সমুদ্রের শহর এল নিডোতে–শেষ পর্ব
নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভ্রমণ, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
সাগরমাঝে সবুজ গাছপালা দিয়ে ঘেরা মনোরম এই দ্বীপগুলো; চুনাপাথরের পাহাড়গুলো ছদ্মবেশে যেন থেরাপিস্ট! নীল আকাশের বিপরীতে তাদের রংগুলো যেন ভিজ্যুয়াল ম্যাজিক, যা শিথিল করার ক্ষমতা রাখে, সম্মোহিত করে এবং সব খারাপ ভাবনাকে দূরে সরিয়ে দেয়। একটি মজার বিষয় হলো, প্রতিবার ইঞ্জিনের শব্দ বন্ধ হয়ে গেলে বুঝতে পারছিলাম যে আমরা একটি নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে যাচ্ছি। এবার সমুদ্রের মাঝে আমাদের ব্যাঙ্কাসটি ইঞ্জিন বন্ধ করে নোঙর করল, আশপাশে কোনো দ্বীপ বা সৈকত নেই। এবার আমাদের ভ্রমণের জায়গাটির নাম ছোট লেগুন ও বড় লেগুন। বড় লেগুন আর ছোট লেগুনের সৌন্দর্য উপভোগের একমাত্র মাধ্যম হলো কায়াক (ছোট সরু নৌকা)। ছোট লেগুন ও বড় লেগুনের পানি বাঙ্কাস ভাসিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট গভীর নয়। এর জন্য আমাদের আলাদাভাবে কায়াক ভাড়া করতে হলো।
প্রতিটি কায়াকে দুজন ভাগ হয়ে বাঙ্কাস থেকে আমরা জলে ভাসলাম, এটি আমাদের জন্য ছিল একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। গভীর সমুদ্রে আমরা কখনো কায়াক ভাসাইনি! লগি–বইঠা কীভাবে, কোনো তালে চলালে কায়াকটি সঠিক পথে এগোবে, তা আমাদের ধারণার বাইরে। কথায় আছে, বাঙালিকে দাবায়ে রাখা যায় না! তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব—এই প্রতিজ্ঞায় আমরা ভেসে রইলাম। আমাদের কায়াক খানিক বাঁয়ে, খানিক ডানে দিশাহীন ঘুরপাক খেয়ে বাঙ্কাস ছেড়ে বড় লেগুনের পথে এগিয়ে গেল। একসময় বুঝে গেলাম, লগি–বইঠা কীভাবে চালাতে হবে। কায়াক তখন পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে।
আমাদের কায়াক সমুদ্রের বুকচিরে জেগে ওঠা চুনাপথরের বড় বড় দুটি পাহাড়শ্রেণির মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্রোতের কোল বেয়ে বড় লেগুনে প্রবেশ করল। উঁচু খাড়া পাহাড়গুলো প্রহরীর মতো দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যত গভীরে যাত্রা করছি, মনে হচ্ছে যেন আমি অচেনা কোনো পৃথিবীর পথ ধরে এগিয়ে চলেছি! যেদিকে তাকাই না কেন, অপেক্ষা করছে শুধু অপার বিস্ময়। আমার কায়াকের নিচে স্বচ্ছ জল, জলের একদম নিচে কী আছে, তা স্পষ্ট দেখা যায়! মাথার ওপর পরিচ্ছন্ন নীল আকাশ, পাহাড়ের চূড়ার পেছনে সূর্য উঁকি দিচ্ছে! অগভীর জলে কায়াক থেকে নেমে পাহাড়ের ছায়ায় কিছু সময় জিরিয়ে নিলাম। অসাধারণ সুন্দর দৃশ্যপট মুঠোফোনের ক্যামেরায় বন্দী করে নিলাম। নিজেরা নিজেদের সঙ্গে কায়াক চালানোর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলাম। চুনাপাথরের গোলোকধাঁধায় স্বপ্নের পথ খোঁজার চেষ্টা করলাম। আমরা মোহিত হলাম, অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা সঙ্গে করে আমাদের বাঙ্কাসে যখন ফিরলাম, তখন আমরা ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত।
৩.
আমাদের বাঙ্কাস আবার ভাসল নীল ফিরোজা জলে, বেশ কিছু সময় পেরিয়ে বাঙ্কাসের ইঞ্জিন আবার বন্ধ হলো। এবার মধ্যাহ্নভোজের পালা। মনোরম একটি সৈকতে আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাজা সামুদ্রিক মাছ, যা আমাদের পরিচিত নারেকেল মাছের মতো, চিংড়ি, আলু দিয়ে রান্না করা মুরগি, ভাত, নুডলস, তরমুজ, কলা আর আনারস দিয়ে দুর্দান্ত একটি মধ্যাহ্নভোজ শেষে কিছু সময় নিরিবিলি বিশ্রাম নিলাম। আমাদের চারপাশে নিবিড়–নিস্তব্ধ দুপুরের নৈঃশব্দ চৌচির করছে সাগরের মৃদু গর্জন। সামনে মিহি সফেদ বালুর তট আর পেছনে খাড়া শৈলপাহাড়। বিকেলের রোদ রাঙা হয়ে এল, শৈলপাহাড়ের চূড়ায় ঢাকা পড়েছে দুপুর সূর্যের তেজ। শৈলপাহাড়ের চূড়ার শীতল ছায়ায় অলস শুয়ে–বসে অনুভব করছি প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য।
আমাদের ট্যুর গাইড সবাইকে বাঙ্কাসে ফিরতে অনুরোধ জানাল। বাঙ্কাসের ইঞ্জিন আবার চালু হলো। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সিক্রেট আইল্যান্ড। বেশ কিছু সময় জলে ভেসে সমুদ্রের বুকচিরে জেগে ওঠা দানবের মতো এক শৈলপাহাড়ের ছায়ায় নোঙর করল বাঙ্কাসটি। জলের রং বলে দিচ্ছে, এখানে গভীরতা নেহাত কম নয়। চারপাশে জল আর জল, কিছুদূর পরপর দানবীয় শৈলপাহাড়। শৈলপাহাড়গুলোর মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে সমুদ্র খালের মতন। এই সমুদ্র, শৈলপাহাড় পাড়ি দিয়ে খাল হয়ে লুটিয়ে পড়েছে গোপন কোনো সৈকতে। এই লুকানো সৈকতে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় সাঁতার; দূরত্বও নেহাত কম নয়। আমাদের বাঙ্কাস থেকে চুনাপাথরেরে এই বিশাল শৈলপাহাড়ের পাস ঘেঁষে যে খাল চলে গেল, তার মুখ পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে সাঁতার কাটতে হবে কমপক্ষে ৩০০ গজ। বোটের সুপারভাইজারকে জিজ্ঞাসা করলাম, খালের মুখ থেকে কতদূর সাঁতার কাটলে তীরে পৌঁছানো যাবে? সে উত্তরে জানাল, প্রায় ৫০০ মিটার! তবে অভয় দিল, এখানে স্রোতের জোর কম আর খালের পাশে কিছু জায়গায় একটু দাঁড়িয়ে বিশ্রাম করা যায়। খালের পাশে মূলত কোনো বালু বা মাটি নেই, আছে শুধু শিলাপাথর, যা এই শৈলপাহাড়ের অংশ।
সমুদ্রের ভয়াল গা–ছমছম করানো সৌন্দর্য, রহস্যময় অসীমতা ও বিরাটত্বের এক সম্মোহনশক্তি আমাদের আকর্ষণ করছিল, আবার মনের গহিনে লুকানো এক অজানা ভয় বাধা দিচ্ছিল। আমাদের বোটের ভিনদেশি পর্যটকেরা প্রায় সবাই ইতিমধ্যে জলে নেমে সাঁতার শুরু করে দিয়েছেন লুকানো দ্বীপের উদ্দেশে! বাকুইট উপসাগরে আজ সারা দিন আমরা বোটে করে ঘুরে বেড়িয়েছি, প্রায় সব দ্বীপে সাঁতার কেটেছি, স্নকলিং গিয়ার পরে সমুদ্রের নিচে উঁকি দিয়েছি, কোরাল দেখেছি, রংবেরঙের মাছ দেখেছি, বিচিত্র সব জলজ জীব আর উদ্ভিদ দেখেছি। তবে এর জন্য তীরের আশপাশে ছাড়া তেমন গভীরে যেতে হয়নি বা এত লম্বা পথ সাঁতার দিতে হয়নি। সবাই দলবেঁধে আনন্দ উপভোগ করেছি, আবকাশ যাপন করেছি। তবে এবারের কর্মসূচি অনেকটা ভিন্ন। ভিনদেশি মানুষগুলোর বিষয়টা আলাদা। তারা সাঁতারে বেশ পটু। অন্য স্পটগুলোয় তাদের অনেককে সাবলীলভাবে সমুদ্রের অনেক দূর পর্যন্ত সাঁতার কাটতে দেখেছি, ডুব দিতে দেখেছি। বয়সের বিবেচনায়ও তারা অনুজ আর আমরা অগ্রজ। ঝুঁকি দেখলে অনেক অজানা আশঙ্কা জেগে ওঠে আমাদের মনে! তা ছাড়া পথটা দীর্ঘ আর কঠিন শিলাপাথরের কারণে কিছুটা বিপজ্জনক, তাতে কারও সন্দেহ নেই! আমাদের মধ্যে যাওয়া না–যাওয়ার বিষয়ে মতভেদ দেখা দিল। আমাদের শিবির দুভাগে বিভক্ত হয়ে একদল যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম আর অন্যদল বোটে থাকার মনস্থির করল।
