গাড়ির চাকায় ইউরোপের ছাদে: শেষ পর্ব
বৃষ্টিস্নাত হালস্টাট—
পরদিন সকালে লিনজের সেই বিশাল বাড়িটিকে বিদায় জানানোর পালা। সকাল নয়টায় যখন চেকআউট করলাম, তখন বাইরের আকাশ ভার হয়ে আছে। গাড়িতে বাক্স-পেটরা ভরার সময় থেকেই শুরু হলো টিপটিপ বৃষ্টি। সেই মেঘলা আকাশ সঙ্গেই রইল আমাদের।
প্রায় দেড় ঘণ্টার ড্রাইভ শেষে আমরা পৌঁছালাম অস্ট্রিয়ার সেই জাদুকরি গ্রাম হালস্টাটে। পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে, বিশেষ করে বাচ্চাদের কাছে এই গ্রামের আবেদনই আলাদা। কারণটা হলো ডিজনি! শোনা যায়, ডিজনির বিখ্যাত মুভি ‘ফ্রোজেন’-এর কাল্পনিক রাজ্য ‘এরেন্ডেল’-এর নকশা নাকি এই গ্রামের আদলেই তৈরি। তাই বাস্তবের এই রূপকথার রাজ্যে একবার পা ফেলার স্বপ্ন নিয়ে সবাই এখানে ভিড় জমায়।
ভিড়ের কারণেই কি না, গাড়ি পার্কিং মিলল বেশ দূরে, এক আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে। গাড়ি থেকে নামতেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় যাকে বলে একদম ‘আকাশ ছেঁচা বৃষ্টি’। আমাদের প্রস্তুতির ভান্ডার খুব একটা সমৃদ্ধ ছিল না। খালেদার ব্যাগে দুটো রেইনকোট ছিল, ওগুলো ইসরা আর মানহা পেল। বাকিরা দুটি ছাতা দিয়ে কোনোমতে মাথা বাঁচিয়ে লেকের পাড়ে এসে দাঁড়ালাম।
বৃষ্টি উপেক্ষা করেই আমরা লেকের ক্রুজ বোটে চড়ে বসলাম। বৃষ্টির ছাট আর কুয়াশার চাদরে মোড়ানো হালস্টাটকে মনে হচ্ছিল এক রহস্যপুরী। লেকের বুক থেকে তাকালে পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে সাজানো ছোট ছোট কাঠের বাড়ি আর গ্রামের আইকনিক চার্চের চূড়াটা অপূর্ব লাগছিল। রোদঝলমলে হালস্টাট হয়তো অনেকেই দেখেছেন, কিন্তু এই বৃষ্টিস্নাত হালস্টাটের রূপ একদম অন্য রকম—একটু বিষাদমাখা, কিন্তু ভীষণ সুন্দর।
বোটের সামনের ডেকে দাঁড়িয়ে আমরা বৃষ্টি মাথায় নিয়েই কিছু ছবি তোলার চেষ্টা করছিলাম। আমাদের অবস্থা দেখে এক সহযাত্রী এগিয়ে এলেন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের সবার একটা সুন্দর গ্রুপ ছবি তুলে দিলেন। কথায় কথায় জানলাম, তিনি তার ছোট মেয়েকে নিয়ে সুদূর কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া থেকে বেড়াতে এসেছেন। কানাডার প্রসঙ্গ আসতেই আমি বললাম, ‘আমাদেরও খুব ইচ্ছে একবার কানাডার রকি মাউন্টেন আর ব্যানফ (Banff) ঘুরে দেখব।’ শুনে উনি মুচকি হেসে বললেন, ‘ওখানের আবহাওয়াও কিন্তু অনেকটা আজকের মতোই—এমন ভেজা আর ঠান্ডা। তবে হ্যাঁ, গরমকালে গেলে কিছু ঝলমলে দিন অবশ্যই পাবে।’
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমাদের ইচ্ছে ছিল পাহাড়ের ওপরের প্রাচীন লবণ খনি বা সল্ট মাইন (Salzwelten) দেখার। কিন্তু বেরসিক আবহাওয়া সব প্ল্যান ভেস্তে দিল। চারদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা, ওপর থেকে কিছুই দেখার উপায় নেই। তাই আর ওপরে ওঠার ঝুঁকি নিলাম না। ততক্ষণে আমাদের জুতা-জামা ভিজে একাকার। ঠান্ডাও জেঁকে বসছিল। অগত্যা পাশের এক দোকান থেকে টেক-অ্যাওয়ে খাবার কিনে আমরা দ্রুত গাড়িতে উঠে পড়লাম। ভেজা শরীরে গাড়ির হিটারের ওমে বসে দুপুরের খাবার খাওয়ার মধ্যে একটা অদ্ভুত আরাম ছিল।
