অনিমা ফোন হাতে নিয়ে দেখল নোটিফিকেশন এসেছে। চোখে পড়ল লেখা, ‘দূর, কী সব ছেলে দেখছ আমার জন্য। তুমি সিঙ্গেল থাকলে খুব ভালো হতো।’

অনিমা চুপচাপ দেখল তবে তেমন প্রতিক্রিয়া হলো না ওর। মেয়েটাকে ভালো করে চেনে অনিমা। সামনাসামনি দেখা হলে খুব আদুরে গলায় আপু ডাকে জুলি। নতুন ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দিয়েছিল। ইদানীং বোধ হয় স্থায়ী হয়েছে। ওকে নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। মেয়েটা ঠিক প্রিয়মের টাইপ নয়, এটা খুব ভালো করে জানে অনিমা। অন্তত প্রথম দর্শনে অনিমার এমন মনে হয়েছে। জুলি যদি দেখতে খুব সুন্দরী হতো তবে অনিমার এই নির্লিপ্ততা কি থাকত?

ফোন হাতে নিয়ে প্রিয়মের মুখভঙ্গি পাল্টে গেল। কালো চশমার আড়ালে চোখের কৌতুক মেশানো খুশি অনিমার চোখ এড়াল না। প্রতিটা মানুষের বোধ হয় ভ্যালিডেশনের প্রয়োজন হয়। সে এখনো ফুরিয়ে যায়নি এমন অনুভূতির লোভ সবার থাকে। এ ভ্যালিডেশন সব সময় ঘরের মানুষ না বাইরের মানুষের কাছেও আসতে পারে।

অনিমা একটু মুখ ভেংচে ভাবল, না, আজকে টেক আউটের বার্গার জুটছে না। গতকাল রাতের খাবারগুলোই খাবে আজকে প্রিয়ম। এমনিতেও মাইগ্রেনের ব্যথা উঠেছে অনিমার। রান্নাঘরে যেতে একেবারে ইচ্ছে করছে না। গরমে আরও বেড়ে যাবে মাথাব্যথা। বেডরুমে গিয়ে আলো নিভিয়ে পর্দা টেনে বিছানায় গা এলিয়ে দিল অনিমা।

ঠিক ঘুম নয়, বরং আধো তন্দ্রা আসছে। মাইগ্রেনের ব্যথার রং বোধ হয় ধূসর। নাহ্ বিশ্রী একটা ঘিয়ে রং ভাবল অনিমা। মনে ওই যে বয়স্করা যেমন ঘিয়ে রঙের ম্যাটমেটে শাড়ি পরেন, ঠিক তেমন।

অনিমার অবশ্য তীব্র ব্যথার সময় মনে হয় মাথার মধ্যে একগাদা আতশবাজি ফুটছে। তার তীব্র আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।

প্রিয়ম এখন তার শেষ সিগারেট ধরাবে। ঘরের লাগোয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে শেষ করে ঘরে ঢুকবে। খেয়েছে কি না জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হচ্ছে না অনিমার।
প্রিয়ম ঢুকে একটু নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘মাথাব্যথা করছে?’
‘হুম।’

কাজ হবে না জেনেও মাথায় হাত বুলিয়ে দিল প্রিয়ম। অনিমার তন্দ্রামতন এসেছে। নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।

বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল প্রিয়ম। সিগারেটে আয়েশ করে টান দিয়ে ভাবল, ওদের দুজনের কি দূরত্ব এসেছে? আসাটাই স্বাভাবিক। এত বড় একটা দুর্ঘটনা গেল। প্রিয়ম বুঝতে পারছিল না কি করবে? অনিমার মিসক্যারেজটা আসলেও ওকে বিপর্যস্ত করেছে।