লাইফজ্যাকেট ভালোভাবে বেঁধে নেমে গেলাম জলে। লাইফজ্যাকেট ভেসে থাকতে সাহায্য করছিল, কিন্তু আবার সাঁতারে কিছু অসুবিধাও সৃষ্টি করছিল। সাঁতারের সময় জ্যাকেটের পেছনের অংশ এমনভাবে ঘাড়ে চাপ দিচ্ছিল যে সাঁতার কাটাতে কষ্ট হচ্ছিল। সবার শেষে হলেও আমরা সাঁতরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম গোপন দ্বীপের পথে আর সুপারভাইজারের কথামতো খালের পাশে দাড়ানোর মতো জায়গাও পাচ্ছিলাম। কিন্তু পায়ের নিচের পাথরগুলো খুব ধারালো মনে হচ্ছিল। সাগরের ঢেউ মৃদু হলেও ধাক্কা লাগছিল, যার কারণে পাথরের ওপর দাঁড়াতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। আসলে আমি এ ধরনের ভ্রমণের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ জলনিরোধী জুতা সঙ্গে আনিনি। ভ্রমণ শুরুর আগে স্নকলিং গ্যাজেটগুলো যখন ভাড়ায় নিচ্ছিলাম, তখন লাগবে না ভেবে জুতা ভাড়ায় নেওয়া হয়নি। এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। বেশ একটা কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতার শেষে সিক্রেট আইল্যান্ড দেখা দিল। শুধু জলনিরোধী এক জোড়া জুতার কারণে সুন্দর এক অভিজ্ঞতা কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত হলো। আবার ফিরতি সাঁতার কেটে বাঙ্কাসে যখন ফেরত এলাম, তখন শিলাময় পাহাড়গুলোর গাঁ বেয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে। নীল সমুদ্রের বুকে জেগে ওঠা কাছের–দূরের পাহাড়শ্রেণি বিদায়ী সূর্যের রক্তিম আবির মেখে আমাদের বিদায় জানাতে প্রস্তুত।
আমাদের বাঙ্কাস ফেরার পথ ধরেছে। যতদূর চোখ যায় জনশূন্য বাকুইট উপসাগরের দিগন্তব্যাপী শুধু নীল জল, মাঝে নাটকীয়ভাবে জেগে ওঠা শৈলপাহাড়। নিস্তব্ধ অপরাহ্ণে নৌকার ছাদে বসে দেখা প্রাকৃতির এই রূপ মনকে এক রহস্যময় বিচিত্র অনুভূতিতে অচ্ছন্ন করে। আমাদের যাত্রা এখনো অনেক বাকি। আজ রাতে এল নিডোর পর্ব শেষ করে আমরা চলে যাব সেবু শহরে। সেবু ফিলিপাইনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। সেবুর থেকে পৌঁছে যাব অন্য এক শহর অসলোবে। ওখানের সমুদ্রে পৃথিবীর বৃহত্তম হাঙর (হোয়েল শার্ক) সাঁতার কেটে বেড়ায়। এই দুঃসাহসিক অভিযানের খাতায় নাম লেখাতে আমরা ছুটে যাব সেবুর ওসলোব এলাকায়। হোয়েল শার্কের সঙ্গে সাঁতার কেটে একটা দিন পার করব। এরপর ফিরে যাব রাজধানী ম্যানিলাতে। সময় খুব কম, তা না হলে এল নিডোতেই এক সপ্তাহ কাটিয়ে দেওয়া যায়। ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’—চারটি গন্তব্যের ‘এ’ ছাড়া বাকি সব অদেখা। এই নিরিবিলি পর্যটন শহর আমাদের খুব মনে ধরেছে। হয়তো আবার ফিরে আসব।
নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভ্রমণ, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]