অচেনা কাক
চৈত্রের দুপুর। ঠাঁ ঠাঁ রোদ। মোতালেব মোড়ল মেঠোপথের আল ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছেন। তাঁর মনটা ভালো না। আজ কোর্টের বারান্দায় এক লোক তাঁকে খুব ধমকাধমকি করেছে। লোকটাকে তিনি চেনেন না। নিজের জমিজমা নিয়ে একটা মামলা নিয়ে তাঁকে প্রায়ই কোর্টে যেতে হয়। কোনো দিন এই লোকের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। লোকটা কোথা থেকে এল কে জানে। তাঁকে প্রায় তেড়েমেড়ে মারতে এসেছিল। উকিল সাহেব না ঠেকালে একটা বিষম কাণ্ড ঘটে যেত। মোড়ল সাহেব এলাকার গণ্যমান্য মানুষ। দীর্ঘ অনেক বছর যাবত এলাকার মেম্বার। তাঁর মানসম্মান আছে। এমন ভরা মজলিশে তিনি কখনো এমন অবস্থার শিকার হননি। উকিল সাহেব লোকটাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘স্যার, কী হয়েছে, বলেন?’ ‘আর বলবেন না উকিল সাহেব, ও ব্যাটা এক বিশাল ফ্রড। সে মানুষকে অপমান করে কথা বলে। এলাকায় পক্ষপাতমূলক বিচার করে। আমি যখন খুব ছোট, তখন বিনা দোষে সে আমার বাবাকে চুরির অপবাদ দিয়েছিল। তাকে সবার সামনে অপদস্ত করেছিল। আমার বাবা রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে আমাদের পরিবার নিয়ে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে যায়। কিন্তু আমার মনে এখনো তার চেহারাটা গেঁথে আছে। একজন জালিম লোভীর চেহারা!’ লোকটার চোখে একরাশ ঘৃণা। ‘আপনার পরিচয়?’ ‘আমার পরিচয় দিয়ে আপনার কাজ কী?’ ‘না বাবা, আপনারে তো চিনবার পারলাম না।’ ‘উনি একজন ম্যাজিস্ট্রেট। একসময় আপনাদের এলাকাই তার বাবা বাস করত। একটা কাজে এসেছেন এখানে।’ ম্যাজিস্ট্রেট! মোড়ল সাহেব অবাক চোখে তাকান লোকটার দিকে। তিনি কিছুই মনে করতে পারেন না। এলাকায় তিনি বহু মানুষের বিচার–আচার করেছেন। পয়সাপাতি পেলে অনেক নির্দোষ মানুষকেও তিনি নিজ ক্ষমতায় দোষী সাব্যস্ত করেছেন। কত মানুষের জমিজমা কৌশলে কিনে নিয়েছেন। কত মানুষের জায়গাজমি যে দখল করেছেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু এই বুড়ো বয়সে এখন আর এসব ভালো লাগে না। গত বছর মসজিদের হুজুরের সঙ্গে হজ করে এসেছেন। দ্বীনের পথে তিনি ধীরে ধীরে প্রবেশ করছেন। কিন্তু যে পাপ তিনি সারা জীবন করেছেন, তার ধাক্কা এখনো মাঝেমধ্যে লাগে তাঁর গায়ে। ‘আচ্ছা স্যার, বিষয়টা ভুলে যান। বয়স্ক মানুষ, জোয়ান বয়সে না বুঝে ভুল করে ফেলেছেন। আপনি জ্ঞানী মানুষ, তাঁকে মাফ করে দেন।’ লোকটা কিছু বলে না। চুপচাপ তাঁকে নিরীক্ষণ করে। মোতালেব মোড়ল স্মৃতির পাতা মেলে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেন। পোলাডা কে? হিসাব মেলে না।
নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
কোর্ট থেকে এই ভরদুপুরে ফিরতে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মোতালেব মোড়ল ক্লান্ত হয়ে গেছেন। পথের মাঝখানে একটা কদমগাছের ছায়ায় তিনি কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়ান। একটা কাক তাঁকে লক্ষ করছে। গত বছর মোতালেব মোড়ল তাঁর বাড়ির উঠানে ধান খেতে আসা একটা কাককে লাঠির আঘাতে মেরে ফেলেছিলেন। বাচ্চারা কাকটিকে বাড়ির ঘাটায় টাঙিয়ে রেখেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে হাজার হাজার কাক এসে কা–কা রবে বাড়িটাকে ঘিরে ফেলেছিল। মোতালেব মোড়ল তড়িঘড়ি করে কাকটিকে মাটি চাপা দিয়েছিলেন। তার কয়েক মাস বাদে তিনি প্রায়ই নানা জায়গায় একটি কাককে পিছু পিছু উড়তে দেখেন। কাকটি যেন তাকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখে। কাকটির চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর ভয় করে। তবে কি সে মৃত কাকের বাচ্চা, যে তার ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়? আজও তিনি কদমগাছের মাথায় সে রকম একটি কাক দেখতে পান। একটি অচেনা কাক। এ কাকের কোনো বাচ্চা বা কোনো আত্মীয়ের কি তিনি কোনো ক্ষতি করেছিলেন? মনে করতে পারেন না। হয়তো করেছিলেন? না হলে কোর্টের ওই অচেনা লোকের মতো অচেনা কাকটি তাঁর দিকে কেন এমন করে তাকিয়ে আছে? মোতালেব মোড়লের ভয় ভয় করে। মনে কেমন একটা অজানা আতঙ্ক ঘিরে ধরে। তিনি দ্রুত বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকেন। কাকটি তাঁর পিছু পিছু উড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে হাজার হাজার কাকে পুরো আকাশ ছেয়ে যায়। তারা মোতালেব মোড়লের পিছু পিছু ছুটছে।
*লেখক: সুলতান মাহমুদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, শরীয়তপুর