বেটুস: ঐতিহ্য ও শিকড়ের সন্ধানে নিরন্তর ছুটে চলা
অফিস থেকে বাসা, বাসা থেকে অফিস। এমনই চক্রে ঘুরতে ঘুরতে একসময় মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ছুটির দিন এলেই ঘুম। একটু দেরিতে চা পান আর অলস দুপুর। তারপর আবার সেই আগের জীবন। অফিস আর বাসা। মুঠোফোন আর ইন্টারনেট ব্রাউজিং। এমনই একঘেয়েমির মধ্যেই আচমকা একজনের মাথায় আসে ভিন্ন এক ভাবনা। মাথায় আসে, ঘুম আর খাওয়ার বাইরেও তো অন্য একটা পৃথিবী আছে। সেই পৃথিবী দেখতে হবে, চিনতে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে, অনুভব করতে হবে।
একে একে আজিজুর রহিম খান মিজান, সানু উদ্দিন রুবেল, সাঈদ খান, ইমরান ইমন, শাহ আলম রাফি, ইমরুল কায়েস ও পারভেজ মোশাররফ একত্র হোন। এদিক–ওদিক ঘুরে অবশেষে ভাবনা থেকে জন্ম নেয় এক নতুন পথচলা ‘বেতালা ট্যুরিস্ট সংঘ’ বা বেটুস। নামটি মজার ছলেই দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে নামের ভেতরেই আড্ডা, গান ও প্রকৃতির টানে ছুটে চলার গল্প জমতে থাকে স্মৃতির ডায়েরিতে। শুরুটা খুব কাছের জগৎ দিয়ে। আশপাশের মানুষ, মাটির গন্ধ আর চারপাশের গ্রামীণ জীবন। ঘুরতে ঘুরতে যেন নিজেদেরই নতুন করে খুঁজে পাওয়া। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো এবং পুরোনো বন্ধুত্বের সব স্মৃতি এসে ভিড় জমায় মনের চিলেকোঠায়। পথের বাঁকে ওত পেতে থাকা পুরোনো স্মৃতিগুলোর কল্পনা বাঘের মতো হালুম করে ওঠে।
অফিস শেষে বাসা, কিন্তু ছুটির দিনে আর ঘুমে ডুবে থাকা নয়। প্রকৃতির ডাকে বেরিয়ে পড়া। সিনিয়র–জুনিয়রের বন্ধনে হাঁটা, বসা, দেখা আর শোনা। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের অপার সৌন্দর্যের গল্পে ভরে ওঠে প্রতিটি মুহূর্ত।
সাত সদস্যের বেটুস সংগঠনটির লক্ষ্য শুধু ঘোরাঘুরি নয়। বেটুস চায় আবহমান বাংলার রূপ ও প্রকৃতি দেখতে, লোকসংস্কৃতি জানতে ও গ্রামীণ মানুষের জীবন ছুঁয়ে দেখতে। ভ্রমণ এখানে শুধু বিনোদন নয়; বরং ভ্রমণ মানে শেখা, বোঝা আর অনুভব করা। ভ্রমণ মানে সৃষ্টিকে দেখা। সৃষ্টির রহস্য জানা।
সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের প্রকৃতি ও ইতিহাসের পথে পথে হেঁটেছে বেটুস। কোম্পানীগঞ্জের উৎমা ছড়ার শীতল জলধারা, সবুজের ছায়াঘেরা পাথরের স্তর। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়, প্রকৃতি নিজেই যেন মানুষকে শান্ত হতে বলছে। লালাখালের স্বচ্ছ নীল জলরাশি, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, পাহাড় আর চা–বাগান ও গাছের সারি। নৌকাভ্রমণের দুলুনিতে মন ফিরে যায় শৈশবের হারানো দিনে।
ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান আর বিস্তীর্ণ হাকালুকি হাওর। প্রকৃতি সেখানে নিজেকে মেলে ধরে নানা রঙে। শীতকালে অতিথি পাখির ডাক। বর্ষা শেষে সবুজ বিছানায় মোড়া হাওর। কৃষকের ছুটে চলা। দুপুরের ক্লান্ত রোদে মাঠের কিনারে খাওয়াদাওয়া। রাখালের বাঁশির সুর। এসব দেখে উপলব্ধি হয়, দেশের আনাচকানাচে কত জীবন্ত গল্প পড়ে রয়েছে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
ভোরের আলোয় জৈন্তাপুরের ডিবির হাওর বা শাপলা বিল যেন এক নীরব শীতল কবিতা। প্রেমিকার জোড়া চোখকেও হার মানায় তার সৌন্দর্য। দিগন্তজোড়া লাল শাপলার মধ্যে সীমান্তঘেঁষা পাহাড় আর স্থির জলরাশি খেলা করে মনে আর মননে। কিছু দৃশ্য ভাষায় ধরা পড়ে না, শুধু অনুভবে থেকে যায়। ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ে তার অবয়ব, কিন্তু আবহাওয়ার শীতলতা আর চোখজুড়ানো প্রশান্তি কেবলই বেটুসের।
আবার সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রের গাছের ছায়ায় বসে বোঝা যায়, এই গাছপালাই মানুষের জীবনের নীরব সঙ্গী। ফুল–ফল ভরপুর অথচ তার নুয়ে থাকা মানুষের জন্য সহজ–সরল সুন্দর শিক্ষা। পাঠ্যবইয়ের সেই উক্তি, ফলবান বৃক্ষ নুয়ে থাকে।
ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে বেটুস দাঁড়িয়েছে সিলেটের জৈন্তা রানির পুরোনো ইট–কংক্রিটের শেওলায় জড়িয়ে থাকা জরাজীর্ণ বাড়ি এবং পথের মধ্যে এখনো দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্রামাগারে আবার ফেঞ্চুগঞ্জের কামাখ্যা বাবু বা বাবুর বাড়ির শতবর্ষী কাঠের দোতলা বাড়ির ভিটেতে। পুকুরঘাট। পুরোনো মন্দির। বাড়ির এক কোণে শানবাঁধানো তুলসীগাছ। নীরব নিস্তব্ধ উঠান। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে কখনো দাঁড়িয়েছে সুনামগঞ্জের প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো গৌরাঙ্গ জমিদার বাড়িতে। যেখানে দেয়ালের চিত্র, পুকুরঘাট, জলবারান্দা—সবই একেকটা সময়ের কথা বলে। একসময় হইহুল্লোড়ে মেতে থাকা পুরো বাড়ি এখন সুনসান নীরবতায় পূর্ণ। গান নেই, নাচ নেই, সেই সঙ্গে নেই জলসাঘর। অযত্ন ও অবহেলায় অনেক ইতিহাস আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত পাগলা জামে মসজিদ, যা তিনটি গম্বুজ ও ছয়টি মিনারের জন্য বিখ্যাত। নান্দনিক কারুকার্য। প্রায় শতবর্ষী দেয়াল। মহামুনি নদের শান্ত প্রবাহ। মসজিদে শিশুরা কায়দা ও আমপারায় মগ্ন। দুপুরে মিনারে আজানের ধ্বনি ছড়িয়েছেন মুয়াজ্জিন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ইয়াসিন মির্জা মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মৌলভীবাজার জেলার শমশেরনগরে অবস্থিত ডানকান ব্রাদার্স (বাংলাদেশ) লি. চা–বাগান, যা এখনো ব্রিটিশ কোম্পানির আওতাধীন বলে জানা যায়। পাশেই রয়েছে বিশাল ক্যামেলিয়া লেক। মন্ত্রের জাদুর মতো মানুষকে কাছে টানে। বেটুসের ভ্রমণ যেন প্রকৃতি ও অতীতের সঙ্গে মানুষের এক নীরব সংলাপ। বেটুসের সদস্যরা সেসব জায়গা ঘুরেফিরে মুগ্ধ।
বেটুসের প্রধান আজিজুর রহিম খান মিজান বলেন, ‘ছুটির দিনে প্রকৃতির কোলে সময় কাটানোতেই পাওয়া যায় অপার আনন্দ। গ্রামীণ মানুষ, ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি জানতেই আমাদের এই পথচলা, যা মনকে উৎফুল্ল করার পাশাপাশি জ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে। প্রকৃতিকন্যা সিলেট এবং আমাদের এই অনিন্দ্যসুন্দর মাতৃভূমিকে ভালোবাসার পাশাপাশি এর সৌন্দর্যকে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা আশাবাদী, বেটুসের মাধ্যমে এই নৈতিক দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারব।’
বেতালা ট্যুরিস্ট সংঘ বা বেটুসের পথচলা নিছক ভ্রমণ নয়। এটি প্রকৃতি, ইতিহাস ও মানুষের জীবনের সঙ্গে আত্মিক সংযোগের প্রয়াস। শিকড়ের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতেই বেটুসের সদস্যরা নিজেকেই নতুনভাবে খুঁজে পান।
*লেখক: ইমরান ইমন, সাবেক সভাপতি, এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি