নীলাদ্রি লেকে সুদূরের হাতছানি
নীলাদ্রি লেকের বুকে থাকা ছোট ছোট গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে নদীপথ। লেকের ঘাট থেকে ছেড়ে আসা সব বোট সেই নদীপথ ধরে ছুটে চলেছে শিমুলবাগানে দিকে। উল্টো পথে অনেক ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলে যাচ্ছে টেকের ঘাটের পানে। যেখানে পাথরের হাট বসে। গ্রামের মেয়েরা নানা কাজ সেরে নিচ্ছেন নদীর জলে। কেউ হাঁড়ি-পাতিল পরিষ্কার করছেন, কেউ বাচ্চাদের গোসল করাচ্ছেন, কেউ আবার ডিঙিনৌকায় চড়ে মাছ ধরছেন। কেউবা বড়শি দিয়ে ধরছেন মাছ। দেখতে দেখতে সকালের সোনালি কিরণ ঝলমলিয়ে উঠে এসে আমাদের জানাচ্ছে অভ্যর্থনা।
নৌকা এগিয়ে চলেছে, অদূরে পাহাড়ের সবুজ শিখর। যেন সূর্যের দেখানো পথ ধরে স্বর্গ অভিমুখে যাত্রা। নদীতে আলোকোজ্জ্বল জলরাশি যেন এক স্বর্গীয় দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে।
এখানকার শিশুদের দিনযাপন এ লেক ঘিরেই। তারা দল বেঁধে আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে সমবেত কণ্ঠে। কেউ আবার হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে। যত এগিয়ে যাচ্ছি, বিমোহিত করছে অপরূপ সব প্রাকৃতিক সৃষ্টি। একদিকে মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড় থেকে বেয়ে আসা পাহাড়ি নদী। দুই পাশে শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মতো সব গ্রাম।
নীলাদ্রি লেকের ঘাট থেকে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা চলার পর শিমুলবাগানে গিয়ে পৌঁছাই। স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, জয়নাল আবেদিন ২০০২-০৩ সালের দিকে প্রায় ৩ হাজারের মতো শিমুলগাছ লাগিয়ে এ বাগান তৈরি করেন। এ বাগানকে আরও সুন্দর করে তুলেছে পাশের মেঘালয় পাহাড়-বারিক্কা টিলা আর যাদুকাটা নদী।
সারি সারি শিমুলগাছের ভাদ্র মাসের নতুন পাতায় ভরে ওঠা চিরসবুজ এ বাগান ঘিরে অনেকের জীবিকা নির্ভর করে। কয়েকজন কিশোর এখানে ঘোড়া নিয়ে ঘুরছে দর্শনার্থীদের বাগান ঘোরাতে। কারও কাছ থেকে ৫০ টাকা আবার কারও কাছ থেকে ১০০ টাকার বিনিময়ে। ঘোড়ায় চড়ে পুরো বাগান ঘুরে দেখে দর্শনার্থীরা উপভোগ করছেন অপরূপ দৃশ্য।
দূরন্ত কিশোরীরা শাপলা বিক্রি করছে এ বাগান ঘিরে। কিশোরীরা বাগানের শিমুলগাছের নিচে শাপলা দিয়ে তৈরি করেছে ‘শাপলার কার্পেট’। সেই অভিনব দৃশ্য ধরে রাখতে টাকার বিনিময়ে ছবি তুলছেন যুগলেরা।
সুনামগঞ্জ জেলায় তাহেরপুর উপজেলা হলো মাছ-পাথর-ধানের অন্যতম জোগানদাতা অঞ্চল। এই মৌসুমে মাছ আর পাথরের ওপর ভর করে চলছে তাদের জীবিকা। এখানকার প্রায় অধের্কের বেশি মানুষের জীবিকা কৃষিকাজ ও পাথর উত্তোলন।
আমরা শিমুলবাগান ঘুরে আবার সবাই বোটে উঠে পড়লাম সকালের মিষ্টি রোদ আর অপরূপ সৃষ্টির মধ্যে আমাদের বোট চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম যাদুকাটা ঘাটে। নদীর প্রবহমান স্বচ্ছ পানি, নীল দিগন্ত আর সবুজ পাহাড়, সব মিলিয়ে প্রকৃতির যেন এক অপূর্ব আয়োজন।
নদীর প্রতিটি পাড় যেন প্রকৃতির আপন মহিমায় স্বযত্নে সাজানো। নৌকা দিয়ে ঘোরার সময় যাদুকাটা নদীতে চোখে পড়বে স্থানীয় শ্রমিকদের ব্যস্ত জীবন। সেই সকাল থেকে শুরু হয় তাঁদের কাজ আর সেটা চলতে থাকে সন্ধ্যা অবধি। তাঁদের পেশা নদী থেকে বালু ও পাথর আহরণ করা।
এ অপরূপ সৌন্দর্যের সঙ্গে জনজীবনের এক চিরন্তন মেলবন্ধন। আর এই রূপেই মুগ্ধ হয়ে এই নদীমুখী হন শত শত দর্শনার্থী। এখানে আসা দর্শনার্থীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। স্বচ্ছ পানিতে দর্শনার্থীরা লাইভ জ্যাকেট নিয়ে সাঁতার কাটছেন, কেউ নদীর স্বচ্ছ পানি নিয়ে খেলায় মেতেছেন। একটু দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বর্ষবরণের পানিখেলা চলছে নদীর নানা প্রান্তে।
সেখানে থাকা ডিঙিনৌকায় করে ছোট ছোট পর্যটক দল ঘুরতে যাচ্ছে মেঘালয়ের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে। এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে বেলা গড়িয়ে যায়, তা বোঝার উপায় নেই।
বেলা বাড়তেই হাউসবোট থেকে আমাদের ডাকা হচ্ছিল দুপুরের খাবোরে জন্য। তখন প্রায় বেলা দুইটা। আমরা আস্তে আস্তে সবাই হাউসবোটে ফিরলাম। বোট ছুটে চলছে আপন গতিতে রক্তিম নদী হয়ে, ভেজা কাপড় পরিবর্তন করে সবাই দুপুরের খাবারের জন্য প্রস্তুতি নিলাম। হাউসবোট ঘেঁষে পাথরবোঝাই করা ডিঙিনৌকা ছুটে চলেছে গন্তব্যে।
সন্ধ্যা হতে আরও কিছুটা সময় বাকি। ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপ হাতে গোধূলির আলোয় রক্তিম আকাশ আর সেই আকাশে হেলান দেওয়া দূরের পাহাড় দেখতে দেখতে সবকিছুই যেন ভুলে যাই। পাখিরা ছুটে চলেছে আপন ঠিকানায়, নদীর দুই পারে গরু-ছাগল নিয়ে ঘরে ফিরছে শিশু রাখালেরা। হঠাৎ বিষণ্নতা ভর করে মনে। নিজের অজান্তে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। স্বর্গরাজ্য ছেড়ে আসার বিষাদে ছেয়ে যায় মন।
আমাদের দুদিনের টাঙ্গুয়ার হাওরের পুরো যাত্রায় বাহন ছিল ‘বেহুলা’ হাউসবোট। ঐতিহাসিক চরিত্রের নামে নামকরণ করা বেহুলা হাউসবোটের অন্দরসজ্জায় ছোট্ট একটি আয়নায় লেখা একটি উদ্ধৃতি মনে পড়ে যায়। সুদৃশ্য সে আয়নায় লেখা ছিল, ‘আচ্ছা, তোমার চোখে কি আছে বলো তো? কাজল।’ সুদূর পাহাড়ি কোনো গ্রামে দেখা এক মোহময়ী সুন্দরীর কাজলপরা চোখের মতোই যাদুকাটার জাদু স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরদিন।
**নাগরিক সংবাদ-এ গল্প, ভ্রমণকাহিনি, ভিডিও, ছবি, লেখা ও নানা আয়োজনের গল্প পাঠান [email protected]এ