রূপকথার রাজ্য হালস্টাটকে বিদায় জানিয়ে দুপুরের পর আমরা আবার রাস্তায় নামলাম। এবার আমাদের গন্তব্য প্রতিবেশী দেশ ইতালি। সামনে অপেক্ষা করছে আল্পসের আরেক বিস্ময়—ডলোমাইটস।
ইতালির পথে রওনা দিয়ে আমরা যখন অস্ট্রিয়ার বর্ডারের কাছাকাছি, তখন চার্জের জন্য অস্ট্রিয়ার ‘ফচো’ এলাকার এক সার্ভিস স্টেশনে থামলাম। জায়গাটা ইসরার চেনা। দুই বছর আগে ও স্কুল থেকে স্কিয়িং করতে এখানে এসেছিল। হঠাৎ করে তা আবিষ্কার করে বেশ রোমাঞ্চিত হলো। সেবার স্কুল থেকে দুটি কোচে একই ক্লাসের ওরা ১০০ জন ১৬ ঘণ্টা কোচ জার্নি করে কেন্ট থেকে এখানে এসেছিল।
ইতালির পথে ও পান্না রঙের লেক
চার্জ শেষ করে আমরা যখন অস্ট্রিয়ার মেঘে ঢাকা পাহাড়ের সুড়ঙ্গ বা টানেলে ঢুকলাম, তখনো আকাশ গুমোট। কিন্তু টানেল থেকে বেরোতেই একি ভোজবাজি! আকাশ একদম পরিষ্কার, ঝকঝকে নীল। সুড়ঙ্গপথ যেন আমাদের এক দেশ থেকে আরেক দেশে, এক ঋতু থেকে আরেক ঋতুতে পৌঁছে দিল। স্বাগত ইতালি!
গাড়িতে ছোটরা শুরু করল ‘Guess Who’ খেলা। ২০টা প্রশ্ন করে বের করতে হবে কে কাকে ভাবছে। ওদের হাসাহাসিতে পথের ক্লান্তি গায়েই লাগল না। ডলোমাইটসের পাহাড়ি রাস্তায় একটু পরপরই টানেল। এরই মধ্যে অন্য গাড়ি থেকে ফোন এল—ওরা হালাল টেক-অ্যাওয়ে থেকে সবার রাতের খাবার কিনে নিয়েছে।
রূপকথার রাজ্য হালস্টাটকে বিদায় জানিয়ে দুপুরের পর আমরা আবার রাস্তায় নামলাম। এবার আমাদের গন্তব্য প্রতিবেশী দেশ ইতালি। সামনে অপেক্ষা করছে আল্পসের আরেক বিস্ময়—ডলোমাইটস।
রাত তখন বেশ গভীর। আমরা যখন ইতালির ডলোমাইটসে আমাদের বুক করা এয়ার-বিএনবির এলাকায় পৌঁছালাম, তখন চারপাশটা এতটাই নিঝুম যে গা ছমছম করে উঠল। রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই, জনমানুষের দেখা নেই, এমনকি কোনো দোকানেও আলো জ্বলছে না। মনে হচ্ছিল আমরা যেন কোনো এক ভুতুড়ে শহরে প্রবেশ করছি! অন্য গাড়িটি আমাদের আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। মুরাদ ভাই মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে এগিয়ে এসে আমাদের ড্রাইভওয়ে থেকে ঘরে নিয়ে গেলেন। বাড়ির ডেকোরেশন বেশ পুরোনো ধাঁচের, তবে ছিমছাম। কিচেন ও ডাইনিং স্পেস পাশাপাশি। এত ধকলের পর রাতে আমরা সদ্য রান্না করা গরম ভাত আর কারি দিয়ে তৃপ্তির ডিনার করলাম।
পান্না রঙের লেক: লাগো ডি ব্রেইস
পরের দিন সকাল। আজ আমাদের গন্তব্য ডলোমাইটসের মুকুটের মণি—লাগো ডি ব্রেইস (Lago di Braies)। বছর দুয়েক আগে ‘পেনসিল ইউকে’ গ্রুপে মাসুদ ভাইয়ের তোলা এই লেকের ছবি দেখেই প্রেমে পড়েছিলাম। তাঁরা ভেনিস থেকে ড্রাইভ করে এসেছিলেন। তখনই ঠিক করেছিলাম, এদিকে আসলে পৃথিবীর সেরা ১০টি সুন্দর লেকের তালিকায় থাকা এই জায়গাটি মিস করব না। পথে একটি শপিং মলের পাশে টেসলা সুপার চার্জারে গাড়ি চার্জ আর প্রয়োজনীয় কিছু শপিং সেরে আবার ছুটলাম লেকের পথে।