প্রিয়মের অনুভূতি ততটা প্রখর না হলেও বুঝতে পারে অনিমা ওকে আজকাল একটু এড়িয়ে চলে। প্রিয়ম বুঝতে পারছে না অনিমা কি ওর সঙ্গে এই ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে চায়? মনে হয় এ বিষয় নিয়ে আলাপ করলে অনিমার বেশি মন খারাপ হবে।

এর কিছুদিন পর অনিমা একদিন একা একা ঘুরছে। আগে ২৭ নম্বর রাস্তায় কত ঘুরেছে প্রিয়মের সঙ্গে। আজকে এক হাঁটতেও খারাপ লাগছে না। রাপা প্লাজার সামনে এক লোক বসেন ফুল নিয়ে। অনিমা হলুদ রঙের কিছু জারবেরা কিনল। ভদ্রলোক মিষ্টি হেসে ওকে কাগজে মুড়িয়ে দিলেন। বললেন, ‘মা আজকে কি আপনার জন্মদিন?’
মা ডাক শুনে একটু আর্দ্র হলো অনিমার মন। হেসে বলল, ‘কেন? জন্মদিন ছাড়া ফুল কিনতে নেই বুঝি? এমনি নিলাম।’

অনিমা কিছুক্ষণ এলোমেলো ভাবে ঘুরল। দোতলার পেছন দিকের আলমাস নামের দোকান থেকে একটা বেগুনি রঙের কাজল কিনল। ওর ইদানীং আসলেও কিছু ভালো লাগে না। বিশেষ করে যেদিন গ্যালারি থেকে আগে বের হয়, সেদিনটা কী ভয়াবহ রকমের দীর্ঘ মনে হয়। এত দিন যার অপেক্ষায় ছিল অনিমা, সে তো ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। অনিমার প্রিয়মের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হয় না। বুঝতে পারবে না, অযথা অভিমান বাড়বে।

ইউরো হাটে গিয়ে বসল অনিমা। কফি খেতে হবে। ঘুম তাড়াতে হবে। ওর ননদের মেয়ের জন্মদিন। ওর জন্য গিফট কিনতে হবে।

অনিমা ফোন দেখছে আর কফি খাচ্ছে। ওর টেবিলের সামনে এসে কেউ দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি কি জয়েন করতে পারি আপনার সঙ্গে?’
অনিমা মুখ তুলে দেখে মারজুক।
‘শিওর। বসুন প্লিজ।’
‘এখানে শপিং করতে এসেছেন?’
‘ওই রকমই। আসলে দুপুরে কোনো কাজ নেই আজকে হাতে।’

‘আড্ডা দেই আজকে। আমি আজকে কোনো কারণ ছাড়াই ছুটি নিয়েছি। কিছু বই কিনলাম। কয়েকটা ক্যানভাস নিলাম।’

‘আপনি ছবিও আঁকেন তাহলে?’
‘হুম। দান্তে গ্যাব্রিয়েল রোসেটি নামের এক ইতালিয়ান চিত্রশিল্পী লিলিথের একটা ছবি এঁকেছিলেন জানেন। ওটার একটা কাছাকাছি ছবি একজন চাইছেন। কমিশনড কাজ।’
‘আচ্ছা। তা লিলিথটা কে শুনি? আই মিন মডেল কি ওনার স্ত্রী?’ বলে হাসছে অনিমা।

‘আহা। পুরোনো প্রেমিকাও তো হতে পারে? দ্য ওয়ান হু গট অ্যাওয়ে। আপনি লিলিথকে চেনেন?’
‘চিনব না কেন? তবে পুরাণের চরিত্র হিসেবে চিনি। বেশি কিছু জানি না।
এক ঘণ্টা কীভাবে কাটল জানে না অনিমা। প্রিয়মের সঙ্গে কখনো ছবি নিয়ে কথা হয় না ওর। গল্প শেষে অনিমা বলল ওর উঠতে হবে। শপিং শেষ হয়নি।
সপ্তাহখানেক পরে মারজুকের সঙ্গে আবারও দেখা হলো অনিমার। এবারে ও এসেছে গ্যালারিতে। এসেই অনিমাকে খুঁজেছে।

