ভ্যান গঘ: ইমারসিভ এক্সপিরিয়েন্স

ছবি: লেখকের পাঠানো

লন্ডনে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেও ঝকঝকে নীল আকাশ খুব নিয়মিত পাওয়া যায় না। হালকা বাতাসে এখনো শীতের হিমেল হাওয়া ভর করেনি। এমন এক বিকেলে সাবওয়েতে অফিস ফিরতি মানুষের ভিড়ে শামিল হলাম। গন্তব্য লিভারপুল স্ট্রিট স্টেশন। তার পাশেই কয়েক মিনিট হাঁটলেই এক আর্ট গ্যালারিতে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ইমারসিভ আর্ট এক্সিবিশন।

হ্যাঁ, ভিনসেন্টের কষ্টের জীবন আর তাঁর বিখ্যাত সব চিত্রকর্মে দুই ঘণ্টায় হারিয়ে যাওয়া বা নিমজ্জনের এই প্রদর্শনী। এমনিতে আজ সন্ধ্যাটির জন্য অন্য কারণৈ অনেক দিন থেকে অপেক্ষায় ছিলাম। বার্মিংহাম থেকে অফিসের কাজে লন্ডনে আসা মোর্শেদ ভাইয়ের সঙ্গে এই প্রদর্শনী দেখব ঠিক করেছি। উনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সেই কোভিড মহামারির আগে। ফোনে প্রায়ই বিভিন্ন কাজে ভাইয়ের সুপরামর্শ পেয়ে থাকি, আমার অগোছালো পরিকল্পনাকে গুছিয়ে একটু ট্র্যাকে আনতে ভাই মূল্যবান উপদেশ দিয়ে থাকেন। আর চিত্রকলায় তাঁর জ্ঞান আর আগ্রহ অপরিসীম। ভ্যান গঘের জীবন ও কর্মে ডুব মারার জন্য তাঁর চেয়ে ভালো কোনো সাথি পাওয়া যাবে না।

‘ইট বিছানো পথে হাঁটা যায় খুব স্বচ্ছন্দে, কিন্তু তাতে কোনো ফুল ফোটে না।’

—ভ্যান গঘ

তাই হয়তো হল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ভিনস্যান্ট বাবার মতো পাদরি হওয়ার মসৃণ পথে না হেঁটে সব ছেড়ে শিল্পী হতে ফ্রান্সে চলে আসেন। ছোট একচিলতে ঘরে নিজের শিল্পীসত্তাকে প্যারিসের অভিজাত পণ্ডিতদের দ্বারা স্বীকৃতি পাওয়ার সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।

লিভারপুল স্ট্রিট স্টেশন আগের মতোই আছে। লন্ডনে বাঙালিপাড়ার কাছেই এই স্টেশন। লন্ডনের কাছে কোথাও যাওয়ার জন্য সাবওয়ে, মেইন লাইনে করে দূরের শহরেও যাওয়া যায়। কাচের ছাদঘেরা বিশাল হলওয়ে ধরে বেরোনোর রাস্তা। অফিসফেরত যাত্রীদের কাতারে শামিল হয়ে ট্রেন থেকে বের হলাম। ইউরোপের কোনো কিছুর বাহ্যিক পরিবর্তন সহজে হয় না। শত বছরের পুরোনো স্থাপনাকেও আগের মতো রাখার প্রাণন্ত চেষ্টা করা হয়। স্ট্রিট ফটোগ্রাফির এক বইয়ে একবার পড়েছিলাম, ইউরোপের কোনো ইমারতের ছবি তুললে সঙ্গে একটি গাড়ি ছবিতে থাকলে ভালো হয়। কারণ, ইমারত ৫০ বছর পর একই চেহারায় থাকলেও সামনের গাড়ির মডেল কয়েক বছর পরই ছবিটিকে স্মরণীয় করে তুলবে। স্টেশন থেকে বেরিয়েই মোর্শেদ ভাইকে পেয়ে গেলাম। অনেক বছর পর দেখা, মাঝখানে কত বছর, অতিমারি পার করলাম। তবে ভিডিও বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জমানায় মনে হয় সঙ্গেই তো ছিলাম এই কবছর।

‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

গুগল ম্যাপ দেখে আর্ট গ্যালারির পথে পা বাড়ালাম। ছোট গলি ধরে কয়েকটি পানশালার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি দুজন। লন্ডনের বিখ্যাত পাব কালচার। অফিস শেষেও কিছু আড্ডা, কিছু হইহই।

আজ যাঁর ছবি পৃথিবীতে এত সমাদৃত, অগণিত প্রদর্শনী হয় নানা প্রান্তে, জীবিত থাকা অবস্থায় তার সিকি ভাগও পাননি। সারা জীবন নিজের কোনো চিত্রকর্মে খ্যাতি বা কারও নজর কাড়তে না পারা, অবহেলার পাত্র ভিনস্যান্ট তাঁর ভাইকে নিজের এক স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, ‘আমি স্বপ্নে দেখি, প্যারিসের কোনো ক্যাফেতে আমার চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হচ্ছে।’

ছবি: লেখকের পাঠানো

‘জীবনযুদ্ধে পরাজিত মানুষের আশ্রয়ের নাম শিল্প’

—ভ্যানগঘ

তুলির আঁচড়ে একটার পর একটা চিত্রশিল্প ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই প্রদর্শনীতে সেই ক্যানভাসকে প্রজেক্টরের সাহায্যে সারা আর্ট গ্যালারির দেয়াল, ছাদ, মেঝেতে নিয়ে আসা হয়েছে। স্টারি নাইট তখন ছোট এক ফ্রেমে বাঁধা নেই। সারা গ্যালারি আর আমরা যাঁরা তাতে নিমজ্জিত হতে এসেছি, তাঁরা যেন ভিনসেন্টের ক্যানভাসেরই এক অংশ।

গ্যালারির আরেক কক্ষে ভি আর অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ১৮৮০-১৮৯০ সালের প্যারিসের ছোট্ট ঘরের দরজা দিয়ে বের হয়ে বিশাল গমখেতের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে ভ্যান গঘের নানা ক্যানভাসের জীবন্ত পরিপ্রেক্ষিত। ক্যানভাসগুলো যেন উপহাস করে বলছে, সেই তো এলে, তবে এত দেরি কেন? ৩৬০ ডিগ্রি ভি আর শেষ হয় রাইন নদীর কোনো এক ব্রিজে, পেছনে নীল আকাশে তখন হাজার হাজার তারার মেলা।

আর্লের হলুদ বাড়িতে ভ্যান গঘের বিখ্যাত বেডরুমের এক মডেল আছে প্রদর্শনীতে। সেই একই রঙের আসবাব। দেয়ালে ঝুলছে কিছু পোর্ট্রেট। একটি ছবি তুলে আমাদের এই সুন্দর সময়কে ক্যামেরাবন্দী করে ফেললাম দুজনে।

আরও পড়ুন
ছবি: লেখকের পাঠানো

মাত্র ৩৭ বছরের জীবন। ব্যর্থতা, হতাশা, মানসিক পীড়ন আর সইতে না পেরে অভ্যে সুর ওয়াজ নামের উত্তর ফ্রান্সের এক গ্রামে নিজেই গুলি করে পৃথিবীকে বিদায় জানান। তারপরও গির্জার একটুকরা জমিতে শেষকৃত্যের ভাগ্য তাঁর হয়নি। ভাই আর কাছের দুই–তিনজন বন্ধু দূরের এক পাহাড়ের টিলায় তাঁকে সমাহিত করেন।

ভ্যান গঘময় দুই ঘণ্টা কীভাবে যে চলে গেল, টের পেলাম না। ফেরার পথে আমি আর মোর্শেদ ভাই রাতের লন্ডনের ঘোলা সোডিয়ামের আলোয় হাঁটছি। ভ্যান গঘে তখনো নিমজ্জিত। তবে মুখে কোনো কথা নেই। জীবন কারও জন্য পুষ্প বিছানো পথ আর কারও জন্য এত কণ্টকময় কেন? নাকি কেউ কেউ থাকে, যারা পথের কাঁটা সরাতে এক জীবন দিয়ে দেয়, যাতে একই পথে হাঁটা পরের পথিকের পথ কিছুটা সহজ হয়। সেসব মানুষের জন্যই পৃথিবী এগিয়ে যায় অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, সভ্যতা বিকশিত হয়।

আরও পড়ুন