একজন শিক্ষকের চোখে বাংলাদেশের সেরা ১০ পর্যটন স্পট

ছবি: প্রথম আলো

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি লাল-সবুজের বাংলাদেশ। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ছোট এই বদ্বীপে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পর্যটন স্থান। বছরজুড়ে দেশ-বিদেশের সৌন্দর্যপ্রিয় ও ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন বিখ্যাত পর্যটন ও দর্শনীয় স্থানগুলোতে। ২৭ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’ স্মরণে আমার মতে বাংলাদেশের বিখ্যাত ১০ পর্যটন স্পট সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত—

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বাংলাদেশের বৃহত্তম ও জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত এই সমুদ্রসৈকতের দৈর্ঘ্য ১২০ কিলোমিটার। দীর্ঘ এই সৈকত পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক ও অখণ্ডিত সমুদ্রসৈকত। সৈকতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাবণী পয়েন্ট। কক্সবাজারকে পর্যটন রাজধানী বললেও কম বলা হবে না! সৈকতের নীল জলরাশি, ঝাউবন, সোনালি বালু পর্যটকদের জন্য অনিবার্য আকর্ষণ তৈরি করেছে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ছাড়াও এই জেলায় রয়েছে আরও অনেক পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র।

সুন্দরবন—

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এটি বেঙ্গল টাইগার ও নানা ধরনের বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবন একটি প্রশস্ত বনভূমি, যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়। এটি ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য। পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার কিছু অংশ নিয়ে বিস্তৃত। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬ হাজার ৫১৭ বর্গকিলোমিটার (৬২%) বাংলাদেশে এবং বাকি অংশ (৩৮%) রয়েছে ভারতের মধ্যে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

সেন্টমার্টিন দ্বীপ—

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। এর নীল জলরাশি ও নয়নাভিরাম দৃশ্যের জন্য দেশ-বিদেশে বিশেষভাবে পরিচিত। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত এই প্রবাল দ্বীপের আয়তন মাত্র আট বর্গকিলোমিটার। এটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ হতে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে ও মিয়ানমারের উপকূল হতে পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত। প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে একে ‘নারকেল জিঞ্জিরা’ বলা হয়ে থাকে। এ ছাড়া এটি ‘জিঞ্জিরা’ ও ‘দারুচিনি দ্বীপ’ বা ‘দেরদিউসা দ্বীপ’ নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের সমুদ্রপ্রেমীদের কাছে সেন্টমার্টিন ব্যাপক পরিচিত একটি নাম। দ্বীপটি তিন দিকের স্থলভাগ জোয়ারের সময় তলিয়ে যায় এবং ভাটার সময় আবার জেগে ওঠে। দ্বীপটি প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, সামুদ্রিক শৈবাল, উদ্ভিদ ও সামুদ্রিক মাছের জন্য বিখ্যাত।

সাজেক ভ্যালি—

সাজেক উপত্যকা রাঙামাটির একটি মনোরম পাহাড়ি এলাকা। মেঘ আর সবুজের লুকোচুরি ঘেরা এই নৈসর্গিক স্থান জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ইউনিয়নের একটি বিখ্যাত পর্যটনস্থল। এর উত্তরে রয়েছে ভারতের মিজোরাম সীমান্ত। সকাল-দুপুর-বিকেল এখানে প্রকৃতির রং বদলায়। সাজেকে সর্বত্র সাদা তুলার মতো মেঘ, পাহাড় আর সবুজের সমারোহ দেখা যায়। আবার সাজেক থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা যায়। সাজেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস বেশ আকর্ষণীয়।

সেন্টমার্টিন দ্বীপ
ফাইল ছবি

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত—

কুয়াকাটা বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্রসৈকত, যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উভয়ই দেখা যায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এই সমুদ্রসৈকত পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত। এই সমুদ্রসৈকতটি লম্বায় ১৮ কিলোমিটার এবং বিস্তৃতিতে প্রায় ৩ কিলোমিটার। কুয়াকাটার আরেক নাম সাগরকন্যা। এই মনোমুগ্ধকর সৈকতে শীতকালে অতিথি পাখির সমাগম সবার নজর কাড়ে।

টাঙ্গুয়ার হাওর—

টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ হাওর। প্রায় ১২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এ হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি ‘নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল’ নামেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান হিসেবে পরিচিত। হাওরের নীল জলরাশি ও নীল আকাশ দেখে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য! এ ছাড়া হাওরের উত্তর পাশে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড় ভ্রমণপ্রেমীর হৃদয়কে রাঙিয়ে দেয়। হাওরে চাঁদের আলো আর হিমেল হাওয়া মিলেমিশে যেন এক স্বর্গসুখের হাতছানি দিয়ে ডাকে। পাখিদের কলকাকলি মুখরিত এই হাওর মাছ, পাখি ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর এক বিশাল অভয়াশ্রম। হিজল-করচের দৃষ্টিনন্দন সারি হাওরকে করেছে আরও আকর্ষণীয়। মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টির বেশি ঝরনা এসে এই হাওরে মিশেছে।

শ্রীমঙ্গল চা–বাগান—

চা–বাগান ও সবুজ প্রকৃতির জন্য শ্রীমঙ্গল সেরা। শ্রীমঙ্গলকে চায়ের রাজধানী বলা হয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত শ্রীমঙ্গল উপজেলা মৌলভীবাজার জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের অন্তর্গত হাইল হাওরের পাশে অবস্থিত। শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রায় ৪৪ ভাগ জায়গাজুড়ে রয়েছে চা–বাগান। প্রচুর বৃষ্টি হওয়ার কারণে এখানে চায়ের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পাহাড়, রেইন ফরেস্ট, হাওর আর সবুজ চা–বাগান মিলিয়ে শ্রীমঙ্গল সবার নজর কেড়েছে। এ স্থানে প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি পর্যটকের সমাগম থাকে। দেশের এক-চতুর্থাংশ চা–বাগানের এই উপজেলায় অবস্থিত।

বান্দরবানের নীলাচল পর্যটন কেন্দ্র
ফাইল ছবি

জাতীয় চিড়িয়াখানা—

বাংলাদেশের জাতীয় চিড়িয়াখানা ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত। ১৯৫০ সালে জীবজন্তুর প্রদর্শনশালা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই চিড়িয়াখানাটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয় ১৯৭৪ সালে। জানা যায়, বছরে প্রায় ৩০ লাখ দর্শনার্থী ঢাকা চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করে থাকেন। ঢাকা চিড়িয়াখানার আয়তন প্রায় ৭৫ হেক্টর। চিড়িয়াখানার চত্বরে ১৩ হেক্টরের দুটি দৃষ্টিনন্দন প্রশস্ত লেকও আছে। চিড়িয়াখানায় বর্তমানে ১৩৪ প্রজাতির দুই হাজারের বেশি প্রাণী রয়েছে। চিড়িয়াখানার আকর্ষণীয় প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে হাতি, বেবুন, চিতা, গন্ডার, জেব্রা, ভোঁদড়, হায়েনা, হরিণ, জিরাফ, ইম্পালা, কালো ভালুক, জলহস্তী, সিংহ, অনেক প্রজাতির বানর, শিম্পাঞ্জি ও বেঙ্গল টাইগার। এ ছাড়া চিড়িয়াখানায় হরেক রকমের পাখিও রয়েছে।

সিলেটের পর্যটন স্পট—

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য খ্যাত সিলেট বাংলাদেশের পর্যটন জেলা বলে পরিচিত। সিলেটের কথা আসলেই একক কোনো পর্যটন স্পটের কথা বললে কম বলা হবে! এই জেলার নাম আসলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একাধিক নামকরা পর্যটন স্পট। সিলেটের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে জাফলং, সাদাপাথর, বিছনাকান্দি, রাতারগুল, পান্থুমাই ঝরনা, সংগ্রামপুঞ্জি ঝরনা, লালাখান, লোভাছড়ার মতো বিখ্যাত সব পর্যটন স্থান। সিলেটের নদী, চা–বাগান ও সবুজ প্রকৃতির জন্য লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানও বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের জন্য সিলেটের বেশ খ্যাতি রয়েছে।

বান্দরবানের পর্যটন স্পট—

বান্দরবান জেলার নাম স্মরণে এলেই পর্যটনের টান অনুভব করেন ভ্রমণপ্রেমীরা! পুরো বান্দরবান জেলায় রয়েছে অসংখ্য পর্যটন স্পট। বান্দরবান মানেই পাহাড়, সবুজ আর রোমাঞ্চকর অনুভূতি। ভ্রমণপিপাসু ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বান্দরবান সর্বদা শীর্ষেই থাকে! এই জেলায় রয়েছে বিস্ময়কর সব জলপ্রপাত। বান্দরবানের জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলো হলো নীলাচল, বগা লেক, কেওক্রাডং, চিম্বুক পাহাড়, স্বর্ণমন্দির, নীলগিরি, শুভ্র নীলা, স্বপ্নপুরী, আমিয়াখুম জলপ্রপাত, জাদিপাই জলপ্রপাত, সাঙ্গু নদী, নাফাখুম জলপ্রপাত এবং বান্দরবান শহর ও পাহাড়ি গ্রাম। বাংলাদেশের তিনটি উচ্চতম স্থান তাজিনডং (বিজয়), সাকা হাফং ও কেওক্রাডং। তিনটিই বান্দরবানে অবস্থিত।

*লেখক: সাধন সরকার, সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও সহকারী শিক্ষক, লৌহজং বালিকা পাইলট উচ্চবিদ্যালয়, মুন্সিগঞ্জ।