আমার দেখা বার্সেলোনার সাগরাদা ফামিলিয়া : গাউদীর অসমাপ্ত মহাকাব্য

১৩ নভেম্বর ২০২৫, বার্সেলোনা ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন। সকাল ১০টায় আমরা তিন মাসের নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে বের হলাম মন্টজুইক ক্যাসল দর্শনে। মন্টজুইক পাহাড়ের উচ্চতা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লা সাগরাদা ফামিলিয়া (La Sagrada Familia) যখন দেখছিলাম, তখনই মনে হয়েছিল সুউচ্চ এই গির্জা কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি সময়ের সঙ্গে চলমান এক জীবন্ত কাহিনি।

লা সাগরাদা ফামিলিয়া শুধু একটি চার্চ নয় এটি বার্সেলোনার আকাশরেখায় দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত স্থাপত্য ইতিহাস, যা প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। এর সৌন্দর্য, জটিল নকশা এবং নির্মাণের দীর্ঘ যাত্রা একে পৃথিবীর অন্যতম অনন্য স্থাপত্যে পরিণত করেছে।

বিকেলের রোদের রক্তিম আলোতে গির্জার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমি যেন একসঙ্গে বর্তমান ও অতীতে দাঁড়িয়ে আছি। কোথাও সুউচ্চ মিনার, কোথাও বিশাল ক্রেন আর ঝুলে থাকা লোহার কাঠামো—এই অসমাপ্ত দৃশ্যই প্রথমে চোখে পড়ে।

আমার মেয়ে আনিকা ২০২২ সালে বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স অধ্যয়নকালে বহুবার এখানে এসেছে। তাই ভ্রমণগাইড হিসেবে আনিকা ও তাঁর জামাতা অনিতের অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিক বর্ণনা আমাকে লিখতে সহায়তা করেছে। প্রবেশদ্বারে থাকা স্প্যানিশ ও ইংরেজি ভাষার তথ্যপত্র থেকেও অনেক তথ্য সংগ্রহ করি।

আইসাম্পলে এলাকায় অবস্থিত এই গির্জা ও আশপাশের মূল নির্মাণ এলাকার আয়তন আনুমানিক ৪,৫০০–৫,০০০ বর্গমিটার। গির্জার প্রধান ‘জিসাস টাওয়ার’-এর পরিকল্পিত উচ্চতা ১৭২.৫ মিটার। সম্পন্ন হলে এটি ইউরোপের সর্বোচ্চ গির্জা হবে। গাউদী ইচ্ছাকৃতভাবেই এটিকে মন্টজুইক পাহাড়ের উচ্চতার চেয়ে সামান্য কম রেখেছিলেন—তাঁর মতে, মানুষের সৃষ্টি কখনোই ঈশ্বরের সৃষ্টিকে অতিক্রম করা উচিত নয়।

নাগরিক সংবাদ–এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

১৮৮২ সালে নির্মাণ শুরু হওয়ার পর আজও সাগরাদা ফামিলিয়া অসমাপ্ত। এটি কখনোই রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ছিল না, শুরু থেকেই সম্পূর্ণ দাননির্ভর। মানুষের অনুদানই এর প্রধান শক্তি। ফলে অর্থের প্রাপ্যতা অনুযায়ী কাজ এগিয়েছে ধীরগতিতে।
এ পর্যন্ত দান ও দর্শনার্থীদের টিকিট বিক্রির অর্থ মিলিয়ে আনুমানিক এক বিলিয়ন ইউরোর বেশি ব্যয় হয়েছে বলে জানা যায়। সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই; কারণ, শতাধিক বছর ধরে ধাপে ধাপে নির্মাণ চলছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী কেন্দ্রীয় টাওয়ারের উচ্চতা ১৬২.৯১ মিটারে পৌঁছেছে, যা উলম মিনস্টার (১৬১.৫৩ মিটার)-কে অতিক্রম করেছে। পূর্ণ উচ্চতায় পৌঁছালে এটি ইউরোপের সর্বোচ্চ গির্জা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

বার্সেলোনায় ছড়িয়ে থাকা গাউদী

কেবল সাগরাদা নয়, বার্সেলোনার আরও কয়েকটি স্থানে গাউদীর সৃষ্টি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল। তখন বুঝলাম—গাউদী কোনো একক স্থাপনার স্থপতি নন তিনি যেন পুরো শহরটিকেই নিজের ক্যানভাসে রূপ দিয়েছেন।

পার্ক গুয়েলে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছিল, যেন রূপকথার ভেতরে ঢুকে পড়েছি। বাঁকানো বেঞ্চ, রঙিন মোজাইক, অদ্ভুত প্রাণীর মূর্তি—সবকিছুতেই শিশুসুলভ কল্পনা ও সুচিন্তিত নকশার মেলবন্ধন।

কাসা বাত্লোর ঢেউখেলানো দেয়াল ও হাড়ের মতো বারান্দা ভবনটিকে জীবন্ত করে তোলে। আর কাসা মিল–লা পেদ্রেরার পাথুরে ঢেউ ও ছাদের ভাস্কর্য গাউদীর সাহসী ও ভবিষ্যতধর্মী চিন্তার পরিচয় দেয়।

গাউদীর নকশায় সরল রেখা প্রায় নেই। কলামগুলো গাছের কাণ্ডের মতো উঠে গেছে, ছাদ শাখা-প্রশাখার মতো বিস্তৃত। প্রকৃতির ভেতরেই তিনি ঈশ্বরকে অনুভব করতেন—সেই দর্শনই সাগরাদা ফামিলিয়াকে দিয়েছে অনন্য রূপ।

গাউদী: মানুষ ও সাধনা—

আন্তোনি গাউদী ছিলেন নিভৃতচারী ও গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ স্থপতি। জাঁকজমক তাঁর জীবনে ছিল না; ছিল সাধনা ও আত্মনিবেদন। ১৯২৬ সালে এক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। সাধারণ পোশাকের কারণে তাঁকে প্রথমে ভবঘুরে ভেবে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তিন দিন পর তাঁর মৃত্যু হলে বার্সেলোনা বুঝতে পারে, তাঁরা কাকে হারিয়েছে।

জীবনের শেষভাগে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে সাগরাদা ফামিলিয়ার কাজেই নিজেকে নিবেদন করেন। তিনি জানতেন, এই গির্জার কাজ তাঁর জীবদ্দশায় শেষ হবে না। তবু থেমে যাননি—কারণ এটি ছিল তাঁর ঈশ্বরনিবেদিত সাধনা।

গাউদীর মৃত্যুর পর ১৯৩৬ সালের স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে গির্জার বহু নকশা ও মডেল ধ্বংস হয়। পরবর্তী স্থপতিরা ভাঙা মডেল, আলোকচিত্র ও তাঁর দর্শনের সূত্র ধরে কাজ এগিয়ে নেন। বর্তমানে কম্পিউটার মডেলিং, থ্রিডি প্রিন্টিং ও আধুনিক প্রকৌশল নির্মাণকাজে নতুন গতি এনেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালে মূল কাঠামো সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গির্জার ভেতরে প্রবেশমূল্য বেশ উচ্চ হওয়ায় আমরা ভেতরে যাইনি। সারাদিন হাঁটা, স্ট্রলারে তিন মাসের রূপকথাকে নিয়ে ঘোরা—সব মিলিয়ে ক্লান্ত ছিলাম। সহধর্মিণীর সঙ্গে গির্জার সামনে বেঞ্চে বসে বিশ্রাম নিয়েছি। অস্তগামী সূর্যের আলো রঙিন কাচ ভেদ করে যখন স্তম্ভে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন গির্জাটি আর নির্মাণাধীন মনে হচ্ছিল না—বরং এক নীরব প্রার্থনাস্থল।

কয়েক ঘণ্টা সেখানে কাটিয়ে রাতে ফিরে আসার সময় মনে হয়েছে—এর সৌন্দর্য সম্পূর্ণতায় নয়, অসমাপ্ততায়। গাউদীর স্বপ্ন, মানুষের দান ও শত বছরের অপেক্ষা মিলিয়ে এটি শেখায়—কিছু সৃষ্টি শেষ হওয়ার জন্য নয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকার জন্য জন্ম নেয়। (১৩ নভেম্বর ২০২৫–ভ্রমণোত্তর ইতিহাস ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাভিত্তিক লেখা)।

  • লেখক: শাহ জালাল ফিরোজ, হ্যালেনবাড, স্টুটগার্ট