গাড়ি যত এগোচ্ছে, ডলোমাইটসের পাহাড়গুলো ততই কাছে আসছে। আল্পসের অন্য অংশের মতো এরা সবুজে মোড়ানো নয়, বরং রুক্ষ। কিন্তু নীল আকাশের ক্যানভাসে এই রুক্ষ পাথুরে পাহাড়ের বিশালতা এক অদ্ভুত মহিমা তৈরি করেছে। ভ্রমণের আগে আমি ফেসবুকে ‘Dolomites for Beginners’ পেজটি ফলো করতাম। ওখান থেকেই জেনেছিলাম, পিক সিজনে আগে থেকে পার্কিং বুক না করলে কয়েক মাইল দূরে গাড়ি রেখে শাটল বাসে আসতে হয়। আমাদের যেহেতু আগে থেকেই পার্কিং রিজার্ভেশন করা, তাই সিকিউরিটি গেট পার হয়ে ভিআইপি স্টাইলে একদম লেকের পাড়েই গাড়ি রাখলাম।
নয়জন মানুষ, দুটি গাড়ি, তিনটি পরিবার আর চারটি দেশ। এই কদিনে আমরা পথ হারিয়েছি, গভীর রাতে বিপদে পড়েছি, আবার অচেনা মানুষের অযাচিত সাহায্য আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। লন্ডনের ব্যস্ত জীবনে ফিরে হয়তো আবার সেই যান্ত্রিকতায় ডুবে যাব আমরা সবাই, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়াব।
গাড়ি থেকে নেমে কয়েক কদম এগোতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই জাদুকরি দৃশ্য। নীল আকাশের নিচে স্থির হয়ে আছে পান্না রঙের স্বচ্ছ জল। সেই সবুজ পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে কাঠের তৈরি ছোট ছোট নৌকা। মুহূর্তেই আমার ডিএসএলআরের শাটার ব্যস্ত হয়ে পড়ল, মোবাইলেও ভিডিও ধারণ চলতে লাগল। এরপর আমরা সবাই মিলে দুটি রোয়িং বোট ভাড়া করলাম। নৌকায় ওঠার আগে লেকের স্টাফ গ্রেটা কিছু নিয়ম বুঝিয়ে দিল। আমাদের রোয়িংয়ের আনাড়িপনার কথা বলতে হেসে ভালো করে বুঝিয়ে দিল কী করতে হবে। অভয় দিয়ে বলল, খুবই সহজ, কোনো ভয় নেই। খালেদা ওর সঙ্গে একটি ছবি তুলে রাখল। ইসরা ওর স্কুলের ক্যাম্পিং থেকে রোয়িং শিখেছে, তাই নৌকা বাওয়ার দায়িত্বটা ও একাই কাঁধে তুলে নিল। মেয়ে দক্ষতার সঙ্গে নৌকা বাইছে, আর আমি মুগ্ধ হয়ে লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করছি—বাবার জন্য এ এক অন্য রকম গর্বের মুহূর্ত।
রোয়িং শেষে পেটে বেশ ক্ষুধা। আমরা ভেজিটেবল পিৎজা আর চিপস অর্ডার করলাম। কিন্তু বিপত্তি বাধল বিল দেওয়ার সময়। পার্কিং টিকিটের সঙ্গে ১৫ ইউরোর একটা ফুড ভাউচার ছিল। ভাউচারের কোড দেখাব, অথচ অতিরিক্ত ছবি তোলার কারণে আমার ফোনের চার্জ একদম শেষ! আমি ইতালিয়ান ভাষা জানি না, কিন্তু মানবিকতার ভাষা যে সর্বজনীন—তা আবার প্রমাণিত হলো। বারের হৃদয়বান কর্মীটি আমার অসহায়ত্ব দেখে নিজেই আমার ফোনটি চার্জে লাগিয়ে দিলেন। পিৎজা রেডি হতে ১৫ মিনিট লাগল, ততক্ষণে ফোন অন হতেই কোড দেখালাম। যেহেতু আমরা আগেই পিৎজার দাম দিয়ে ফেলেছিলাম, তাই ভাউচারের কোডে তিনি আমাদের দুটি চিজ কেক অফার করলেন। বললেন, ‘এটা ইতালির সেরা চিজ কেক, খেয়ে দেখুন। বিদায়বেলায় তাঁর সেই উষ্ণ সম্ভাষণ— Safe Journey—মন ছুঁয়ে গেল।
ফেরার পথে ড্রাইভিং সিটে মুরাদ ভাই। আমি পাশের সিটে বসে পিৎজা আর সেই বিখ্যাত চিজ কেক খেতে খেতে জানালার বাইরে তাকালাম। দূরে ডলোমাইটসের কোলে ছবির মতো সাজানো ছোট ছোট গ্রাম সরে সরে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো, এই সৌন্দর্য বোধ হয় দূর থেকেই সবচেয়ে ভালো অনুভব করা যায়। গ্রামের ভেতরে থাকলে হয়তো এর এই সামগ্রিক রূপ বা বিশালতা চোখে পড়ত না। মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টের একটি কবিতার লাইন মনে পড়ল—
“Heaven gives its glimpses only to those
Not in position to look to close.'
অন্ধকার রাতের বিভীষিকা ও ভোরের আলোয় স্বর্গ—
ডলোমাইটসের পূর্ব প্রান্তের পাট চুকিয়ে আমরা এবার যাত্রা শুরু করলাম পশ্চিম দিকে, ইতালির আরেক পাহাড়ি জনপদ এপ্রিকার (Aprica) উদ্দেশ্যে। এখান থেকে বিখ্যাত লেক কোমো খুব বেশি দূরে নয়, তাই আমরা এখানকার পাহাড়ের চূড়ায় একটি কটেজ বুক করেছি। কটেজটি একদম টিপিক্যাল ‘আল্পাইন শ্যালে’ (Alpine Chalet) পুরোটা কাঠের তৈরি, দেখলেই একটা ট্র্যাডিশনাল ভাব চলে আসে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হলো গন্তব্যে পৌঁছাতে গিয়ে। যখন আমরা কটেজের লোকেশনের কাছাকাছি পৌঁছালাম, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা পেরিয়েছে। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার, তার ওপর শুরু হয়েছে পাহাড়ের সেই হাড়হিম করা বাতাস। মেইন রাস্তা ছেড়ে কটেজে ওঠার রাস্তাটা এতটাই সরু যে বুকটা কেঁপে ওঠে। গত কয়েক দিনে কয়েক হাজার মাইল গাড়ি চালিয়েছি, কিন্তু সত্যি বলতে, এই প্রথম ভয় লাগল।
জিপিএস আমাদের গোলকধাঁধায় ফেলে দিল। সঠিক কটেজ কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না। এর মধ্যে ঘটল বিপত্তি। ভুল করে একটা বাড়ির খোঁজ করতে গিয়ে আরিফ ভাই গাড়ি নিয়ে ওই বাড়ির ঘাসের ড্রাইভে নেমে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওঠার সময় আর উঠতে পারছেন না! খাড়া ঢাল আর ভেজা ঘাসে গাড়ির চাকা অনবরত স্লিপ করছে। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি থমথমে হয়ে গেল। ওই গাড়ির থেকে সবাইকে নেমে গাড়ি হালকা করতে হলো। সবাই মিলে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে, একপ্রকার যুদ্ধ করে অবশেষে গাড়িটাকে আবার পাকা রাস্তায় তুলতে পারলাম। ভিনদেশে, নির্জন পাহাড়ের ওপর সেই মুহূর্তের আতঙ্ক বলে বোঝানোর মতো নয়।
আমরা আরেকটা ভুল বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভাগ্যিস, পাশের বাড়ির এক ভদ্রলোক শব্দ শুনে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। তিনি আমাদের সঠিক ঠিকানা পেতে সাহায্য করলেন। আমাদের ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত চেহারা দেখে মুরাদ ভাই তো ইশারা-ইঙ্গিতে তাঁকেই বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন যে আমাদের আর যাওয়ার শক্তি নেই, তাঁর বাড়িতেই যেন রাতে থাকতে দেন! ওদিকে আমাদের এয়ার-বিএনবি হোস্ট ফোন ধরছেন না। সব মিলিয়ে এক হযবরল অবস্থা।
অবশেষে শেষ রাতে হোস্টের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। তাঁর দেওয়া নির্দেশনায় যখন আমরা আমাদের কাঠের কটেজে পৌঁছালাম, তখন পূর্ব আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ক্লান্তি আর স্বস্তির এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে আমরা বিছানায় গা এলালাম।
পরের দিন যখন ঘুম ভাঙল, তখন বেলা ১১টা। কাল সারা রাতের ধকলে সবাই এতটাই ক্লান্ত যে লেক কোমোতে যাওয়ার এনার্জি আর অবশিষ্ট নেই। তাই প্ল্যান চেঞ্জ। ঠিক হলো, লেক কোমো বাদ; আজ আমরা এই পাহাড়ি কটেজেই আয়েশ করে সময় কাটাব। বিকেলের দিকে আমরা সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন (Lucerne) বা ইন্টারল্যাকেন এলাকার দিকে রওনা হব, যাতে কাল সকালে আমাদের স্বপ্নের ‘ইয়ংফ্রাউ’ (Jungfraujoch) জয় করতে পারি।
