ধারাবাহিক গল্প: কিডন্যাপ–২

[email protected]

আজ সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। আজ আমি বাসা থেকে পালাচ্ছি। পালাচ্ছি বললে আসলে ভুল হবে। পরিকল্পনা করে নিজেই নিজেকে কয়েক দিনের জন্য কিডন্যাপ করব বলে ঠিক করেছি। অবশ্য এই পরিকল্পনা করতে আব্বার সাহায্য নিয়েছি গৌণভাবে। আমার আব্বা ঘুষ নিতেন না, এমনকি পাশের টেবিলের কেউ ঘুষ নিলেও আব্বা নালিশ করেন ওপরমহলের স্যারের কাছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেই স্যাররাও আব্বার ভয়ে ঘুষ নিতে পারেন না। ঘুষ তো পরের কথা, পরিচিত কারোর ফাইলের কাজ আগে করলে স্বজনপ্রীতি করার দায়ে তাদের দোষী সাব্যস্ত করেন আমার আব্বা। এসব কারণে আব্বাকে অপছন্দ করেন, এমন লোকের অভাব নেই। সত্যি বলতে, আব্বার এই সততার কারণেই আব্বা বেশি দিন এক জায়গায় থাকতে পারেন না। এখন তো আব্বার পদোন্নতিও হচ্ছে না এই কারণেই।

বেশ কয়েক বছর আগে একবার তো এমন হয়েছিল যে আব্বা একটা ফাইল আটকে রেখেছিলেন। ওপরমহল থেকে চাপ দিয়েও আব্বাকে দিয়ে ফাইলের কাজটা করিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল না। আব্বার একটাই কথা, এখানে যে ভূমি সংস্কার প্রকল্পের কথা বলে ফাইল জমা হয়েছে, বাস্তবে এ প্রকল্পের কোনো হদিস নেই। আব্বা নিজে তো কাজটা করেনইনি, এমনকি কেউ যাতে ঘুষ নিয়ে ফাইলটা ছাড়তে না পারে, তার জন্য আব্বা ফাইলটা নিজের কাছেই আটকে রেখেছিলেন। অবস্থা দেখে যাদের ফাইল, তারা আব্বার পেছনে সন্ত্রাসী লাগাল। সন্ত্রাসীরা আব্বাকে ভয় দেখাতে একদিন সন্ধ্যায় তাঁকে আটকে তাঁর ডান কান কেটে ফেলার চেষ্টা করেছিল। সেখানে হঠাৎ টহল পুলিশ চলে আসার কারণে আব্বার পুরো কান কাটা না পড়লেও ধস্তাধস্তিতে কানের ওপরের অংশটা কাটা পড়েছিল। আব্বাকে কিছুদিন হাসপাতালেও থাকতে হয়েছিল সেবার। তাও আব্বা ফাইল ছাড়েননি দেখে শেষ পর্যন্ত আমাদের ভাইবোনের ওপর ছোটখাটো হামলা করা শুরু হয়েছিল ভয় দেখানোর জন্য। তখন আম্মা ভয়ে আমাদের নিয়ে নানাবাড়িতে চলে গিয়েছিলেন আর আব্বাও এখানে–সেখানে লুকিয়ে ছিলেন অনেক দিন। পরে আবার বদলি নিয়ে অন্য জেলায় যোগ দিয়েছিলেন।

আব্বার এ সততার কারণে অনেক শত্রু থাকার ব্যাপারটাকে আমি এখন কাজে লাগাব বলে ঠিক করেছি। দুই বন্ধু এই কাজে আমাকে সাহায্য করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। বিনিময়ে তাদের চাইনিজ রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে হবে। তারা ঠিক বন্ধু নয়, সহপাঠী বলা যায়। বন্ধুদের থেকে সাহায্য নিলে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাদের দুজনের বাসায় আমি পালা করে দুই রাত থাকব, তারা আব্বাকে মুঠোফোনে জানাবে, আমাকে তারা কিডন্যাপ করেছে। ১০ লাখ টাকা দিলে আমাকে ছেড়ে দেবে। সেই ১০ লাখ টাকার জোগান হওয়ার আগেই আমি বাসায় ফিরে এসে বলব, আমি কিডন্যাপারদের আস্তানা থেকে পালিয়ে এসেছি অনেক কষ্টে। ব্যাপারটা কিছুটা বাংলা সিনেমা টাইপ। কিন্তু ভাবতেই কেমন উত্তেজনা কাজ করছে মনের মধ্যে। আমার এই সহপাঠীদের মা–বাবাদের সঙ্গে আমার আম্মা–আব্বার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা শূন্য ভাগ। কারণ, আব্বা কিংবা আম্মা কেউই যেখানে এই দুই সহপাঠীকে চেনেন না, সেখানে তাদের মা–বাবাদের চেনার তো প্রশ্নই আসে না। সুতরাং তাদের বাসায় থাকলেও জানাজানির ভয় থাকবে না। তাদের বাড়িতে বলা হবে, পরীক্ষা উপলক্ষে পড়ালেখা করার জন্য আমি তাদের সঙ্গে এক রাত থাকব। নতুন সিম কেনা হয়েছে এই কাজের জন্য। একবার আব্বার সঙ্গে কথা বলার পরই সিমকার্ড কুমিল্লার ধর্মসাগরের পানিতে ফেলে দেওয়া হবে। দুই দিন পর বাসায় এসে এমনিতেই আমি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত থাকব। তখন আর কেউ পরীক্ষার কথা তুলবে না আশা করি। প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরেছি, এটাই বড় কথা, পরীক্ষার কথা তো চিন্তায়ই আসা উচিত নয়। এখন পর্যন্ত এই পরিকল্পনায় কোনো ফাঁকফোকর চোখে পড়ছে না। মনে হচ্ছে, অনেক গোছানো পরিকল্পনা। সম্পূর্ণ ব্যাপারটা ভাবতেই নিজেকে একই সঙ্গে স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং নায়ক মনে হচ্ছে।

