দশ দিন তিন দেশ: তৃতীয় পর্ব
ড্রেসডেন ভ্রমণ শেষে ফিরে আসার পর মা-মেয়ে আর আমি মিলে বসলাম পরবর্তী ভ্রমণ প্ল্যান ঠিক করতে। ঠিক হলো, যেহেতু বার্লিন আমাদের বেজ, সে তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না! সুতরাং আশপাশের আরও দু–একটা শহর ঘুরে তারপর আরামে বার্লিন ঘোরা যাবে।
প্ল্যানমাস্টার লামিয়া ঠিক করল, পরবর্তী দুদিনের মিশন: লুবেনাউ ও পটসডাম অভিযান। ট্রেনের সময় দেখা আর নতুন কাহিনির খোঁজে বেরিয়ে পড়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল!
জার্মানিতে আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে কার্যকর সঙ্গী ছিল DB-এর Deutschland-Ticket। একটি মাসিক টিকিট দিয়েই আমরা বার্লিন, পটসডাম, ড্রেসডেন, লুবেনাউসহ বিভিন্ন শহরে S-Bahn (শহরতলির ট্রেন), U-Bahn (মেট্রো/সাবওয়ে), ট্রাম, বাস এবং আঞ্চলিক ট্রেনে অবাধে যাতায়াত করেছি। ফলে প্রতিটি যাত্রার আগে আলাদা টিকিট কেনার ঝামেলা হয়নি, সময় ও অর্থ দুটিই সাশ্রয় হয়েছে। ভ্রমণের পুরো সময়টায় এই টিকিট আমাদের চলাচলকে করেছে সহজ, স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং দুশ্চিন্তামুক্ত। এই টিকিটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, জার্মানির সব অঞ্চলে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পরিবহনে ভ্রমণ করা যায়। শুধু বড় শহর নয়, ছোট শহর ও গ্রামের সৌন্দর্যও সহজে উপভোগ করা সম্ভব।
লুবেনাউ: ইউরোপের মাঝখানে বাংলাদেশের গ্রামকে খুঁজে পাওয়া—
বার্লিন থেকে সকালে রওনা দিলাম লুবেনাউয়ের দিকে। ট্রেনের জানালার বাইরে জার্মানির গ্রীষ্মকালীন প্রকৃতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। কোথাও সবুজ মাঠ, কোথাও হলুদ শর্ষের মতো রঙের ফসল, কোথাও দূরে উইন্ডমিলের ধীর ঘূর্ণন। লুবেনাউ শহরে পৌঁছানোর পর আমার প্রথম অনুভূতি ছিল—এই জায়গা যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপের শহরগুলো সাধারণত দ্রুতগতির, চকচকে, আধুনিক। কিন্তু লুবেনাউ ঠিক উল্টো। এই শহরের সৌন্দর্য জাঁকজমকপূর্ণ নয়; বরং নরম, শান্ত, ধীর।
লুবেনাউয়ের প্রাণজুড়ে প্রবাহিত হয়েছে স্প্রিওয়াল্ড— জলপথের আঁকাবাঁকাতে আঁকা এক শহর। ইউনেসকোস্বীকৃত এক অনন্য জীবমণ্ডল অঞ্চল। শত শত সরু খাল, সবুজে ঢাকা বনপথ আর গাছগুলো রঙে রঙে ভরা—লাল, সবুজ, বাদামি। কাঠের ছোট ছোট সেতু আর ধীরগতির নৌকার চলাচল—সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা এক জলরঙের ছবি। লুবেনাউয়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার খালপথ। খালের পানি এত শান্ত যে মনে হয় পানি নয়, সময়ই সেখানে থেমে আছে।
সানসুসি পযালেন্স শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি ফ্রেডরিক দ্য গ্রেটের ব্যক্তিগত দর্শনের প্রতীক। তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক রাজা—যিনি যুদ্ধের চেয়ে সংগীতকে বেশি ভালোবাসতেন, ক্ষমতার চেয়ে নীরবতাকে বেশি মূল্য দিতেন।
