বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানীর মতামত নেওয়া হলো। তারপর বঙ্গবন্ধু, আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, আবদুস সালাম খান, হাশিম উদ্দিন আহমদসহ মোট ১২ জন ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেন। ১৯৫৪ সালের মে মাসে তাঁদের শপথ হলো।

কিন্তু মন্ত্রিসভার শপথের দিনই আদমজী জুট মিলে বাঙালি-অবাঙালি এক ভয়াবহ দাঙ্গা হলো। বঙ্গবন্ধু দ্রুত আদমজীতে পৌঁছে খোঁজখবর নিলেন। এক অবাঙালি নিরাপত্তাকর্মীর মৃত্যু নিয়ে দাঙ্গা। কয়েক শ মানুষ আহত-নিহত হয়েছে। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে প্রায় ৩০০ আহত শ্রমিকের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে মৃত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫০০। পুকুর ও অন্যান্য জায়গায় হয়তো আরও ১০০ লাশ লুকানো আছে।

সেদিন আরও ভয়ংকর দাঙ্গার জন্য শত শত বাঙালি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সে সময় বঙ্গবন্ধু তাঁদের অনেক বুঝিয়ে থামিয়েছিলেন। এটা ছিল একটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। সে সময় ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) পুলিশের আইজি শামসুদ্দোহাসহ সবাই বিষয়টা জানার পরও কোনো উদ্যোগ নেননি। বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরলেন। রাত সাড়ে ১০টায় ক্যাবিনেট মিটিংয়ে বললেন, যাঁদের ব্যর্থতায় এত মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের কঠিন শাস্তি পেতে হবে। রাত একটায় মিটিং থেকে বের হলেন। বাইরে বঙ্গবন্ধুর জন্য লোকজন অপেক্ষা করছেন। তাঁরা বললেন, যেকোনো সময় অবাঙালিদের ওপর আক্রমণ হতে পারে। বঙ্গবন্ধু দেখলেন, তাই তো, মোড়ে মোড়ে মানুষ জড়ো হচ্ছেন। সেই রাতে তিনি সবার সঙ্গে কথা বললেন। তাঁদের শান্ত করলেন। রাত চারটায় বাড়িতে পৌঁছালেন। শপথ নেওয়ার পর থেকে বাসায় আসা হয়নি। দিনভর কিছু খাননি। সেই গভীর রাতেও ঘরে ফিরে দেখেন, বেগম মুজিব তখনো না খেয়ে বসে আছেন।

এই দাঙ্গা ছিল যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র। সারা পৃথিবীকে এটা দেখাতে চাওয়া যে যুক্তফ্রন্ট একটা ব্যর্থ সরকার। করাচি থেকে এ ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল। এর সঙ্গে সরকারি ও মিলের কিছু কর্মচারী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। পুঁজিপতিরা তাঁদের রাজনৈতিক ও শ্রেণিস্বার্থে সব সময় দাঙ্গা বাধান। মানুষ হত্যার পরিকল্পনা করেন। এটাও তা–ই। মুসলিম লীগ মোহাম্মদ আলী বগুড়াকে সামনে নিয়ে সুযোগ খুঁজছিল। আদমজীর ঘটনা সেটাকে উসকে দিল। যুক্তফ্রন্ট যদি আওয়ামী লীগসহ পূর্ণ মন্ত্রিসভা নিয়ে শাসনব্যবস্থা চালাত, তাহলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে থাকত।

সেদিন বেলা তিনটায় ফোন এল

মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক বলেছেন, বাংলাকে স্বাধীন করা তাঁর প্রথম কাজ। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সাংবাদিক কালাহান সে সময় এমন একটি খবর প্রকাশ করেন। পাকিস্তান সরকার এমনিতেই যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। এ জন্য তারা নানান অছিলা খুঁজছিল। কালাহানের এই খবর ছিল তাদের ষড়যন্ত্রের একটি মোক্ষম হাতিয়ার। গোলাম মোহাম্মদ ছিলেন তখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল। তিনি এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ১৯৫৪ সালের ৩১ মে ফজলুল হকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনেন।

