সিংহল সমুদ্র থেকে
১.
কলম্বোতে পা রাখার পর মনে হলো, শহরটা একরৈখিক নয়। একদিকে আধুনিক সব স্থাপনা, অন্যদিকে শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপত্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, উপনিবেশ আর আধুনিকতা যেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
হোটেল মেরিন স্যুইটের বারান্দা থেকে কলম্বো শহরের আরও একটি রূপ চোখে পড়ে। ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত জলরাশি—অবিরাম, অস্থির, অথচ অদ্ভুতভাবে মন শান্ত করা এক বিশাল উপস্থিতি; যেন কেউ সমুদ্র আর শহরটিকে পাশাপাশি অনায়াসে বসিয়ে দিয়েছে।
সকালে যখন মেরিন ড্রাইভ রোড ধরে হাঁটছিলাম, বাতাসে কারিপাতা আর কফির ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছিল। উপকূলীয় এই সড়কটিতে শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁগুলোর সন্ধান পেলাম। মজার বিষয় হলো, এখানে কোনো বেলাভূমি নেই। ভারত মহাসাগরের ঢেউ সরাসরি আছড়ে পড়ছে শহরের গায়ে। পাশেই রেললাইন, কলম্বোর বিখ্যাত সি ট্রেন এই লাইন ধরেই চলাচল করে।
কিছুটা এগিয়ে শহরের ভেতরে ঢুকতেই প্রথম যে জায়গাটা মনে দাগ কাটে, সেটা ‘গল ফেস গ্রিন’। ১৮৫৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সিলনের গভর্নর হেনরি জর্জ (১৭৯৭-১৮৬০) নারী ও শিশুদের বিনোদনের কথা ভেবে সমুদ্রতীর ঘেঁষে প্রায় এক মাইল (১ দশমিক ৬ কিলোমিটার) দীর্ঘ একটি প্রমোদপথ নির্মাণের অনুমোদন দেন। ১৮৫৯ সালে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত এটা কলম্বোর অন্যতম জনপ্রিয় স্থান।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো, কলম্বোর ইতিহাস আসলে দীর্ঘ এক যাত্রার ইতিহাস। প্রাচীন সময়ে কলম্বো ছিল ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অ্যারাবিয়ান, চায়নিজ ও ভারতীয় বণিকেরা এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক চরিত্র প্রাথমিকভাবে গড়ে দেয়। ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরা কলম্বোকে নিজেদের সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে আসে ডাচ এবং ব্রিটিশরা—প্রতিটি ঔপনিবেশিক শক্তিই এই শহরের ওপর নিজেদের ছাপ রেখে গেছে, যা আজও স্থাপত্যে, পুরোনো সরকারি ভবনের নীরব উপস্থিতিতে স্পষ্ট।
পেত্তাহ মার্কেটে গেলে নির্জন কলম্বোর চিত্র খানিকটা বদলে যায়। চারদিকে দোকানপাট, কাপড়ের স্তূপ, মসলার গন্ধ, মানুষের ডাকাডাকি—সব মিলিয়ে মনে হয় পুরান ঢাকার কোনো বাজারে ঢুকে পড়েছি। দারুণ সব জিনিসপত্র পাওয়া যায় এখানে। দাম তুলনামূলক কম তাই ভিড় অনেক বেশি।
