বাবার হাতে বিজয় নিশান
এখনো দেশটা স্বাধীন হয়নি। দেশে যুদ্ধ চলছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাকে আটক করে রেখেছে। আমি জালিমদের কারাগারে বন্দী হয়ে বেঁচে আছি। আমি এদের জন্য আজরাইল হয়ে এসেছিলাম, এদের জীবন নিতে। কিন্তু পারিনি। আমার দেশীয় রাজাকার ভাইয়েরা আমার গোপন তথ্য দিয়েছে ওদেরকে।
সেদিন সকালবেলা। মা বললেন, রফিক, তুই যাস নে বাবা। ওরা তোকে মেরে ফেলবে। ছোট বোন নোরা আমার হাত চেপে ধরল। কাঁদতে কাঁদতে বেচারি চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলল। ছোট ভাই জব্বার ভাঙা জানালার পাশে বসে হাত বাড়িয়ে ডাকছে আমাকে। এখনো ওর মুখের বুলি ফোটেনি। মা ওদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে চোখের জল ফেলছেন।
দুই দিন আগে আমার বাবা দেশের জন্য শহীদ হয়েছেন। আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। আমার মায়ের চোখের জলের ভাষা আমি বুঝতে পারছি। তার চোখে প্রতিশোধের অগ্নিশিখাও জ্বলছে। আবার আমার প্রতি ভালোবাসাও জন্মেছে।
বাবাও যুদ্ধে গিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন। আমিও যাচ্ছি বাবার কাতারে শামিল হতে। মাকে কদমবুসি করলাম। মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমি চলে এলাম। দীর্ঘ দুই মাস যুদ্ধ করেছি। আমার সহযোদ্ধা যে ছিল। সে একটা মুনাফিক, রাজাকার, দেশ ও দশের শত্রু। নিজের স্বার্থের জন্য সে আমার ও দেশের সঙ্গে গাদ্দারি করল। আমি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী হয়ে রইলাম।
হঠাৎ একদিন স্বপ্ন দেখলাম। যুদ্ধের পোশাক পরে বাবা এলেন কারাগারে। বাবার হাতে বিজয় নিশান। স্বাধীন দেশের স্বাধীন পতাকা। বাবা বললেন, রফিক, তুই দ্রুত ফিরে আয়। আমরা তোকে স্বাগত জানানোর জন্য বসে আছি। আমাদের দেশটা স্বাধীন হয়ে গেছে। শুধু তোর জন্য হচ্ছে না। তুই ফিরে আয় আমাদের কাছে।
আমি বললাম, বাবা, এত সুন্দর পতাকা তুমি কোথায় পেলে? বাবা চুপ করে রইলেন। কোনো উত্তর দিলেন না।
বাবার চোখ ছাপিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নিজের চোখ মুছে বললেন, রফিক, তোকে কী খেতে দেয় ওরা? ভালো কিছুই দেয় বাবা। তবে আগে খুব বাজে খাবার দিত। কয়েক দিন ধরে রোজই জিজ্ঞাসা করে আমাকে, আজ তোমার কী খেতে ইচ্ছা করছে?
বাবা জানো,
এই কারাগারের প্রধান না। খুউব ভালো মানুষ।
দুই বছর ধরে তোমাকে যেই বই কিনতে বলেছিলাম না। তুমি তো দিতে পারোনি। শুধু বলেছিলে, বাবা, কয়েকটা দিন পরে কিনে দিই। এ মাসের তো এখনো ১১ দিন বাকি!
দেখেছ, সেই বই এখন আমার হাতে। প্রচ্ছদটা দারুণ না। বইটা লেখার কথা আমারই ছিল। কিন্তু কোনো এক বিচিত্র কারণে আমি লিখতে পারিনি।
মন দিয়ে পড়ছি। ভীষণ হাসছি। অথচ এই বই পড়ে সবাই নাকি কাঁদে! আমার এত হাসি পাচ্ছে কেন, বাবা?
তবে আমি কি বেশি দিন বাঁচব না?
বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি বুকের মধ্যে মাথা রেখে বললাম, বাবা, পাশের বাড়ির আফিফাকে বলবে, সে যেন আমাকে ভুলে যায়। কেন জানি মনে হচ্ছে, এই খবর তার পাওয়ার অধিকার আছে। ও খুব লাজুক মেয়ে। মুখে কিচ্ছু বলতে পারে না। শুধু চোখ দিয়ে কথা বলে। কারাগারে আসার আগে ওর চোখের ভাষা আমি বুঝিনি। এখন দিব্যি বুঝতে পারছি।
বাবা,
তোমার চোখে দেখি জল নেমে এসেছে!
তোমাকে তো কখনো কাঁদতে দেখিনি।
সেদিন দাদা মারা গেলেন। বাড়ির সবাই কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলল। অথচ তুমিই কাঁদোনি। উঠানে বসে বসে আমাদের লাল্লু কুত্তাও কাঁদল দাদার শোকে।
কই, তুমি তো কাঁদোনি?
আজ কি বড্ড মায়া হচ্ছে আমার জন্য?