‘দুই মিনিটে আমাদের জীবনসংগ্রামের গল্প বলা সম্ভব নয়’
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী উপকূলীয় ও আদিবাসী নারীরা। অথচ জলবায়ুনীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও কণ্ঠস্বর এখনো যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে ‘জলবায়ু, নারী ও নারী স্বাস্থ্য’–বিষয়ক এক সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা। নারী আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘সান্তাল’ এ সংলাপের আয়োজন করে। এ আয়োজনে সহযোগিতা করে বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠন ও সোশাল অ্যাকশন ফর ইয়ুথ অ্যালায়েন্স (সায়া)। এতে বনজীবী নারী, নারী জেলে, নারী কৃষক, বাঘবিধবা নারী এবং মুন্ডা সম্প্রদায়ের নারীরা অংশ নেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাতিনাখালীতে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয় আজ শুক্রবার।
সংলাপে অংশ নেওয়া নারীরা জানান, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নিরাপদ পানির সংকট, জীবিকার অনিশ্চয়তা ও ঘন ঘন দুর্যোগ তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে মাথায় ও কোমরে ভারী কলস বহন করে পানি আনতে হয়। গর্ভাবস্থাতেও অনেক নারীকে এই কষ্টকর কাজ করতে হয়, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
সংলাপে বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের স্বত্বাধিকারী শেফালি বিবি বলেন, ‘বিভিন্ন বড় বড় সভা, সেমিনার ও কর্মসূচিতে সুন্দরবন নিয়ে কথা বলার সুযোগ দিলে আমাদের বলা হয়, সুন্দরবন নিয়ে কথা বলার সময় মাত্র দুই মিনিট। অথচ সুন্দরবন ও উপকূলকে টিকিয়ে রাখতে যেসব নারী প্রতিদিন লবণাক্ত পানি, ঝড়, নদীভাঙন, জীবিকার অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছেন, তাঁদের কষ্টের কোনো সীমা নেই। দুই মিনিটে আমাদের জীবনসংগ্রামের গল্প বলা সম্ভব নয়।’
সংলাপে নারীরা আরও বলেন, লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে চর্মরোগ, প্রজননস্বাস্থ্য সমস্যা, মূত্রনালির সংক্রমণ, শারীরিক দুর্বলতা, উচ্চ রক্তচাপ, পানিশূন্যতা, হাঁটুর ব্যথা ও কোমরব্যথার মতো সমস্যা বাড়ছে। নিরাপদ পানি, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ায় এসব সমস্যা অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিচ্ছে।
আলোচনায় বাল্যবিবাহের বিষয়টিও উঠে আসে। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে নারীস্বাস্থ্যের অবনতি, দারিদ্র্য, দুর্যোগ ও জীবিকার টানাপোড়েন অনেক পরিবারকে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য করছে। ফলে অল্প বয়সে মাতৃত্ব, অপুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য জটিলতা এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার হার বাড়ছে।
সংলাপের আলোচকেরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অংশীজনদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জলবায়ু অভিযোজন ও পরিবেশনীতিতে নারীস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উপকূলীয়, বনজীবী ও আদিবাসী নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া লবণাক্ততা ও জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা উদ্যোগ নিতে হবে।