জনজীবনের ভিড় আর হৈহুল্লোড় থেকে বেরিয়ে এবার রওনা দিলাম গঙ্গারামায়ার দিকে। মন্দির প্রাঙ্গণে ঢুকেই একরাশ মুগ্ধতা। বেইরা হ্রদের তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্দিরটি শুধু উপাসনালয় নয়, শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ ঐতিহ্য, শিল্প, ইতিহাস ও সমাজসেবার এক অনন্য কেন্দ্র। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটি কলম্বোর অন্যতম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থানে পরিণত হয়েছে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এই মন্দিরে শ্রীলঙ্কার প্রথাগত বৌদ্ধ স্থাপত্যের সঙ্গে থাই, চীনা, ভারতীয়, এমনকি ইউরোপীয় প্রভাবও মিশে আছে। একক স্থাপত্যধারার প্রতিনিধিত্ব না করেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতি বিনিময়ের দৃশ্যমান দলিল হয়ে উঠেছে গঙ্গারামায়া।
মন্দির চত্বরে বিশাল এক বোধিবৃক্ষ চোখে পড়ল। বোধিবৃক্ষের নিচে অনেকেই ধ্যানে উপবিষ্ট, কেউ কেউ কিছু সময়ের জন্য মৌনতার আশ্রয় নিয়েছেন। দৃশ্যটি শ্রীলঙ্কার জনজীবনের একটি গভীর দিক সামনে আনে—ধর্ম শুধু রিচুয়াল নয়, দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
গঙ্গারামায়ার সঙ্গে বেইরা লেকের মাঝখানে আরেকটি মন্দির আছে। নাম সীমা মালাকা। হ্রদের জলে ভাসমান সীমা মালাকার নকশা করেছিলেন শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি স্থপতি জিওফ্রে বাওয়া (১৯১৯–২০০৩)। প্রকৃতি আর স্থাপত্যকে অবিচ্ছেদ্য সত্তায় রূপ দেওয়ার বিরল ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি। শ্রীলঙ্কার বহু উল্লেখযোগ্য স্থাপনার মতো এই ধ্যানমণ্ডপেও তাঁর সেই স্বাক্ষর স্পষ্ট।
নানা প্রায়ই বলতেন, কোনো জনপদকে গভীরভাবে জানতে হলে তাদের খাদ্যাভ্যাস ও পাঠাভ্যাস বুঝতে পারলে অর্ধেকের বেশি জানা হয়ে যায়। ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কার খাবার সম্পর্কে আমি কিছুটা ধারণা পেয়েছি, মনে মনে তাই লাইব্রেরি নিদেনপক্ষে একটা বইয়ের দোকান খুঁজছিলাম। আশ্চর্যজনকভাবে কলম্বোর রাস্তায় কোনো বইয়ের দোকান চোখে পড়েনি। গাইড জানালেন শ্রীলঙ্কায় ভিসাক উপলক্ষে তিন দিনের সরকারি ছুটি। বইয়ের দোকান কিংবা লাইব্রেরি খোলা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বিষণ্ন মন নিয়েই সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরলাম।
২.
সকালের মৃদু রোদ চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল। গতকাল রাতে পূর্ণিমা ছিল। মেরিন স্যুইটের বারান্দায় বসে দেখছিলাম শ্বেতপাথরের থালার মতো চাঁদ। ভারত মহাসাগরের আছড়ে পড়া ঢেউ, চাঁদের আলো আর কলম্বোর প্রকৃতি মিলে অদ্ভুত জাদুবাস্তবতা তৈরি করেছিল। জীবনানন্দ দাশ হয়তো এমন কোনো রাতের কথা ভেবেই ‘গভীর হাওয়ার রাত’ কবিতাটি লিখেছিলেন।
গাইডের ফোনকলে সংবিৎ ফিরে পেলাম। তড়িঘড়ি করে বেরোতে হলো। আজ আমাদের গন্তব্য ডাম্বুলা।
পথে যেতে যেতে জানালার বাইরের দৃশ্য বদলে যাচ্ছিল। এখানে প্রকৃতি একটু বেশি কঠোর, একটু বেশি রোদে পোড়া। তবু ধুলা মেশানো বাতাসে একটা ছান্দিক আভিজাত্য ছিল—এই পথ বহু শতাব্দী ধরে দিগ্বিজয়ী রাজা, অসংখ্য তীর্থযাত্রী আর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পদচিহ্ন বয়ে চলেছে।