এ ছাড়া ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা গঠন, মন্ত্রিত্ব বণ্টন, কলকাতার বক্তব্য, আদমজীর দাঙ্গায় মিথ্যা দায় চাপানো—সবকিছু নিয়ে যুক্তফ্রন্টের মধ্যে চলছিল একধরনের অস্থিরতা। এরই মধ্যে হঠাৎ তিনি বঙ্গবন্ধুকে করাচিতে যাওয়ার কথা বললেন। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকার খবর দিয়েছে। করাচিতে গিয়েই বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন, যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করার গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী ফজলুল হককে তাঁর রুমে ডাকলেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে ভালো আচরণ করলেন না। বঙ্গবন্ধু এর প্রতিবাদ করলেন। মোহাম্মদ আলী বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘মুজিবুর, তোমার বিরুদ্ধে ফাইল আছে।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ফাইল তো থাকবেই। আপনাদের জন্যই আমাকে বারবার জেল খাটতে হয়। আপনার বিরুদ্ধেও প্রাদেশিক সরকারের কাছে ফাইল আছে।’

default-image

গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের সঙ্গেও তাঁরা কথা বললেন। পরদিন বঙ্গবন্ধু খবর পেলেন, যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হবে। গভর্নরের শাসন চালু করবে। তাঁদের করাচি থেকে ফিরতে দেওয়া হবে না। তখন হাফিজ ইসহাক ছিলেন মুখ্য সচিব। কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে নির্দেশ দিয়েছে যেন প্লেনের টিকিট না দেওয়া হয়। মুখ্য সচিব বলেছেন, এখনো তিনি যুক্তফ্রন্ট সরকারের নির্দেশ মানতে বাধ্য।

২৯ মে বঙ্গবন্ধু, ফজলুল হক, আতাউর রহমান খান, নান্না মিয়া রাতের প্লেনে কলকাতা হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলেন। সঙ্গে ছিলেন মুখ্য সচিব হাফিজ ইসহাক ও আইজিপি শামসুদ্দোহা।

আইজিপি শামসুদ্দোহা ছিলেন ষড়যন্ত্রের অংশ। তিনি ফজলুল হককে বললেন, ‘স্যার, রাতেই ইস্কান্দার মির্জা, মিলিটারি প্লেনে ঢাকায় গেছেন। বিমানবন্দরে কিছু ঘটতে পারে। কলকাতায় থেকে যান।’ হক সাহেব বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে বললেন। বঙ্গবন্ধু বললেন যে যা–ই হোক, তাঁরা ঢাকায় যাবেন। কলকাতায় থাকলে পাকিস্তানি শাসকচক্র সারা বিশ্বকে দেখাবে, হক সাহেব দুই বাংলাকে এক করতে চান।

যুক্তফ্রন্ট সরকার পাকিস্তানের শত্রু, রাষ্ট্রদ্রোহী। আর বঙ্গবন্ধুসহ অন্যরা তাঁর সহযোগী। শামসুদ্দোহা আবার বঙ্গবন্ধুকে বললেন, তিনি খবর পেয়েছেন, ঢাকা এয়ারপোর্ট মিলিটারি ঘিরে রেখেছে। বঙ্গবন্ধুকে চিন্তা করে দেখতে বললেন। বঙ্গবন্ধুর এককথা, ঢাকায় আসবেনই।

ঢাকায় এসে একেবারে অন্য রকম দৃশ্য। বিশাল জনতা অপেক্ষা করছে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। অভ্যর্থনার মধ্যেও বঙ্গবন্ধু খবর পেয়ে গেলেন, যেকোনো মুহূর্তে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ভেঙে দেওয়া হবে। কয়েক দিন আগে বেগম মুজিব ঢাকায় এসেছেন। সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। সংসার এখনো গুছিয়ে উঠতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু বাসায় ফিরে বললেন, ‘রেণু, সংসার আর গোছানোর প্রয়োজন হবে না। মন্ত্রিসভা ভেঙে দেবে। আমাকেও গ্রেপ্তার করবে। আমার কাছে একটু থাকবা, ঢাকায় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ হবে, সে জন্যই তো এসেছিলে।’ বেগম মুজিব একেবারে নীরব। শুধু দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন।
১৯৫৪ সালের ৩১ মে। বঙ্গবন্ধু গোসল সেরে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেদিন বেলা তিনটায় টেলিফোন এল। কেন্দ্রীয় সরকার ৯২ (ক) ধারা জারি করেছে। মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করা হয়েছে। মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে পূর্ব বাংলার গভর্নর করা হয়েছে। চিফ সেক্রেটারি করা হয়েছে এন এম খানকে।

