রসগোল্লা সমাচার

রসগোল্লা ভালো কি না তা চেনার কিছু সহজ উপায় আছেছবি: লেখকের পাঠানো

রসে ভরা রসগোল্লা—কে না পছন্দ করে! মুখে দিলেই গলে যায়, আহা কী স্বাদ—ভোলা যায় না। মিষ্টির তালিকায় যত রকমের মিষ্টিই থাকুক না কেন, রসগোল্লার জায়গা যেন সবার ওপরে। বিয়ে, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীসহ বাঙালির সব উৎসব-আয়োজনেই রসগোল্লা যেন অবধারিত। রসগোল্লা ছাড়া আনন্দের আয়োজন অসম্পূর্ণই থেকে যায়। রসগোল্লা নানা আকারে ও দামের হয়। কোথাও ১০, ২০, ২৫ কিংবা ৫০ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি হয়, বিশেষ করে মফস্বল এলাকায়। আবার অনেক জায়গায় কেজি হিসেবেও রসগোল্লা বিক্রি করা হয়। এই বহুল প্রচলনই প্রমাণ করে—রসগোল্লা শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির অংশ।

বিপুল জনপ্রিয়তার পেছনে একটি বড় প্রশ্নও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায়—রসগোল্লার জন্ম কোথায়? এই প্রশ্ন ঘিরে মূলত পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। আধুনিক স্পঞ্জি রসগোল্লার উদ্ভাবক হিসেবে কলকাতার নবীনচন্দ্র দাসের নাম (১৮৬৮ সাল) বহুল প্রচলিত। অন্যদিকে আদি বা সাধারণ রসগোল্লার সৃষ্টিকর্তা হিসেবে নদীয়া জেলার হারাধন ময়রার কথাও বলা হয়। তবে এই বিতর্কের বাইরে বাংলাদেশও নয়।

বাংলাদেশের বনেদি মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের একটি বড় অংশই বিশ্বাস করেন—রসগোল্লার জন্ম হয়েছিল এই ভূখণ্ডেই, বাংলার কারিগরদের হাতে। এই দাবির পক্ষে খাদ্যবিষয়ক লেখক ও গবেষক শওকত ওসমানের মতামত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, লিখিত কোনো প্রমাণ না থাকলেও ধারণা করা হয় ষষ্ঠ শতকে দক্ষিণাঞ্চলীয় পটুয়াখালী এলাকায় পর্তুগিজরা দুধ থেকে পনির ও সন্দেশজাতীয় খাবার তৈরি করত। সেই পনির ব্যবহার করেই তাদের বাঙালি স্ত্রীরা রসগোল্লা কিংবা রসগোল্লার কাছাকাছি ধরনের মিষ্টান্ন তৈরি করেছিলেন। শওকত ওসমান আরও বলেন, ‘রসগোল্লার আবিষ্কারক হিসেবে কলকাতায় যে নবীনচন্দ্র দাসের কথা বলা হয়, তিনি বরিশাল অঞ্চলের মানুষ ছিলেন এবং পটুয়াখালীর কাছাকাছি এলাকায় বসবাস করতেন।’ তাঁর হাত ধরেই এই মিষ্টির শিল্প অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন ধারণাও গবেষকদের।

বাংলাদেশের বহু ভোক্তা এবং মিষ্টান্নপ্রেমীদের বিশ্বাস, রসগোল্লা বাংলাদেশেরই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। এই বিশ্বাসকে আরও জোরালো করে দেশের পুরোনো মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের বক্তব্য। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে মিষ্টান্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এমন একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হলো মরণ চাঁদ গ্র্যান্ড সন্স। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দাবি, রসগোল্লা বাংলাদেশের কারিগরদেরই এক অসাধারণ উদ্ভাবন—যা আজ পুরো উপমহাদেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। রসগোল্লা তাই কেবল স্বাদের নয়, ইতিহাস, বিতর্ক আর গর্বের এক অনন্য নাম—বাঙালির মিষ্টি ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ভেতরে সমানভাবে রস ঢুকেছে কি না—এক কামড়েই সেটা বোঝা যায়; শুকনো বা শক্ত হলে তা ভালো রসগোল্লা নয়
ছবি: লেখকের পাঠানো

বাংলাদেশের মিষ্টান্ন সংস্কৃতিতে রসগোল্লা শুধু একটি জনপ্রিয় মিষ্টিই নয়, এটি যেন অঞ্চলভিত্তিক স্বাদ-ঐতিহ্যের পরিচয়বাহী এক অনন্য নাম। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে রসগোল্লা ও অন্যান্য মিষ্টি কেবল খাবার নয়—সেগুলো সেই এলাকার পরিচিতি, ইতিহাস ও গর্বের অংশ হয়ে উঠেছে।

ফরিদপুরের খোকা মিঞার মিষ্টি বহু বছর ধরেই রসগোল্লাপ্রেমীদের কাছে এক আস্থার নাম। এখানকার রসগোল্লার নরম গঠন ও ভারসাম্যপূর্ণ মিষ্টতা দূর-দূরান্তের মানুষকে টেনে আনে। একইভাবে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার রসগোল্লা স্বাদে ও মানে আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছে।

