নগদে ৫ লাখের বেশি লেনদেন এখন করযোগ্য আয়

কিছুদিন আগে আমার সহকর্মী মি. জোহান এসে বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে জানালেন, তিনি তাঁর এক আত্মীয়ের কাছ থেকে নগদ ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে একটি জমি ক্রয় করেছেন। আয়কর রিটার্নে তিনি এই টাকাকে আনসিকিউরড লোন হিসেবে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সার্কেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তা এই অর্থকে করযোগ্য আয় হিসেবে গণ্য করে একটি নোটিশ পাঠান। এখন কী করা উচিত, তা জানার জন্যই তিনি আমার কাছে পরামর্শ চান।

নগদ লেনদেন: বাড়তি করের অজানা একটি ঝুঁকি

আমাদের সমাজে জরুরি প্রয়োজনে আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে নগদ টাকা ঋণ কিংবা ধার নেওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই জানেন না, নগদ লেনদেনের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, যা অতিক্রম করলে তা কর-ঝুঁকি তৈরি করে। আইন অনুযায়ী, সীমা লঙ্ঘিত হলে নগদ লেনদেনকে করদাতার অন্যান্য খাতের আয় হিসেবে গণ্য করা হয়, এবং তাঁর ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়।

বাংলাদেশের আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৬৭(১৩)-এ নগদ লেনদেনের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি পাঁচ লাখ টাকার বেশি অর্থ অগ্রিম, ঋণ বা আমানত হিসেবে গ্রহণ করলে তা অবশ্যই ব্যাংক ট্রান্সফার বা ক্রসড চেকের মাধ্যমে হতে হবে। অন্যথায়, অর্থাৎ নগদ লেনদেন হলে, সেই অর্থ করযোগ্য আয় হিসেবে ধরা হবে। অর্থাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে পাঁচ লাখ টাকার বেশি নগদ লেনদেন এখন সরাসরি করের আওতায় চলে আসে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম হলো, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান বা আপন ভাই-বোনের কাছ থেকে পাওয়া নগদ অর্থ আয় হিসেবে গণ্য হবে না, যদি উভয়ের আয়কর রিটার্নে সেই লেনদেন স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে।

অন্যদিকে, আয়কর আইন ২০২৩-এর ষষ্ঠ তফসিলের প্রথম অংশের অনুচ্ছেদ ৩৫ অনুযায়ী, বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানো উপহারের ক্ষেত্রে দাতার আয়কর রিটার্নে তা প্রদর্শনের প্রয়োজন নেই। সার্বিকভাবে, আইনের বিধানগুলো জানা থাকলে করভোগী অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বা অতিরিক্ত করভার থেকে সহজেই বাঁচতে পারেন।

আইনটি শুধু কর সংগ্রহের বিধান নয়—এটি আমাদের অর্থনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনে। দীর্ঘদিন ধরে নগদ অর্থ ছিল আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক; হাতে গোনা টাকার উষ্ণতাই ছিল লেনদেনের প্রমাণ। কিন্তু সময় বদলেছে। আজকের অর্থনীতি ডিজিটাল পথে এগোচ্ছে, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো টাকার উৎস ও তার স্বচ্ছ নথি। কারণ, নথিবদ্ধ অর্থই ন্যায্য অর্থনীতির ভিত্তি।

তবে আইনটি মানবিক বাস্তবতার প্রতিও সহানুভূতিশীল। পরিবারের সদস্যদের—যেমন স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান বা ভাই-বোনের মধ্যে, অর্থ লেনদেন এই নিয়মের আওতায় পড়বে না, যদি রিটার্নে তা সঠিকভাবে প্রদর্শিত হয়। কিন্তু যদি তা না হয়, সে ক্ষেত্রে উক্ত প্রাপ্ত অর্থ করযোগ্য আয় হিসেবে বিবেচিত হবে। একইভাবে, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও ব্যুরো বা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নিবন্ধিত সংস্থার ক্ষেত্রে এই ধারা প্রযোজ্য নয়; কারণ, তাদের সব লেনদেন ইতিমধ্যেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে নথিভুক্ত থাকে।

অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, করফাঁকি ও অপ্রদর্শিত আয়ের প্রবাহ রোধ করা এই ধারার মূল উদ্দেশ্য। তবে এর গভীরে আরও বড় একটি বার্তা নিহিত আছে, এটি নাগরিক দায়িত্ববোধের এক ঘোষণা। আইনটি যেন বলছে: ‘যে অর্থের উৎস স্পষ্ট, তার দায়ও স্পষ্ট।’

আরও পড়ুন

জোহানের ক্ষেত্রে করণীয় কী

জোহানের ঘটনা আইন অনুযায়ী খুবই সরল, তিনি আত্মীয়ের কাছ থেকে নগদ ২০ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যা ৫ লাখ টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার না করায়, এই পুরো অর্থকে কর কর্মকর্তা আয় হিসেবে গণ্য করেছেন এবং নোটিশ দিয়েছেন। আমি তাঁকে স্পষ্টভাবে জানালাম, এই অবস্থায় কর পরিশোধ ছাড়া তাঁর সামনে অন্য কোনো পথ নেই। কারণ, তিনি আইনের নির্ধারিত নগদ লেনদেন সীমা অতিক্রম করেছেন।

বাংলাদেশ এখন নগদের গন্ধ পেছনে ফেলে ব্যাংকিং স্বচ্ছতার যুগে প্রবেশ করছে। পাঁচ লাখ টাকার সীমা শুধু একটি সংখ্যা নয়—এটি একটি আর্থিক প্রতীক, যেখানে স্বচ্ছতার বাইরে যাওয়া মানেই করযোগ্যতার পরিসরে প্রবেশ। কারণ, অর্থ কেবল লেনদেনের বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক প্রতিশ্রুতি: ‘আমি স্বচ্ছ, আমি দায়বদ্ধ।’ নগদের যুগ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর তার জায়গায় তৈরি হচ্ছে ডিজিটাল স্বচ্ছতার ছাপ—যা একটি সমৃদ্ধ, ন্যায্য ও আধুনিক বাংলাদেশের আর্থিক স্বাক্ষর হয়ে থাকবে।

*লেখক: ফয়সাল ইসলাম, এফসিএ, আর্থিক খাতের বিশ্লেষক। [email protected]

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]