ডাম্বুলায় পাহাড়ের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে এক বিস্ময়—কেইভ টেম্পল। দূর থেকে প্রথমে পাহাড়ই মনে হয়। কাছে গেলে বোঝা যায় এটা শুধু পাহাড় নয়, সময়ের ভেতরে গড়া জীবন্ত ইতিহাস।
পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলাম। চারপাশে শালগাছের ছায়া, দূর থেকে বাতাসে ভেসে আসছে শুকনা পাতার শব্দ। প্রায় তিন শ ফুট ওপরে উঠে দেখলাম পুরোপুরি ভিন্ন জগৎ। এই মন্দির চত্বরটি খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর। বিশাল একটি ঝুলন্ত শিলার নিচে পাঁচটি গুহা। গুহাগুলোর ভেতরটা শুকনা রাখবার জন্য পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে। দেয়ালজুড়ে হাজার বছরের পুরোনো চিত্র, রং ফিকে হয়ে আসা বুদ্ধমূর্তিগুলো শুধু পাথর নয়—ধ্যানের মহিমায় ভাস্বর।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে অনুরাধাপুরের রাজা ভালাগাম্বা দক্ষিণ ভারতীয়দের কাছে রাজ্য হারিয়ে ডাম্বুলায় পালিয়ে আসেন। প্রায় ১৫ বছর তিনি এই প্রাকৃতিক গুহাগুলোতে আশ্রয় নেন। পরে সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ গুহাগুলোকে বৌদ্ধ বিহার ও উপাসনালয়ে রূপান্তরিত করেন।
এমন জায়গায় এলে নিজের ভেতরের কোলাহল কমে আসে। মনে হয়, বাইরের পৃথিবীর দুর্লঙ্ঘ্য অন্যায়, অভিযোগ, আকাঙ্ক্ষা কিছুই নেই।
গুহা মন্দিরের সৌন্দর্য চোখে নিয়েই আমরা রওনা দিই জিওফ্রে বাওয়ার (১৯১৯–২০০৩) আরেকটি অভিনব স্থাপনা দেখতে। ‘হেরিটেন্স কান্ডলামা’। পাঁচ তারকা এই হোটেলটি কোনো সাধারণ স্থাপত্য নয়। প্রকৃতিকে না ভেঙে তার ভেতরে জীবনযাপনের একটি দর্শন।
দূর থেকে দেখলে মনে হয়, এ ভবনটি পাহাড়েরই অংশ। কোনো কৃত্রিমতা নেই, আলাদা উপস্থিতি নেই। জঙ্গল নিজেই যেন ধীরে ধীরে কংক্রিটের রূপ নিয়েছে।
ভেতরে রাজকীয় আভিজাত্য, সুনসান নীরবতা। লবিতে দরজা-জানালার সীমাবদ্ধতা নেই। বাতাস সরাসরি ভেতরে ঢুকে পড়ে। আলোও আটকে থাকে না, ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
করিডর দিয়ে হাঁটলে মনে হয়, দেয়ালগুলো আসলে গাছ আর পাহাড়ের সঙ্গে লেগে আছে। কোথাও কোনো জোরজবরদস্তি নেই, সবকিছু খুব স্বাভাবিকভাবে গড়ে উঠেছে।
রুমের বারান্দায় দাঁড়ালে নিচে কান্ডালামা লেক দেখা যায়—বিশাল শান্ত আয়নার মতো। ভোরের আলো পড়লে পানি ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে ওঠে আর সন্ধ্যায় পুরো দৃশ্যটা নরম কমলা রঙে ডুবে যায়। আকাশ আর পানির সীমারেখা তখন আলাদা করা যায় না।
সবচেয়ে দারুণ অনুভূতিটা হলো—মানুষ এখানে অতিথি মাত্র, প্রকৃতিই সর্বেসর্বা। স্বল্প সময়ের জন্য এলেও হেরিটেন্স কান্ডালামার স্থাপত্যশিল্প দেখে মনে হয়েছে প্রকৃতি বাঁচিয়ে রেখেও নগর তৈরি করা যায়।
রাতে চাঁদের আলোয় কান্ডালামা লেকের অপার্থিব সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা সিগিরিয়ার দিকে রওনা দিলাম। আমাদের সাউন্ড সিস্টেমে শ্রীকান্ত আচার্য গেয়ে চলেছেন নজরুলের গান। ‘জ্যোৎস্নার সাথে চন্দন দিয়ে মাখাবো তোমার গায়...’
