এক টুকরো জাপান, একমুঠো স্মৃতি
উড়োজাহাজটা যখন সমুদ্রের ওপর দিয়ে এক টুকরো মাটির সন্ধান পেতে দ্রুতবেগে মেঘের বুক চিরে ছুটে চলেছে, ঠিক তখনই কাচঘেরা ছোট্ট জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি সূর্য পশ্চিম দিকে প্রায় ঢলে পড়ছে, যেন মিষ্টি সুরে অভিবাদন জানাচ্ছে বিমানে থাকা প্রতিটি যাত্রীকে, ‘স্বাগতম তোমাদের, সমুদ্রতীরের এই নগরী ওসাকাতে।’
অনেক দিন থেকেই প্ল্যান করছিলাম জাপান থেকে ঘুরে আসব, আর সে ভাবনা থেকেই একদিন হুট করেই টিকিট কেটে উঠে পড়লাম ওসাকাগামী এই হাওয়াই জাহাজে।
ঠিক বেলা ৩টার কিছু সময় পরেই ল্যান্ড করল আমাদের বিমান। হাতের ব্যাগপত্র নিয়ে অন্যান্য যাত্রীদের মতো আমিও গিয়ে দাঁড়ালাম জাপানের ইমিগ্রেশনে। কিন্তু বিধিবাম, সবুজ এই পাসপোর্ট দেখলেই আলাদা করে আপ্যায়ন করতে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে অনেক প্রশ্ন করবে, এটা অনুমান যদিও করেছিলাম, তবুও মনে ক্ষীণ আশা ছিল, হয়তো অন্যান্য দেশের মানুষের মতো আমিও বের হয়ে যেতে পারব, কিন্তু না, যে ভাবনা তাই সত্য হলো, সেখানে নিয়ে যাওয়ার পরে সব প্রশ্ন শেষে প্রায় ২ ঘণ্টা পরে ছাড়া পেলাম।
সেখান থেকে বের হয়েই প্রথমে আমেরিকার ডলার ভাঙিয়ে জাপানের ইয়েন নিয়ে নিলাম সঙ্গে। আর এদিকে জাপানে যাওয়ার আগেই ICOCA কার্ড করে রেখেছিলাম যেটা দিয়ে সহজেই তাদের পাবলিক বাস কিংবা ট্রেনে চড়া যায়। আর সেটা দিয়েই প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে ছুটে চললাম আগে থেকে কনফার্ম করে রাখা হোটেলের গন্তব্যে।
আমার হোটেল ছিল শিন ইমামিয়া নামক একটা জায়গায়, হোটেলে চেক ইন করে আগে গোসল করে ফ্রেশ হতেই দেখি বাইরে অন্ধকার নেমেছে, এদিকে পেটে ক্ষুধাও উঁকি দিচ্ছিল, তাই ফোনে ম্যাপের সাহায্যে মুসলিম রেস্টুরেন্ট সার্চ দিতেই বেশ কয়েকটা পেয়ে গেলাম, সব থেকে কাছেরটা প্রায় ১ কিলোমিটার রেঞ্জে দেখাল, হেঁটেই রওনা দিলাম, ইচ্ছা শহরটাও একটু দেখা আর খাওয়াও সেরে নেওয়া।
হাঁটার সময় লক্ষ করলাম শান্ত এই শহরে সবাই সাইকেলে ছুটে চলছে, এখানে ইলেকট্রনিক সাইকেল তেমন নেই চায়নার মতো, এখানে সবাই এখনো তাদের কাছে ধারে চলাচলের জন্য সাইকেল ব্যবহার করে, আর সেটা বেশির ভাগই ভাড়া নেওয়া যায়। এগুলো দেখতে দেখতেই আমি পৌঁছে গেলাম রেস্টুরেন্টে, গিয়ে দেখি একজন মেয়েই কেবল সেখানে সার্ভ করছে আর আস্তে পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত চলছে। আমি মেনু দেখে অর্ডার করলাম হালাল রামেন, অর্ডার দেওয়ার পরে জানতে পারলাম, মেয়েটা ইন্দোনেশিয়ান, এখানে এসেছে প্রায় ৩ বছর ধরে কাজের সুবাদে। এটাও জানলাম যে এখানে ট্যাক্স অনেক বেশি। বেতন, খাবার, কেনাকাটা কিংবা বাসাভাড়া যাই করি না কেন, তার একটা বড় অংশ ট্যাক্সে চলে যায়।
তারপর খাওয়া শেষে তাকে ধন্যবাদ জানালাম, সে–ও আমাকে ‘আরিগাতো ওজাইমাস’ জানাল আবারও। এরপর তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে ওসাকার নাইট লাইফ দেখতে বেরিয়ে গেলাম কাছের আরেকটা জায়গায়। সেখানে যাওয়ার পথে দেখা হলো এক সাইকেল আরোহীর সঙ্গে, চেহারা দেখে বাঙালি মনে হলো, এরপর জিজ্ঞেস করতেই একগাল হেসে জানাল, সে নেপালি, এখানে পড়াশোনা করতে এসেছে, সঙ্গে এটাও জানাল তার ভাঙা ভাঙা বাংলায় যে সে বাংলাদেশকে ভালোবাসে এবং ক্লাসে তার বেশ কয়েকজন বাঙালি বন্ধুও আছে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
