বাংলাদেশে ঐতিহ্য পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় রয়েছে ষাটগম্বুজ মসজিদছবি: প্রথম আলো

‘কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়, এমন স্নিগ্ধ নদী কাহার?
কোথায় এমন হরিৎক্ষেত্র আকাশ তলে মেশে?
এমন ধানের ওপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে?’
—দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে খুবই সুন্দর এবং বাংলাদেশের সৈকতে, হাওরে, সুন্দরবনে কিংবা পর্বতাঞ্চলে অন্তর্দেশীয় পর্যটন বিকশিত হচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এর পুরো পরিমাণ ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং যা দেশের জাতীয় উত্পাদনে জিডিপি ৩ শতাংশ যোগ করে। প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ছাড়াও ঐতিহ্য ভ্রমণের অপার সম্ভবনা আছে, যা পুরোপুরি হয়তো আবিষ্কার ও বিকাশ করা হয়নি।

ঐতিহ্য ভ্রমণের সূচনা হয় ইউরোপে, যখন বিভিন্ন হোটেল সংস্থা কিছু ক্ষেত্রে সরকার মধ্যযুগীয় দুর্গ ও প্রাসাদগুলোকে সংস্কার করে সেগুলোকে উচ্চ মানের হোটেল ও রিসোর্ট বানায় এবং অভিজাত সমাজের হাত থেকে নিয়ে সমাজের সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়। ফরাসি chateau, স্কটিশ দুর্গ প্রভৃতি হলো এর উদাহরণ। ভারতে স্বাধীনতা ও ভূমি সংস্কারের পর রাজস্থানের রাজপরিবারের প্রাসাদগুলোকেও একইভাবে বিলাসবহুল হোটেলে রূপান্তরিত করা হয়। সম্প্রতি পশ্চিম বাংলাতেও করা হয়েছে এবং এই প্রসঙ্গে বাওয়ালি, মহিষাদল ও ইটাচুনা রাজবাড়ির কথা উল্লেখ্য।

পুরো বাংলাদেশের আনাচকানাচে এ রকম অনেক প্রাসাদোপম জমিদারবাড়ি আছে। এদের খুব অংশকেই সরকারি দপ্তর ও কয়েকটিকে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের এক একটি জমিদারবাড়ি ইন্দো–ইউরোপীয় স্থাপত্যের অপরূপ নিদর্শন। কিন্তু যে পরিমাণ পুরোনো ও সুন্দর জমিদারবাড়িগুলো আছে তার বেশির ভাগই অরক্ষিত থাকায় ভেঙে ভেঙে পড়ে যাচ্ছে ও দেশের অনেক ঐতিহ্য ও ইতিহাস বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত থেকে যে অর্থনৈতিক ও স্থানীয় কর্মসংস্থান হতে পারে, সেটা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

কীভাবে করা যায়

সব জমিদারবাড়িকে একসঙ্গে এর আওতায় আনা সম্ভব নয়। তাই পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রতিটি বিভাগে দুই-তিনটি বড় জমিদারবাড়ি চিহ্নিত করতে হবে, যা অরক্ষিত কিন্তু প্রভূতই সুন্দর। তারপর সেখানে বসতি বা দখলদার থাকলে সরকারকে আইনিভাবে সেটা মুক্ত করে বা পুনর্বাসন দিয়ে বাড়িকে দখলমুক্ত করে তার পুনরুদ্ধার করতে হবে। সরকারকে এ জন্য আইন বানাতে হবে বা আইনি সহায়তা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরাসরি বেসরকারি বিনিয়োগ আনা যেতে পারে হোটেল সংস্থা ও অন্যান্য দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। ইউনেসকোরও সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য বিশেষজ্ঞদের সাহায্য লাগবে পুনরুদ্ধারে যাতে এই স্থাপনাগুলোকে যথাসম্ভব তার আদিরূপ ফেরত পায়। তারপর এগুলোকে বিভিন্ন মানের বিলাসবহুল হোটেল বা রিসোর্টে রূপান্তরিত করলে তা পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে রাজবাড়িগুলো নির্বাচনের সময় তার ভৌগোলিক অবস্থান যেমন নদী সংযোগস্থল, যাতায়াতব্যবস্থা ও পারিপার্শিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভালো হলে প্রকল্পের সাফল্যের সম্ভাবনাও বাড়বে। এভাবে পাইলট প্রকল্পগুলো সফল হলে আরও বেশি করে বাড়িগুলো পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে। ছোট জমিদারবাড়িগুলোকে উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে আকর্ষণীয় হোম স্টে (home stay) বানানো যেতেও পারে।