কটেজের বারান্দায় আসতেই গতকাল রাতের সব কষ্ট নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। দিনের আলোয় পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই কাঠের বাড়িটি যে এত সুন্দর, তা রাতে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। এখান থেকে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছিল না।
এই ট্রিপের জন্য আমি বিশেষ কিছু টি-শার্ট ডিজাইন করেছিলাম, যাতে লেখা ‘Alpine Road Trip’। সবাই মিলে সেই টি-শার্ট পরে নিলাম। আমার ড্রোনটা আকাশে ওড়ালাম, ওপর থেকে শ্যালের বারান্দায় আমাদের সবার হাসিমুখের ছবি আর ভিডিও নিলাম। এরই ফাঁকে মেয়েরা শাড়ি পরে পাহাড়ের কোলে কিছু ছবি তুলল। দূরে আল্পসের নীলাভ পাহাড়, কাঠের কটেজ আর বাঙালির শাড়ি—সব মিলিয়ে এক দারুণ ফিউশন তৈরি হলো।
বিকেলের সোনাঝরা রোদে আমরা যখন কটেজ ছেড়ে সুইজারল্যান্ডের পথে নামলাম, তখন মনে হলো—গত রাতের ওই ভয়টুকু না থাকলে হয়তো এই সকালটা এতটা সুন্দর লাগত না।
মেঘের রাজ্যে ড্রাইভ ও লাল ট্রেনের রোমাঞ্চ
এপ্রিকা থেকে বের হওয়ার আগে আমরা দুটি গাড়িতেই ফুল চার্জ দিয়ে নিলাম। এরপর ইতালির টিরানো (Tirano) বর্ডার ক্রস করে প্রবেশ করলাম স্বপ্নের দেশ সুইজারল্যান্ডে। আর জিপিএস আমাদের যে রুটে নিয়ে এল, সেটা এককথায় অবিশ্বাস্য! এটি সেই বিখ্যাত রুট, যেখান দিয়ে সুইজারল্যান্ডের আইকনিক লাল ট্রেন ‘বার্নিনা এক্সপ্রেস’ (Bernina Express) চলে।
পাহাড়ি রাস্তায় ড্রাইভ করছি, হঠাৎ আমাদের চমকে দিয়ে গাড়ির পাশ দিয়ে হুশ করে ছুটে গেল সেই টকটকে লাল ট্রেনটি। অদ্ভুত সুন্দর এক অভিজ্ঞতা! পথের বেশ কিছু জায়গায় ট্রেনের লাইন আর গাড়ির রাস্তা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। মাঝে মাঝে তো রাস্তার ওপর দিয়েই ট্রেনের ট্র্যাক চলে গেছে। মনে হচ্ছিল যেন আমরা আর ট্রেনটি পাল্লা দিয়ে আল্পস জয় করছি।
এই রোমাঞ্চকর লুকোচুরি খেলার মধ্যেই আমরা পাহাড়ে চড়তে শুরু করলাম। চারপাশটা এত সুন্দর যে না থেমে পারলাম না। গাড়ি সাইড করে আমার ড্রোনটা ওড়ালাম। পাহাড়ের চূড়ায় তখন সূর্যাস্ত হচ্ছে, ড্রোনের ক্যামেরায় সেই মায়াবী আলোয় আল্পসের রূপ ধরা পড়ল। আশপাশে সব বিখ্যাত স্কি রিসোর্ট। যেহেতু এখন গ্রীষ্মকাল, তাই রিসোর্টগুলোতে পর্যটকদের সেই চেনা ভিড় নেই, একধরনের শান্ত স্নিগ্ধতা বিরাজ করছে। কিন্তু নিচের উপত্যকায় সবুজ ঘাস থাকলেও ওপরের মাউন্টেন পিকগুলো কিন্তু ঠিকই সাদা তুষারে ঢাকা।
পাহাড়ের আরও ওপরে উঠতেই দৃশ্যপট পাল্টে গেল নাটকীয়ভাবে। হঠাৎ আমাদের গাড়িটি একদম মেঘের ভেতর ঢুকে পড়ল। চারপাশ ধবধবে সাদা, কিছুই দেখা যায় না। উইন্ডস্ক্রিনে তুলার মতো মেঘ এসে আছড়ে পড়ছে। মনে হচ্ছিল আমরা আর গাড়িতে নেই, বিমানের ককপিটে বসে আছি—ঠিক যেমন পাইলটরা মেঘের রাজ্যে প্লেন চালান। ভিজিবিলিটি প্রায় শূন্য, তার মধ্যেই সাবধানে ড্রাইভ করতে হলো।
প্রায় পাঁচ মিনিট মেঘের দেশে ভেসে থাকার পর আমরা আবার নিচে নামতে শুরু করলাম। সর্পিল বা আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছি। জিপিএস বলছে সুইজারল্যান্ডের চুর (Chur) শহর আর বেশি দূরে নয়।
রাতের বিভ্রাট ও গ্রিন্ডেলওয়াল্ডের পথে
মেঘের রাজ্য আর লাল ট্রেনের রোমাঞ্চ শেষে আমরা একটি শর্ট ব্রেক নিলাম। এরপর আবার ছুটলাম আমাদের রাতের আস্তানার দিকে। গন্তব্য—সুইজারল্যান্ডের ‘লুজান’ (Lucerne)। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়িতে রাত একটা বেজে গেল।
আগের রাতের মতো একই বিপত্তি বাধল এয়ার-বিএনবি খুঁজে পেতে। হোস্ট আমাদের যে লোকেশন দিয়েছিলেন, সেটা আসলে কার পার্কের পোস্ট কোড, মূল বাড়ির ঠিকানা নয়। অচেনা শহর, গভীর রাত, তার ওপর ভুল ঠিকানা—সব মিলিয়ে এক ভুতুড়ে পরিস্থিতি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক পথচারী আমাদের একটা বিল্ডিং দেখিয়ে দিলেন। কিন্তু কাছে গিয়ে তো আমাদের চক্ষু চড়কগাছ! ওটা একটা নাইট ক্লাবের ওপরের ফ্ল্যাট! নিচে গানবাজনা আর হট্টগোল চলছে। ফ্যামিলি আর বাচ্চাদের নিয়ে এমন পরিবেশে থাকার প্রশ্নই আসে না। এদিকে হোস্টও সঠিক ঠিকানা দিচ্ছেন না বা ফোন ধরছেন না।
রাত তখন অনেক। সবার চোখে ঘুম, শরীর ক্লান্ত। কিন্তু আমরা মনোবল হারালাম না। এয়ার-বিএনবির আশা ছেড়ে আমরা দ্রুত হোটেলের খোঁজ শুরু করলাম। আরিফ ভাই গুগল করে পাশের এক হোটেলে ফোন দিলেন। এরপরের জাদুটা দেখালেন মুরাদ ভাই। রিসেপশনে কথা বলার দায়িত্ব নিলেন তিনি। তাঁর মিষ্টি কথা আর কূটনৈতিক অনুরোধে কাজ হলো ম্যাজিকের মতো। এত রাতেও লুজানের ‘ইবিজ স্টাইলস’ হোটেলের রিসিপশনিস্ট শেহরোজ আমাদের জন্য তিনটি রুমের ব্যবস্থা করে দিলেন। কিছুক্ষণ আগেও আমরা ঘরছাড়া রাত কীভাবে কাটাব সেই চিন্তাতে ছিলাম, কিন্তু আল্লাহ আমাদের লুজানের সবচেয়ে সুন্দর চ্যাপেল ব্রিজের পাশের হোটেলে থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন।
রাতের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি শেষে পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখন সব ক্লান্তি উধাও। সকাল ১০টায় চেকআউট করে আমরা গাড়িতে উঠলাম। এবার আমাদের যাত্রা এই ট্রিপের চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য ‘ইয়ংফ্রাউ’।
ইউরোপের ছাদে
হোটেল থেকে বের হয়ে বিখ্যাত চ্যাপেল ব্রিজকে ডানে রেখে আমরা লেক লুজান ক্রস করলাম। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে ইন্টারল্যাকেনের (Interlaken) দিকে ছুটছি। আমাদের ঠিক সামনেই চলছে নীল রঙের একটি ক্ল্যাসিক কার, যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য! ইন্টারল্যাকেনের পান্না রঙের লেককে নিচে রেখে আমরা গ্রিন্ডেলওয়াল্ড (Grindelwald) গ্রামে পৌঁছালাম।
গ্রিন্ডেলওয়াল্ড টার্মিনাল থেকে ‘টপ অব ইউরোপ’-এর টিকিট কেটে আমরা চড়লাম বিখ্যাত ট্রাই-ক্যাবল গন্ডোলা বা ‘আইগার এক্সপ্রেস’-এ। ভাগ্য বেশ ভালো, তেমন ভিড় নেই। বিশাল এক গন্ডোলায় আমরা নয়জন ছাড়া আর কোনো ট্যুরিস্ট নেই। আমরা নিজেদের মতো করে হাসি-ঠাট্টা আর ছবি তুলতে তুলতে ১৫ মিনিটের মধ্যেই আইগার গ্লেসিয়ার স্টেশনে পৌঁছালাম।
