যে ভ্রমণ শেষ হয় না ফেরার পর: জাফলং থেকে মেঘের দেশে
জাফলং থেকে ওপারের পাহাড় দেখে শুরু হয়েছিল স্বপ্ন। নিজেরাই পরিকল্পনা করে তামাবিল পেরিয়ে মেঘালয়ের পাহাড়, ঝরনা, গুহা, জীবন্ত সেতু আর খাসি সংস্কৃতির কাছে পৌঁছানো—আর ফেরার পথে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য ট্রেন মিস করেও আবিষ্কার, ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো কখনো কখনো পরিকল্পনার বাইরেই তৈরি হয়। ভ্রমণপ্রেম, লেখালেখি এবং দাম্পত্যের সঙ্গ—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতার কথা এখানে বলেছি।
ভ্রমণ আমাদের কাছে শুধু নতুন কোনো জায়গায় গিয়ে ছবি তোলা নয়। নতুন জায়গার প্রকৃতি, মানুষ, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ইতিহাসকে বোঝার চেষ্টা—সব মিলিয়েই আমাদের ভ্রমণ। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দেশের বাইরে প্রথম ভ্রমণ ছিল মেঘালয়ে। পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সীমান্ত পেরোনো, পাহাড়ি পথে ঘোরা, স্থানীয় মানুষের জীবন দেখা, খাবার চেখে দেখা—সবকিছুই হয়ে উঠেছিল আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা।
প্রশ্ন: মেঘালয় যাওয়ার ইচ্ছাটা কীভাবে তৈরি হলো?
উত্তর: প্রথমে আমরা মেঘালয় যাই, পরে প্রায় এক বছর পর দার্জিলিংয়ে গিয়েছি। দার্জিলিং যাওয়ার ইচ্ছা অবশ্য অনেক আগে থেকেই ছিল। তবে মেঘালয়ের প্রতি আগ্রহটা তৈরি হয় আমাদের প্রথম সিলেট ভ্রমণের পর।
জাফলং থেকে আমরা ঝুলন্ত সেতু, জৈন্তা পাহাড়, ওপারের মেঘালয় এবং উমগট নদী—এসব দেখেছিলাম। তামাবিল সীমান্তের ওপারেই যে এতটা অন্য রকম একটা পৃথিবী, সেটা বাংলাদেশ থেকেই দেখতে পেয়েছিলাম। তখনই মনে হয়েছিল, পরের কোনো এক ভ্রমণে মেঘালয় যাব।
এরপর আমরা অনেক মেঘালয় ভ্রমণের ভ্লগ দেখি। বিশেষ করে বাংলাদেশি কাপল ভ্লগারদের ভিডিও আমাদের অনেক সাহায্য করেছে। সেখান থেকেই জায়গাগুলো সম্পর্কে ধারণা নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করি।
প্রশ্ন: পরিকল্পনাটা কীভাবে করেছিলাম?
উত্তর: সিলেট থেকে ফেরার পরই আমরা মেঘালয় ভ্রমণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। কিছুদিন টাকা জমিয়েছি। ভিসার ক্ষেত্রেও তামাবিল পোর্ট যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে আমাদের নিজেরাই অনেক খোঁজ নিতে হয়েছে। কোন পোর্ট দিয়ে যাওয়া যাবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে—এসব ভ্লগ ও অনলাইন তথ্য দেখে নিজেরাই করেছি।
যেসব জায়গায় যেতে চাই, সেগুলো প্রথমে ভ্লগ দেখে তালিকা করেছি। এরপর গুগল মেপসে জায়গাগুলো খুঁজে বের করে মার্ক করেছি। কোন দিনে কোন জায়গায় যাব, কোন রুটে গেলে একসঙ্গে বেশি জায়গা দেখা যাবে—এসব হিসাব করে একটা টাইমলাইন বানিয়েছিলাম। যাতায়াতের জন্য কিছুটা বাড়তি সময়ও রেখেছিলাম।
এমনকি বিভিন্ন ভ্লগ থেকে হোটেল, হোমস্টে বা লজের নম্বর সংগ্রহ করে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে আগে থেকেই বুকিং করেছি। পুরো ভ্রমণটাই অনেকটা ডিজিটাল পরিকল্পনার মধ্যে ছিল।
প্রশ্ন: তামাবিল সীমান্ত পেরিয়ে মেঘালয়ে ঢোকার অভিজ্ঞতা
উত্তর: মেঘালয় ভ্রমণটা আমাদের জন্য অন্য রকম উত্তেজনার ছিল। কলকাতা গিয়েছিলাম আগে, কিন্তু সেগুলো অনেকটা শহরকেন্দ্রিক বা কাজের ভ্রমণও ছিল। মেঘালয় ছিল আমাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিদেশভ্রমণ।
ঢাকা থেকে রাতে বাসে সিলেট যাই। ভোরে হারুন চত্বরে নেমে রিকশায় পানশিতে গিয়ে নাশতা করি। তখন হালকা ঠান্ডা। এরপর পানশির সামনে থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে সিএনজি নিয়ে তামাবিল সীমান্তে যাই।
তামাবিল যাওয়ার রাস্তার দুই পাশে মালনীছড়া চা-বাগান, সুন্দর গ্রাম, বিল—সব মিলিয়ে পথটাও খুব সুন্দর ছিল। তামাবিল সীমান্তও বেশ শান্ত ও সুন্দর, খুব বেশি ভিড় ছিল না।
বাংলাদেশ অংশে ইমিগ্রেশন ও বিজিবির চেকিং শেষ করে ভারতের দিকে যাই। সেখানে বিএসএফ চেকিংয়ের পর একটু দূরে থাকা ইমিগ্রেশন ভবনে যেতে হয়। ভবনটাও বেশ সুন্দর। পর্যটকদের মাইক্রোবাস বা ছোট গাড়িতে করে পর্যায়ক্রমে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়, ইমিগ্রেশন শেষে আবার ফিরিয়ে আনা হয়।
তারপর ডাউকি বাজারে গিয়ে আগের কলকাতা ভ্রমণে কেনা ভারতীয় সিম রিচার্জ করি। অন্য একটি দলের সঙ্গে প্রাইভেট গাড়ি শেয়ার করে প্রথম দিনের যাত্রা শুরু করি।
প্রশ্ন: ডাউকি ব্রিজ প্রথমবার নিজেরা পার হওয়ার অনুভূতি
উত্তর: এটা সত্যিই অন্য রকম অনুভূতি ছিল। জাফলং থেকে আমরা আগে এই ব্রিজ দেখেছি। বাংলাদেশ থেকে দাঁড়িয়ে যে ব্রিজটাকে দেখেছিলাম, এবার সেটার ওপর দিয়ে নিজেরাই যাচ্ছি—এই ব্যাপারই খুব উত্তেজনাপূর্ণ ছিল।
ব্রিজে গাড়ি থামানো যায় না। নিরাপত্তার কারণে দুই দিক থেকে একসঙ্গে গাড়ি চলাচলও হয় না। তাই ব্রিজ পার হওয়ার মুহূর্তটা বেশ আলাদা লেগেছিল।
ডাউকি থেকে বোরহিল জলপ্রপাতের দিকে যাওয়ার সময় পাহাড়ি রাস্তা, দুই পাশে পরিকল্পিত সুপারি বাগান আর দূরে বাংলাদেশের সমতলভূমি—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা অসাধারণ ছিল।
প্রশ্ন: মাওলিননং ও লিভিং রুট ব্রিজের অভিজ্ঞতা
উত্তর: মাওলিননং বেশ পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর। সেখানে গিয়ে প্রথমে খাওয়াদাওয়া করি, তারপর ঘুরি। জায়গাটায় পর্যটকদের জন্য কিছুটা সাজানো পরিবেশ যেমন আছে, তেমনি স্থানীয় ও আদিবাসী জীবনযাপনের ছাপও দেখা যায়।
একটা জায়গা ছিল ‘বাংলাদেশ ভিউ’। বাঁশের তৈরি একটা ওয়াচটাওয়ার থেকে বাংলাদেশের অনেকটা অংশ দেখা যায়। সেখানে কলকাতা থেকে আসা একটি পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। মধ্যবয়সী এক নারী বলছিলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষের বাড়ি বাংলাদেশে। কথাটা শুনে জায়গাটার সঙ্গে হঠাৎ একটা অন্য রকম আবেগ তৈরি হয়।
এরপর কাছেই একটি লিভিং রুট ব্রিজ দেখতে যাই। আমার কাছে এটা প্রকৃতি আর মানুষের যৌথ প্রকৌশলের অসাধারণ উদাহরণ মনে হয়েছে। গাছের শিকড়কে ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া জীবন্ত সেতু, নিচে পাহাড়ি স্রোত-পুরো ব্যাপারটাই অসাধারণ।
সেদিনের শেষ গন্তব্য ছিল চেরাপুঞ্জি বা সোহরা।
প্রশ্ন: সোহরায় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
উত্তর: সোহরায় সেই রাতটা আমাদের ভ্রমণের অন্যতম সুন্দর রাত। প্রচণ্ড ঠান্ডা ছিল। আকাশ ছিল একদম পরিষ্কার, আলোক দূষণ প্রায় ছিল না বললেই চলে। জীবনে এত বেশি তারা একসঙ্গে সম্ভবত আগে দেখিনি।
আমার মনে হয়েছে, প্রকৃতির কাছে গেলে সাধারণ জিনিসও কত অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে, সেটা ভ্রমণ না করলে বোঝা যায় না।
প্রশ্ন: সোহরার পরের দিন কী কী দেখেছিলাম?
