ভোটের গল্প: নির্বাচনী স্মৃতি
নির্বাচন, ভোট—এসব ছোটবেলায় বুঝতাম না। যখন যে দলের মিছিল হতো, আনন্দ নিয়ে তাতে যোগ দিতাম। গলা ফাটিয়ে চেঁচাতাম—
‘ওমুক ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র’,
‘শুভেচ্ছা, স্বাগতম ওমুক ভাইয়ের আগমন’—
এমন কত স্লোগান!
যার কথা বলতাম, আদৌ তার চরিত্র কেমন, তা জানতাম না। সবাই বলছে, আমিও বলতাম। বিশেষ করে মাইকের কাছে গেলে জোশে ভেসে যেতাম। দু-একবার মাইকে বলতে দিত—তখন মনে হতো, আমি বুঝি দুনিয়াটা জয় করে ফেলেছি। সেই ক্ষুদ্র স্বীকৃতিটুকুই ছিল আমাদের বড় প্রাপ্তি।
সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল মিছিল শেষে ছোটদের মাঠে বসিয়ে চানাচুর-মুড়ি মাখানো খেতে দেওয়া হতো। কখনো বা মুড়ির সঙ্গে বাতাসা। আহা, সে কী স্বাদ! শুধু জিভে নয়, সেই স্বাদ যেন আজও স্মৃতির ভাঁজে লেগে আছে। মিছিলে ছোটদের একটা কদর ছিল। ছোটরা থাকলে সংখ্যাটা বড় দেখাত—আর আমরা সেই ‘সংখ্যা’ হওয়ার আনন্দে ভরে থাকতাম।
প্রার্থীদের বিভিন্ন রং ও সাইজের পোস্টার ছাপানো হতো। দৌড়ে গিয়ে পোস্টার চাইতাম। বেশি পেলে তা দিয়ে লেখার খাতা বানানো হতো। পোস্টারের এক পাশ সাদা থাকত—সেই সাদায় লিখে গেছি আমাদের শৈশবের প্রথম অক্ষর। পোস্টার লাগাতে সাহায্য করলে চা-নাশতার জন্য ১০ টাকার মতো দিত। আজকে যে টাকায় কিছুই হয় না, সেই ১০ টাকাই তখন ছিল রাজকীয় প্রাপ্তি। ভাগ বসানো, মন খারাপ, আবার হাসি—সব মিলিয়ে ছিল জীবন শেখার পাঠশালা।
প্রার্থীদের বিভিন্ন রং ও সাইজের পোস্টার ছাপানো হতো। দৌড়ে গিয়ে পোস্টার চাইতাম। বেশি পেলে তা দিয়ে লেখার খাতা বানানো হতো। পোস্টারের এক পাশ সাদা থাকত—সেই সাদায় লিখে গেছি আমাদের শৈশবের প্রথম অক্ষর।
ওমুক প্রার্থী আসবে—মাঠ সাজানো হতো। ছোট ছোট লিফলেট দিয়ে বিয়েবাড়ির মতো রঙিন করে তোলা হতো চারপাশ। কখনো–বা মাঠের পাশে খিচুড়ি রান্না হতো। কী যে মজার খিচুড়ি! কলাপাতায় বসে খেতে খেতে মনে হতো, এ আনন্দের কোনো শেষ নেই। পাতা চেটেপুটে খাওয়ার মধ্যেও ছিল একধরনের নির্ভেজাল সুখ।
ক্যামেরাম্যান বড় ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলত। ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠলে আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। ছবি তোলা যে এত বড় এক জাদু! প্রার্থীর কাছাকাছি দাঁড়ানোর চেষ্টা করতাম—যদি কোনোভাবে ফ্রেমে ঢুকে পড়ি। কেউ কেউ ধমক দিত, দূরে সরিয়ে দিত। তখন রাগ হতো, কষ্ট হতো, কিন্তু সেই কষ্টও আজ বড় মায়াময় লাগে।
আজ সময় বদলেছে। প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু সেই আড্ডা নেই। পোস্টার আছে, কিন্তু গল্প নেই। ভোট আছে, কিন্তু উৎসব নেই। বাতাসা-মুড়ি নেই, খিচুড়ির ধোঁয়া নেই, শিশুদের সেই অবাধ আনন্দও নেই।
তখন অনেক প্রার্থী থাকলেও মারামারি, হানাহানি ছিল না। যে যার মতো প্রচার চালাত। মসজিদে মিলাদ হতো, দোয়া চাওয়া হতো। শেষে জিলাপি কিংবা আমিত্তি। একবার নিয়ে আবার লাইনে দাঁড়ানোর দুষ্টুমি—সে দুষ্টুমির মধ্যেও ছিল নিরীহ আনন্দ।
নির্বাচনী ক্যাম্পে বড়দের আড্ডা, চায়ের দোকানে রাজনৈতিক গল্প—সব মিলিয়ে নির্বাচন মানেই ছিল উৎসব। মনে হতো, পুরো এলাকা একসঙ্গে শ্বাস নিচ্ছে। দল আলাদা হলেও আনন্দটা ছিল সবার।
আজ সময় বদলেছে। প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু সেই আড্ডা নেই। পোস্টার আছে, কিন্তু গল্প নেই। ভোট আছে, কিন্তু উৎসব নেই। বাতাসা-মুড়ি নেই, খিচুড়ির ধোঁয়া নেই, শিশুদের সেই অবাধ আনন্দও নেই।
নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: nsprothomalo.com
ছোটবেলার সেই নির্বাচনী সময়টা ভীষণভাবে মিস করি। আহারে—কী আদর, কী মমতা, কী রঙিন ছিল সেই দিনগুলো! আজ বুঝি, নির্বাচন শুধু ভোটের হিসাব ছিল না—ওটা ছিল আমাদের শৈশবের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব।
*লেখক: বেসরকারি চাকরিজীবী, বনানী, ঢাকা