একাত্তরে আজ ছিল মলিন ঈদ

করোনায় গত বছর ও চলতি বছর সাধারণ মানুষের ঘরে ঈদ আসেনি। ৫০ বছর আগেও এমন বিবর্ণ ছিল। ১৯৭১ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মানুষের কিসের ঈদ! ১৯৭০ সালেও প্রলয়ংকরী এক ঘূর্ণিঝড়ে হারিয়ে গিয়েছিল বাঙালির ঈদ। চলে মানুষের দীর্ঘ অনাহার।
১৯৭০ সালের নভেম্বরের শুরুতে দেশজুড়ে শুরু হয় কলেরার প্রকোপ। বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, টাঙ্গাইল, ঢাকা, নরসিংদী, সিলেট, ফরিদপুর, যশোরসহ দেশের একটা বড় অংশ বিপন্ন হয়ে পড়ে। এ মহামারি ঠেকানোর বদলে সরকার উল্টো এর দায় চাপিয়ে দেয় মুক্তিকামী মানুষের ওপর। সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়, ‘পর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দুষ্কৃতকারীদের কারণে চিকিৎসাকর্মীরা আক্রান্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারছে না।’

মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ইতিহাস বলে, সে সময় ঈদ উপলক্ষে রাজাকারদের বেতন-ভাতা বাড়ে। পাকিস্তান অবজারভারে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কোম্পানি কমান্ডারদের বেতন নির্ধারিত হয় রেশনসহ ২৫৫ রুপি, রেশন ছাড়া ৩০০ রুপি। প্লাটুন কমান্ডারদের রেশনসহ ও ছাড়া যথাক্রমে ১৩৫ ও ১৮৫ রুপি। সাধারণ রাজাকারদের ক্ষেত্রে ৭৫ ও ১২০ রুপি।

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’র ২৮তম সংখ্যা।

অন্যদিকে, ঈদ উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বাণী ছিল, ‘দেশের জনগণের দুর্দমনীয় সাহস ও সেনাবাহিনীর জিহাদি শক্তি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার কবচ।’ পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধরত সৈনিকদের জাতির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার পাশাপাশি ভারতে অবস্থানরত উদ্বাস্তুদের দেশে ফেরার আহ্বান জানানো হয়। তাদের সব ধরনের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হয়। গভর্নর মালিক বলেন, ‘ঈদের শিক্ষার মাধ্যমেই আমরা জাতীয় সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হব। দেশরক্ষায় যুদ্ধরত যেসব সৈনিক তাঁদের পরিবার–পরিজনদের সঙ্গে মিলিত হতে পারছেন না, তাঁদের এই ত্যাগ জাতি চিরদিন স্মরণ করবে।’ পল্টন ময়দানে এদিন ঈদের নামাজ পড়েন মালিক। সেখানে তিনি বলেন, ‘এ দেশের একশ্রেণির নেতারা জনগণকে বিপথে পরিচালনা করছে। জনগণের অধিকার আদায়ের নামে তারা জয় বাংলা ধ্বনি তুলছে, যা পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি ও অখণ্ডতা বিপন্ন করে তুলছে।’
সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভারতীয় বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম শুরু করে। তাদের একজন ৩১ পাঞ্জাবের কমান্ডিং অফিসার মেজর মুমতাজ হোসেইন শাহ পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নালে সিলেটের যুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিকথা লিখেছেন। সেখানে অবশ্য ২১ নভেম্বরকে ঈদের দিন বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্যে, ‘It was 21 st November, the Eid-ul-Fitr was being celebrated throughout the Muslim world with religious fervour. We had barely finished our Eid prayers, when my forward positions reported Indians concentration, requesting for artillery fire. The artillery duel commenced and continued till afternoon.’ (পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নাল, ভারতীয় ও মার্কিন নথিপত্র)।

মুক্তিযোদ্ধা গবেষক অজয় দাশগুপ্ত স্মৃতিকথায় লেখেন, ‘ঈদ রণাঙ্গনে, এ এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। অনেকেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে, যাঁদের অনেকেই রয়েছেন হানাদার বাহিনী কবলিত মৃত্যু–উপত্যকায়। কেমন আছেন তাঁরা? বেঁচে থাকলে স্বাধীন বাংলাদেশে ঈদ করবেন তাঁরা। আমার প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জয়ের অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম। কয়েক হাত দূরেই পাকিস্তানি বাহিনী। যারা এ অভিযানে যেতে পারেনি, তাদের মন খারাপ। এ অবস্থাতেই এক দুপুরে আমাদের মাঠে বসিয়ে কলাপাতায় গরম ভাত পরিবেশন করা হয়। সঙ্গে এক টুকরা করে খাসির মাংস। কেন এ বিশেষ খাবার, সে প্রশ্ন করায় উত্তর আসে—আজ ঈদ। ইংরেজি তারিখ ধরলে যত দূর মনে পড়ে ২০ নভেম্বর। ঈদ যেতে না যেতেই আসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত—পাকিস্তানিদের সম্মুখ সমরে পরাজিত করার চূড়ান্ত সংকেত।’

খ.