আরও পড়ুন

যেই ভাবা, সেই কাজ। প্রবেশপত্র আনতে স্কুলে যাওয়ার জন্য বের হলাম। হাতে অফুরন্ত সময়। বিকেল নাগাদ বাসায় ফেরার কথা বলে দিয়েছেন আম্মা। সুতরাং বিকেলের দিকে আগে থেকে ঠিক করে রাখা বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে পড়লেই হবে। স্কুলের বাস থেকে ‘বাসায় মানিব্যাগ ফেলে এসেছি’ বলে অর্ধেক পথ এসে নেমে গেলাম। এদিক–সেদিক একটু ঘোরাঘুরি করব ভেবে কুমিল্লার শাসনগাছা বাস টার্মিনাল থেকে অন্য একটা বাসে উঠে বসলাম। বাসটা কোন দিকে যাচ্ছে জানি না, কিন্তু কেন যেন অনেক ভালো লাগছে। নিজেকে মুক্ত বিহঙ্গের মতো বাঁধনছাড়া মনে হচ্ছে। চালকের সহকারীর কাছ থেকে জানলাম, আমি ঢাকাগামী বাসে উঠে পড়েছি। ২৫০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে ভাবছি, যেহেতু উঠেই পড়েছি, ঢাকায় গিয়ে একটু ঘুরে আসি। দুই ঘণ্টা লাগবে ঢাকায় যেতে, আবার নাহয় এই বাসেই ফিরে আসব। আমি কখনো এই পথে ঢাকা যাইনি। সব সময় ট্রেনেই যাওয়া হয়। বাস এখন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গোমতী নদীর ওপর নির্মিত সেতুর ওপর দিয়ে যাচ্ছে। অনেক বেশি সুন্দর লাগছে জানালা দিয়ে নদীর পাড়ের দৃশ্য দেখতে! নদীর পানিতে সূর্যের আলো পড়ে কেমন ঝিকমিক করছে। ট্রেনে যাওয়ার সময় বর্ষার সঙ্গে আমাকে বসতে হয় আর প্রতিবার বর্ষা জানালার পাশে বসে। ওর জন্য আমি কখনো ভালো করে বাইরের দৃশ্য দেখতে পারতাম না। আজ পারছি। যখন বড় হব, তখন ছুটির সময় আমি আর কখনো হল থেকে বাসায় আসব না। নিজে নিজে এদিক–সেদিক ঘুরে বেড়াব। বাংলাদেশের কোন কোন জেলায় কী কী আছে, সেসব জেনে কোথায় কোথায় ঘুরব, তার একটা তালিকা আগে থেকেই বানাতে হবে। মনে মনে তালিকা করতে গিয়ে ঘুম চলে আসছে। গত দুই রাত উত্তেজনায় ঘুম হয়নি। ঢাকায় পৌঁছাতে হাতে এখনো অনেক সময়। একটা লম্বা ঘুম দিলে শরীরটা আরাম পাবে ভেবে ঘুম দিলাম আমি।

চলবে...

লেখক: নুসরাত আহমেদ আশা, সফটওয়্যার কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স ইঞ্জিনিয়ার কার্ল জাইস ডিজিটাল ইনোভেশন জিএমবিএইচ, মিউনিখ, জার্মানি।

**দূর পরবাসে লেখা পাঠাতে পারবেন [email protected]-এ