তথ্যের ভান্ডার পরিদর্শনে বাকৃবির শিক্ষার্থীরা

‘যতটুকু অত্যাবশ্যক কেবল তাহারই মধ্যে কারারুদ্ধ হইয়া থাকা মানবজীবনের ধর্ম নহে’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বাণীটি জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। পাঠ্যবই পড়া যেমন অত্যাবশ্যক, ভ্রমণে গিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। এটি শিক্ষার্থীদের শেখায় যে জ্ঞান কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। শুধু বইয়ের গাদা গাদা পাতা মুখস্থ করে কখনোই জ্ঞানের অসীমের সান্নিধ্য লাভ সম্ভব নয়। তাই তো জনশুমারি, কৃষিশুমারি, অর্থনৈতিক শুমারি ও জরিপ সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের বাইরের জগৎকে দেখার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি অর্থনীতির শিক্ষার্থীদের এবার সুযোগ হয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিদর্শনের। শ্রেণিকক্ষের পরিচিত সেই তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর যখন বাস্তব প্রয়োগ দেখার সুযোগ হলো, তখন তা যেন এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল।

গত ৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও ফলিত পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য দিনটি ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতার। ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ১১ তলা সুউচ্চ ভবনের আভিজাত্যের আড়ালে যে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলে, তা নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে আমাদের। কৃষি ও ফলিত পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম এবং সহকারী অধ্যাপক মো. ফখরুল হাসানের তত্ত্বাবধানে এই শিক্ষাসফরে আমরা অফিশিয়াল স্ট্যাটিসটিকসের মাঠপর্যায়ের জ্ঞান ও তথ্য আহরণের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি।

আমাদের স্বাগত জানানো হয় বিবিএসের প্রশিক্ষণ কক্ষে। জানানো হয়, বিবিএস প্রধানত ৮টি উইংয়ের মাধ্যমে কাজ করে। এর মধ্যে অ্যাগ্রিকালচার উইং নিয়ে আলোচনা ছিল সবচেয়ে প্রাণবন্ত। বর্তমানে সনাতন পদ্ধতির বদলে ট্যাবের মাধ্যমে ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ ও ‘রিয়েল টাইম মনিটরিং’ ব্যবস্থার ব্যবহার আমাদের মুগ্ধ করেছে। এর ফলে কোনো গণনাকারী সঠিক স্থানে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন কি না, তা প্রধান কার্যালয় থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এক কক্ষ থেকেই এখন সারা দেশের তথ্য সংগ্রহ পর্যবেক্ষণ করা যায়। কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি। কৃষি ও ফলিত পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম যথাযথই বলেছেন, ‘এই সফর শিক্ষার্থীদের স্যাম্পলিং ফ্রেম তৈরি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করবে, যা ভবিষ্যতে তাদের কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

আলোচনায় উঠে আসে দেশের কৃষি পরিসংখ্যানের বৈচিত্র্য। ১০,৩৪৮টি স্থায়ী দাগগুচ্ছ (ক্লাস্টার) থেকে বছরে চারবার ফসলের আয়তন নির্ধারণ করা হয়। প্রধান ফসলের উৎপাদন জানতে নির্দিষ্ট মাপের জমি থেকে সরাসরি ফসল কেটে ‘ক্রপ কাটিং’ করা হলেও অপ্রধান ফসলের ক্ষেত্রে কৃষকের সাক্ষাৎকারের ওপর নির্ভর করা হয়।

নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ছিল বিবিএসের ‘রিয়েল টাইম মনিটরিং রুম’ ও ‘জাদুঘর’ পরিদর্শন। বিশাল স্ক্রিনে দেশের মানচিত্রের প্রতিটি অবস্থান দেখা আমাদের অবাক করে দেয়। জাদুঘরে সংরক্ষিত বিশাল আকারের পুরোনো কম্পিউটারগুলো জানান দিচ্ছিল পরিসংখ্যানের বিবর্তনের কথা। এর মধ্যে বিশেষ আকর্ষণ ছিল পুরোনো মেইনফ্রেম ও ওএমআর মেশিন। এ ছাড়া পরিসংখ্যান ভবনে রয়েছে বিভিন্ন আদমশুমারি, জরিপ এবং দেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও আর্থ-সামাজিক বিষয়ের ওপর প্রকাশিত প্রতিবেদন ও প্রকাশনাসমূহের বিশাল সংগ্রহশালা। কয়েক হাজার পৃষ্ঠার প্রতিবেদনগুলো আমাদের মাঝে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।

কথায় আছে, পৃথিবীতে তিন ধরনের মিথ্যা আছে, যার একটি হলো পরিসংখ্যান। কিন্তু দিন শেষে এই পরিসংখ্যানই দেশের উন্নয়নের বীজ বোনে ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দেয়। নির্ভুল তথ্য অতি মূল্যবান সম্পদ। শুধু প্রয়োজন সেই তথ্যের যথাযথ ব্যবহার। বাস্তব জ্ঞান লাভের পাট চুকিয়ে সেদিনই আমরা ফিরে আসি আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে। সেদিনের স্মৃতি হিসেবে সঙ্গে রয়ে গেছে পাটের ব্যাগের ভেতরে থাকা কৃষি বর্ষগ্রন্থ, সারা দিনের হাসি, আনন্দ আর অভিজ্ঞতার ঝুলি। এ ধরনের শিক্ষাসফর শিক্ষার্থীদের জ্ঞান লাভের তৃষ্ণা আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের সঙ্গে এই বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে নিঃসন্দেহে সহায়তা করবে।

*লেখক: তাহমিনা সোনিয়া, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