৩.
সিগিরিয়ায় পৌঁছে বেশ ক্লান্ত লাগছিল। আমাদের গাইড উপুলদা আগে থেকেই ছোট্ট একটা বাংলোমতো ঠিক করে রেখেছিলেন—সেরেনে সিগিরিয়া। ফ্রেশ হয়ে ঠান্ডা স্মুদিতে চুমুক দিতে দিতে বাংলোর খোলা বারান্দায় বসে সিগিরিয়ার অরণ্যঘেরা রাতের সৌন্দর্য দেখছিলাম। চারদিকে ঝিঁঝি পোকার ডাক। মনে হচ্ছিল, বিভূতিবাবুর আরণ্যকের কোনো এক অধ্যায়ে ঢুকে পড়েছি।
পরদিন সকালে সিগিরিয়ার পথে বেরিয়ে বুঝলাম, এই অঞ্চল শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়—প্রকৃতি, কিংবদন্তি আর ইতিহাসের সার্থক সমন্বয়। রাস্তার দুধারে সবুজ বন, তাল-নারকেলের সারি, ছোট ছোট গ্রাম আর সেই বিখ্যাত শিলাদুর্গ। সমতল ভূমির বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এক রহস্যময় প্রহরী।
প্রায় দেড় হাজার বছর আগে, খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকে রাজা কাশ্যপ এই শিলার চূড়ায় তাঁর রাজধানী নির্মাণ করেছিলেন। পিতা ধাতুসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিংহাসনে বসার পর তিনি আশঙ্কা করেছিলেন তাঁর ভাই মোগ্গল্লান একদিন প্রতিশোধ নিতে ফিরে আসবে। সেই ভয় থেকেই অনুরাধাপুরা ছেড়ে দুর্গম শিলার ওপর নির্মাণ করেন এই অভেদ্য দুর্গনগরী।
আজও সিগিরিয়ার দিকে তাকালে হতবাক না হয়ে পারা যায় না। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৬৬০ ফুট উঁচু বিশাল পাথরের মাথায় কীভাবে এই রাজপ্রাসাদ, বাগান, জলাধার ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল!
দুর্গের নিচে আছে বিশ্বের প্রাচীনতম পরিকল্পিত জলবাগানগুলোর একটি। বর্ষার পানি সংরক্ষণ কিংবা সরবরাহের জন্য যে প্রকৌশলব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, তা আজও গবেষকদের মুগ্ধ করে।
ওপরে উঠতে উঠতে দেখা মেলে পাথরের গায়ে আঁকা অপূর্ব সব চিত্রের। কেউ বলেন এই নারীমূর্তিগুলো স্বর্গের অপ্সরা, কেউ বলেন এঁরা ছিলেন রাজদরবারের অভিজাত নারী। অপ্সরাদের চিত্র পেরিয়ে আয়নাপ্রাচীর। আরও কিছুটা ওপরে উঠে পৌঁছাতে হয় সিংহদ্বারে। শুরুতে একটি বিশাল সিংহমূর্তির মুখ দিয়েই দুর্গে প্রবেশ করতে হতো। এখন শুধু সিংহের থাবা দুটো অবশিষ্ট আছে।
চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালে বোঝা যায় কেন কাশ্যপ এই স্থানটিকে বেছে নিয়েছিলেন। দিগন্তজোড়া সবুজ বনভূমি, গ্রাম, হৃদ, পাহাড়ের সারি কী নেই এখানে! ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা, ক্ষমতার লোভ, শিল্পের সৌন্দর্য আর প্রকৃতির মহিমা—সবকিছু যেন এক জায়গায় এসে মিলেছে।
প্রাচীন রাজ্যের স্মৃতি, সবুজ অরণ্যের বিস্তার ছেড়ে আসতে মন সায় দিচ্ছিল না; কিন্তু আমাদের হাতে সময় কম।
সিগিরিয়ার কয়েকটি দোকানে ঢুঁ মেরে কিছু কেনাকাটাও করা হলো। শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, ছোটখাটো স্মারকসামগ্রী সংগ্রহ করে আমরা আবার রওনা দিলাম। এবার গন্তব্য ক্যান্ডি—শ্রীলঙ্কার সাংস্কৃতিক রাজধানী।
ক্যান্ডিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। জীবনানন্দের ভাষায় বলতে গেলে, অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল। স্থানীয় একটা দোকান থেকে আমরা থাম্বিলি জুস (কিং কোকোনাট-লালচে রঙের ডাব) খেলাম। দোকানটার অন্য পাশে একটা গণেশমন্দির দেখতে পেলাম। গাইড জানালেন এটা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এরপর জেমস অ্যান্ড জুয়েলারি শোরুমে গিয়ে বিখ্যাত নীলকান্তমণিসহ নানা ধরনের মূল্যবান পাথর দেখলাম। রিজেন্সিতে গিয়ে বুদ্ধ আর হাতির ভাস্কর্য দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হলাম। শ্রীলঙ্কায় তৈরি পোশাকের দাম ভয়াবহ চড়া। তবে ভালো মানের টি-শার্ট তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়।
ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে—কথাটা মিথ্যা নয়। কলম্বো, ডাম্বুলা, সিগিরিয়ায় কোনো বইয়ের দোকান খোলা না পেলেও আমি হাল ছাড়িনি। ক্যান্ডিতে এসেও খোঁজা শুরু করলাম। উপুলদা কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন ক্যান্ডি লেকের পাশে একটা শপিং মল আছে। সেখানে অনেকগুলো বইয়ের দোকান। নিশ্চিত খোলা আছে। আমরা বিশাল একটা পাবলিক পার্কিং জোনে গাড়ি রেখে শপিং মলে ঢুকে পড়লাম। কপালের ফেরে সেগুলোও বন্ধ ছিল।
ক্যান্ডিতে এসে ক্যান্ডি লেক, টুথ টেম্পল আর ক্যান্ডি কালচারাল সেন্টারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান না দেখলে নাকি জীবন বৃথা। যেহেতু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হতে কিছুটা সময় বাকি ছিল, আমরা ক্যান্ডি লেকের পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করলাম।
শহরের ঠিক মাঝখানে এমন দুর্দান্ত লেক দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। পাহাড়ঘেরা লেকটির চারদিকে ঘন সবুজ, মাঝখানে শান্ত জল।
আঠেরো শতকে শেষ ক্যান্ডিয়ান রাজা শ্রী বিক্রম রাজসিংহের আমলে এটা তৈরি করা হয়। শহরের শত ব্যস্ততা, যানবাহনের শব্দ, পর্যটকের ভিড়—সবকিছুর উপেক্ষা করে লেকটি আশ্চর্য শান্তি ধরে রেখেছে।
লেকের মাঝখানের ছোট্ট দ্বীপটি দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। উপুলদা জানালেন, একসময় দ্বীপটি ছিল রাজপরিবারের অবকাশযাপনের স্থান। ক্যান্ডিতে ইতিহাস আর প্রকৃতি এমনভাবে মিশে আছে যে আলাদা করা যায় না।
হাঁটতে হাঁটতেই আমরা পৌঁছে গেলাম কালচারাল সেন্টারের সামনে। বাইরে তখন পর্যটকদের ছোটখাটো ভিড়। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনা। একের পর এক নৃত্যশিল্পী বর্ণিল পোশাকে মঞ্চে আসছিলেন। কারও মাথায় রুপালি মুকুট, কারও পরনে ঝলমলে পোশাক। ঢোল, তবলা, শিঙা আর করতাল মিলে তৈরি হচ্ছিল এক সম্মোহনী ছন্দ। নৃত্যশিল্পীদের দ্রুত পদক্ষেপ, শরীরের নিখুঁত ভঙ্গি আর মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যাচ্ছিল, এটা শুধু বিনোদন নয়, নিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে রাখা ঐতিহ্য।
অনুষ্ঠান যত এগোচ্ছিল, দর্শকেরাও তত বেশি মগ্ন হয়ে উঠছিল। শেষের দিকে শুরু হলো ফায়ার ডান্স। জ্বলন্ত মশাল ঘোরানো, আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটা, শিখার সঙ্গে নৃত্যের ছন্দ মেলানো—সবকিছুই ছিল চোখধাঁধানো।
একপর্যায়ে মঞ্চ থেকে একজন শিল্পী হাত বাড়িয়ে দর্শকদের ডেকে নিলেন। মুহূর্তের মধ্যে ভিড় নড়ে উঠল। আমরাও সুযোগ হাতছাড়া করলাম না। সিঁড়ি বেয়ে মঞ্চে চলে গেলাম। চারপাশে নানা দেশের পর্যটক। কারও মুখে বিস্ময়, কারও মুখে আনন্দ, কেউ আবার মুঠোফোনের ক্যামেরায় স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এটাই—ভাষা না মিললেও অনুভূতি মিলিয়ে দিতে পারে।
অনুষ্ঠান শেষে বাইরে বেরিয়ে দেখি সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ক্যান্ডি লেক তখন দিনের চেয়ে আরও সুন্দর। পাহাড়ের গায়ে জ্বলে ওঠা আলোর প্রতিফলন জলের ওপর কেঁপে কেঁপে উঠছে। অনতিদূরে টুথ টেম্পলের সাদা অবয়ব, বাতাসে নাম না–জানা ফুলের গন্ধ, স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। আমাকে ভীষণ অবাক করে কানে কানে যেন অ্যালান পো বলে গেলেন—
‘আমরা যা দেখি, আমাদের যা মনে হয়, সবই কি স্বপ্নের ভেতরে আরেকটি স্বপ্ন?’
৪.
শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার সময় ভাবিনি ঐতিহ্যবাহী ভেসাক উৎসব এত কাছ থেকে দেখতে পাব। যদিও যেখানে যাই, সেখানকার মানুষের মনোবীক্ষণের মাধ্যমে বুদ্ধকে জানার চেষ্টা করি। এবারকার জানাটা সমৃদ্ধির পথে আরও খানিকটা এগিয়ে নিল। টেম্পল অব দ্য স্যাক্রেড টুথ রেলিকের স্থানীয় নাম শ্রী ডালাডা মালিগাওয়া।
ক্যান্ডির পাহাড়ঘেরা উপত্যকার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরটি কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নয়, শ্রীলঙ্কার ইতিহাস, রাজনীতি ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রবিন্দুও বটে। বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর তাঁর দেহভস্ম থেকে দন্তাবশেষ সংরক্ষিত হয়। চতুর্থ শতকে ভারতের কলিঙ্গ রাজ্য থেকে রাজকুমার দন্ত ও রাজকুমারী হেমমালা সেই দন্তাবশেষ গোপনে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে আসেন। কিংবদন্তি বলে, রাজকুমারী হেমমালা নাকি চুলের খোঁপায় লুকিয়ে দাঁতটি নিয়ে এসেছিলেন। সেই থেকে দন্তাবশেষটি শুধু ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতীক নয়, রাজকীয় বৈধতারও প্রতীক হয়ে ওঠে। দীর্ঘ শতাব্দী ধরে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন রাজধানী ঘুরে অবশেষে ষোড়শ শতকের শেষ দিকে ক্যান্ডিতে স্থায়ী আশ্রয় লাভ করে।