কেমন ছিল আমাদের সে সময়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মুসলিমদের ঈদ? ‘রোজার মাস। আর কয়টা দিন পরেই ঈদ। বাঙালি মুসলমানের সেই দুঃখের দিনের ঈদ। তার ডাক্তার স্বামী বলল: আমি একটু শহর থেকে ঘুরে আসি। বাচ্চাদের কয়টি জামাকাপড় কিনে নিয়ে আসি। যদি পারি তোমার জন্যও একটি শাড়ি কিনে আনব। বৌ বলে: না, তোমার যেয়ে কাজ নেই। আমাদের আবার কিসের ঈদ। জীবনে যে বেঁচে আছি, এটাই আমাদের ঈদের উপহার।’ (জসীমউদ্‌দীন/ইত্তেফাক ১৯৭৫)

‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইয়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর ডায়েরিতে বেদনামাখায় বর্ণনা দেন, ‘আজ ঈদ। ঈদের কোন আয়োজন নেই আমাদের বাসায়। কারও জামাকাপড় কেনা হয়নি। দরজা-জানালার পর্দা কাচা হয়নি। ঘরের ঝুল ঝাড়া হয়নি। বাসায় ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদান। শরীফ, জামী ঈদের নামাজও পড়তে যায়নি। কিন্তু, আমি ভোরে উঠে ঈদের সেমাই, জর্দা রেঁধেছি। যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আজ আসে এ বাড়িতে? বাবা-মা-ভাই-বোন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোন গেরিলা যদি রাতের অন্ধকারে আসে এ বাড়িতে? তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য আমি রেঁধেছি পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা, কাবাব। তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াব। তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য এক শিশি আতরও আমি কিনে লুকিয়ে রেখেছি।’
অবরুদ্ধ ঢাকায় ঈদের সময় অবস্থান করছিলেন শিল্পী হাশেম খান। ‘২০ নভেম্বর ১৯৭১’ শিরোনামে একটি লেখায় সেদিনের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘আজ ঈদ। আনন্দের দিন, উৎসবের দিন। কিন্তু, কী আনন্দ করব এবার আমরা? নতুন জামাকাপড় বা পোশাক কেনাকাটার আগ্রহ নেই! শিশু-কিশোরদের কোনো আবদার নেই, চাওয়া-পাওয়া নেই। বাড়িতে বাড়িতে কি পোলাও, কোরমা, ফিরনী, সেমাই রান্না হবে? আমার বাড়িতে তো এসবের কোনো আয়োজন হয়নি। প্রতিটি বাঙালির বাড়িতে এ রকমই তো অবস্থা।’
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ‘আমার একাত্তর’ গ্রন্থে লেখেন, ‘ঈদের কদিন আগে তাজউদ্দীন আমাকে ডেকে পাঠালেন। স্বভাবতই বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হলো। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ-সফরের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি কিছুটা ধারণা দিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বঙ্গবন্ধুর বিচারের ফল যাই হোক, বিশ্বজনমতের কারণেই, পাকিস্তানিরা তাঁকে হত্যা করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধ যে চূড়ান্ত লক্ষের দিকে অগ্রসর হচ্ছে সে-বিষয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল না। কথাবার্তার শেষে উঠে গিয়ে ঘরের মধ্যে রাখা আয়রন শেলফ থেকে একটা খাম বের করে তিনি আমার হাতে দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম: “কী এটা?” তিনি বললেন, “সামনে ঈদ, তাই।” খামে পাঁচ শ টাকা ছিল-তখন আমার এক মাসের মাইনের সমান। আমি নিতে চাইলাম না। তিনি বললেন: “ঈদে আপনার বাচ্চাদের তো আমি উপহার দিতে পারি, নাকি।” কথাটা বলতে গিয়ে তিনি নিজেই ভাবাবেগপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন, আমিও খুব অভিভূত হয়ে কিছু আর বলতে পারিনি।’

কমান্ডিং অফিসার মেজর মুমতাজ হোসেইন শাহ পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নালে স্মৃতিকথা। ছবি: পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নাল, ভারতীয় ও মার্কিন নথিপত্র

গ.
মুক্তিযুদ্ধে ঈদ উদ্‌যাপন করেননি মুক্তিযোদ্ধারা বরং দেশ স্বাধীন করে ‘বিজয়ের ঈদ-উৎসব’ উদ্‌যাপনের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। সমগ্র জাতিই তখন যুদ্ধে শামিল। এ রকম ঈদ মনে হয় জাতির জীবনে আর কখনো আসেনি। ‘আতঙ্ক, দেশ স্বাধীন করার সংকল্প, শরণার্থীশিবিরে অনিশ্চিত জীবন—এ সবকিছু করেছিল প্রতিটি মানুষের মন। রণাঙ্গনে ঈদের দিনেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চলছিল। সারা দেশে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ এবং শহীদ হওয়ার ঘটনা ঘটছিল। ভূরুঙ্গামারীতে শহীদ হয়েছিলেন বীর উত্তম আশফাকুস সামাদ।’ (একাত্তরের ঈদ, আসিফুর রহমান সাগর)

তবে কলকাতায় ঈদের নামাজ হয়েছিল। প্রবাসী সরকারের উদ্যোগে ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতার থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয় প্রাঙ্গণে ঈদ নামাজের আয়োজন করা হয়েছিল। নামাজে অংশ নিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান, প্রধান সেনাপতি মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, বিমানবাহিনীর প্রধান এ কে খন্দকার, অধ্যাপক ইউসুফ আলী প্রমুখ।

‘ঈদের দিন আমরা বানপুর ক্যাম্পে ছিলাম। সকালে নামাজ পড়ে খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি। হঠাৎ জানানো হলো জীবন (চুয়াডাঙ্গা) নগর-দত্তনগর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদেরকে এক্ষুনি রওনা দিতে হবে। তারপর সারা দিন জীবননগর-দর্শনা এলাকা থেকে পাকিস্তানিদের সাথে লড়াই করেছি।’

অধ্যাপক নুরুন নাহার বেগম বলেন, ‘কলকাতার পার্ক সার্কাসে ময়দানে এক মাস ধরে মেলা চলল—প্রথমে দুর্গাপূজা, পরে এক মাস পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে। প্রতিদিন অসংখ্যা লোকের জমায়েত হতো, ছেলে–মেয়ে–শিশু–বৃদ্ধনির্বিশেষে। বিভিন্ন ধরনের দোকান ছাড়াও মাঠের মধ্যখানে শিশুদের জন্য মেরি গো রাউন্ড, নাগরদোলা ইত্যাদির ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু পয়সা নেই, ছেলেটাকে একটা কিছু কিনে দিতেও পারি না। খুব খারাপ লাগত একটা সময়।’

সাংবাদিক এম আর আখতার মুকুল স্মৃতিচারণায় বলেন, ‘আমরা যখন থিয়েটার রোডে পৌঁছালাম, তখন কেবলমাত্র নামাজ শেষ হয়েছে। তাই প্রায় সবার সঙ্গে কোলাকুলি করলাম। এরপর সবার অশ্রুভেজা কণ্ঠে কেবল রণাঙ্গন ও ঢাকার আলাপ। প্রতিমুহূর্তে উপলব্ধি করলাম, দৈহিকভাবে আমরা মুজিবনগরে থাকলেও আমাদের মন-প্রাণ সবই পড়ে রয়েছে দখলীকৃত বাংলাদেশে। আর সেখানকার সব মানুষ তাকিয়ে আছে আমাদের সাফল্যের দিকে। বাঙালি জাতির এ রকম একাত্মতাবোধ আর দেখিনি।’

সাহিত্যিক আবু জাফর সামসুদ্দীন লেখেন, ‘ঈদের দিন শনিবার। যুদ্ধকালে কোনো জামাত জায়েজ নয়। নামাজে যাইনি। কনিষ্ঠ পুত্র কায়েসকে সঙ্গে নিয়ে সকাল ৯টায় ছিদ্দিক বাজারের উদ্দেমে বেরোলাম। রিকশায় চড়ে দেখি সড়ক জনমানবশূন্য। টেলিভিশন অফিসে যেতে রিকশা ফিরিয়ে দিল। ট্রাকে ট্রাকে টহল ও পাহারায়ও মিলিটারি—যাওয়ার সময় দেখলাম বায়তুল মোকাররম মসজিদে মিলিটারি পাহারায় ঈদ জামাত হচ্ছে—আমার জীবনে এই প্রথম ঈদের জামাতে শরিক হইনি।’

লেখক: কবি ও গবেষক

তথ্য সহায়ক

  • আমি বিজয় দেখেছি, এম আর আখতার মুকুল

  • আমার একাত্তর, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

  • একাত্তরের দিনগুলি, জাহানারা ইমাম

  • ঘাতকের দিনলিপি, রমেন বিশ্বাস

  • বাংলাদেশ ১৯৭১, আফসান চৌধুরী

  • স্মৃতিতে ১৯৭১, অধ্যাপক নুরুন নাহার বেগম

  • সাপ্তাহিক জয় বাংলা, মুক্তিযুদ্ধকালীন পত্রিকা

  • একাত্তরের রণাঙ্গন: অকথিত কিছু কথা, নজরুল ইসলাম

  • গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গা জেলা ১৯৯৭

  • পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নাল, ভারতীয় ও মার্কিন নথিপত্র (মুক্তিযুদ্ধের এক টার্নিং পয়েন্ট)