প্রথম আলো ফাইল ছবি

কীভাবে পর্যটন হতে পারে

প্রথমত, রিসোর্ট হিসেবে ব্যবহার করলে এগুলো সপ্তাহান্তে ভ্রমণ (weekend gateway) হিসেবে আকর্ষণীয় হবে। নানা করপোরেট মিটিংয়ে জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

প্যাকেজ ট্যুরিজম

বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ মানুষ কলকাতা আসে পর্যটনের জন্য, সে পরিমাণ কলকাতা বা ভারত থেকে বাংলাদেশ যায় যদিও যাওয়া উচিত। বাংলাদেশ পর্যটন কর্তৃপক্ষকে এখানে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। প্যাকেজ পর্যটন যেমন Tagore circuit, Lalon circuit, Sylhet heritage tourism বা ঐতিহ্য পর্যটনের জন্য প্যাকেজ পর্যটন যেখানে এই বাড়িগুলোতে থাকা, স্থানীয় খাওয়াদাওয়া, ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো দেখান, বিলাসবহুল নৌকায় পদ্মা বা মেঘনায় ভ্রমণ একসঙ্গে করলে মানুষকে এগুলো টানবে।

ফেস্টিভ্যাল ট্যুরিজম (Festival tourism)

বাংলাদেশের নানা স্থানে অনেক দুর্গাপূজা হয়, এই সময় পশ্চিমবঙ্গের স্কুল ও অফিসে লম্বা ছুটি থাকে, অনেকে তাই এই সময় কাশ্মীর, কেরালা, রাজস্থান নানা জায়গায় যান। সেই সময় বাংলাদেশের পূজা দেখানো ও সঙ্গে প্যাকেজ থাকলে ভালো সংখ্যায় মানুষ বাংলাদেশ ভ্রমণে আগ্রহী হবেন।

এ ছাড়া শীতকালে বাংলার প্রকৃতি খুবই মনোরম, তার সঙ্গে পিঠে, বাংলা ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি খাওয়া যোগ করলে সেটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

অর্থনীতি

ভালোভাবে উদ্যোগ নিলে তাড়াতাড়ি পর্যটন খাত বাংলাদেশের জিডিপিতে ৩ থেকে ৫-৬% অবদান রাখতে পারবে। ফলে গ্রামাঞ্চলে আধা দক্ষ এবং অদক্ষ শ্রমিক যেমন কৃষক, পাচক নানা জিনিসের সরবরাহকারী, নৌকাচালক, গাড়িচালক যেমন রোজগার পাবেন তেমনি দক্ষ পর্যটনকর্মী যেমন শেফ, হোটেল কর্মী, পর্যটন বিশেষজ্ঞ তারাও অনেক কাজ পাবেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে। দেশের মধ্যে ও দেশের বাইরেও বাংলাদেশের সুনাম বাড়বে, যা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের নানা খাতে বিনিয়োগে সাহায্য করবে এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সাহায্য করবে।

লেখক: প্রসেনজিৎ ভট্টাচার্য্য, জ্যেষ্ঠ পরিচালক, ইউপ্রো টেকনোলজিস, ভারত

**নাগরিক সংবাদে ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল অ্যাড্রেস [email protected]