করাচি গ্রেপ্তারের জন্য অস্থির

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ছিল পূর্ব বাংলার আইন পরিষদের নির্বাচন। মোট ১৬টি দল এ নির্বাচনে অংশ নেয়। আইন পরিষদের ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩ আসন পেয়ে যুক্তফ্রন্ট বিশাল বিজয়ের মাইলফলক সৃষ্টি করে। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম সেদিন যুক্তফ্রন্টের এ বিজয়কে ‘ভোট বিপ্লব’ বলে অভিহিত করে।

এমন একটি বিজয়ী দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা। কিন্তু পাকিস্তান সরকার মাত্র ২ মাস ১৮ দিন পর ১৯৫৪ সালের ৩১ মে সম্পূর্ণ অবৈধ, অনৈতিক ও অন্যায়ভাবে এটা ভেঙে দিল।

যে বাঙালি মুসলমান একদিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান জন্য জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগস্বীকার করেছিল, সেই দেশটি নিয়ে সবার আগে স্বপ্নভঙ্গ হলো তাদের। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ দিয়েছেন যে তা মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জোটি নেই।’

নতুন গভর্নর হলেন মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা। বঙ্গবন্ধু এর তীব্র প্রতিবাদ করলেন। তিনি নেতা-কর্মীদের বললেন, ‘মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া চরম অন্যায়। নীরবে আপনারা এটা মেনে নেবেন না। এর কঠিন প্রতিবাদ করতে হবে। দেশবাসী প্রস্তুত। নেতৃত্ব দিতে হবে আপনাদের। অনেককেই জেলে যেতে হবে। প্রতিবাদ করে জেল খাটা উচিত।’ কিন্তু কারও কাছ থেকে তেমন সাড়া পেলেন না। বঙ্গবন্ধু বুঝে গেলেন, অযোগ্য নেতা নিয়ে দেশের কাজে নামতে নেই। এতে সেবার চেয়ে জনগণের সর্বনাশ হয় বেশি।

এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ বাসায় ও অফিসে গেছে। বঙ্গবন্ধু বাসায় ফোন করে বললেন, পুলিশ আসলে যেন বলে, তিনি দ্রুত বাসায় ফিরবেন। সরকারি বাসা ছেড়ে রিকশায় বাড়িতে এলেন। পুলিশ বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। সে সময় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এহিয়া খান চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু তাঁকে ফোন করে বললেন, তিনি বাড়িতে আছেন। পুলিশ এলে গ্রেপ্তার করতে পারবে।

ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, ‘স্যার, আমাদের তো হুকুম মানতে হয়। বারবার ফোন আসছে আপনাকে গ্রেপ্তারের জন্য।’ বেগম মুজিব কাঁদতে লাগলেন। বঙ্গবন্ধু ইয়ার মোহাম্মদ খানকে বেগম মুজিবের জন্য একটা বাড়ি ভাড়া করে দিতে বললেন।

আধঘণ্টা পর গাড়ি এল। শহিদুল ইসলাম নামে গোপালগঞ্জের এক কর্মী চিৎকার করে কাঁদছিলেন। বঙ্গবন্ধুর তাঁর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘কেন কাঁদিস? এই তো আমার পথ। একদিন তো বের হব।’ বঙ্গবন্ধুকে প্রথমে ম্যাজিস্ট্রেটের রুমে আনা হলো। ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, ‘করাচি আপনাকে গ্রেপ্তারের জন্য পাগল হয়ে গেছে।’ বঙ্গবন্ধু খুব ক্লান্ত ছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেছে।

এক ইন্সপেক্টর ওয়ারেন্ট বানালেন। খুন–ডাকাতি করার চেষ্টা, লুটতরাজ, সরকারি সম্পত্তি নষ্টসহ আরও কিছু ধারা বসিয়ে দিলেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডিভিশন লিখে দিলেন। রাত প্রায় একটায় বঙ্গবন্ধুকে জেলে নেওয়া হলো। ডিআইজি ইদ্রিস বঙ্গবন্ধুর কাছে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল হাইয়ের কথা জানতে চাইলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কীভাবে আপনি এ খবর আশা করেন?’ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, আইনসভার সদস্য ও অন্যান্য দল থেকে প্রায় তিন হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হলো। ইয়ার মোহাম্মদ খান একদিন বেগম মুজিবকে নিয়ে জেলগেটে গেলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। জেলগেট থেকেই ইয়ার মোহাম্মদ খানকে গ্রেপ্তার করা হলো।

