বৃষ্টিভেজা পথে নিদ্রাচর দ্বীপে

ছবি: লেখকের পাঠানো

ঘুরতে যাওয়ার বেশ কয়েক দিন আগে এক সন্ধ্যায় আমার এক বান্ধবী মেসেজ দিয়ে বলল, ‘সন্ধ্যার পর হলে দেখা করিস।’ সেদিন আমার অন্য একটি কাজ থাকায় আর দেখা করা হয়নি। পরে জানতে পারলাম, ভোলা রোডে বন্ধু-বান্ধবীরা মিলে আলোচনা করে ঠিক করেছে, তারা বরগুনার নিদ্রাচর দ্বীপে যাবে।

রাতেই গ্রুপে একটি মেসেজ এলো—‘বৃহস্পতিবার আমরা নিদ্রাচর দ্বীপে যেতে চাই। যারা যাবে, সবাই সকাল ছয়টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে অপেক্ষা করবে।’ প্রথমে যেতে খুব ইচ্ছা করলেও ভেতরে ভেতরে বেশ ভয় হচ্ছিল। কারণ, আমি সাঁতার জানি না। যেহেতু দ্বীপে যেতে হয়, তাই ইউটিউবে কয়েকটি ভিডিও দেখে নিশ্চিত হলাম সেখানে যেতে ট্রলার লাগে কি না। ভয়কে দূরে সরিয়ে শেষ পর্যন্ত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যাওয়ার আগের রাতেও আমরা নিশ্চিত ছিলাম না, আদৌ যাওয়া হবে কি না। তার ওপর আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল দুই-তিনজনকে ঘুম থেকে ডেকে দেওয়ার। ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে ঘুম থেকে উঠে ৪টা ৩৫ মিনিট থেকেই ফোন করা শুরু করলাম। তবে যাদের ঘুম থেকে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তাদের কথা ভেবে মনে হলো, ভবিষ্যতে আর এমন গুরুদায়িত্ব নেওয়া লাগবে না!

সকাল থেকেই আকাশ ছিল বৃষ্টিস্নাত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আমরা ৯ জন বন্ধু-বান্ধবী অটোতে উঠে রওনা দিলাম রুপাতলীর উদ্দেশে। পাঁচজন বন্ধু—আবদুল্লাহ, জুবায়ের, মেহেদী, সিফাত ও ধীমান; আর চারজন বান্ধবী—আমি, সাদিয়া, নাবিলা ও যূথী। গান, গল্প, ছবি তোলা আর আড্ডার মধ্য দিয়েই শুরু হলো আমাদের যাত্রা। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম প্রকৃতির সান্নিধ্যে। শুনেছিলাম, গন্তব্যে পৌঁছাতে আড়াই ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। কিন্তু পথ যেন শেষই হচ্ছিল না! এরই মধ্যে নাবিলা গাড়িতে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তবে মজার বিষয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তার অসুস্থতার কোনো চিহ্নই আর দেখা গেল না।

আমতলিতে বাস থামলে সবাই নেমে গেলেও আমি আর ঘুমকাতুরে সাদিয়া বসে রইলাম। আমি ব্যাগ পাহারা দিচ্ছিলাম, আর সাদিয়া তখনো আধো ঘুমে। কিছুক্ষণ পর আবার বাস ছাড়ল তালতলির উদ্দেশে। বাস যত ভেতরের দিকে যাচ্ছিল, ততই মনে হচ্ছিল আমরা ব্যস্ত শহরকে পেছনে ফেলে অজানার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। তালতলি থেকে অটো ভাড়া করে পৌঁছালাম ডিসি পয়েন্টে। সেখান থেকেই শুরু হলো কাদামাখা পথ পেরিয়ে হাঁটা। কেউ কেউ খালি পায়ে হাঁটছিল। এর মধ্যেই শুরু হলো ঝমঝম বৃষ্টি। আর ঠিক তখনই প্রথমবারের মতো চোখের সামনে ভেসে উঠল নিদ্রাচর দ্বীপ। মুহূর্তেই মনে হলো, প্রকৃতি যেন তার সব সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে এই ছোট্ট দ্বীপের বুকে। মহান আল্লাহর কী অপরূপ সৃষ্টি! আজও চোখ বন্ধ করলে সেই দৃশ্য ভেসে ওঠে। আমার কাছে নিদ্রাচর দ্বীপ যেন বঙ্গোপসাগরের বুকে ছোট্ট এক সুইজারল্যান্ড। চারদিকে নীল জলরাশি, স্নিগ্ধ বাতাস আর এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল, শুধু তাকিয়েই থাকি; এই দেখা যেন কখনো শেষ না হয়।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

এরই মধ্যে আমার বন্ধুরা গাছে উঠে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর ছবি তোলার দায়িত্ব পড়ল আমার আর যূথীর ওপর। এর আগে কখনো এত কাছ থেকে সাগর দেখা হয়নি বলে আমার একটু ভয় লাগছিল। কিন্তু সাদিয়া, আবদুল্লাহ আর সিফাতের জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত দ্বীপের কিনারে নেমে গেলাম। প্রথমে ভয় পেলেও ধীরে ধীরে সেই ভয় কেটে গেল। বরং সাগরের ঢেউ আর বাতাসের সঙ্গে নিজেকে একাকার মনে হচ্ছিল।

দুপুরে দ্বীপের একটি ছোট হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করলাম। খাবার খুব একটা ভালো না হলেও সকাল থেকে না খেয়ে থাকার কারণে সেটিই তখন আমার কাছে অমৃতের মতো মনে হয়েছিল। এরপর আমরা রওনা হলাম শুভ সন্ধ্যা বিচের উদ্দেশে। সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগল মাত্র দশ মিনিট।

শুভ সন্ধ্যা বিচে আমরা দলবেঁধে ছবি তুললাম, ভিডিও করলাম। গল্প করতে করতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো, তা টেরই পাইনি। ফিরতে একদম মন চাইছিল না। দূরে নৌকা আর ট্রলারগুলোকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে দেখে মনে হচ্ছিল, সময়টা যদি একটু থেমে যেত! সেদিনই প্রথম উপলব্ধি করলাম, সাগরের ঢেউয়ের শব্দ কতটা মনোমুগ্ধকর হতে পারে।

ছবি: লেখকের পাঠানো

অবশেষে সন্ধ্যার পর আমরা অটোতে করে তালতলি ফিরে এলাম। এক কাপ গরম চা খেয়ে মাহেন্দ্রে চড়ে বসলাম আমতলির উদ্দেশে। ফেরার পথটাও ছিল কম রোমাঞ্চকর নয়। রাতের আঁধারে চারবার গাড়ি বদলানো, বন্ধুদের মুখে ভূতের গল্প আর সময়মতো গাড়ি পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে যেন এক অন্য রকম অ্যাডভেঞ্চার। শেষ পর্যন্ত যখন বরিশালগামী গাড়িতে উঠে বসলাম, তখন মনে হলো—দিনটি সত্যিই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বরিশালে ফিরে এসেও বারবার মনে হচ্ছিল, নিদ্রাচর দ্বীপের সেই বৃষ্টিভেজা বিকেল, সাগরের ঢেউয়ের শব্দ আর বন্ধুদের হাসি যেন এখনো আমার সঙ্গে পথ চলেছে। কিছু ভ্রমণ শুধু নতুন জায়গা দেখায় না, বরং স্মৃতির পাতায় আজীবনের জন্য জায়গা করে নেয়।

*লেখক: শিক্ষার্থী, ওরাইনা খাঁন চৌধুরী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়