‘ক্ষমতা’কে প্রশ্ন করা যাবে?

রাজনীতিপ্রতীকী ছবি

ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। স্বাধীন মতপ্রকাশ আর নির্ভয়ে প্রশ্ন করার অধিকার না থাকলে, গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র বিকশিত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে নির্ভয়ে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ভয় যখন নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে, স্বাধীনতার নামে মূলত পরাধীনতার শৃঙ্খলটি তখন গায়ে জড়িয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজ, রুদ্ধ হয়ে পড়ে গণতন্ত্রের বিকাশ। শাসক হয়ে ওঠে স্বৈরাচার, রাষ্ট্র হয়ে পড়ে অমানবিক। ‘ক্ষমতা’কে প্রশ্ন করা গণতন্ত্রের অনিবার্য অনুষঙ্গ! আমাদের সমাজ কি সেই পথে এগিয়ে যাবে?

পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র সর্বত্র আধিপত্যবাদের সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতিতে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা সহজ কাজ নয়। তবু মফস্‌সল থেকে রাজধানী অবধি কিছু মানুষ প্রশ্ন করার জন্য দাঁড়িয়ে যান। কখনো কখনো ফলাফলটি নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। মফস্‌সলের সাংবাদিক প্রবীর শিকতার তাঁর প্রমাণ। ক্ষমতার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। ফলস্বরূপ পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে হলো। ক্ষমতা খুশি হলেন! সমাজ, রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতা দেখল।

আরও পড়ুন

এবিএম মূসা! লেখক, সাংবাদিক কলামিস্ট হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শৈশব থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের অনুসারী হিসেবেই মানুষ দেখেছে। আওয়ামী লীগের চরম দুর্দিনেও কলম থামেনি। একসময়ে ‘প্রশ্ন করা’ তাঁর জীবনে কাল হয়ে উঠল! ক্ষমতার চক্ষুশূল হয়ে গেলেন। তাঁর মৃত্যুতেও শেখ হাসিনা আর আওয়ামী লীগের চোখের কোণে পানি আসেনি।

গাফ্‌ফার চৌধুরী! ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ! অবিরত বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ আর মুক্তিযুদ্ধের পাশে! সত্য যখন বিপক্ষে চলে গেল! তখন তিনিও ক্ষমতার চক্ষুশূল হয়ে উঠলেন। একের পর এক, যখন ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন, ক্ষমতার চারপাশের তির তাঁর গায়ে বিঁধতে শুরু করল। লাখ লাখ অনুসারী কাঁদলেও, ক্ষমতা কাঁদেনি। শেষবিদায়টা ছিল অনাড়ম্বর।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

ক্ষমতাকে প্রশ্ন করলে জীবন বিপন্ন হয়! কারাগারের প্রকোষ্ঠ আর দুঃসহ রিমান্ড অনিবার্য হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের অনুসারী হয়ে যায়, জামায়াত-বিএনপি। বিএনপির অনুসারী হয়ে যায় ‘র’–এর এজেন্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে প্রতিকৃতি বানিয়ে জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্নকর্তাকে দুদকের জালে আটকে ফেলে দেয়ালবন্দী করা হয়। আব্দুন নূর তুষার আর আনিস আলমগীর এর নিষ্ঠুরতম উদাহরণ।

ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে শুধু ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানও বিপন্ন হয়। আধিপত্যবাদ প্রশ্নের মুখে পড়লে গণভবনের চার দেয়ালে নিষিদ্ধ হয়ে যায় ডেইলি স্টার, প্রথম আলো। নিষিদ্ধ হয় একুশে টিভি। দখল হয়ে যায় জনকণ্ঠ। তালাবদ্ধ হয় ‘আমার দেশ’! সাংবাদিক, সম্পাদকদের দেশান্তরি হয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়। বাঁচার জন্য মালিককে ক্ষমতা–ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক বানাতে হয়। কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ–বা শান্তির অন্বেষায় আবার কেউ বাধ্য হয়ে তৈল মর্দনের পথটি বেছে নেয়! প্রশ্ন করা অব্যাহত রাখলে, গরু জবাই করে মেহমানদারি করা হয়। ভবনসুদ্ধ জ্বলে যায়, ক্ষমতা থাকে নির্বিকার!

