ হলেও রাস্তা এত ফাঁকা যে তেমন কোনো অসুবিধা হয় না চালাতে। তবে ছোট পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি খুব সাবধানে চালাতে হয়।

গ্রিসের রাজধানী এথেন্স থেকে ৩০০ কিলোমিটার থেকে দূরে ইজিয়ান সাগরের দ্বীপ সান্তরিনি মূলত এক সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। শেষ অগ্ন্যুৎপাত হয় ১৯৫০ সালে। এটি আবার সক্রিয় হতে পারে ভবিষ্যতে। তবে কবে, এটা কি সঠিক করে কেউ বলতে পারে? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আগেই বলেই গেছেন, ‘ভয়ংকর সুন্দর।’ সুন্দর এই দ্বীপ দেখতে গেলে এই রিস্ক তো নিতেই হবে।

ফিরা বিমানবন্দর থেকে ১৫ মিনিটের ড্রাইভে আমরা পৌঁছে গেলাম পিরগোস এলাকায় এয়ার বিএনবি থেকে রেন্ট করা আমাদের ভিলায়। জার্মানি থেকে সকালের ফ্লাইটে আমাদের বন্ধু রিপুল ও দীবা আগেই চলে এসেছে। ওরা দুজনই পিএইচডি করেছিল স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ও স্টার্লিং থেকে। ১০ বছর আগে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় আমরা ওদের সঙ্গে অনেক ঘোরাঘুরি করেছি। দুজনই এখন বাংলাদেশের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পোস্টডক করতে জার্মানিতে আছে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত।
আমাদের হলিডে হোমটি সান্তরিনির ট্র্যাডিশনাল সাদা কেভ হাউস। সান্তরিনির প্রায় সব বাড়ির রংই সাদা। সাদা চুনের রং করার কারণ নিয়ে কয়েকটি মত আছে। বৃষ্টির পানি এখানে সংরক্ষণ করা হয়, চুনে ধোয়া বৃষ্টির পানি পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় তা সংরক্ষণ করে ব্যবহারে সুবিধা। আরেকটি মতবাদ হচ্ছে, গ্রিসসহ সান্তরিনি ৪০০ বছর অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল, তখন গ্রিসের সাদা–নীল পতাকা ওড়ানো যেত না। তাই দ্বীপবাসী বাড়িগুলো সাদা রং করে ফেলে, বাড়ির ব্যাকগ্রাউন্ডে নীল আকাশ তো কোনো সাম্রাজ্যের কথায় রং বদলায় না।

টেপের পানি এখানে লবণাক্ত, তাই রান্না বা পানের জন্য বোতলের পানিই ভরসা। আর টয়লেট ব্যবহারে তো আরেক বিরাট ঝামেলা। পুরো দ্বীপের কোনো টয়লেটে কোনো টিস্যু পেপার ফেলা যায় না। টয়লেটের পাশে রাখা বিনে ফেলতে হয়। এখানকার সুয়ারেজ সিস্টেম টিস্যু পেপার হ্যান্ডল করতে পারে না। ভাগ্যিস আমাদের এশীয়রা বদনা আবিষ্কার করেছিল। না হলে চিন্তা করেন, ওসব ময়লা টিস্যু পেপারও ওই ব্যাগে ফেলতে হতো।

আমরা পৌঁছাতেই ইফতারির সময় হয়ে গেল। পাহাড়ের ঢালুতে তৈরি সাদা রঙের কেভ হাউস। সামনের দিক খোলা থাকলেও পেছনের দিকটা পাহাড়ের ভেতর। দরজা–জানালা আকাশের সঙ্গে মিল করে আকাশি রং করা। এমনভাবে বানানো যে এক ভিলা আরেক ভিলার ভিউ ব্লক করছে না। মাঝখানের খোলা ডাইনিং এরিয়া থেকে ছাদের সিঁড়ি। সিঁড়ির পাশের ঘরেই জাকুজি। ইসরা, ইনায়দা তো তখনই পানিতে নামতে চায়।

ইফতার করে আমরা সবাই ছাদে উঠে আগামীকাল থেকে দ্বীপ অভিযানের পরিকল্পনা শুরু করলাম। চমৎকার তারাভরা আকাশ। সেই সঙ্গে ইজিয়ান সাগর থেকে ছুটে আসা মাতাল হাওয়া, দূরে রাজধানী ফিরা শহরের বাতি দেখা যাচ্ছে। গ্রিস বা ইউরোপে চাঁদ দেখা যায়নি বলে আগামীকাল আমরা সান্তরিনিতে এবারের শেষ রোজা রাখব। সাহ্‌রিতে খিচুড়ি রান্নার দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপর। মেডিকেলের হোস্টেলে থাকতে রুমমেট অরুন আর রনজুর কাছ থেকে যে খিচুড়ি রান্না শিখেছিলাম, তার এক্সপেরিমেন্ট হবে আজ রাতে।

সান্তরিনির সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম ইয়া। নীল গম্বুজের গির্জা আর পেছনে নীলাকাশ হচ্ছে এ দ্বীপের ট্রেডমার্ক ছবি, যা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ সব সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায়–পাতায় ঘুরতে থাকে। রোজা থাকায় আমাদের নাশতার কোনো ঝামেলা নেই। দ্বীপের একদম উত্তরের ইয়াতে আমাদের যেতে সময় লাগবে ৩০ মিনিট। এক পাহাড় থেকে নেমে আরেক পাহাড়ে ওঠা।

কিন্তু মেয়েরা ম্যাকডোনাল্ডস খাবে, পুরো দ্বীপের একমাত্র ম্যাকডোনাল্ডসটি ফিরায়। তাই আমরা প্রথমে ফিরার ম্যাকডোনাল্ডসে গেলাম। সান্তরিনিতে কোভিডের স্বাস্থ্যবিধি এ মে মাসেও আছে, দোকানে বা রেস্তোরাঁর ভেতরে এখনো মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। নিজের না থাকলে ওরা একটা হাতে ধরিয়ে দেয়।
ফিরায় দেখা হলো এক বাংলাদেশি ভাইয়ের সঙ্গে। স্যুভেনিরের দোকানের সামনে আমাদের বাংলা কথাবার্তা শুনে উনি আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে এসেছেন। গ্রিসের এথেন্সে ছিলেন অনেক দিন। সান্তরিনিতে এসেছেন গত মাসে কাজের খোঁজে। বললেন, এখানে থাকা–খাওয়ার খরচ অনেক বেশি, কয়েকজন মিলে এক বাসায় থাকেন আর এশীয় খাবারেরও সুবিধা কম। উনি শিগগিরিই এথেন্সে ফিরে যাবেন।

ফিরা থেকে ইয়াতে যাওয়ার পথে পাশে এক সুন্দর নীল সমুদ্র দেখে আমরা আবার থামলাম। এই সৈকত পাথুরে হওয়ায় মনে হয় একদম ফাঁকা। আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। কিছুক্ষণ এখানে কাটিয়ে আমরা ইয়াতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাই দুপুর হয়ে গেল। কার পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে সরু রাস্তা ধরে আমরা সবাই রিপুলকে ফলো করছি, ও গুগল ম্যাপ দেখে নীল গুম্বুজওয়ালা চার্চে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। রাস্তার দুই পাশে স্যুভেনিরের দোকান। খালেদা অলরেডি বুঝে ফেলেছে, এখানে দরদাম করা যায়। দ্বিগুণ উৎসাহে কেনাকাটা চলছে। চলবে...