ইউরোপের এই ছবির মতো দৃশ্যের ভেতর হঠাৎ করে বাংলাদেশের কথা মনে পড়বে—সেটা সত্যি ভাবিনি। কিন্তু লুবেনাউ পৌঁছে প্রথম ধাক্কাটা সেখানেই খেলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল একটি বিশাল খড়ের গাদা। আসলে বেশ কয়েকটা ইতস্তত ছড়ানো খড়ের মেই। অবিকল যেমনটা দেখা যায় আমাদের গ্রামগুলোতে। সেই একই আকৃতি, একই রং, একই বিন্যাস। খড়ের মেইটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ল গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার কথা। ধান কাটার মৌসুম শেষে মাঠ থেকে খড় এনে এভাবেই তুলে রাখা হতো। বিকেলে আমরা খড়ের গাদার চারপাশে খেলতাম, কখনো গোপন ঘাঁটি বানাতাম, কখনো তার ওপর উঠে বসে আকাশ দেখতাম। সন্ধ্যা নামলে মা দূর থেকে ডাক দিতেন, আর আমরা অনিচ্ছায় ফিরতাম ঘরে।
স্মৃতিগুলো এত দিন কোথায় লুকিয়ে ছিল কে জানে! লুবেনাউয়ের সেই খড়ের মেই যেন এক ঝটকায় সব খুলে দিল। অদূরে সবুজ ঘাসে ঘেরা একটি বড় মাঠে কয়েকটি গরু নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে। দূরে গাছের সারি, আকাশে মেঘের ভেলা, আর সেই খড়ের মেই—মনে হলো, কয়েক মুহূর্তের জন্য জার্মানি মিলিয়ে গেছে, আর আমি ফিরে গেছি বাংলাদেশের কোনো গ্রামে। আমি থমকে দাঁড়ালাম। ইউরোপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেশের গ্রামের গন্ধ পাওয়া—এটা এক অদ্ভুত, অপ্রত্যাশিত আনন্দ। মনে হচ্ছে, বিদেশে এসে নিজের গ্রামের সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে।
লুবেনাউকে স্থানীয়রা মজা করে বলে ‘Gurkenhauptstadt’—অর্থাৎ আচারের রাজধানী। স্প্রিওয়াল্ডের শসার আচার জার্মানিতে কিংবদন্তি।
লুবেনাউয়ের আরেকটি সৌন্দর্য হলো Sorbian জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। তাদের ভাষা, পোশাক, গান—সবকিছুই জীবন্ত ঐতিহ্য। লাল ছাদের ছোট ঘর, কাঠের জানালা আর রঙিন ফুলের বাগান। খালের ধারে সাজানো ক্যাফে, রেস্তোরাঁ আর ওই দূরে একটি গির্জার চূড়া আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খালের ওপর ভেসে থাকা নৌকা, পাশে কাঠের ডক, আর আকাশে নাটকীয় মেঘ—সব মিলিয়ে শহরটি যেন কোনো পুরোনো ইউরোপীয় উপন্যাসের দৃশ্য। কয়েকটি বাড়ির সামনে ছোট ছোট টেবিলে সাজানো ছিল মৌসুমি ফল—চেরি, বেরি আর কিছু পরিচিত-অপরিচিত ফল। ফলগুলো ছোট ছোট প্যাকেটে গুছিয়ে রাখা। পাশে একটি বোর্ডে দাম লেখা, আর তার ঠিক পাশেই ছোট্ট একটি ক্যাশবক্স। কোনো বিক্রেতা নেই। আপনি ফল পছন্দ করবেন, দাম অনুযায়ী টাকা বা কয়েন বক্সে রেখে দেবেন, তারপর ফল নিয়ে চলে যাবেন। আমরাও একটি টেবিলের সামনে থামলাম। লাল টুকটুকে চেরির কয়েকটি প্যাকেট দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না। নির্ধারিত টাকা বক্সে রেখে একটি প্যাকেট তুলে নিলাম। ভ্রমণের শেষে অনেক দৃশ্য ভুলে গেছি, কিন্তু সেই নির্জন টেবিল আর বিশ্বাসভরা বাক্সটি আজও মনে রয়ে গেছে।
পটসডাম শুধু রাজাদের শহর নয়; এটি ইতিহাসের শহরও। এখানেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের নতুন মানচিত্র আঁকা হয়েছিল।
পটসডাম: রাজাদের নিঃশব্দ দুপুর আর ইতিহাসের নরম আলো—
বার্লিন থেকে অল্প সময়ের ট্রেনযাত্রা পটসডাম। বার্লিনের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে যখন ট্রেন পটসডামের দিকে এগোতে থাকে, জানালার বাইরে দৃশ্য বদলে যায়। উঁচু ভবনের জায়গা নেয় সবুজ মাঠ, লাল ছাদের ছোট ঘর, আর দূরে গাছের সারি। মনে হয়—শহর থেকে বেরিয়ে কোনো শান্ত, রাজকীয় চিত্রকর্মে দিকে হাঁটছি।
পটসডাম এমন এক শহর, যেখানে ইতিহাসের ভার নেই; আছে নরম আলো। এখানে রাজাদের পদচিহ্ন আছে, কিন্তু অহংকার নেই। এখানে প্রাসাদ আছে, কিন্তু কোলাহল নেই। এখানে আছে এমন এক নীরবতা, যা মানুষকে নিজের ভেতর টেনে নেয়।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে প্রথম যে জায়গাটি আমাকে থামিয়ে দিল, তা হলো ডাচ কোয়ার্টার। লাল ইটের ঘর, কাঠের জানালা, ছোট ক্যাফে—সব মিলিয়ে মনে হয় যেন ইউরোপের কোনো পুরোনো বাণিজ্যিক শহরে এসে পড়েছি। রাস্তার দুপাশে সাজানো দোকানগুলোতে স্থানীয় শিল্পীরা নিজেদের কাজ সাজিয়ে রেখেছেন। একটা নরম, ধীর, শান্ত জীবন এখানে স্পষ্ট।
এই পথের শেষেই দাঁড়িয়ে আছে Sanssouci Palace—প্রুশিয়ান রাজা ফ্রেডরিক দ্য গ্রেটের ব্যক্তিগত আশ্রয়স্থল। একটি প্রাসাদ, যার নামের অর্থই বলে দেয় তার চরিত্র—Sans Souci, অর্থাৎ চিন্তামুক্ত। পটসডামের হৃদয় হলো Sanssouci Palace। ফরাসি শব্দ Sans Souci—অর্থ চিন্তামুক্ত। প্রাসাদের সামনে দাঁড়ালে নামের অর্থটা যেন বাতাসে ভেসে আসে।
অনেক প্রাসাদ আছে যেখানে রাজকীয়তা চোখে পড়ে। কিন্তু সানসুসি আলাদা। এখানে রাজকীয়তা নেই; আছে শান্তি। এখানে ক্ষমতার প্রদর্শন নেই; আছে নীরবতার সৌন্দর্য। রোকোকো শৈলীর সোনালি দেয়াল, মার্বেল মেঝে, আর নিখুঁত অলংকরণ—কোথাও রাজকীয়তা, কোথাও শিল্প, কোথাও নীরবতা। বাগানের নিচ থেকে ওপরের দিকে তাকালে প্রাসাদটি যেন ধীরে ধীরে উঠে আসে—একটি সোনালি রেখা, একটি নীরব স্থাপনা, একটি শান্ত রাজ্য।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
পটসডামের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার বাগানগুলো। সবুজ মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মার্বেলমূর্তি, দূরে ঝিলমিল করা ফোয়ারা, গাছের পাতায় আলো-ছায়ার খেলা, চারপাশে নীরবতা, দূরে পাখির ডাক, বাতাসে আঙুরপাতার নরম শব্দ আর সামনে সানসুসির সোনালি দেয়াল—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
পটসডাম শুধু রাজাদের শহর নয়; এটি ইতিহাসের শহরও। এখানেই হয়েছিল Potsdam Conference, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের নতুন মানচিত্র আঁকা হয়েছিল।
সানসুসি পজালেন্স শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি ফ্রেডরিক দ্য গ্রেটের ব্যক্তিগত দর্শনের প্রতীক। তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক রাজা—যিনি যুদ্ধের চেয়ে সংগীতকে বেশি ভালোবাসতেন, ক্ষমতার চেয়ে নীরবতাকে বেশি মূল্য দিতেন।
চারপাশে যত দূর চোখ যায়, বাগান, টেরেস, ফোয়ারা, ভাস্কর্য আর সুবিশাল সব স্থাপনা। সেই পুরোনো আমলের একটা উইন্ডমিলও চোখে পড়ল। রাজাদের প্রাসাদ বলে কথা—সবকিছুই বিশাল, সুপরিকল্পিত এবং অভিজাত সৌন্দর্যে ভরপুর।
এক বিকেল বা এক বেলায় এই পুরো এলাকা ঘুরে দেখা আসলে প্রায় অসম্ভব। একটি অংশ দেখে আরেকটি দিকে এগোতেই নতুন কোনো বাগান, নতুন কোনো প্রাসাদ কিংবা নতুন কোনো দৃশ্য চোখে পড়ে।
আমাদের হাতে সময় সীমিত ছিল। তবু যতটুকু দেখেছি, তাতেই মুগ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কোথাও রাজকীয় ইতিহাসের ছোঁয়া, কোথাও প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য।
কিছুটা ক্লান্ত হয়ে বাগানের একটি বেঞ্চে বসলাম। দূরে ফোয়ারা, সামনে সোনালি রঙের প্রাসাদ, চারপাশে পাখির ডাক। মনে হলো, পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে পৌঁছে মানুষের কোনো কথার প্রয়োজন হয় না। শুধু পাশে বসে থাকা যায়। শুধু একটু চুপ করে থাকা যায়।
পটসডাম শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছালে প্রথম যে জায়গাটি থামিয়ে দেয়, তাক করায়, আর নীরবে ইতিহাসের দিকে টেনে নেয়—তা হলো alter Markt; অর্থাৎ পটসডামের পুরোনো মার্কেট স্কয়ার। এটি শুধু একটি স্কয়ার নয়; এটি শহরের আত্মা। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়—পটসডাম তার ইতিহাস, রাজকীয়তা, শিল্প আর নীরবতা একসঙ্গে ধরে রেখেছে।
আল্টার মার্কেটের সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো স্থাপনা হলো St. Nicholas Church—একটি বিশাল গম্বুজযুক্ত চার্চ, যা স্কয়ারটিকে রাজকীয় সৌন্দর্য দেয়।
আল্টার মার্কেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো Potsdam City Palace—যা একসময় প্রুশিয়ান রাজাদের বাসভবন ছিল। যুদ্ধের সময় প্রাসাদটি ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু আজ তার পুনর্নির্মিত অংশ স্কোয়ারটিকে রাজকীয় ছায়া দেয়।
একজন পথশিল্পী শান্ত মনে তাঁর বাদ্যযন্ত্রে সুর তুলছেন। সুরের ভাঁজে ভাঁজে যেন মিশে আছে নিজের সুখ-দুঃখ, স্মৃতি আর স্বপ্নের গল্প। আশপাশে কে থামল, কে চলে গেল, তা যেন তাঁর ভাবনায় নেই। সামনে রাখা খোলা বাক্সটিও কেবল উপার্জনের জন্য নয়, বরং শিল্পী আর পথচারীর নীরব এক সংযোগের প্রতীক। ইউরোপের জনাকীর্ণ চত্বর হোক কিংবা নির্জন কোনো পথ, এমন দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে। কেউ নিজের মনে গান গেয়ে যায়, কেউ বাঁশিতে সুর তোলে, কেউ আবার গিটারের তারে জীবনের গল্প শোনায়।
চার্চের সিঁড়িতে বসে মানুষ গল্প করে, ছবি তোলে, বা শুধু নীরবে চারপাশ দেখে। মনে হয়, জায়গাটি শহরের নীরবতার কেন্দ্র। আর সেই নীরবতার মধ্যেই হয়তো ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো জন্ম নেয়।