শিক্ষাসফরের যে দিনগুলো রয়ে যাবে স্মৃতির পাতায়

শিক্ষাসফর শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু মনোরঞ্জন নয়, বরং জ্ঞানার্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। শিক্ষাজীবনে নিয়মের বেড়াজাল আর যান্ত্রিক চাপের মধ্যে শিক্ষাসফরের আয়োজন স্বস্তির শীতল বাতাস বইয়ে দেয় মনে। এমনই এক স্মরণীয় শিক্ষাসফর আয়োজন করে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ছিল শেষ শিক্ষাসফর। এ সফরের গন্তব্য ছিল পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত সেন্ট মার্টিন দ্বীপ।

ভ্রমণ ছিল এ বছরের ১১ জানুয়ারি। আমরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন ভবনের সামনে জড়ো হলাম। আমাদের সফরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অভিভাবক হিসেবে পেয়েছিলাম আইন বিভাগের অধ্যাপক আরমিন খাতুন ম্যামকে। যাত্রা শুরুর আগে ম্যাম আমাদের দিকনির্দেশনা দিলেন। বিকেল ৪টায় আমাদের যাত্রা শুরু করলাম।

ক্যাম্পাসের সীমানা পেরিয়ে বাস যখন পথচলা শুরু করল, তখন থেকেই শিক্ষাসফরের প্রাণবন্ত পরিবেশ শুরু হলো। নাচ-গান আর হাসি-আনন্দে ভরপুর এক মুহূর্তে পরিণত হলো পুরো বাস। আমাদের আনন্দমুখর যাত্রায় সঙ্গী হলেন আরমিন খাতুন ম্যাম। পথিমধ্যে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন সহযোগী অধ্যাপক সাজ্জাদুর রহমান স্যার। স্যারের উপস্থিতি সফরে নতুন মাত্রা যোগ করল। বাস তখন মহাসড়ক ধরে ছুটছে দূর সৈকতের শহর কক্সবাজারের দিকে। শিক্ষাসফরের গাড়িতে ঘুম এক অলীক কল্পনামাত্র! এই কথার সত্যতা আমরা আবারও প্রমাণ করলাম। গভীর রাত হলেও বাসের ভেতর ছিল কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ।

মধ্যরাতের বিরতি পড়ল ফেনীতে। সেখানেই আমরা সবাই মিলে রাতের খাবার খেলাম। খাবার শেষে আবারও যাত্রা শুরু হলো। এবার সবাই আরও উৎসাহী, কারণ, কক্সবাজার আর খুব বেশি দূরে নয়।

প্রায় ১৮ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রার পর আমরা পৌঁছাই কক্সবাজার। নির্ধারিত হোটেলে চেক-ইন করতেই ভ্রমণের ক্লান্তি সবার শরীরে ভর করে। ক্লান্ত চোখ আর অবসন্ন শরীরে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার পরই শুরু হয় নতুন উচ্ছ্বাস। সমুদ্রের ডাক উপেক্ষা করা যে অসম্ভব!

হোটেল থেকে বেরিয়ে খালি পায়ে সবাই নেমে পড়ি সৈকতের নরম বালুচরে। প্রথম স্পর্শেই যেন সব ক্লান্তি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সমুদ্রের লোনাজলে ঝাঁপিয়ে পড়তেই এক অদ্ভুত মুক্তির অনুভূতি ছুঁয়ে গেল মনে। ঢেউয়ের মৃদু স্নিগ্ধতায় আমাদের মিতালি গড়ে ওঠে সমুদ্রের সঙ্গে। কখন যে ঘড়ির কাঁটা বেলা দুইটায় পৌঁছেছে, তা যেন বুঝতেই পারিনি। দুপুরের খাবারের জন্য তাড়াহুড়ো করে হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে সেরে নিলাম মধ্যাহ্নভোজ। খাবারের মেন্যুতে থাকা সামুদ্রিক মাছের স্বাদ যেন এক অনন্য উদাহরণ।