উত্তর: খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিলাম। আমাদের পুরো দিনের পরিকল্পনা আগে থেকেই করা ছিল। যে হোমস্টেতে ছিলাম, সেটার অবস্থানই ছিল অসাধারণ—পাহাড়ি রাস্তার একটা বাঁকে, সামনে গভীর গিরিখাত, যত দূর চোখ যায় পাহাড়।
সকালে প্রচণ্ড ঠান্ডা, কিন্তু রোদ ঝলমলে। প্রথমে যাই সেভেন সিস্টার্স ফলসে। খারাপ লাগার বিষয় হলো, আমরা ভুল সময়ে গিয়েছিলাম-ঝরনায় পানি ছিল না। তবে ভিউটা এত সুন্দর ছিল যে হতাশা পুরোপুরি থাকেনি। সেখানে ধাবায় বসে চা আর ম্যাগি খেয়েছিলাম।
এরপর মাওসমাই গুহা। দুজনের জন্যই সেটা ছিল প্রথম গুহা দেখার অভিজ্ঞতা। অনেক পর্যটকের সঙ্গে ভেতরে ঢুকেছিলাম।
তারপর নোহকালিকাই ফলস। জায়গাটার সঙ্গে স্থানীয় নানা গল্প ও মিথ জড়িয়ে আছে। পানির প্রবাহ খুব বেশি না থাকলেও পুরো জায়গাটার সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করেছে।
প্রশ্ন: স্থানীয় মানুষ ও তাঁদের সংস্কৃতি আপনাদের কেমন লেগেছে?
উত্তর: খাসি মানুষদের আমাদের কাছে বেশ বন্ধুসুলভ, নরম স্বভাবের ও হাসিখুশি মনে হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের জীবনযাপন যে সহজ নয়, সেটাও বোঝা যায়।
পর্যটকদের সঙ্গে তাঁদের ব্যবহার ভালো লেগেছে। এটা তাঁদের জীবিকা বা পেশার অংশ—সেটা আমরা বুঝি, কিন্তু তারপরও একটা আন্তরিকতা চোখে পড়েছে। কোথাও আমাদের সঙ্গে প্রতারণা বা খারাপ ব্যবহার হয়েছে—এমন অভিজ্ঞতা হয়নি।
গাড়ি ভাড়া নিয়ে দরদাম করার সময়ও চালকদের রূঢ় হতে দেখিনি। বরং কোনো জায়গায় আমরা বেশি সময় কাটালে তাঁরা তাড়া না দিয়ে অনেক সময় নিজেরাই গাইডের মতো করে জায়গাগুলো দেখিয়েছেন।
আর একটা বিষয় খুব চোখে পড়েছে—অনেক দোকানেই পরিবারের নারীরাই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। খাবারের দোকান হোক বা অন্য কোনো দোকান, নারীদের অংশগ্রহণ বেশ বেশি মনে হয়েছে।
প্রশ্ন: খাবারের ক্ষেত্রে কী কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল?
উত্তর: খাবারের ব্যাপারে শুরু থেকেই আমাদের একটু সতর্ক থাকতে হয়েছে। ভারতে ভ্রমণের সময় আমরা সাধারণত মাংসজাত খাবার এড়িয়ে চলি।
মাওলিননংয়ে মাছ পাওয়া গিয়েছিল, তাই সেখানে খেতে সুবিধা হয়েছে। সোহরার হোমস্টেতে ডিম চেয়ে খেয়েছি। আর পুরো মেঘালয় ভ্রমণটা যেন অনেকটা ডিমের ওপরই চলেছে!
মোমো আমাদের দুজনেরই খুব পছন্দ। তাই ভেজ মোমো খাওয়ার ইচ্ছা ছিল। ম্যাগিও অনেক খেয়েছি। বাংলাদেশের শুকনা ম্যাগির তুলনায় ওখানে ম্যাগি অনেকটা স্যুপের মতো করে বানায়, ঠান্ডার মধ্যে সেটা দারুণ লেগেছে।
প্রায় সব জায়গাতেই ভেজ থালি, ডিমের কারি, এগ ব্রেড—এসব সহজে পাওয়া গেছে। খুব বেশি তেলঝাল বা ভারী খাবারও চোখে পড়েনি।
প্রশ্ন: পুরো ভ্রমণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
উত্তর: চেরাপুঞ্জির রাস্তা কিছুটা খারাপ ছিল-ভাঙাচোরা ও ধুলোময়। শিলং শহরও তুলনামূলকভাবে বেশি ঘিঞ্জি ও ব্যস্ত মনে হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় সমস্যার একটি ছিল টাকাপয়সা। শিলংয়ে গিয়ে সহজে টাকা বদলাতে পারছিলাম না। কার্ডও ঠিকমতো কাজ করছিল না। ফলে টাকা কনভার্ট করা নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল।
প্রশ্ন: শিলংকে সোহরার তুলনায় কেমন লেগেছে?
উত্তর: একেবারেই আলাদা। সোহরা যেখানে পুরোপুরি প্রকৃতিনির্ভর, শিলং অনেক বেশি শহুরে। শপিং মল, মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে শহরের পরিবেশ।
আমাদের হোটেল অবশ্য মূল শিলং থেকে কিছুটা দূরে ছিল। হোটেলের আশপাশের পরিবেশ বেশ সুন্দর ছিল।
প্রশ্ন: একজন পর্যটক আর একজন ভ্রমণবিষয়ক লেখকের মধ্যে আমাদের নিজের পার্থক্যটা কোথায়?
উত্তর: আমি ভ্রমণে গিয়ে শুধু জায়গাটা দেখে ফিরে আসতে পারি না। আমার আগ্রহ তৈরি হয় যখন এমন কিছু দেখি, যা আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের বাইরে-কোনো বিশ্বাস, ঐতিহ্য, প্রতীক, মিথ বা কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি।
মেঘালয়ে প্রথমদিকে একটা মোরগ বা মুরগির প্রতীক অনেক জায়গায় দেখেছিলাম। তখন ছবি তুলে রেখেছিলাম। পরে সেটা নিয়ে খোঁজ করতে গিয়ে ‘Seng Khasi’ আন্দোলন ও তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্ক জানতে পারি। এটা নিয়ে পরে প্রথম আলোতেও লিখেছি।
মেগালিথও একইভাবে আগ্রহ তৈরি করেছিল। মেঘালয়ের ইতিহাস, খাসি, জৈন্তিয়া ও গারো পাহাড়—এসব নিয়েও জানার চেষ্টা করেছি।
প্রশ্ন: এসব বিষয়ে তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করি?
উত্তর: স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু ভাষাগত সীমাবদ্ধতা আছে। আবার অনেক স্থানীয় মানুষ নিজের সংস্কৃতি বা ইতিহাস নিয়ে বিদেশি পর্যটকের সঙ্গে খুব বেশি কথা বলতে আগ্রহীও হন না।
তাই অনেক সময় বই ও ইন্টারনেটের সাহায্য নিতে হয়। যেমন মোরগের প্রতীকটা প্রথমে শুধু চোখে পড়েছিল। ছবি তুলে রেখেছিলাম, পরে ফিরে এসে গবেষণা করেছি। মেগালিথের ক্ষেত্রেও একই কাজ করেছি।
প্রশ্ন: কখন ঠিক করলাম যে মেঘালয় ভ্রমণ নিয়ে লিখবেন?
উত্তর: আসলে ফেরার পথেই ঠিক করেছিলাম, এই ভ্রমণ নিয়ে অবশ্যই লিখতে হবে। ফেরার বাসে বসেই কিছু প্রাথমিক গবেষণা শুরু করি। কারণ, তখনো সবকিছু একদম টাটকা মনে ছিল। সাধারণ জীবনে ফিরে গেলে অনেক ছোট ছোট বিষয় ভুলে যেতে পারি।
একসময় আমি ব্লগ লিখতাম। এখন অবশ্য ভ্লগের সময়, আমরাও ভ্লগ করার চেষ্টা করি। অনেক ছবি ও ছোট ভিডিও তুলি। কিন্তু ব্লগ বা ভ্রমণ বিষয়ে লেখার একটা আলাদা অনুভূতি আমার কাছে এখনো আছে।
আর কোনো লেখা যখন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়, বিশেষ করে প্রথম আলোর নাগরিক সংবাদের মতো জায়গায়, তখন একটা আলাদা ভালো লাগা কাজ করে।
প্রশ্ন: আমাদের দুজনের ভ্রমণ চিন্তা
উত্তর: আমার স্ত্রী আমার চেয়েও বেশি ভ্রমণপ্রেমী। সে জায়গাটাকে সঙ্গে সঙ্গে উপভোগ করার দিকে বেশি মনোযোগী। আমি হয়তো একটা জায়গা দেখে ভাবছি, এর ইতিহাস কী, এই প্রতীকটার অর্থ কী—আর সে তখন জায়গাটার সৌন্দর্য উপভোগ করছে, ছবি তুলছে, ভিডিও করছে।
তবে আমার এই গবেষণা বা লেখার আগ্রহকে সে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। আমি কোনো বিষয় নিয়ে বললে সে আগ্রহ নিয়ে শোনে, প্রশ্ন করে, আলোচনায় থাকে।
আমাদের ভ্রমণের পরিকল্পনাও দুজন মিলে করি। সাধারণত প্রাথমিক পরিকল্পনাটা সে বেশি করে, আর বাস্তবে কোথায় কীভাবে যাব, সময় বা পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি একটু যুক্ত থাকি।
প্রশ্ন: মেঘালয় থেকে ফেরার পথেও কি কোনো স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছিল?
উত্তর: আমাদের পরিকল্পনা ছিল তামাবিল থেকে সিলেট ফিরে বিকেলের ট্রেনে ঢাকায় ফিরব। সেই অনুযায়ী ট্রেনের টিকিটও কাটা ছিল।
তামাবিল থেকে স্টেশনের দিকে যাওয়ার পথেই বুঝতে পারছিলাম, হয়তো ট্রেনটা মিস হয়ে যাবে। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে একটু মনোমালিন্যও হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য ট্রেনটা মিস করি। এটা ছিল আমাদের জন্য প্রথমবারের মতো কোনো ট্রেন সময়মতো ছেড়ে যাওয়ার কারণে সমস্যায় পড়া!
পরে আমরা বুঝলাম, এত সুন্দর একটা ভ্রমণকে এই ছোট্ট ঘটনার কারণে নষ্ট হতে দেওয়া ঠিক হবে না। তাই সিলেট শহরে ফিরে যাই। যেহেতু সিলেট আমাদের দুজনেরই পছন্দের জায়গা, তাই মনটাও খুব বেশি খারাপ থাকেনি।
পানশিতে খাওয়াদাওয়া করি। এরপর পানশির বিপরীতের পার্কে রাত পর্যন্ত বসে থাকি। রাতে বাসে করে ঢাকায় ফিরি।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ফেরার সময় ওই অপেক্ষাটাও পরে আমাদের ভ্রমণের অন্যতম সুন্দর মুহূর্ত হয়ে যায়। আমরা পুরো সময়টা নিজেদের মধ্যে ভ্রমণের গল্প করেছি, ভালো লাগাগুলো শেয়ার করেছি, একে অপরকে সময় দিয়েছি।
তখন মনে হয়েছিল, ভ্রমণের সৌন্দর্য শুধু গন্তব্যে নয়। কখনো কখনো ফেরার পথে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অপেক্ষাও ভ্রমণের অংশ হয়ে যায়। আর সেই মুহূর্তগুলোই পরে সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।
প্রশ্ন: শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে ভ্রমণের আসল আনন্দটা কোথায়?
উত্তর: সবকিছুতেই। নতুন জায়গা দেখা যেমন আনন্দের, তেমনি সেই জায়গাটাকে বোঝার চেষ্টা করাও আনন্দের। ছবি, ভিডিও, গল্প—সবই থেকে যায়।
তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, একটা ভ্রমণ শেষ হওয়ার পরও তার কিছু অংশ আমাদের সঙ্গে থেকে যায়। কখনো কোনো দৃশ্য, কখনো কোনো মানুষের কথা, কখনো কোনো গল্প বা কোনো নতুন উপলব্ধি।
আমাদের কাছে ভ্রমণ তাই শুধু একটা জায়গায় গিয়ে ফিরে আসা নয়; বরং কিছুদিনের জন্য নিজের পরিচিত পৃথিবী থেকে বেরিয়ে অন্য একটা পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখা, বোঝা এবং তারপর সেই অভিজ্ঞতাটা নিজেদের জীবনের অংশ করে নিয়ে ফিরে আসা।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]