নাথুলা ও বাবা মন্দিরে ঘোরাঘুরি
বিছানায় শুয়ে ফেসবুক দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ল ‘দুই বছর পর বুড়িমারী/চ্যাংড়াবান্দা স্থলবন্দর পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হলো।’ খবরটা দেখার পর সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে ওয়ার্ডরোবে রাখা পাসপোর্ট বের করলাম। দুই বছর করোনার কারণে দেশ বন্দী থাকার পর এমন খবর ভীষণ আনন্দের। আমি যেহেতু রংপুরে থাকি, তাই বুড়িমারী সীমান্ত আমার জন্য সুবিধা, কারণ বাংলাবান্ধা বন্ধ আছে।
রাতেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রেডি করে সকালে ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও চাকরির প্রত্যয়নপত্র নিয়ে রংপুরে ভারতীয় দূতাবাস অফিসে হাজির। বিশাল লাইন। ভীষণ রোদের মধ্যেও দাঁড়িয়ে আছি। অবশেষে ঘণ্টা দুয়েক পরে ভেতরে গিয়ে আবার এক ঘণ্টা পরে পাসপোর্টসহ কাগজপত্র জমা দিলাম। সাত দিন পরে ভিসাসহ পাসপোর্ট হাতে পেলাম।
এবারের গন্তব্য বাবা মন্দির, যার পুরো নাম বাবা হরভজন সিং মন্দির।
১৩ হাজার ১২৩ ফুট উঁচুতে এ মন্দির সম্পর্কে আমি প্রথম জানতে পারি আমার ভারতীয় এক স্যারের কাছ থেকে। এরপর অনলাইনে বিভিন্ন লেখা ও ভিডিও দেখে আগ্রহ বেড়ে যায়। আর আমি যেহেতু একটু অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করি, তাই সিদ্ধান্ত নিলাম বাবা মন্দিরে যাব। আমি সব সময় কোনো ভ্রমণে পরিবারের অনুমতি নিই।
পরিবার অনলাইন ও বিভিন্ন মাধ্যমে খবর নিয়ে অনুমতি দেয়। এ রকম কয়েকবার গন্তব্যস্থল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সবকিছু রেডি করার পরও পারিবারিক অনুমতি মেলেনি। পারিবারিক অনুমতি নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম।
প্রথম গন্তব্য সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক।
আমি যেহেতু করপোরেট চাকরি করি, তাই ছুটি মাত্র তিন দিনের। সময় খুবই কম হওয়ায় আমি মিনিটের হিসাব করে চলি। বৃহস্পতিবার অফিস করে রংপুর থেকে ১০০ টাকা দিয়ে থ্রি–হুইলারে শেয়ারে হাতীবান্ধা চলে যাই। সেখান থেকে ৫০ টাকা দিয়ে বাসে পাটগ্রাম। ২০ টাকা দিয়ে অটোতে চড়ে বুড়িমারী। ইমিগ্রেশন পার হয়ে ২০ রুপি দিয়ে অটো করে চ্যাংড়াবান্দা বাইপাস। কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পরে বাসে চড়ে ৭০ রুপি দিয়ে শিলিগুড়ি। শিলিগুড়িতে ১ হাজার রুপি দিয়ে হোটেলে রাত্রিযাপন।
পরদিন সকাল ৭টায় মাহিন্দ্র বোলেরো (পাহাড়ে চলাচলের জন্য বিশেষ গাড়ি, যার ৪ চাকায় ব্রেক থাকে) গাড়িতে ৪০০ রুপিতে গ্যাংটকের উদ্দেশে যাত্রা করলাম। ৫ ঘণ্টার পাহাড়ি পথ। সময়টা মে মাস হওয়ায় পুরো পথ মেঘে ঢাকা ছিল। কখনো কখনো এত মেঘ ছিল যে গাড়ি থামিয়ে দিতে হয়েছে। পাশ দিয়ে বয়ে চলা তিস্তা নদী ভীষণ গর্জন করে ছুটে চলেছে বাংলাদেশের দিকে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় চার ঘণ্টা পর পৌঁছালাম রংপো নামের জায়গায়। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছোট্ট অফিস। যেখান থেকে সিকিম ভ্রমণের জন্য অনুমতি নিতে হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিলে পাসপোর্টে সিল মেরে একটা অনুমতিপত্র নিয়ে আবার রওনা দিলাম। রংপো থেকে এক ঘণ্টার পথ গ্যাংটক। গ্যাংটক গিয়ে হোটেলে চেক ইন করে বের হলাম কীভাবে বাবা মন্দির যাওয়া যায়। বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে বাবা মন্দির সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারলাম। সিকিমে যেকোনো জায়গায় যেতে হলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুমতি নিতে হয়, যা সাধারণত এজেন্সিরাই করে থাকে। পাসপোর্ট, ভিসা, সিকিমে প্রবেশের অনুমতিপত্র ও ছবি দিলে এজেন্সিরা ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুমতি সংগ্রহ করে দেয়। গ্যাংটকের এম জি মার্গে অনেক পর্যটক এজেন্সি আছে। সবকিছু ঠিক করে ৬ হাজার রুপি দিয়ে গাড়ি ভাড়া করে পরদিন ভোরে রওনা দিলাম ৫২ কিলোমিটার দূরে বাবা মন্দিরের উদ্দেশে।