তারপর দুজনে কিছুক্ষণ কথা বলে সামনে এগোলাম, সে আমাকে একটা বাংলাদেশের রেস্টুরেন্ট দেখাল, তার সামনে বাংলাদেশ এর পতাকা ঝুলছে, নাম ‘বাঙালিয়ানা’ বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা দেখে ভীষণ ভালো লাগল, মনে হলো এখানেও যেন আমার কাছের কোনো স্বজন আছে।
তারপর তাকে বিদায় দিয়ে রেস্টুরেন্টের ভেতরে গিয়ে এক বাংলাদেশি বোনের সঙ্গে পরিচিত হলাম, জানলাম উনি আর ওনার হাজব্যান্ড মিলে এই ব্যবসা করছেন, একটা ছোট্ট মিষ্টি বেবিও আছে ৬ বছরের। এরপর কুশল শেষে আমি বেরিয়ে পড়লাম পাশের এক শপিং মলে, সেখানে কী নেই! যথারীতি ট্রলি ঠেলে ঝটপট আমিও কিছু কেনাকাটা শেষ করে ফিরলাম হোটেলে, ক্লান্ত হয়ে সেদিন কখন ঘুমিয়েছি নিজেও টের পাইনি।
পরদিন এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙার পর দ্রুত রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম ট্রেনের জন্য, উদ্দেশ্য ওসাকা ক্যাসেল। পথে তাইওয়ানের এক দম্পত্তির সঙ্গে পরিচয় হলো, তারা আজই ফিরে যাচ্ছে তাদের ভ্রমণ শেষে।
ট্রেন গিয়ে থামল আমার গন্তব্যের স্টেশনে, নামার আগে খেয়াল করলাম, প্রায় প্রত্যেক জাপানিজ তাদের ব্যাগে একটা বই রাখে, যখনই ট্রেন চলা শুরু করে তারা বই পড়ে। সেটা আমাকে বেশ মুগ্ধ করল। এদিকে গন্তব্যে চলে আসায় গিয়ে পৌঁছালাম ওসাকা ক্যাসেলের গেটে। সেখান থেকে অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে যেতে হবে, দেখলাম আমার মতো অনেক দেশের অনেক মানুষ হাটছে এই চমৎকার স্থাপনা দেখার উদ্দেশ্যে, আমিও হাঁটলাম, পথিমধ্যে কিছু ছবিও তুললাম, হাঁটতে হাঁটতে পরিচিত হলাম এক বিদেশির সঙ্গে, যিনি ইউরোপের দেশ আইসল্যান্ড থেকে ৩ মাসের জন্য এখানে ছুটি কাটাতে এসেছেন, কথা বলতে বলতেই চলে এলাম চমৎকার এই ক্যাসেলে, চোখ মুগ্ধ করা এই স্থাপনার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, কত শক্তিশালী রাজাই না এখানে থেকেছেন, কিন্তু আজ তাঁরা নেই, কেবল শুধু স্থাপনা আর তাঁদের স্মৃতিটুকুই রয়ে গেছে।
এটা ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণ এখানে সময় কাটিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখি ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছুঁই ছুঁই করছে, তাই আর দেরি না করে ওখান থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে হালাল রেস্টুরেন্ট খোঁজ করে পাচ্ছিলাম না, অবশেষে এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের দেখা পেলাম, সেখানে গিয়ে ফোনটা একটু চার্জ দিয়ে দুপুরে ইন্ডিয়ান বিরিয়ানি,লাচ্ছি এসব খেয়ে চলে এলাম জাপানের বিখ্যাত ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে। আগে থেকেই টোয়াইলাইট পাস কেনা ছিল, সেটা দেখিয়ে ঢুকে পড়লাম ভেতরে।
ওমা, ভেতরে কী বিশাল কাণ্ড, মুভির পোকা হিসেবে যাদের ছবি দেখেছি এত দিন, তাদের যেন বাস্তবে পেয়ে গেলাম, মিস্টার মারিও, জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের ডাইনোসর, নিন্টেন্ডো ওয়ার্ল্ড, হরর–এর চরিত্র, মিনিয়ন আরও কত কী!
