শীত মানেই কি বিষণ্নতা

প্রথম আলো ফাইল ছবি

শীত মানে কি কেবলই বিষণ্নতা। আমার তো মনে হয় শীত একটা উদ্‌যাপনের ঋতুও বটে। ছেলেবেলায় বইয়ে পড়েছি ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু এখন আর ছয়টা ঋতু সেভাবে উপলব্ধি করা যায় না। গরমই যেন বাংলাদেশে বেশি সময়জুড়ে রাজত্ব করে।

অনেকেই বলে শীত মানেই শূন্যতা, প্রাণহীন এক জড়তা। সত্যিই কি শীত এক বিষণ্নতা ভরা ঋতু। হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে উত্তরের হাওয়া মেখে একটু একটু করে আসা হিমেল পরশ আমাদের মনকে জানান দিয়ে যায় শীত আসছে। পাহাড়ের গায়ে কুয়াশা জমলে সবুজ খানিকটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়, কিন্তু সেই ধূসরতাও কখনো কখনো মনকে শ্রান্ত করে আবার কুয়াশাচ্ছন্ন শিশিরে ভেজা ভোরও স্নিগ্ধতা বাড়ায়। প্রভাতের রাঙা সূর্যের আলো যখন উঁকি দেয় উঠানে, তখন গায়ে চাদর জড়িয়ে যে উষ্ণতা পাই, তাতে এক বিচিত্র অনুভূতি টের পাওয়া যায়, যা অন্য কোনো ঋতুতে খুঁজে পাই না।

আবার একটু একটু করে চলে যাওয়া বিকেলের নরম সূর্যের আলো যখন বাড়ির আঙিনায় এসে পড়ে, তখন মনে হয় আলোছায়ার এই খেলা কোনো এক পান্থজনের গল্প এঁকে যাচ্ছে। খুব আটপৌরে সাজসজ্জাহীন এক স্নিগ্ধ রূপ। গাছের সবুজ পাতারা ঝরে যায়, রাস্তাঘাটে ধুলা জমা অস্বস্তিকর পরিবেশ, নদী শুকিয়ে কাঠ—সব মিলিয়ে সত্যি সাদা থান পরা এক বিধবা বউয়ের মতো অলংকারহীন দেখায় সদ্য চলে যাওয়া সাদা কাশফুলের শরৎ এবং বর্ষার স্নিগ্ধ সবুজ প্রকৃতিকে। অথচ এ অলংকারবিহীন নিস্তব্ধতা প্রকৃতিতেও আমি এক ভালোলাগা টের পাই, যা কেবল বুকের ভেতর অনুরণিত হয়।

হ্যাঁ, শীতে প্রকৃতিতে নেমে আসে নিস্তব্ধ নীরবতা। হয়তো এ কারণেই কারও কারও মন উদাস হয়ে যায়। অনেকেই শীতের এ পরিবর্তনটা মেনে নিতে পারে না, তাদের মন কেমন করে! আমার তো মনে হয় শীত তার খুব নিজস্বতা নিয়ে আসে আমাদের মধ্যে। এ সময় ভোরের সূর্য যেন ভরা কলসির মতো একেবারে উপুর করে ঢেলে দেয় তার আদরমাখা মায়াবী রোদ।

বিষণ্নতারও না একটা রং আছে, যা ভরা বর্ষা কিংবা শ্রাবণের ভেজা প্রকৃতিকেও কখনো কখনো ছাপিয়ে যায়। আসলে একেকটা ঋতুর একেক রকম মাধুর্য। হয়তো মফস্‌সলে বেড়ে উঠেছি বলেই প্রকৃতির এই ভিন্ন ভিন্ন রূপ আমাকে এত বেশি টানে। কারণ, শীত মানেই চোখে ভেসে ওঠে গ্রামের সেই আটপৌরে জীবনের চিত্র। শহরের চেয়ে গ্রামের শীত যেন অনেক বেশি প্রকট। ভোরের কনকনে ঠান্ডায় গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো সবুজ ঘাসের ওপর জমে থাকা শিশির মাড়িয়ে বেরিয়ে পড়েন জীবিকার সন্ধানে। গ্রামের এ সাধারণ ছবিগুলোই শিল্প হয়ে ফুটে ওঠে নতুন বছরের ক্যালেন্ডারের পাতায়।

তীব্র শীতে শুকনা খড় জ্বালিয়ে পথের পাশে বসে আগুন পোহানো গ্রামের সাধারণ মানুষের এক চিরাচরিত রূপ। গ্রামের মা-চাচিদের ঢেঁকিতে চাল কুটে পিঠা বানানোর ধুম পড়ে যায় এ সময়। সকালে মাটির চুলার পাশে বসে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম ভাপা পিঠা খেতে কী যে মজা, তা সত্যি বর্ণনাতীত।

আবার বলি, শীত মানেই বিষণ্নতা নয়। শীত অনেকটা উদ্‌যাপনের। শীত নিয়ে রয়েছে কত কবিতা। জীবনানন্দের ভাষায়—
‘এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে,
বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে কিংবা পাতা,
কিংবা প্যাঁচার গান, সে–ও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো।’

অপরূপ সৌন্দর্যের দেশ বাংলাদেশ। এ দেশ তার রূপের মুগ্ধতা ছড়ায় ক্ষণে ক্ষণে। সব ঋতুতেই আমরা তার রূপ উপলব্ধি করি, উপভোগও করি। সত্যি প্রকৃতি আমাদের উজাড় করে দেয়, অথচ আমরাই তাকে আগলে রাখতে জানি না।

