মেধার কারাবাস: সক্ষম মানুষেরাও কেন নিজের পথ নিজেই আগলে দাঁড়ান?
মানুষের বুদ্ধিমত্তা কি কেবলই তার অগ্রযাত্রার পাথেয়, নাকি কখনো কখনো এটিই হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক কারাগার? সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখি; অত্যন্ত মেধাবী, সৃজনশীল ও সক্ষম মানুষেরা সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এক জায়গায় থমকে আছেন। তাঁদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা প্রখর, দূরদর্শিতা প্রবল, তবু জীবনের একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে তাঁরা অদৃশ্য শিকলে বন্দী হয়ে পড়েন। এই থমকে যাওয়া বুদ্ধির অভাব নয়, বরং এক নিগূঢ় মনস্তাত্ত্বিক সংকট, যাকে মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় ‘সেলফ-স্যাবোটাজ’ (Self-sabotage) বা আত্ম-অন্তর্ঘাত।
প্রশ্ন জাগতে পারে, একজন বুদ্ধিমান মানুষ কেন সচেতনভাবে নিজের ক্ষতি করবেন? মনোবিজ্ঞান বলে, এর মূলে বুদ্ধিমত্তা নয়, বরং কাজ করে অবচেতন মনের এক জটিল ‘ডিফেন্স মেকানিজম’ বা প্রতিরক্ষা কৌশল। আমরা যখনই কোনো বড় সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছাই, তখন আমাদের ভেতরে একধরনের অস্তিত্ববাদী আতঙ্ক তৈরি হয়। কারণ, সাফল্যের সমান্তরালে বাড়ে দায়িত্বের ভার। পারিপার্শ্বিক প্রত্যাশার পারদ যখন ঊর্ধ্বমুখী হয়, তখন ভুল করার ভয় আমাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেয়। এই উৎকণ্ঠা থেকেই আমরা সুযোগ হাতছাড়া করি, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করি এবং ‘আরেকটু নিখুঁত হওয়া প্রয়োজন’, এমন এক অবাস্তব পারফেকশনিজমের অজুহাতে নিজেকে গুটিয়ে রাখি।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ‘ইমপোস্টার সিনড্রোম’। অনেক উচ্চবিত্ত মেধার অধিকারী মানুষ ভেতরে–ভেতরে একধরনের হীনম্মন্যতায় ভোগেন। তাঁরা ভাবেন, তাঁদের সাফল্যগুলো যোগ্যতা নয়, বরং নিছক ভাগ্য বা কাকতালীয়। এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব থেকে তাঁরা সফলতার ঠিক দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে নিজের সক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করেন। কিছু বুদ্ধিমান মানুষের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা ভুলের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক ফলাফল নিয়ে ‘ওভারথিঙ্কিং’ বা অতিরিক্ত চিন্তা করেন। এই অতি-সচেতনতাই তাঁদের ঝুঁকি গ্রহণের সাহসকে কমিয়ে দেয় এবং তাঁদের অগ্রযাত্রার গতিকে ধীর করে দেয়।
তবে বাস্তবতা হলো, নিজেকে অদৃশ্য করে রেখে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া গেলেও স্থায়ী নিরাপত্তা পাওয়া যায় না। স্থবিরতা প্রকারান্তরে সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটায়। পৃথিবী কোনো দিন নিখুঁত মানুষের জন্য অপেক্ষা করেনি, সাহসী ও কর্মতৎপর মানুষের হাত ধরেই সভ্যতা এগিয়েছে। মনোবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি, মেধার প্রকৃত সার্থকতা কেবল বিশ্লেষণে নয়, বরং সেই মেধার দায়ভার কাঁধে নেওয়ার সাহসিকতায়।
তাই আজ আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা প্রয়োজন, আমরা কি আসলেই সক্ষমতার অভাবে পিছিয়ে আছি, নাকি আমরা আমাদের পরবর্তী উন্নত সংস্করণটির দায়িত্ব নিতে ভয় পাচ্ছি? নিজের ভেতরের এই বাধাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারা এবং ভুলের অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়াই হলো এই মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসার প্রথম ধাপ। নিজেকে থামিয়ে রাখাটা কোনো সুরক্ষা নয়, বরং এটা নিজের ভেতরকার অসীম সম্ভাবনাকে অবরুদ্ধ করে রাখা। এই কারাবাস থেকে মুক্তি পাওয়ার চাবিকাঠি আমাদের নিজেদের হাতেই।
*লেখক: হাসান নাঈম, শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