হাসিমুখে বলল, ‘আপনি কি আমাকে স্টক করছেন?’
‘এক্সকিউজ মি। আমি যে গ্যালারিতে কাজ করি, সেখানে এসে উল্টো আমাকে বলা হচ্ছে আমি স্টকার, তাই না?’
মারজুক হেসে ফেলল। ওর ঝকঝকে হাসিতে আলোকিত হলো চারপাশ।

‘জোকস আ পার্ট। আমি আজকে একটা পেইন্টিং কিনতে এসেছি। নাম ধূসর জলছবি।’

‘গুড চয়েস। নদীর পানিতে ঘূর্ণি আর আকাশে কালো মেঘ। সামনে যে মেয়েটা গলুইয়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে তার মুখের এক্সপ্রেশন কি মনে হয় আপনার? ওই যে লাল জামা পরা মেয়েটা?’
‘আপনার পেছনের মেয়েটাকে চোখে পড়ছে না কেন বলুন তো? নীল শাড়ি পরা মেয়েটার মুখে তো স্পষ্ট বিষাদ। ওর পেছনে যে বসে আছে, তার মুখটা দেখুন।’
‘এ ছবিতে আসলেও একটা লুকোনো গল্প আছে।’

‘আপনি কি শিল্পীকে চেনেন?’
‘আসলে, ঠিক ব্যক্তিগত পরিচয় নেই।’
‘তবে কেন যেন মনে হয় এই ছবির বিষাদ ব্যক্তিগত। নিজের মনের গোপন কুঠুরি খুলে কেউ এঁকেছে।’

একটু ইতস্তত করে অনিমা মারজুককে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনি বৃহস্পতিবার রাতে কী করছেন? খুব ব্যস্ত না থাকলে আমাদের সঙ্গে ডিনার করবেন। আসলে আমাদের অল্প কয়েকজন বন্ধুকে ডাকছি। আপনিও আসুন।’
মারজুক রাজি হয়ে গেল আর জিজ্ঞাসা করল, ‘আমি কি ডিজার্ট আনব?’
‘কিচ্ছু আনবেন না একদম। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।’

অনিমা একটু খুশিই হলো যেন মনে মনে। বাড়িতে অতিথি এলে একটু পরিবেশ বদলায়। কালো মেঘের অন্ধকার যেন কেটে যায় রোদ ঝকঝকে হাসির শব্দে।
অনিমা নিজের সম্বন্ধে তেমন কিছু বলেনি। তবে মারজুক ঠিকঠাক বের করে ফেলল অনিমা বাগান করতে পছন্দ করে। ওর কালেকশনে কিছু সুন্দর অর্কিড আছে। নীলসাদা জগতে একান্ত গোপনীয় কিছুই নেই আজকাল। মারজুক ঠিক করল একটা অর্কিড নিয়ে যাবে অনিমার বাড়িতে।

অনিমা বেশ কয়েকজনকে ডেকেছে। মারজুককে একা ডাকতে অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল আসলে। প্রিয়মের একটা খুব ভালো গুণ আছে। অতিথি আসার আগে অনিমাকে ঘরদোর গোছাতে সাহায্য করে। অনিমার একটা হাইপোথিসিস আছে এটা নিয়ে। ঘরদোর গোছানো পরিপাটি থাকলে হয়তো ওর মনে হয় সব ঠিকঠাক চলছে।
অনিমা একটা কালো মসলিন পরেছে আজকে। চুল খোলা। চোখে খুব গাঢ় সাজ আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। ওর সিগনেচার ফরাসি ল্যাংকমের সুগন্ধি স্প্রে করে প্রিয়মকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ঠিক আছে?’
‘সুন্দর দেখাচ্ছে।’ চলবে...

*লেখক: ফারহানা সিনথিয়া, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, ক্যালগারি, কানাডা

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন