ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বদলে যাচ্ছে পর্যটন

২৭ সেপ্টেম্বর পর্যটন দিবস। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রানি সাজেক। এখানে রাত–দিন সারাক্ষণ প্রকৃতির নানা রূপ উপভোগ করেন পর্যটকেরা। সবুজ গাছপালায় ঢাকা বনের ভেতরে জুমঘরের আদলে তৈরি মাচাং কটেজ থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগও পান ভ্রমণপিপাসুরা। সাজেক পর্যটন কেন্দ্রে, বাঘাইছড়ি, রাঙামাটি, ২৬ সেপ্টেম্বরছবি: সুপ্রিয় চাকমা

ভ্রমণের ধরন বদলেছে, আর সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পর্যটন ব্যবসার চেহারাও। একসময় কোথাও বেড়াতে যাওয়ার আগে পরিচিতজনের পরামর্শ, ট্রাভেল এজেন্টের সহায়তা কিংবা একটি টেলিফোন কলই ছিল ভরসা। এখন একজন মানুষ ঘরে বসেই গন্তব্য সম্পর্কে জানতে পারেন, হোটেলের ছবি ও অতিথিদের মতামত দেখতে পারেন, রুম বুক করতে পারেন, অনলাইনে টাকা পরিশোধ করতে পারেন এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী পুরো ভ্রমণসূচি সাজিয়ে নিতে পারেন।

এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো ডিজিটাল প্রযুক্তি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। ফলে পর্যটন এখন শুধু কোথায় যাবেন—এই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং কখন যাবেন, কোথায় থাকবেন, কী করবেন এবং কীভাবে আরও ভালো অভিজ্ঞতা পাবেন—সেসব সিদ্ধান্তেও প্রযুক্তি ক্রমেই ভূমিকা রাখছে।

ডিজিটাল পরিবর্তনের পথচলা

আজকের এআই-নির্ভর পৃথিবী একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রযুক্তিগত পথচলা। ১৯৫৫ সালে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনায় ‘Artificial Intelligence’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়। পরের বছর, ১৯৫৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজে অনুষ্ঠিত Dartmouth Summer Research Project on Artificial Intelligence আধুনিক এআই গবেষণার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে।

এরপর ১৯৮৯ সালে CERN-এর বিজ্ঞানী টিম বার্নার্স-লি World Wide Web-এর প্রস্তাব দেন। ১৯৯০ সালে প্রথম ওয়েব সার্ভার ও ব্রাউজার চালু হয় এবং ১৯৯১ সালে ওয়েব প্রযুক্তি আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবহারের সুযোগ পায়।

পর্যটনশিল্পও এই পরিবর্তনের বাইরে ছিল না। ১৯৯৬ সালে Expedia অনলাইন ভ্রমণ বুকিংয়ের বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। অনলাইন বুকিংয়ের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পর্যটকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিও বদলাতে থাকে।

আজ সেই পথ এসে দাঁড়িয়েছে মোবাইল প্রযুক্তি, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডেটা বিশ্লেষণ এবং জেনারেটিভ এআইয়ের যুগে।

পর্যটনে এআই কী বদলাতে পারে?

এআইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত বিপুল পরিমাণ তথ্য থেকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত বের করে আনা। একজন পর্যটক কোথায় যেতে চান, তার বাজেট কত, কত দিন থাকবেন বা কী ধরনের অভিজ্ঞতা পছন্দ করেন—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তার জন্য আরও উপযোগী পরামর্শ দেওয়া সম্ভব।

হোটেল ব্যবসায় এর ব্যবহার আরও বিস্তৃত। সম্ভাব্য চাহিদা বোঝা, রুমের মূল্য নির্ধারণে সহায়তা, অতিথির সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ, অনলাইন সেবার উন্নয়ন এবং বিপণনের জন্য সঠিক গ্রাহক খুঁজে নেওয়ার মতো কাজে এআই সহায়ক হতে পারে।

তবে প্রযুক্তি নিজে কোনো জাদুর সমাধান নয়। ভালো তথ্য, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ মানুষ ছাড়া প্রযুক্তির সুবিধাও পুরোপুরি পাওয়া যায় না।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বাংলাদেশের পর্যটনে নতুন সুযোগ

বাংলাদেশের পর্যটনের বড় শক্তি হলো বৈচিত্র্য। কক্সবাজারের সমুদ্র, সুন্দরবনের বন, সিলেটের চা-বাগান, পাহাড়ি অঞ্চল, নদী, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং গ্রামীণ জীবন—সব মিলিয়ে আমাদের হাতে রয়েছে নানা ধরনের পর্যটন পণ্য।

কিন্তু শুধু সুন্দর জায়গা থাকলেই পর্যটন গড়ে ওঠে না। পর্যটকের কাছে তথ্য সহজে পৌঁছাতে হয়, যাতায়াত সুবিধা থাকতে হয়, বুকিং ব্যবস্থা সহজ হতে হয় এবং পুরো ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে যতটা সম্ভব ঝামেলামুক্ত করতে হয়।

এখানে ডিজিটাল প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতে শুধু একটি গন্তব্যের ছবি প্রচার করাই যথেষ্ট হবে না; পর্যটক কী চান, কখন আসছেন এবং কী ধরনের অভিজ্ঞতা খুঁজছেন—সেই তথ্যও কাজে লাগাতে হবে। অর্থাৎ Destination Promotion-এর পাশাপাশি আমাদের ভাবতে হবে Destination Intelligence নিয়ে।

লেখক

ভবিষ্যতের কক্সবাজার: শুধু সমুদ্রসৈকত নয়

কক্সবাজারের নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সমুদ্রসৈকত। সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ আরও বড় করে ভাবার সুযোগ আছে।

আগামী দিনে কক্সবাজারকে একটি সমন্বিত স্মার্ট পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। একজন পর্যটক ঢাকায় বসে যদি বলতে পারেন-‘আমি পরিবার নিয়ে তিন দিনের জন্য কক্সবাজার যাচ্ছি, বাজেট মাঝারি, সমুদ্রের পাশাপাশি প্রকৃতিও দেখতে চাই’-তাহলে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তার জন্য হোটেল, যাতায়াত, সৈকত, হিমছড়ি, ইনানী, মহেশখালী, খাবার, কেনাকাটাসহ একটি সাজানো ভ্রমণসূচি তৈরি করতে পারে।

এ ধরনের ব্যবস্থা পর্যটকের সময় বাঁচাবে, সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ করবে এবং একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসাগুলোকেও পর্যটকের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করবে।

কক্সবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নতুন সম্ভাবনা

কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ পর্যটনের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিমান যোগাযোগ যত সহজ হবে, ততই দেশ-বিদেশের পর্যটকের জন্য গন্তব্যটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে ৬ হাজার ৭৭৫ ফুট থেকে ৯ হাজার ফুটে উন্নীত করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে উন্নয়নের জন্য অবকাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২ অক্টোবর ২০২৫ থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষণা কার্যকর হয়। এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পর্যটনের জন্য নতুন দরজা খুলতে পারে।

তবে বিমানবন্দর বা যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন একা যথেষ্ট নয়। পর্যটক যেন বিমানবন্দর থেকে হোটেল, গন্তব্য ও বিভিন্ন সেবায় সহজে পৌঁছাতে পারেন—সেই পুরো অভিজ্ঞতাটিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

‘বিচ ডেস্টিনেশন’ থেকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য

কক্সবাজারের পর্যটনে একটি বড় সম্ভাবনা হলো পর্যটকের অবস্থানের সময় বাড়ানো। একজন মানুষ শুধু কয়েক ঘণ্টা সমুদ্রসৈকতে কাটিয়ে চলে যাবেন—এর বদলে যদি তাকে দুই-তিন দিনের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা দেওয়া যায়, তাহলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়বে। এর জন্য কক্সবাজারের পর্যটন পণ্যকে কয়েকটি স্তরে ভাবা যেতে পারে—সমুদ্র ও মেরিন অভিজ্ঞতা, প্রকৃতি ও ইকোট্যুরিজম, মহেশখালীসহ উপকূলীয় গন্তব্য, স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতি, ওয়েলনেস ও অবকাশ এবং করপোরেট বা মাইস ট্যুরিজম। তখন কক্সবাজার শুধু ‘সৈকতে বেড়াতে যাওয়ার জায়গা’ থাকবে না; হয়ে উঠতে পারে এমন একটি গন্তব্য যেখানে একই ভ্রমণে পর্যটক প্রকৃতি, খাবার, সংস্কৃতি, অবকাশ ও ব্যবসায়িক আয়োজন—সবকিছুর স্বাদ পাবেন।

স্মার্ট কক্সবাজার মানেই টেকসই কক্সবাজার

পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যটনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা। সমুদ্র, পাহাড়, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করে কোনো গন্তব্য দীর্ঘদিন এগিয়ে যেতে পারে না।

ডিজিটাল প্রযুক্তি এখানে বাস্তব কাজে লাগতে পারে। কোন সময়ে কোথায় পর্যটকের চাপ বেশি, কোথায় বর্জ্য বেশি তৈরি হচ্ছে, কোথায় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা গেলে ব্যবস্থাপনাও উন্নত করা সম্ভব।

অর্থাৎ, স্মার্ট ট্যুরিজমের লক্ষ্য শুধু বেশি পর্যটক আনা নয়; বরং পর্যটনের চাপ, সম্পদ এবং মানুষের প্রয়োজনের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা।

প্রযুক্তি যতই এগোক, আতিথেয়তার জায়গাটি মানুষেরই

পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি শেষ পর্যন্ত মানুষ। একজন পর্যটক অনলাইনে হোটেল খুঁজে পেতে পারেন, এআইয়ের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারেন; কিন্তু একটি আন্তরিক অভ্যর্থনা, একজন কর্মীর সহযোগিতা কিংবা স্থানীয় মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তার অনুভূতি প্রযুক্তি পুরোপুরি তৈরি করতে পারে না। তাই ভবিষ্যতের পর্যটনে প্রযুক্তি ও মানুষকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং এআই, ডেটা ও ডিজিটাল অবকাঠামো মানুষের কাজকে সহজ করবে, আর মানুষ সেই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে অতিথিকে আরও ভালো অভিজ্ঞতা দেবে।

এই ভারসাম্যটিই হবে আগামী দিনের আতিথেয়তার আসল শক্তি।

আগামী দিনের পর্যটন

১৯৫৫-৫৬ সালের এআই গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা থেকে ১৯৮৯ সালের World Wide Web, ১৯৯৬ সালের অনলাইন ট্রাভেল প্ল্যাটফর্ম এবং আজকের জেনারেটিভ এআই-প্রযুক্তির প্রতিটি বড় ধাপ মানুষের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে বদলে দিয়েছে।

বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। বিশেষ করে কক্সবাজারের সামনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সহজ ডিজিটাল সেবা, এআই, ডেটাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, টেকসই পর্যটন এবং দক্ষ মানবসম্পদকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলে কক্সবাজার ভবিষ্যতে আরও আন্তর্জাতিক, আরও স্মার্ট এবং আরও টেকসই পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।

ভবিষ্যতের পর্যটন হবে আরও ডিজিটাল, আরও তথ্যনির্ভর এবং আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পর্যটনের হৃদয়ে থাকবে মানুষ—তার আতিথেয়তা, সংস্কৃতি এবং আন্তরিকতা।

*লেখক: এ কে এম আসাদুর রহমান, বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের প্রধান, হোটেল গ্র্যান্ড প্যাসিফিক