খাবার শেষে যার যার মতো আবার ছুটে গেলাম সৈকতের দিকে। আমরা ছোট দলে ভাগ হয়ে লাবণী সৈকতে অপেক্ষা করতে থাকলাম সূর্যাস্তের সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটির জন্য। নীল আকাশ ধীরে ধীরে রঙ বদলাতে শুরু করল। সূর্যের সোনালি আভা লালচে কমলাতে রূপ নিয়ে এক অপার্থিব দৃশ্যের সৃষ্টি করল। দিগন্তরেখায় মিশে যাওয়া সূর্যের শেষ আলো যেন আমাদের হৃদয়ে এক গভীর প্রশান্তি ছড়িয়ে দিল। মৃদুমন্দ হাওয়ার স্নিগ্ধ স্পর্শ আর সাগরের ক্রমাগত গর্জন যেন এক অনন্য সংগীতের সুর তুলে ধরল। এই সুর যেন প্রকৃতির এক অদৃশ্য সিম্ফনি, যা হৃদয়ের গভীরে গিয়ে স্পর্শ করে।

রাত ১০টায় সবাই একত্র হয়ে খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। আরমিন ম্যাম আমাদের পরবর্তী দিনের জন্য নির্দেশনা দিয়ে সবাইকে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে বললেন। আমরা পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে চাঁদের গাড়িতে করে রওনা হলাম মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে টেকনাফের উদ্দেশে।

কক্সবাজারের এই সড়ক পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ রোড। একপাশে সমুদ্রের গর্জন ও অন্যপাশে সবুজে মোড়ানো উঁচু পাহাড় থেকে দিচ্ছে সবুজের হাতছানি। এমন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রেমে পড়তে যে কেউই বাধ্য। কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কে আমাদের এই যাত্রা যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক অপূর্ব সংলাপ। এই পথে যেতে প্রথমেই আমরা পৌঁছাই সোনাপাড়া সমুদ্রসৈকতে, যেখানে ঢেউয়ের মৃদু গর্জন আর বালুকার কোমল স্পর্শে মন যেন প্রকৃতির সুরে হারিয়ে যায়। এরপর পাটুয়ারটেকে কিছু সময় বিরতি নিয়েছিলাম আমরা। যখন আমরা শামুক সৈকতে পৌঁছালাম, মনে হলো যেন প্রকৃতি নিজ হাতে সাজিয়েছে ঝিনুক আর বালুকার মোহনীয় মেলা। এরপর আমরা পৌঁছে গেলাম টেকনাফ। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে দাঁড়িয়ে সাগর আর আকাশের মিলনরেখায় চোখ রেখে মুক্তির এক অনির্বচনীয় অনুভূতি হলো।

সবশেষে ফেরার পথে হিমছড়িতে সূর্যাস্তের দৃশ্য আমাদের মুগ্ধতার চূড়ান্ত সীমানায় পৌঁছে দেয়। এখানে পাহাড়ের চূড়া থেকে রক্তিম আলোয় ঢেউ খেলা সাগর দেখে মনে হচ্ছিল যেন এক জীবন্ত শিল্পকর্ম।

এরপর হোটেলে পৌঁছাতে আমাদের রাত হয়ে গেল। আমরা রাতের খাবার খেয়ে যে যার মতো বেরিয়ে পড়লাম। কেউ রাতের সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আর কেউ গেল মার্কেটে। আমরা পরদিন ভোরে উঠেই রওনা হলাম জাহাজঘাটের উদ্দেশে। আমরা যথাসময়ে জেটিতে পৌঁছে জাহাজে উঠলাম। নয়টার কিছুক্ষণ পর জাহাজ ছাড়ল। আমরা জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়ালাম। খোলা আকাশ, মৃদু হাওয়া আর বিস্তৃত সমুদ্র এক অনন্য অনুভূতির সৃষ্টি করল। আমাদের কেউ কেউ খোলা ডেকে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করছে, কেউ ছবি তোলায় ব্যস্ত আবার কেউ গান ও আড্ডায় মেতেছে। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর পৌঁছে গেলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। আমরা জাহাজ থেকে নামলাম। কিন্তু নেমেই মনে হলো দ্বীপে প্রবেশের ব্যবস্থাপনা আরও ভালো হতে পারত। যা–ই হোক, আমরা আমাদের নির্ধারিত রিসোর্টে পৌঁছে দ্রুত খাওয়াদাওয়া সেরে বের হয়ে পড়লাম প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের নীল জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করতে। ‌