১৩ হাজার ১২৩ ফুট উঁচুতে ছোট্ট একটা মন্দির। বছরের বেশির ভাগ সময়ে বরফে ঢাকা। একপাশে চীনের সীমান্ত। চারপাশে সুউচ্চ বরফে মোড়ানো পাহাড়। চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি ও ভারতীয় সেনাবাহিনী সমানতালে সীমান্ত প্রহরায় ব্যস্ত। এ ভারতীয় সেনাক্যাম্পে ছিলেন হরভজন সিং নামের এক সৈনিক। অত্যন্ত নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী, সৎ ও বুদ্ধিবান এ সৈনিকের বেশ প্রশংসা ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। এমনকি চীনা সীমান্তে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যকার পতাকা বৈঠকে হরভজন সিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। সেই জন্য চীনা পিপলস আর্মিতেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল।
১৯৬৮ সালের অক্টোবরে তিনি একটি দুর্গম ফাঁড়ির জন্য জিনিসপত্র সরবরাহকারী মালবাহী পশুর একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এমন সময় তীব্র তুষার ঝড় শুরু হয়।
তুষার ঝড়ের কবলে পড়ে হরভজন সিং হিমবাহে ডুবে যান। মালবাহী পশুগুলো সেনাক্যাম্পে ফেরত এলেও হরভজন সিং না আসায় খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তাঁর সন্ধান মেলে না। তিন দিনের মাথায় তাঁর সহকর্মীরা স্বপ্ন দেখেন যে হরভজন সিং একটা হিমবাহে ডুবে আছেন। প্রথমে তাঁরা বিষয়টা নিছক স্বপ্ন মনে করলেও যখন একাধিক সৈন্য একই রকম স্বপ্ন দেখেন, তখন তাঁরা স্বপ্নে দেখা পথ অনুসরণ করে দেখেন একটি উপত্যকার খাঁজে হিমবাহের নিচে পড়ে আছে হরভজন সিংয়ের মরদেহ। বিষয়টা নিয়ে ভীষণ সাড়া পড়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির মধ্যে। তারপর পুরো রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাহ করা হয়।
এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী ও চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির একাধিক সৈন্য দেখেছেন পূর্ণিমা রাতে মৃত হরভজন সিংয়ের ছায়ামূর্তি ঘোড়ার পিঠে চড়ে দুধসাদা পাহাড়ি সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। তাঁর অনুসারীরা বিশ্বাস করেন হরভজন সিং মৃত্যুর পরেও ভারতীয় সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত আছেন এবং যদি কখনো ভারত ও চীন যুদ্ধ লাগে, তবে হরভজন সিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। তাঁর সম্মানে সেই নালায় ১৩ হাজার ১২৩ ফুট উঁচুতে ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি মন্দির গড়েন। তাঁকে সন্তু হয়েছে মানা হয় এবং বিশ্বাসীরা তাঁকে বাবা হয়েছে মানেন। মৃত্যুর পরেও তিনি দেশ রক্ষা করছেন বলে বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বাস থেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনী মৃত্যুর পরেও প্রতি মাসে তাঁকে বেতন দিয়ে যাচ্ছে, যা একটি অ্যাকাউন্টে জমা থাকছে। তাঁর ব্যবহৃত বুট এখনো নিয়মিত পলিশ করা হয় এবং তাঁর সামরিক পোশাক অন্যদের মতোই এখনো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। অন্য সেনাদের যখন বুট ও সামরিক পোশাক বরাদ্দ হয়, তখন মৃত হরভজন সিংয়ের জন্যও বরাদ্দ হয়। তাঁর বুট ও পোশাক পরিষ্কারের জন্য পেয়াদা নিয়োগ করা আছে। পরিপাটি করে রাখা আছে তাঁর বিছানাটিও। অনেকে বিশ্বাস করে, হরভজন সিংয়ের আত্মা মাঝেমধ্যে এখানে বিশ্রাম নেন। মৃত্যুর পরে তাঁর আত্মা দায়িত্ব পালন করছেন বিধায় তাঁকে ক্যাপ্টেন পদমর্যাদা দেওয়া হয়।
বছরে একবার অন্য সেনাদের মতোই তাঁকে বাড়িতে যাওয়ার ছুটি দেওয়া হয়। তখন সামরিক যানে একটি আসন ফাঁকা রেখে তিনজন সৈনিক পাহারা দিয়ে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে আসে এর ট্রেনের এসি বার্থ কামরায় একটি আসন ফাঁকা রেখে তিনজন সৈনিকের পাহারা দিয়ে পাঞ্জাবের কপুরথালা জেলায় কোকো গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। অনুসারীরা বিশ্বাস করে, ফাঁকা আসনে হরভজন সিং বসে আছেন।
এরপর বাড়িতে গিয়ে পাহারা দেওয়া সৈনিকেরা তাঁর পরিবারকে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত উপহার, টাকাপয়সা দিয়ে আসেন। ছুটি শেষ হলে অনুরূপভাবে তাঁকে নাথুলায় নিয়ে আসা হয়। এখনো নাথুলা সীমান্তে চীন–ভারত পতাকা বৈঠকের সময় একটি আসন ফাঁকা রাখা হয়।
নাথুলা হলো সিকিম, তিব্বত ও চীনের মাঝামাঝি একটি উপত্যকা। এই উপত্যকা ও সুউচ্চ পর্বতের দায়িত্বে থাকা সেনারা বিশ্বাস করেন, বাবা হরভজন সিংয়ের আত্মা তাঁদের সুরক্ষা দেয়। বেশির ভাগ সাধুদের মতোই বিশ্বাস করে বাবাকে যাঁরা শ্রদ্ধা করেন এবং উপাসনা করেন, বাবা তাঁদের সুরক্ষা দেন। ভারতীয় জওয়ানদের কাছ তিনি একজন বীর এবং দেবতা।