৫৯ জনের ‘হরিকেল অভিযাত্রা’

সাদাপাথরের ধলাই নদের জলে ভ্রমণসঙ্গীদের একসঙ্গে কাটানো সময়ছবি: লেখক

দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা, নানা পরিকল্পনা আর প্রস্তুতির পর ঠিক হলো, এবারের ব্যাচ ট্যুর হবে শ্রীহট্টে। কোথায় যাব, কীভাবে যাব, কোথায় থাকব, এসব নিয়ে চলল বেশ কিছুদিনের আলোচনা। গন্তব্য ঠিক হওয়ার পর ট্যুরের নাম নিয়েও ভাবনা শুরু হলো। শেষ পর্যন্ত নাম দেওয়া হলো ‘হরিকেল অভিযাত্রা’।

নাম ঠিক হলেও তখনো অভিযাত্রা শুরু হয়নি। বরং শুরু হলো প্রস্তুতির সবচেয়ে কঠিন পর্ব। ৫৯ জনকে একসঙ্গে নিয়ে যাত্রার ব্যবস্থা করা।

টিকিটের ঝামেলায় শুরু

৫৯ জনের বিশাল দল। সবাই একসঙ্গে ট্রেনে যেতে চাই। সে জন্য দুটি বগির ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলল। কিন্তু দুই দিন চেষ্টা করেও বগির সুরাহা হলো না। এবার বিকল্প ভাবনা। কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, সকাল আটটায় সবাই একত্র হয়ে রেলওয়ের অ্যাপে টিকিট কাটতে হবে।

আমাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ঘুমকাতুরে আরও প্রায় ২০ জনকে একসঙ্গে করা হলো এই কাজে। নির্ধারিত সময়ে সবাই মিলে অনলাইনে টিকিট কাটার মিশনে বসে গেলাম। শেষ পর্যন্ত ৫৯ জনের টিকিট কাটা হলো। কিন্তু স্বস্তি মিলল না। একেকজনের টিকিট পড়ল একেক বগিতে। ৫৯ জনের দল, অথচ ট্রেনে উঠেই সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে!

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

এত কিছুর পরও অবশ্য যাত্রার উৎসাহে ভাটা পড়েনি। থাকার জায়গাও আগে থেকে ঠিক করা হয়েছিল সিলেট শহরের দরগাগেটের পাশে। শহরের মধ্যে হওয়ায় বিভিন্ন দিকে যাতায়াতের সুবিধা হবে, এই হিসাবেই হোটেলটি বেছে নেওয়া হয়েছিল।

সব প্রস্তুতি শেষ করে ২ সেপ্টেম্বর রাতে ৫৯ জনের বহর হাজির কমলাপুর রেলস্টেশনে। রাত সাড়ে ১০টার উপবন এক্সপ্রেসে শুরু হলো শ্রীহট্টের পথে যাত্রা।

রাতের ট্রেন। জানালার বাইরে অন্ধকার, ভেতরে পরিচিত মুখগুলোর আড্ডা। কেউ গল্প করছে, কেউ ঘুমানোর চেষ্টা করছে, কেউ আবার পরদিনের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত। এভাবেই কেটে গেল রাত।

পরদিন সকাল আটটার দিকে ট্রেন এসে থামল সিলেট স্টেশনে। আগে থেকে ঠিক করে রাখা লেগুনায় চেপে সবাই চলে এলাম হোটেলে। ফ্রেশ হয়ে, কিছুটা বিশ্রাম ও খাওয়াদাওয়া সেরে শুরু হলো ‘হরিকেল অভিযাত্রা’র প্রথম দিনের অভিযান।

কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রার আগে ৫৯ জনের বহর
ছবি: লেখক

বৃষ্টিভেজা মালনীছড়া

প্রথম গন্তব্য মালনীছড়া চা-বাগান। সিলেট শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এই চা-বাগান দেশের চা-ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মালনীছড়াকে সরকারি তথ্য অনুযায়ী উপমহাদেশের প্রথম চা-বাগান হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

আমরা যখন সেখানে পৌঁছালাম, আকাশ মেঘলা। সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। বৃষ্টিভেজা চা-গাছের সারি, ভেজা পথ আর চারপাশের সবুজে সিলেটকে যেন প্রথম দেখাতেই চিনে নেওয়া গেল।

দল বেঁধে ঘুরছিলাম। কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ আবার বৃষ্টির মধ্যেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত। তবে সময় বেশি দেওয়া গেল না। সামনে আরও পথ, আরও গন্তব্য।

মালনীছড়া পেছনে ফেলে এবার রওনা হলাম রাতারগুলের উদ্দেশে।

রাতারগুলের জলাবনে

গোয়াইনঘাটের রাতারগুল বাংলাদেশের পরিচিত মিঠাপানির জলাবনগুলোর একটি। বর্ষায় বনের বড় অংশ পানিতে ডুবে যায়। গাছপালার ফাঁক দিয়ে নৌকায় ঘুরে দেখাই তখন এখানকার প্রধান আকর্ষণ।

মালনীছড়া চা-বাগানের সবুজ চা-গাছের সারির মধ্যে আমরা
ছবি: লেখক

নৌকায় উঠতেই চারপাশের দৃশ্য বদলে গেল। স্থলপথের কোলাহল পেছনে ফেলে সরু জলপথে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল নৌকা। পানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গাছ, মাথার ওপর সবুজের ছায়া আর নৌকার চলার সঙ্গে তৈরি হওয়া ছোট ছোট ঢেউ, সব মিলিয়ে অন্য রকম এক পরিবেশ।

৫৯ জনের দল বলে কথা। তাই রাতারগুলের শান্ত পরিবেশেও আমাদের উপস্থিতি বেশ জানান দিচ্ছিল। কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ আবার নৌকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে। নৌকাভ্রমণ শেষে এবার আমাদের বহুল প্রতীক্ষিত গন্তব্য সাদাপাথর।

সাদাপাথরে হারাল ক্লান্তি

রাতারগুল থেকে সাদাপাথরের পথে যেতে যেতে গাড়িতে বসে সবার শরীরে ক্লান্তি জমছিল। সকাল থেকে একের পর এক জায়গা ঘুরে তখন বেশ পরিশ্রান্ত। কিন্তু ভোলাগঞ্জের দিকে এগোতেই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করল। দূরে পাহাড়ের রেখা, চারপাশে সবুজ আর সীমান্তঘেঁষা প্রকৃতি দেখে বোঝা যাচ্ছিল, গন্তব্য আর খুব দূরে নয়।

কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জে ধলাই নদের পাথরঘেরা এলাকাই সাদাপাথর নামে পরিচিত। ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা ধলাই নদীর পানি, পাথর আর ওপারের পাহাড় এই এলাকার প্রধান আকর্ষণ।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছে পানিতে পা রাখতেই যেন মুহূর্তে বদলে গেল সবার চেহারা। ঠান্ডা জল পায়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। পাথরের গায়ে পানির ধাক্কায় তৈরি হচ্ছে একটানা শব্দ। সামনে দূরের পাহাড়, তার গায়ে জমে থাকা মেঘ। কখনো পাহাড় স্পষ্ট, কখনো মেঘের আড়ালে আবছা হয়ে যাচ্ছে।

সাদা পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে চলা জলধারা, পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা মেঘ আর চারপাশের সবুজ, সব মিলিয়ে দৃশ্যটা ছিল চোখে রাখার মতো। এতক্ষণ গাড়িতে বসে থাকা ক্লান্ত দলটি পানিতে নামতেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেল।

কেউ পাথরের ওপর বসে ছবি তুলছে, কেউ পানিতে নেমে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। কেউ আবার দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি তখন আর কারও মনে নেই।

সময় গড়িয়ে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ল। ফিরতে হবে হোটেলে। তাই সাদাপাথরের সৌন্দর্য যতটা সম্ভব চোখে-মনে জমিয়ে এবার ফেরার পালা। প্রথম দিনের অভিযান শেষ হলো ক্লান্ত শরীর আর ভরা মন নিয়ে।

দ্বিতীয় দিন, একটু অলস শুরু

দ্বিতীয় দিনের পরিকল্পনা ছিল আরও কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখা। তাই সকাল সকাল বের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগের দিনের ধকলের প্রভাব পড়ল ঘুমে। তৈরি হতে হতে, খাওয়াদাওয়া শেষ করতে করতে প্রায় সকাল নয়টা বেজে গেল।

এরপর রওনা হলাম লালাখালের উদ্দেশে।

সারি সারি গাছের ফাঁকে নৌকা, রাতারগুলের জলাবনের পথে
ছবি: লেখক

লালাখালের নীল-সবুজ জলে

জৈন্তাপুর উপজেলার লালাখাল পাহাড়, বন, চা-বাগান ও সারি নদীঘেরা একটি এলাকা। সিলেট শহর থেকে সারিঘাট প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে নৌকায় লালাখালের দিকে যেতে হয়।

লালাখালের পানির রং আর দুই পাশের সবুজই এখানকার বড় আকর্ষণ। নৌকা যখন নদীর বুক চিরে এগিয়ে যায়, কোথাও পাহাড়ের ছায়া পানিতে পড়ে, কোথাও চা-বাগানের সবুজ ঢাল চোখে পড়ে। নৌকার ধীরগতি আর চারপাশের দৃশ্য মিলিয়ে তৈরি হয় আলাদা এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।

তবে লালাখালে আমাদের অভিজ্ঞতা শুধু প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আশপাশের একটি পুঞ্জি এলাকায় গিয়ে স্থানীয় মানুষের জীবনযাপনও দেখার সুযোগ হলো। পাহাড়ি জনপদের ঘরবাড়ি, চা-বাগান আর মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুই শহুরে জীবনের চেয়ে আলাদা। ঘরবাড়ির ধরন, চারপাশের পরিবেশ ও মানুষের চলাফেরা দেখে মনে হলো, ভ্রমণ মানে শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়; সেই জায়গার মানুষের জীবনকেও কাছ থেকে চেনা। লালাখাল থেকে এবার আমাদের গন্তব্য জাফলং।

জাফলংয়ে সময়ের সঙ্গে দৌড়

খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে পিয়াইন নদীর তীরে জাফলং। ওপারের পাহাড়, নদীর পাথুরে তট আর স্বচ্ছ পানির জন্য জায়গাটি পরিচিত। সিলেটের ভ্রমণতালিকায় জাফলংয়ের নাম থাকবেই। আমাদের তালিকাতেও ছিল। কিন্তু লালাখাল ঘুরতে সময় লেগে যাওয়ায় জাফলং পৌঁছাতে বেশ দেরি হয়ে গেল। হাতে সময় কম। তাই খুব বেশি ঘোরাঘুরি করা হলো না। যতটুকু সময় পেলাম, তার মধ্যেই নদীর পাথর, পাহাড় আর সীমান্তের দৃশ্য চোখে নেওয়ার চেষ্টা চলল। এর মধ্যেই সিদ্ধান্ত হলো, যেহেতু দিনটি কর্মদিবস, তাই মায়াবী ঝরনায় যাওয়া যায়। যেই কথা, সেই কাজ। জাফলং থেকে রওনা হলাম মায়াবী ঝরনার দিকে।

তবে সেখানে গিয়ে কিছুটা হতাশ হতে হলো। পানি ছিল কম, জায়গাটিও তুলনামূলক ছোট। তার ওপর দর্শনার্থীর ভিড়। ফলে যতটা প্রত্যাশা নিয়ে গিয়েছিলাম, ততটা অভিজ্ঞতা পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ থেকে আবার ফিরতে হলো।

ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। আমাদের তালিকায় আরও একটি জায়গা ছিল, আগুন পাহাড়। কিন্তু হাতে সময় তখন খুব কম। রাত ১১টায় ফিরতি ট্রেন। তাই ইচ্ছা থাকলেও আগুন পাহাড় এবার ‘হরিকেল অভিযাত্রা’র তালিকায় অপূর্ণই রয়ে গেল।

জাফলংয়ের পিয়াইন নদী ও মেঘালয়ের পাহাড়
ছবি: লেখক

ফেরার তাড়াহুড়া

জাফলং থেকে হোটেলে ফেরার পথটাও কম অভিযানের ছিল না। দীর্ঘ রাস্তা, কোথাও উঁচু-নিচু, কোথাও গর্ত। লেগুনা ঝাঁকুনি দিয়ে এগিয়ে চলেছে, আর আমরা বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি। রাত বাড়ছে। সামনে ব্যাগ গোছানো, খাওয়াদাওয়া, তারপর স্টেশন। শেষ পর্যন্ত হোটেলে পৌঁছাতে প্রায় রাত ১০টা।

তখন শরীরে দুই দিনের ক্লান্তি। তবু ব্যাগ গোছাতে হলো দ্রুত। রাত ১১টার ট্রেন ধরতে হবে। এতক্ষণে কত ছবি, কত ভিডিও, কত গল্প জমে গেছে। সেসব গুছিয়ে নেওয়ার সময়ও নেই।

হোটেল থেকে বেরিয়ে আবার স্টেশনের পথে। সামনে ঢাকার ব্যস্ততা, ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট আর পরিচিত ক্যাম্পাসজীবন। পেছনে পড়ে রইল শ্রীহট্টের পাহাড়, নদী, চা-বাগান আর দুই দিনের নানা অভিজ্ঞতা।

‘হরিকেল অভিযাত্রা’য় শিক্ষার্থীরা
ছবি: লেখক

গন্তব্যের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে যাত্রা

‘হরিকেল অভিযাত্রা’র শুরুটা হয়েছিল টিকিটের ঝামেলা দিয়ে। ৫৯ জনের টিকিটের দৌড়, রাতের ট্রেন, বৃষ্টিভেজা মালনীছড়া, রাতারগুলের জলাবন, সাদাপাথরের ঠান্ডা পানি, লালাখালের নীল-সবুজ নদী, জাফলংয়ের পাহাড়। দুই দিনে কত গল্পই না জমে গেল।

সব জায়গা পরিকল্পনা অনুযায়ী দেখা হয়নি। আগুন পাহাড়ের পরিকল্পনা বাদ পড়েছে, মায়াবী ঝরনাও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তবু ভ্রমণের হিসাব শুধু গন্তব্য দিয়ে মেলে না। একসঙ্গে পথ চলা, ক্লান্তির মধ্যে হাসি, হঠাৎ তৈরি হওয়া গল্প, এসবই শেষ পর্যন্ত ভ্রমণের স্মৃতি হয়ে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন একদিন শেষ হবে। সবাই ছড়িয়ে পড়বে ভিন্ন শহর ও পেশায়। তখন হয়তো মনে পড়বে রাতের ট্রেন, সিলেটের বৃষ্টি, সাদাপাথরের ঠান্ডা পানি কিংবা জাফলং থেকে ফেরার সেই তাড়াহুড়া। মনে হবে, শ্রীহট্টে আমরা শুধু দুই দিন ঘুরতে যাইনি; সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি কিছু মুহূর্ত, যেগুলোর কোনো ফেরার টিকিট নেই।