নীল আকাশ আর সমুদ্রের সঙ্গম যেন দিগন্তজুড়ে সৃষ্টি করেছে এক অদ্ভুত রঙের খেলা। সেই নীল জলে ডুব দেয় ভ্রমণপ্রেমীদের দল। কেউ ঢেউয়ের মায়ায় ভেসে সাঁতার কাটছে, কেউ লবণাক্ত পানিতে ডুব দিয়ে খুঁজে বের করছে ঝিনুক। অনেকে সাইকেলে চড়ে ঘুরে দেখছে দ্বীপের সৌন্দর্য। বিকেলের আকাশ তখন কমলা-রক্তিম আভায় রাঙা, সূর্য ধীরে ধীরে গোধূলির কোলে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা তখন সৈকতের ধারে সাইকেল চালিয়ে চলেছি। বাতাসের ঠান্ডা শীতল পরশ, আর সাগরের গর্জন—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব অনুভূতি!

কখন যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, টেরই পাইনি। লালচে আলোয় সেন্ট মার্টিন তখন এক মোহনীয় রূপ ধারণ করেছে। দ্বীপের নির্জনতা, জোৎস্নার মায়াবী আলো আর সাগরের গুঞ্জন মিলে এক সম্মোহনী আবহ সৃষ্টি করেছে। এই নির্জনতায় যেন প্রকৃতিই সুর তুলে গাইছে নিঃশব্দ কোনো গান। সৈকতে বসে ঢেউয়ের ছন্দে মনটা হারিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু ক্ষুধার তীব্রতা মনে করিয়ে দিল, সামনে অপেক্ষা করছে সুস্বাদু সামুদ্রিক খাবারের আয়োজন!

বারবিকিউয়ের ধোঁয়া, সুগন্ধি মসলার ঘ্রাণ, আর তপ্ত কয়লার ওপর রাখা টাটকা সামুদ্রিক মাছ—এ যেন এক স্বর্গীয় ভোজন। রাত গভীর হলে আমরা ফিরে এলাম রিসোর্টে। আমরা সবাই মিলে এক প্রাণবন্ত আড্ডায় মেতে উঠলাম। গল্প, গান, র‍্যাফেল ড্র—সব মিলিয়ে রাতটা হলো অনবদ্য!

পরদিন খুব ভোরে উঠে পড়লাম, কারণ, এখানে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই অমূল্য। সূর্যের প্রথম রশ্মি যখন সমুদ্রের বুকে প্রতিফলিত হলো, সেন্ট মার্টিন যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। আমরা সাগরের জলে পা ভিজিয়ে, নুড়ি কুড়িয়ে শেষবারের মতো দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম।

দুপুরের খাবার সেরে বিদায়ের প্রস্তুতি নিতে হলো। হৃদয়ে একরাশ বিষাদ, কিন্তু ফিরতেই হবে! জাহাজ যখন ধীরে ধীরে সেন্ট মার্টিন ছেড়ে গেল, আমরা তাকিয়ে রইলাম যতক্ষণ না দ্বীপটা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল। বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি চিরে জাহাজ এগিয়ে চলল কক্সবাজারের পথে। রাতে কক্সবাজার পৌঁছে খাওয়াদাওয়া সেরে ক্যাম্পাসের উদ্দেশে রওনা হলাম। চোখে একরাশ ক্লান্তি, কিন্তু হৃদয়ে একগুচ্ছ স্বপ্নময় স্মৃতি। আমাদের ভ্রমণের সেই অনিন্দ্যসুন্দর দিনগুলো হয়তো ফিরে আসবে না, কিন্তু মুহূর্তগুলো স্মৃতির পাতায় চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে!

* লেখক: শাহরিয়ার কবির রিমন, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া।

‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]