ভয়ংকর বাঁক ও পাহাড় পেরিয়ে কেওক্রাডং
পাহাড়ি জেলা বান্দরবান। বাংলাদেশের ‘দার্জিলিং’ বলে অনেকে। রুমা, থানচি কিংবা আলীকদম উপজেলার গহিন অরণ্য মানে পাহাড়ের অরণ্য প্রত্যন্ত অঞ্চল। বান্দরবান মিলনছড়ি পেরিয়ে ওয়াই জংশন। একদিকে থানচি আরেকদিকে রুমা উপজেলা। দুদিকেই রোমাঞ্চকর যাত্রা। ভয়ংকর সব বাঁক ও গহিন পর্বত পেরিয়ে যেতে হয় কেওক্রাডং পর্বতে। কেওক্রাডং নাম শুনেই কেমন যেন রোমাঞ্চ জাগে। শান্ত পাহাড় অশান্ত থাকার জন্য কেওক্রাডং ভ্রমণ অনেক দিন বন্ধ ছিল। অবশেষে খুলে দেওয়া হয় ১ অক্টোবর ২০২৫। ২ অক্টোবর আমরা বগালেক হয়ে কেওক্রাডং ভ্রমণ করি। যাওয়ার আগে কী যে রোমাঞ্চ! যতই যেতে থাকি ততই রোমাঞ্চ বাড়ে! রুমা পার হতেই মনে হয় এই বুঝি বগালেক,Ñএই বুঝি কেওক্রাডং! রুমা থেকে সাত হাজার টাকায় চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করে আমরা এগারোজন ছুটলাম কেওক্রাডংয়ের পথে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
কেওক্রাডং বান্দরবানে অবস্থিত দেশের সরকারিভাবে স্বীকৃত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। কেওক্রাডং শব্দটি মারমা ভাষা থেকে এসেছে। মারমা ভাষায় ‘কেও’ মানে পাথর, ‘ক্রা’ মানে পাহাড়, ‘ডং’ মানে ‘সবচেয়ে উঁচু’। অর্থাৎ কেওক্রাডং মানে সবচেয়ে উঁচু পাথরের পাহাড়। সরকারিভাবে এটির উচ্চতা ১,২৩০ মিটার (৪,০৪০ ফুট)। একসময় কেওক্রাডংকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হতো। পরে পরিচালিত জরিপে কেওক্রাডংয়ের স্থলে তাজিংডংকে সরকারিভাবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কেওক্রাডং যাওয়ার পরেই অনুধাবন করলাম ভয়ংকর উঁচুনিচু ও বাঁকের রাস্তা ঝূকিপূর্ণ। কিন্তু অপূর্ব সব সৌন্দর্য! চোখ ফেরানো দায়! যাওয়া-আসার পথে দেখলাম অনেক বাইক উলটে পড়ে যাচ্ছে। ঝুঁকি যেখানে, রোমাঞ্চ সেখানে বেশি হবেই। তবে আগে কেওক্রাডং পর্বতের শীর্ষে উঠতে হলে হেঁটে ট্র্যাকিং করতে হলেও এখন পিচের রাস্তা। পর্বতের শীর্ষে ইট-পাথরের অবকাঠামোও হয়েছে। সীমিত আকারে থাকা-খাওয়ার ব্যববস্থা করা হয়েছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যে কী নান্দনিকতা!Ñবলার ভাষা নেই! শীতের আগেই ঠান্ডা বাতাস! শীতে কনকনে ঠান্ডা! আমরা বগালেক থেকে যাওয়ায় সময় দেরি হওয়ার সূর্যোদয়ের দেখা পাইনি! তবে সামান্য পরে গিয়েই বুঝেছি সুর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্ত কেওক্রাডংকে লাস্যময়ী ও অনিন্দ্য সুন্দরী করে তোলে!
রুমা ঢুকতেই আর্মি চেকপোস্ট। কেওক্রাডং বা বগালেক যেতে হলে এখান থেকে অনুমতিপত্র নিতে হবে। এ দুটি পয়েন্টে যেতে গাইড লাগবে। চাঁদের গাড়িও নিতে হবে। রুমা উপজেলা পেরিয়েই উঁচুনিচু রাস্তার রোমাঞ্চ ভরপুর। যেতেই দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মুনলাই পাড়া। রুমা থেকে তিন–চার কিমি যেতেই। ভয়ংকর রাস্তা। মাঝে পড়বে কাটা পাহাড়, অনেকে বলেন বাংলার লাদাখ। সেটা পেরিয়েই বগালেক। এটি কেওক্রাডং পাহাড়ের পাশে অবস্থিত প্রাকৃতিকভাবে দেশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত মিষ্টিপানির লেক। এটি ‘বগাকাইন হ্রদ’ নামেও পরিচিত। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২৪৬ ফুট (৩৮০ মিটার) উচ্চতায় অবস্থিত। এ লেকের অদ্ভুত ফানেল আকৃতির গঠনের জন্য এটি অনেকের কাছে ‘ড্রাগন লেক’ বা ‘লেক অব মিস্ট্রি’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। লেকটি বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে। এরপর গহিন পাহাড়-পর্বত আর বন পেরিয়ে একসময়ের দেশের সর্বোচ্চ বিন্দু বা পর্বত কেওক্রাডং।
যাতায়াত
ঢাকা বা যেকোনো শহর থেকে চট্টগ্রাম (ঢাকা হলে বাস/ট্রেন) কিংবা বান্দরবান যেতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে বাসে বান্দরবান যাতায়াতের সুবিধা আছে।
চাঁদের গাড়ি ও গাইড
রুমা থেকে বগালেক বা কেওক্রাডং যেতে চাঁদের গাড়ি ও গাইড লাগবে। রুমা থেকে সাত হাজার টাকায় চাঁদের গাড়ি ভাড়া নিতে হবে। ১৪ জন যেতে পারবেন এক গাড়িতে। প্রতি চাঁদের গাড়িতে একজন গাইড লাগবে। এক দিনের জন্য ৭০০ টাকা। রাত থাকলে প্রতিরাতের জন্য ৭০০ টাকা যোগ করে হবে। আর প্রতি ছয় বাইকারের জন্য একজন গাইড নেওয়া আবশ্যক। গাইডের থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা ট্যুরিস্টেরই করতে হয়। জাতীয় পরিচয়পত্রের কয়েকটি ফটোকপি সঙ্গে রাখতে হবে কয়েক স্থান দেখাতে/জমা দিতে হতে পারে। রুমা শহরের ঠিক আগেই আর্মিক্যাম্প থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা দিয়ে অনুমতিপত্র নিয়ে সঙ্গে রাখতে হবে। বগালেকে অনুমতিপত্র গাইডের মাধ্যমে আর্মিক্যাম্পে জমা রাখতে হবে।
থাকা ও খাওয়া
বগালেক কিংবা কেওক্রাডং থাকতে হলে পাহাড়িদের কটেজে থাকতে হবে। জনপ্রতি প্রতিরাতের জন্য ৩০০ টাকা। কটেজেই খেতে পারবেন ২০০ টাকার আশেপাশে। গোসল করতে হবে বগালেকে অথবা পানি কিনে।