বাংলার সত্যিকার নেতা

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অসুস্থ। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ছিলেন। দীর্ঘদিন পর করাচিতে আসেন। তাঁকে ব্যাপক সংবর্ধনা দেওয়া হলো। কিন্তু সংবর্ধনা দিলে কী হবে! পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ তাঁকে ফাঁদে ফেললেন। সোহরাওয়ার্দীকে বললেন, ‘আপনি পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু এর আগে আপনাকে আইনমন্ত্রী হতে হবে। আইনমন্ত্রী হয়ে একটা শাসনতন্ত্র রচনা করবেন।’
সোহরাওয়ার্দী পূর্ব বাংলায় এলেন না। পরিস্থিতি বুঝলেন না। কারও সঙ্গে পরামর্শও করলেন না। জনগণ আশা করেছিল, তিনি নেতৃত্ব দেবেন। সরকার তাঁকে পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী করতে বাধ্য হবে। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকায় আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই সঠিক পথে চলতে পারছিল না। একটার পর একটা ভুলে দূরে চলে যাচ্ছিল। আর পাকিস্তান প্রশাসন ঠিক এটাই চাইছিল।

পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে ফজলুল হকের বোঝাপড়া হলো, তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু তিনি যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে পারবেন না। তাঁকে এ–ও ঘোষণা করতে হবে যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যুক্তফ্রন্টের কেউ নন। তারা জানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপস করতে হলে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। আবার পাকিস্তান সরকার এটাও জানে যে পূর্ব বাংলা ও পাকিস্তান দুই জায়গাই সোহরাওয়ার্দী ব্যাপক জনপ্রিয়। পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দুই অংশের মানুষই তাঁকে সমর্থন করবে। কিন্তু এ অঞ্চলকে নিজেদের করায়ত্ত রাখতে হলে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়েই সব করতে হবে।

default-image

বঙ্গবন্ধুর বাবা অনেক অসুস্থ হলেন। তিনি বাবাকে দেখতে গোপালগঞ্জ গেলেন। পরদিনই টেলিগ্রাম পেলেন, শহীদ সাহেব করাচিতে যেতে বলেছেন। বাবার অবস্থা এখন অনেকটা ভালো। সেদিন রাতেই করাচিতে গেলেন। কিন্তু শহীদ সাহেবের সঙ্গে দেখা করলেন না। পরদিন দেখা হলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী বললেন, ‘রাতেই তো আসতে পারতে।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এসে কী হবে? আপনি তো এখন মোহাম্মদ আলীর আইনমন্ত্রী। ভাবছি সারা জীবন আপনাকে নেতা মেনে ভুল করেছি কি না।’ শহীদ সাহেব বললেন, ‘বুঝেছি, আর বলতে হবে না। বিকেল তিনটায় এসো। কথা আছে।’ পরদিন শহীদ সাহেব বললেন, তিনি যদি মন্ত্রী না হন, তাহলে গোলাম মোহাম্মদ পূর্ব বাংলায় মিলিটারি শাসন দেবেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, অন্য কাউকে মন্ত্রিত্ব দিতে পারতেন। আপনাকে একটা ফাঁদে ফেলেছে। ফল খুব ভালো হবে না। কিছুই করতে পারবেন না। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে কিছু না করতে পারলে তিনি এসব ছেড়ে দেবেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় আসতে চাইলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ভাসানী সাহেব দেশে না এলে ও রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি না দিলে আপনার ঢাকায় যাওয়া উচিত হবে না। তিনি রাগ করে বললেন, ‘এর অর্থ তুমি আমাকে পূর্ব বাংলায় যেতে নিষেধ করছ।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, কিছুটা তা–ই। তিনি অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুকে পরদিন আবার আসতে বললেন।

পরদিনের খবর হলো, আবু হোসেন সরকারকে হক সাহেবের নমিনি হিসেবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বে গ্রহণ করা হয়েছে। ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় শহীদ সাহেবের জায়গা হলো না। কিন্তু তিনি এর কিছুই জানেন না। জানার পরই বুঝতে পারলেন, পাকিস্তান সরকার একটা ষড়যন্ত্রের খেলাই খেলেছে।

বঙ্গবন্ধু ছোটবেলা থেকে শহীদ সাহেবের কাছে রাজনীতি শিখেছেন। তাই পাকিস্তান ও পূর্ব বাংলার রাজনীতি তাঁর মুখস্থ। পাকিস্তানের প্রত্যেক নেতা–নেত্রীকে দেখেই বলে দিতে পারেন, কে কী চান। কে কী চক্রান্ত করেন। শহীদ সাহেব এই প্রথম অনুভব করলেন, পূর্ব বাংলায় যদি সত্যিকার কোনো নেতা থাকে, তিনি শেখ মুজিব।

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন