বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়ায় হারিয়ে যাওয়া শৈশব

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসে তখন ক্লাস শেষের ব্যস্ততা। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠছে, কেউ বা লাইব্রেরির পথে হাঁটছে, কেউ মুঠোফোনে চোখ রেখে ধীরে ধীরে হলের দিকে ফিরছে। এই চেনা, নিরাপদ আর স্বপ্নময় পরিবেশের এককোণে, টিনের ছাউনির নিচে ধোঁয়া ওঠা হাঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাপ্পি। বয়স মাত্র ১৪ বছর। তার সামনে সাজানো ভাত, ডাল আর তরকারির পাত্র। হাতে খুন্তি, মুখে চাপা ক্লান্তি। সে পরিবেশন করছে দুপুরের খাবার। এই বয়সে তার হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, মাথায় থাকার কথা ছিল পরীক্ষার প্রস্তুতি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাপ্পির স্কুলে যাওয়ার সময় নেই, কারণ তাকে কাজ করতে হয়।

বাপ্পির দোকানটা বড় কোনো রেস্টুরেন্ট নয়। কাঠের ফ্রেমে বানানো ছোট একটি স্টল। সামনে কয়েকটি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে ভাত, ডাল, সবজি আর ভাজি। আশপাশে প্লাস্টিকের লাল চেয়ার-টেবিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মচারী, কখনো আশপাশের শ্রমজীবী মানুষ এখানে নিয়মিত খেতে আসেন। খাবারের দাম তুলনামূলক কম, পেট ভরে; এই দুই কারণেই দোকানটি পরিচিত। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন যে এই দোকানের নিয়মিত শ্রমের একটি বড় অংশ আসে একটি শিশুর কাছ থেকে।

কথা বলতে গেলে বাপ্পি প্রথমে একটু লজ্জা পায়। চোখ নামিয়ে খুন্তি নাড়াতে নাড়াতে ধীরে ধীরে সে খুলে বলে তার গল্প। সে পাশের একটি গ্রামের ছেলে। মা–বাবার সঙ্গেই এই দোকানে কাজ করে। সংসারে চারজন সদস্য। বাপ্পি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। স্কুলের ইউনিফর্ম, বই, ক্লাস সবই একসময় তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল। কিন্তু সংসারের টানাপোড়েন বাড়তে থাকায় সেই নিয়মিত জীবনে ছেদ পড়ে। খরচ চালানো কঠিন হয়ে উঠছিল। তখন বাবা বলেছিলেন, তুই একটু কাজ করলে সংসারে সুবিধা হবে। সেই ‘একটু কাজ’ এখন বাপ্পির পুরো দিনের বাস্তবতা।

শুরুতে বাপ্পির কাজ ছিল হালকা। থালা ধোয়া, দোকান পরিষ্কার করা, বাজার থেকে সবজি আনা। ধীরে ধীরে রান্নার কাজে সাহায্য করা, পরে খাবার পরিবেশনও তার দায়িত্বে এসে পড়ে। এখন সে সকাল থেকে দুপুর, আবার বিকেল পর্যন্ত দোকানেই থাকে। স্কুলে যাওয়ার প্রশ্নে সে একটু চুপ করে থাকে। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে, ‘ইচ্ছা তো আছে, কিন্তু এখন গেলে ঘরে কে টাকা দেবে?’

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

এই একটি প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি সমাজের অসহায়ত্ব। একটি বিশ্ববিদ্যালয়, যার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানচর্চা, মানবিক মূল্যবোধ আর সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করা, তার ভেতরেই একটি শিশু কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এটি শুধু বাপ্পির ব্যক্তিগত গল্প নয়। এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য আর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর ব্যর্থতার একটি বাস্তব চিত্র।

বাংলাদেশে শিশুশ্রম আইনত নিষিদ্ধ। ১৪ বছরের নিচে শিশুদের শ্রমে নিয়োগ দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমাবদ্ধতা। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, এসব আইন অনেক সময় কাগজেই রয়ে যায়। বাপ্পির মতো শিশুরা প্রতিদিন কাজ করছে হোটেলে, গ্যারেজে, কারখানায়, ইটভাটায় এবং আরও উদ্বেগজনক, কারণ এটি ঘটছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে।

এখানেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে। ক্যাম্পাসে দোকান থাকবে, খাবার বিক্রি হবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দোকানে কে কাজ করছে, কত বয়স তার, সে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে কি না, এসব বিষয় দেখভাল করার দায়িত্ব কার? দিনের পর দিন একটি শিশু কাজ করছে, অথচ সেটি কারও নজরে পড়ছে না কিংবা পড়লেও গুরুত্ব পাচ্ছে না, এটা কি নিছক অবহেলা, নাকি দায়িত্বহীনতার একটি দীর্ঘ অভ্যাস?

শিক্ষার্থীদের অনেকেই বাপ্পিকে চেনে। কেউ নাম জানে, কেউ জানে যে সে ‘দোকানের ছোট ছেলে’। কেউ তাকে ডেকে খাবার দেয়, কেউ হাসিমুখে ধন্যবাদ জানায়। কিন্তু খুব কম মানুষই থেমে ভাবে, এই বয়সে তার এখানে থাকার কথা ছিল কি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে শিশু অধিকার, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে সেমিনার হয়, গবেষণা হয়, ক্লাসে তত্ত্ব শেখানো হয়। অথচ বাস্তব জীবনে সেই অধিকারই নীরবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।

বাপ্পির চোখে কোনো অভিযোগ নেই। আছে শুধু অভ্যস্ত ক্লান্তি আর বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার একধরনের নীরবতা। সে জানে না, তার সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে কি না। সে শুধু জানে, কাজ না করলে খাওয়ার টাকা জুটবে না। এই জায়গাতেই সমাজ সবচেয়ে বড় অপরাধটি করে একটি শিশুকে এমন বাস্তবতায় ঠেলে দেয় যেখানে সে অন্যায়কেই স্বাভাবিক মনে করতে শেখে।

শিশুশ্রম শুধু একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেয় না, এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে। পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়া শিশুরা বড় হয়ে আবার দারিদ্র্যের চক্রেই আটকে থাকে। তাদের সন্তানেরাও একই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। বাপ্পির গল্প সেই চক্রেরই একটি জীবন্ত উদাহরণ।

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি নৈতিক জায়গা, একটি সামাজিক মডেল। এখানে যা ঘটে, তা সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত হওয়া উচিত। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই শিশুশ্রম স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে আমরা সমাজের বাইরে কী বার্তা দিচ্ছি? আমরা কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বলছি জ্ঞান আর মানবিকতা কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয়, বাস্তব জীবনে নয়?

বাপ্পির জন্য সমাধান অসম্ভব কিছু নয়। তাকে স্কুলে ফেরানো যায়। তার পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে ক্যাম্পাসে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে কার্যকর নজরদারি চালাতে পারে। সামাজিক সংগঠন, শিক্ষার্থীরা মিলেও উদ্যোগ নিতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, বাপ্পিকে ‘দোকানের ছেলে’ হিসেবে নয়, ‘শিশু’ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

দিন শেষে দোকান গুটিয়ে বাপ্পি বাড়িতে ফেরে। ক্যাম্পাস তখন ধীরে ধীরে নীরব হয়ে আসে। গ্রন্থাগার আর গবেষণাগারে জ্বলে ওঠে জ্ঞানের আলো। প্রশ্ন থেকে যায়, এই আলো কি কোনো দিন বাপ্পির জীবনেও পৌঁছাবে নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়াতেই হারিয়ে যাবে তার শৈশব, স্বপ্ন আর সম্ভাবনা? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আমরা কেমন সমাজ চাই।

*লেখক: গিয়াসউদ্দিন শোভন, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।