শীতের বাহারি সবজি নিয়ে দোকানিরা যখন পসরা সাজিয়ে বসে থাকেন, তখন কী যে ভালো লাগে দেখতে। শুধু দেখতেই নয়, ভোজনপ্রিয় বাঙালি নানা রকম স্বাদের তরকারি খেতে পায় এই দাপুটে শীতে। শীতের সকালে বাড়ির উঠান অথবা ছাদে মায়েরা ডাল বেঁটে কুমড়া বড়ি শুকাতে দেন। সে দৃশ্য এক অনিন্দ্য ছবির মতো মনে হয়।

কবিতার মতো বলতে ইচ্ছা করে,
‘পাশের বাড়ি শীতের শখে পেঁয়াজ কলির চাষ করবে
তাদের বাড়ির কামরাঙাগাছ আমার দিকে ঝুঁকে পড়বে
তিলের নাড়ু গুছিয়ে দিতে গ্রামের মাসি আমায় ডাকবে
আমি অনেক সহজ হব।’
প্রতিটি ঋতুই যেন একেকটা কবিতা।

শীতকাল মানেই যেন পিঠা পার্বণের ধুম। বাড়িতে বাড়িতে চাল কুটা পিঠা বানানো মেয়ে-জামাইয়ের নিমন্ত্রণ, আত্মীয়স্বজনের এক মহোৎসব লেগে যায়। হরেক রকম পিঠা তো আছেই, তার মধ্যে অন্যতম শীতের খেজুর রস। মেঠো পথের ধারে লিকলিকে খেজুরগাছের মাথায় উঠে কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে তাকে নিরাপদ আশ্রয় বানিয়ে পিঠ এলিয়ে দিয়ে কী নিশ্চিন্ত মনে গাছি বেচারা গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন, সে এক অনবদ্য ছবি।

লেখক
ছবি: সংগৃহীত

শীতকে একটা ফ্যাশনেবল ঋতুও বলা যায়। একটা সময় ছিল যখন মায়েরা তাঁদের সন্তানদের জন্য উল কাঁটায় হাতে সোয়েটার বুনতেন। একটু করে বোনা হতো আর বলতেন, দেখি একটু এদিকে আয় তো। তারপর পিঠের ওপর সেই আধবোনা সোয়েটারটা ধরে মাপ ঠিক করতেন। যখন সেটা পুরোপুরি কমপ্লিট হয়ে যেত, সে কী আনন্দ হতো! আহা সেসবই আজ স্মৃতির অতলে।

এখন নামীদামি ফ্যাশন হাউস থেকে শুরু করে রাস্তার পাশেও পাওয়া যায় রকমারি ডিজাইনের শাল, সোয়েটার, টুপি, হুডি কত কী। এগুলো দেখতেও যেমন সুন্দর, তেমনি পরতেও বেশ আরামদায়ক। তরুণ–তরুণীরা তো শীত আসার আগে থেকেই শুরু করে দেয় সাজ সাজ রব।

রোজ রোজ উন্নত বিশ্বে পড়ালেখা ও কর্মের জন্য বাংলাদেশ ছাড়ছে হাজারো মানুষ। কেমন আছে তারা বিদেশে, জানতে চাইলেই তারা বলে, ধুর এটা কোনো দেশ, বাংলাদেশ বেটার, বাংলাদেশ অপূর্ব। সত্যি এমন মায়ায় জড়ানো প্রকৃতি পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না।

গ্রামের মানুষগুলো শীতের অলস দুপুরটা বেশ আয়োজন করে কাটায়। বাড়ির বাইরে খোলা মাঠে পাটি পেতে তারা রোদ পোহায়। কেউ কেউ তো সেখানে বসে লুডু খেলে, কেউ বই পড়ে। মায়েরা ডালের বড়ি, শুঁটকি মাছ শুকায় আবার অনেকেই বসে বসে কাঁথা সেলাই করে।

আরও পড়ুন

আমার ছেলেবেলায় দেখেছি, শীতকালে মালাকার বাড়ির দাদা–বউদিরা তাদের কাজের জিনিসপত্র সব নিয়ে পালানে (খোলা মাঠ) চলে আসত। সেখানে মিষ্টি রোদে বসে তারা মুকুট, চরকি, ঝালর এসব বানাত। কী অপূর্ব লাগত তাদের হাতে বানানো সেসব কারুকাজ দেখতে।

শীতের পড়ন্ত বিকেলে ছেলেরা বাড়ির উঠান কিংবা বাইরের আঙিনায় নেট টানিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলে। কখনো কখনো তো গভীর রাত অবধি চলে এই খেলা। শুধু গ্রামে নয়, শীতের মৌসুমে শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রতিটি কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলের মাঠেও চলে এই ব্যাডমিন্টন খেলা। বিয়েশাদি থেকে শুরু করে নানা রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এ শীত ঋতুতে। তাই শীত কেবল নীরবতার নয়, আনন্দের ঋতুই বটে।

তবে হ্যাঁ, শিশু-বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষদের জন্য শীতকাল মোটেও আনন্দের নয়। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জন্য এ ঋতু বড্ড কষ্টদায়ক। তাই এসব দুঃখী মানুষগুলোর জন্য প্রতিটি প্রতিকূল পরিবেশই যেন আনন্দের হয়, সে দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। শীত আসার আগেই মানবতা ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে তাদের দিকে। যেন তারা কোনোভাবেই শীতে কষ্ট না পায়। নিজেরা ভালো থাকব, আনন্দে থাকব আর আমাদের পাশের মানুষগুলো নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাবে, তা হতে পারে না। তাই আমরা নিজেদের জায়গা থেকে প্রত্যেকে তাদের জন্য উষ্ণতা হয়ে পাশে দাঁড়াব।
*লেখক: রোজিনা রাখী, ফিচার লেখক