সেখান থেকে চাপলাম লাল রঙের ক্লক রেলে (Cogwheel Train)। পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি অন্ধকার টানেল বেয়ে ট্রেন আমাদের নিয়ে চলল ৩৪৫৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ইয়ংফ্রাউ স্টেশনে—যাকে বলা হয় ইউরোপের ছাদ।
হঠাৎ ট্রেনের সিটের পাশে খালেদা একটি মোবাইল ফোন পেল। আগের যাত্রী হয়তো ভুল করে ফেলে গেছেন। আমি ফোনটি স্টেশনের লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডে জমা দেওয়ার জন্য সঙ্গে নিয়ে নিলাম। কিন্তু জমা দেওয়ার আগেই মোবাইলে কল এল। আমি ধরতেই ওপাশ থেকে ফোনের মালিক ‘কেলি’ বললেন, ফোনটা যেন অফিসে জমা না দিয়ে আমি সঙ্গে রাখি। তিনি তখন নিচে কেবল কার টার্মিনালে আর আমরা পাহাড়চূড়ায়। আমি নিচে নামলে তিনি আমার কাছ থেকে ফোনটি সংগ্রহ করবেন। আমি বললাম, ‘তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই, তবে আমাদের ফিরতে সন্ধ্যা ছয়টা বাজবে।’ তাতেই তিনি রাজি। আমাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রাখলেন।
ট্রেন থেকে নেমে টানেল দিয়ে আমরা বরফের রাজ্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় খেয়াল হলো খালেদা ও শায়লা ভাবি তাঁদের জ্যাকেট গাড়িতেই ফেলে এসেছেন! মাইনাস তাপমাত্রায় জ্যাকেট ছাড়া বাইরে যাওয়া অসম্ভব। ভাগ্য ভালো, স্ফিংক্স অবজারভেটরির (Sphinx Observatory) দোকানে জ্যাকেট পাওয়া যায়। দেখা গেল মেয়েরা তিনজনেই তিনটি জ্যাকেট কিনে নিল। ব্যালকনিতে পা রাখতেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস আমাদের জাপটে ধরল। তখন ভরদুপুর, ক্যালেন্ডারে গ্রীষ্মকাল, অথচ এখানে মাইনাস তাপমাত্রা!
চারপাশ ধবধবে সাদা তুষারে ঢাকা। এখান থেকে আমরা দেখলাম আল্পসের দীর্ঘতম হিমবাহ ‘আলেচ গ্লেসিয়ার’ (Aletsch Glacier)। বরফের ওপর সূর্যের আলো পড়ে হীরার মতো জ্বলজ্বল করছে। পাশেই ছোট লাল রঙের একটি পোস্টবক্স—এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পোস্টবক্স। সুইস পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই একটি গ্রুপ ছবি তুললাম।
এরপর আমরা বরফের রাজ্যে নেমে এলাম। ছোটরা তো বরফ পেয়ে পাগলপ্রায়, স্নো-বল ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেল। মানহা, ইসরা আর ইনায়দা বরফের ওপর শুয়ে ‘স্নো-এঞ্জেল’ বানাতে লাগল। যুক্তরাজ্যের সোয়ানসি থেকে আসা আরেকটি পরিবারের ছোট ছেলেও ওদের সঙ্গে স্নো বল ফাইট শুরু করল। পাশেই অনেকে স্নো-বোর্ডিং আর স্কিয়িং করছে। এত উঁচুতে অক্সিজেনের পরিমাণ কম, একটু হাঁটলেই শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কিন্তু বিজয়ের আনন্দ আর চোখের সামনের এই অপার্থিব সৌন্দর্য সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। হাজার হাজার মাইল ড্রাইভ করে, নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে আমরা আমাদের স্বপ্নের শিখরে!
কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে আমরা নিচে নামার ট্রেন নিলাম। কিন্তু গল্প করতে করতে সবাই ভুলে গেলাম মাঝপথে ট্রেন বদলে কেব্ল কার নিতে! এতে আমাদের নিচে ফিরতে সময় বেশি লাগল ঠিকই, তবে শাপেবর হলো। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে ট্রেন থেকে ছোট ছোট গ্রামের দৃশ্য দেখতে দেখতে নামার অভিজ্ঞতাটা ছিল দারুণ।
ট্রেন স্টেশনের পাশের রেস্টুরেন্টে সবাই ডিনারের জন্য বসলাম। সেই ফাঁকে আমি কেলির মোবাইল ফেরত দিয়ে আসলাম। কেলি আমাদের জন্য চকলেট নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে আসা কেলি বারবার ধন্যবাদ দিলেন। বললেন, ‘আমার সুইজারল্যান্ড ভ্রমণের সব ছবি এই মোবাইলে। তুমি আমার ফোনের সঙ্গে আমার ছুটির স্মৃতিগুলোও বাঁচিয়ে দিয়েছ।’ ভিনদেশে কারও এমন উপকার করতে পেরে নিজেরই খুব ভালো লাগল। বিদায়ের আগে ও আমার সঙ্গে একটা ছবি তুলে নিল।
রেস্টুরেন্টে ফিরে দেখি খাবার চলে এসেছে। আরিফ ভাইয়ের জন্মদিন দুদিন পরে, তাই খালেদা আগেই বলেছিল একটা কেক নিতে। আমি পাশের শপ থেকে একটা কেক কিনে এনেছি। ডিনারের পর আরিফ ভাইয়ের জন্মদিনের কেক কাটার মধ্য দিয়ে আমাদের এই মহাকাব্যিক আল্পাইন রোড ট্রিপের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলো। কেকটা মিষ্টি ছিল, কিন্তু আমাদের সবার মনের ভেতর তখন বিষাদের একটা চোরা সুর বাজছে—ইশ্! স্বপ্নের মতো এই দিনগুলো যদি শেষ না হতো!
ফেরার পথে ড্রাইভিং সিটে মুরাদ ভাই। আমি পাশে বসে সুন্দর গ্রিন্ডেলওয়াল্ড ছেড়ে আসা পথের ভিডিও করছিলাম। মোবাইল স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গলাটা কেমন যেন ধরে আসছিল। গত কয়েক দিনের স্মৃতিগুলো সিনেমার রিলের মতো চোখের সামনে ভাসছিল। জার্মানির গভীর ব্ল্যাক ফরেস্ট, অস্ট্রিয়ার বৃষ্টিস্নাত হালস্টাট, ইতালির রুক্ষ ডলোমাইটসের বুকে পান্না রঙের লেক, আর সবশেষে সুইজারল্যান্ডের এই তুষারশুভ্র চূড়া—সবকিছু পেছনে ফেলে আমরা ছুটে চলেছি যান্ত্রিক জীবনের দিকে।
গাড়ির ভেতরের এই ভারী নিস্তব্ধতা ভাঙতে সবাইকে একে একে জিজ্ঞেস করলাম—এই ট্রিপে তাদের সেরা মুহূর্ত কোনটি? ভোটের পাল্লা ভারী হলো লাগো ডি ব্রেইসের দিকেই। তবে সবার শেষে চুপচাপ থাকা ছোট্ট ইনায়দা বলল, তার নাকি কেব্ল কারে করে ইয়ংফ্রাউর পাহাড়ের চূড়ায় উঠে স্নো নিয়ে খেলাটাই ছিল সেরা মুহূর্ত। ওর আবদার—পরেরবার যেন আমরা আর কোথাও না থেমে সরাসরি এখানেই চলে আসি। ওর এই সরল চাওয়াটা আসলে আমাদের সবারই মনের কথা। মন তো চাইছে না এই পাহাড়, এই মেঘ আর এই মায়া ছেড়ে ফিরতে।
নয়জন মানুষ, দুটি গাড়ি, তিনটি পরিবার আর চারটি দেশ। এই কদিনে আমরা পথ হারিয়েছি, গভীর রাতে বিপদে পড়েছি, আবার অচেনা মানুষের অযাচিত সাহায্য আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি।
লন্ডনের ব্যস্ত জীবনে ফিরে হয়তো আবার সেই যান্ত্রিকতায় ডুবে যাব আমরা সবাই, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়াব। কিন্তু ক্লান্ত দুপুরে বা অলস সন্ধ্যায় চোখ বন্ধ করলেই আল্পসের এই বিশালতা আমাদের কানে কানে বলে যাবে—
‘পৃথিবীর এই সব গল্প বেঁচে র’বে চিরকাল;
এশিরিয়া ধুলো আজ—বেবিলন ছাই হয়ে আছে।’