বেশ কয়েকটা রাইডে চড়ে যখন বুঝলাম পা আর চলছে না, তখন হাতের ডিজিটাল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় ১৫ কিলোমিটার হেঁটে ফেলেছি এতক্ষণে।
পা ব্যাথা যখন চরমে পৌঁছেছে, তখন বুঝলাম আর থাকা যাবে না, তাই ফিরলাম আবার হোটেলের দিকে, হোটেলের কাছে এসে বুঝলাম শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, তাই পাশের একটা জাপানিজ ম্যাসাজ থেকে ম্যাসাজ নিলাম, সেটা নিয়ে বেশ ভালো বোধ করলাম, তারপর হোটেলে ফেরার আগে আরেকটা মুসলিম রেস্টুরেন্ট খুঁজে সেখানে খেতে গেলাম।
সেখানে গিয়ে দেখি দুজন বাংলাদেশি ভাই কাজ করছে, কথায় কথায় তারা জানাল, তারা এখানে ব্যাচেলরে পড়াশোনা করছে, পাশাপাশি পার্ট টাইম এই রেস্টুরেন্টে কাজ করে।
সেখান থেকে খাওয়াদাওয়া শেষ করে বাইরে এসে একা হাঁটছিলাম আর রাতের সৌন্দর্য দেখছিলাম, আমার মতো অনেকেই হাঁটতে বের হয়েছে, এদিকে পা আর সায় দিচ্ছে না দেখে হোটেলে ফিরে সেদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়লাম।
ছোট্ট এই ভ্রমণের তার পরদিনই ছিল শেষ দিন, সকালে ফ্যামিলি মার্ট থেকে স্যান্ডউইচ দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলাম। তারপর হোটেল চেক আউট করলাম ১০টায়, চেক আউটের সময় পাশের রুমের এক আমেরিকান ভদ্রোমহিলার সঙ্গে পরিচয় হলো, নিজে থেকেই কথা বললেন, জানালেন যে ওনার বয়স ৭৩, আগামীকাল ওনার জন্মদিন, সেটা সেলিব্রেট করতেই উনি একাই এসেছেন জাপানে। সঙ্গে নিজে থেকে এই কথাও বললেন যে কারও ডিভোর্স হয়ে গেলে কিংবা হাজব্যান্ড মারা গেলে কিংবা বাচ্চারা কথা না বললে নিজে নিজে যে ঘোরা যাবে না, তার তো কোনো কথা নেই, তা–ই না?
আমিও ওনার মনের কথা বুঝতেই তাঁকে সমর্থন করে বললাম, বাদ দিন তো এসব, এর থেকে চলুন আপনার জন্মদিনের অগ্রিম উইশ করে দিই, এই বলেই হ্যাপি বার্থডে উইশ করতেই হোটেলের লবিতে আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন যোগ দিল, কোথাও যেন মনে হলো, এই অনাকাঙ্ক্ষিত উষ্ণ ভালোবাসা , তা–ও আবার সব অপিরিচিত ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছ থেকে পেয়ে ওনার চোখ ছলছল করে উঠল, সেটুকু দেখেই হাত নেড়ে বিদায় দিয়ে আমি আমার ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্যে প্রথম দিন পরিচিত হওয়া বাঙালিয়ানা রেস্টুরেন্টের সেই ভাইয়ের কাছে।
সেখানে পৌঁছে দেখি, এখনো দোকান খোলেননি, কিন্তু বাংলাদেশের পতাকা পতপত করে উড়ছে দোকানের সামনে, সেটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই দেখালাম উনি এসে পড়েছেন, এরপর বেশ কিছুক্ষণ ওনার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা হলো, ওনার ছোট্ট মেয়েটি এসে জানাল, তার হাত থেকে পড়ে গিয়ে মোবাইল ভেঙে গেছে, এরপর সে কী কান্না! তার সঙ্গেও কথা হলো, ৬ বছরের ছোট্ট বাচ্চাটার নাম জিজ্ঞেস করতেই জানাল তার নাম জানতে হলে একটা কুইজ খেলতে হবে, সে আমাকে ৩টা হিন্টস দেবে, আর আমাকে খুঁজে বের করতে হবে, ৩টা হিন্টস–এর পরও যখন তার নাম জানতে পারলাম না, সে জানাল রক পেপার সিজার খেললে যদি আমি জিতি, তবেই কেবল তার নাম জানার জন্য আরেকটা ক্লু পাব, অবশেষে জিতে গিয়ে আরেকটা ক্লু পেয়ে জানতে পারলাম তার নাম আকাঙ্ক্ষা।
সেখান থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে ফিরে এলাম আবার সেই বিমানবন্দরে, সেখানে তাকিয়ে দেখি আমাদের নিয়ে ছুটে চলার জন্য জাপান এয়ারলাইনসের বিশালাকৃতির এক বিমান দাঁড়িয়ে আছে।
ইমিগ্রেশন শেষ করে উঠে পড়লাম আবার সেই উড়োজাহাজে, একরাশ মুগ্ধতা, সঙ্গে বেশ কিছু স্মৃতি আর জাপানিদের সুন্দর জীবনযাপনের শিক্ষা নিয়ে ফিরে চললাম আমার চিরচেনা গন্তব্যে।
*লেখক: সাজ্জাদুল ইসলাম তুষার, সাউথ এশিয়ান রিজিওনাল ম্যানেজার, টি অ্যান্ড বি গ্রুপ