প্রশ্নকর্তার সুরক্ষা নেই। তাই জন্ম নেয় সুবিধাবাদ। প্রশ্নকর্তা যে সময় নিয়ে প্রশ্ন করেন, তার দশ গুণ সময় স্তুতি বাক্য আওড়ান। ক্ষমতাকে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করেন। ক্ষমতার প্রশংসা করেন! ক্ষমতার পিতা-মাতাকেও মহামানব বানিয়ে ছাড়েন! সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রশ্নকর্তার অনুকূলে থাকে না। তাই প্রশ্ন করা সহজ নয়। প্রশ্নকর্তার তথ্য ক্ষমতার অনুকূলে না গেলে রক্তচক্ষুর চাহনি সারাক্ষণ প্রশ্নকর্তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

২৪–এর অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে অনেকেই ভাবলেন, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার মোক্ষম সময় সামনে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সরকারপ্রধান যখন বললেন, ‘আপনারা মন খুলে কথা বলুন, যা খুশি তা লিখুন’! অনেকেই সাহসী হওয়ার চেষ্টা করলেন। এক ছাত্র তাঁর শিক্ষককে বললেন, ‘স্যার এবার মন খুলে লিখুন’ কিছুদিন যেতে না যেতেই, ‘স্যার’ মানে লরিয়েটের সেই অধ্যাপক বন্ধু যেন বাক্‌শক্তি হারিয়ে ফেললেন। প্রেসার গ্রুপ নামক এক দানবীয় মবোক্রেসি ক্ষমতার পাশে দাঁড়িয়ে গেল। শারীরিক, মানসিক নিগ্রহের সংস্কৃতি নৈমিত্তিক হয়ে উঠল। আশা জাগিয়েছিলেন অধ্যাপক ইউনূস। স্বপ্ন ফিকে হতে সময় লাগেনি!

প্রশ্ন করা মানবিক অধিকার। স্বৈরতন্ত্র প্রশ্নকে ভয় পায়। দলনিরপেক্ষ সরকারের আমলে প্রশ্নকর্তারা কেমন থাকে? মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, বিগত এক বছরে ৩৮১ জন সাংবাদিক নিগৃহীত হয়েছেন। তিনজন নিহত হয়েছেন, চারজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ১১৮ জন সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন, ২০ জনের ওপর মৃত্যু পরোয়ানার হুমকি জারি হয়েছে। ১২৩ জন সংবাদ প্রকাশের জন্য মামলার মুখোমুখি হয়েছেন! ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা কি আসলেই সহজ?

পশ্চিমের দেশে পায়ের ওপর পা তুলে ক্ষমতাকে তির্যক প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার সংস্কৃতি আছে। উত্তর যথাযথ না হলে, ক্ষমতা কেঁপে ওঠে। প্রশ্নকর্তার ভয়ে ‘ক্ষমতা’ সদা-সর্বদা তটস্থ থাকেন। গণতন্ত্রকে পথে রাখতে, রাষ্ট্র প্রশ্নকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে। আমাদের সমাজের চিত্রটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ক্ষমতা অখুশি হলে প্রশ্নকর্তাকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। শুধু রাষ্ট্রীয় হেনস্তা নয়, শারীরিক মানসিক হেনস্তার শত সহস্র দৃষ্টান্ত এখন জাতির সামনে। প্রথম আলোর রোজিনা ইসলাম আজও তার সাক্ষী হয়ে আছেন।

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন এক সংস্কৃতির জন্ম দিল। লন্ডন থেকে ঢাকার মাটিতে ফিরে অদ্যাবধি তারেক রহমানের প্রতিটি কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সুবাতাসের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। বক্তব্যে রূঢ়তা নেই, প্রতিহিংসার ইঙ্গিত নেই, নিজেকে সাধারণ থেকে আলাদা করার অদম্য কোনো প্রতিযোগিতা নেই। প্রশ্ন করার আগে স্থুতি বক্তৃতাকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, জনতার চোখে যেন ভিনদেশের কোনো রাজনৈতিক নেতার প্রতিচ্ছবি! ২৪–এর অভ্যুত্থানের পর নারীদের মুখেও যখন অশালীন স্লোগান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তখন শুধু নিজেকে নয়, নিজের দলকেও অশালীনতা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন! এমন দৃষ্টান্ত যখন সামনে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সুযোগটি কি তবে উন্মোচিত হবে?

অতীতে কেউ বাধ্য হয়ে কেউ–বা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় ক্ষমতাকে তোষামোদ করেছেন! এই তোষামোদকারীদের অনেকেই আজ নিষ্ঠুর প্রায়শ্চিত্ত করছেন। নির্ভয় আর আইনের সংস্কৃতি চালু থাকলে, এদের অনেকেই হয়তো তোষামোদকে বেছে নিতেন না। দুঃখজনক হলেও সত্য, দোসর আখ্যায়িত হয়ে এদের অনেকেই আজ বিতর্কিত মামলার আসামি। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার উদার সংস্কৃতি চালু থাকলে, লাভবান হতো গণতন্ত্র! ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা থাকলে, লাভবান হতো শুদ্ধাচারের সংস্কৃতি! তারেক রহমান কি পারবেন সেই সংস্কৃতির কান্ডারি হতে?

লেখক: কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক
ই–মেইল : [email protected]