যশোরের ঐতিহ্যবাহী জামতলার মিষ্টি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ঝিনাইদহের মেজদার জলযোগ নামেই বোঝা যায়—এখানকার মিষ্টিতে রসের আধিক্য আর স্বাদের গভীরতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বরিশালের শশী মিষ্টি ও বানারীপাড়ার কালীর বাজারের মিষ্টি বরিশাল অঞ্চলের মিষ্টান্ন ঐতিহ্যকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কমলমুন্সির হাটের গৌরাঙ্গের রসগোল্লা চট্টগ্রামবাসীর কাছে এক আবেগের নাম। এখানকার রসগোল্লা আকারে বড়, ভেতরে রসে ভরা আর স্বাদে অতুলনীয়। খুলনার ইন্দ্রমোহন সুইটস দীর্ঘদিন ধরে মান ও স্বাদের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে রসগোল্লাসহ নানা মিষ্টিতে সুনাম অর্জন করেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মৌলভীবাজারের ম্যানেজার স্টল স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও সমান জনপ্রিয়। শরীয়তপুরের হারু ঘোষ মিষ্টান্ন ভান্ডার বহু পুরোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে আজও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এ ছাড়া বিক্রমপুরের রসগোল্লা ও উপকূলীয় কলাপাড়ার রসগোল্লা স্বতন্ত্র স্বাদ ও নির্মাণশৈলীর কারণে বিশেষভাবে পরিচিত।

এসব অঞ্চলের রসগোল্লা ও মিষ্টির মধ্যে হয়তো উপকরণে বড় পার্থক্য নেই, কিন্তু কারিগরদের হাতের ছোঁয়া, রসের ঘনত্ব, দুধের মান আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা অভিজ্ঞতাই প্রতিটি জায়গার মিষ্টিকে আলাদা স্বাদ ও চরিত্র দিয়েছে।

গরম রসগোল্লা কখন পাবেন

রসগোল্লা সবচেয়ে মজাদার তখন, যখন এটি গরম থাকে। সাধারণত উনুন থেকে তৈরি হয়ে গরম অবস্থাতেই নামানো হয়। তখন মুখে দিলেই রস ও নরম ছানা মিলিয়ে সত্যিই স্বাদ অসাধারণ লাগে। মফস্‌সলে সাধারণত বিকেলের দিকে রসগোল্লা বাজারে আসে। বেশির ভাগ মিষ্টির দোকানের পেছনে ছোট ছোট কারখানা থাকে, যেখানে সরাসরি রসগোল্লা তৈরি করা হয়। সেখানে গিয়ে তৈরির পুরো প্রক্রিয়া দেখাও সম্ভব, যা মিষ্টিপ্রেমীদের জন্য একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা।

ভালো রসগোল্লা চেনার উপায়

রসগোল্লা ভালো লাগে, তাই বলে যেনতেন রসগোল্লা খেতে নেই। এবার জেনে নিন, রসগোল্লা ভালো কি না তা চেনার কিছু সহজ উপায় । প্রথমত, রসগোল্লা আঙুলে হালকা চাপ দিলে সঙ্গে সঙ্গে আগের আকারে ফিরে এলে বুঝতে হবে এটি নরম ও স্পঞ্জি। দ্বিতীয়ত, ভেতরে সমানভাবে রস ঢুকেছে কি না—এক কামড়েই সেটা বোঝা যায়; শুকনো বা শক্ত হলে তা ভালো নয়। তৃতীয়ত, রঙ হবে পরিষ্কার সাদা বা হালকা দুধে-সিদ্ধ রঙের, অতিরিক্ত হলদে বা ধূসর হলে সন্দেহ করা যায়। চতুর্থত, গন্ধে কোনো টকভাব বা পোড়া দুধের গন্ধ থাকা উচিত নয়। সব মিলিয়ে নরম স্পর্শ, রসে ভরা ভেতর আর পরিমিত মিষ্টতাই ভালো রসগোল্লার আসল পরিচয়।

রসগোল্লা আঙুলে হালকা চাপ দিলে সঙ্গে সঙ্গে আগের আকারে ফিরে এলে বুঝতে হবে এটি নরম ও স্পঞ্জি
ছবি: লেখকের পাঠানো

স্পঞ্জ রসগোল্লা ও সাধারণ (দেশি/আদি) রসগোল্লা

স্পঞ্জ রসগোল্লা ও সাধারণ (দেশি/আদি) রসগোল্লার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে তাদের গঠন ও তৈরির প্রক্রিয়ায়। স্পঞ্জ রসগোল্লায় ছানা মাখার সময় সামান্য সুজি বা ময়দা মেশানো হয়, ফলে এটি হালকা, ফাঁপা ও স্পঞ্জের মতো নরম হয়—যা মূলত কলকাতার রসগোল্লার বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে সাধারণ বা আদি রসগোল্লায় ব্যবহৃত হয় শুধু বিশুদ্ধ ছানা, তাই এর গঠন তুলনামূলকভাবে ঘন ও দুধের স্বাদ বেশি অনুভূত হয়। অঞ্চলভেদে এই রসগোল্লা কিছুটা বেশি জ্বাল দেওয়া হয়, ফলে কখনো হালকা লালচে বা বাদামি আভাও দেখা যায়। কম জ্বালে তৈরি স্পঞ্জ রসগোল্লা সাধারণত ধবধবে সাদা, আর তৈরির পদ্ধতির এই ভিন্নতাই দুই ধরনের রসগোল্লার স্বাদ ও চরিত্রকে আলাদা করে তোলে। স্পঞ্জ রসগোল্লা বেশি নরম হয়।

নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]