বর্তমান মন্দিরটি ক্যান্ডি রাজ্যের রাজাদের হাতে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। পর্তুগিজ আক্রমণে প্রাচীন কাঠামো ধ্বংস হলেও পরবর্তী রাজারা বারবার এটি পুনর্নির্মাণ করেন। আজ যে শ্রী ডালাডা মালিগাওয়া দেখা যায়, তার দেয়াল, খোদাই, সোনালি ছাদ, ঢাকবাদ্যের প্রাঙ্গণ এবং রাজপ্রাসাদ-সংলগ্ন অবস্থান শ্রীলঙ্কার শেষ স্বাধীন রাজ্যের স্মৃতি বয়ে চলেছে। মন্দিরের অন্তঃকক্ষে বহু স্তরের সোনার পাত্রের ভেতরে সংরক্ষিত রয়েছে সেই পবিত্র দন্তাবশেষ। সাধারণ দর্শনার্থীরা সরাসরি দেখতে পান না, কিন্তু হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন ফুল হাতে এসে শ্রদ্ধা জানায়।
আমাদের সৌভাগ্য ছিল ভেসাকের সময় এই মন্দিরে যাওয়ার। ভেসাক বা শ্রীলঙ্কার ভাষায় ‘ওয়েসাক’, বৌদ্ধ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। বৈশাখী পূর্ণিমার এই দিনটিতেই বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ এবং মহাপরিনির্বাণ—এই তিনটি ঘটনাকে একসঙ্গে স্মরণ করা হয়। বলা যায় এটা শুধু উৎসব নয়, এক গভীর আত্মসমীক্ষার সময়।
শ্রী ডালাডা মালিগাওয়ায় গিয়ে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি সেই পবিত্র কক্ষের সামনে, যেখানে বহু স্তরের সোনালি আধারের ভেতরে বুদ্ধের দন্তাবশেষ সংরক্ষিত আছে। অসংখ্য মানুষের ভিড়ের মাঝেও একধরনের নীরবতা অনুভব করা যায়। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম সেই কুঠুরির সামনে। সেই মুহূর্তে ইতিহাস, কিংবদন্তি আর আধ্যাত্মিকতা একাকার হয়ে গিয়েছিল।
ভেসাকের রাতে শ্রীলঙ্কা যেন আলোর অক্ষরে লেখা এক প্রাচীন গ্রন্থ। শহরের পর শহর, গ্রামের পর গ্রাম রঙিন কাগজের লণ্ঠন—ভেসাক কুডু—দিয়ে সাজানো। কোথাও বিশাল আলোকিত তোরণ, যাকে তারা ‘থোরণা’ বলে, সেখানে জাতক কাহিনির দৃশ্য আলোর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। সন্ধ্যা নামতেই মনে হয় দ্বীপটি তার দৈনন্দিন চেহারা খুলে রেখে আলোর পোশাক পরে নিয়েছে।
এই উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত মানুষের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি। রাস্তাঘাটে অস্থায়ী খাদ্যকেন্দ্র বা ‘দানশালা’ বসে। সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে খাবার, পানীয়, আইসক্রিম, চা কিংবা ভাত-তরকারি পরিবেশন করা হয়। অপরিচিত মানুষেরা একসঙ্গে বসে খায়, হাসে, কথা বলে। দানের আনন্দই এখানে মুখ্য। বুদ্ধের করুণা ও মৈত্রীর শিক্ষা কয়েক দিনের জন্য বাস্তব রূপ পায় মানুষের আচরণে।
আমরাও সেই দানশালার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। আশপাশে স্থানীয় পরিবার, শিশু, বয়স্ক মানুষ, ভিক্ষু—সবাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিল। কারও মধ্যে কোনো তাড়াহুড়া নেই, নেই কোনো অস্থিরতা।
ভাত, আস্ত জিরা ফোড়ন দিয়ে মিষ্টিকুমড়োর সবজি, কারিপাতা আর নারকেল তেল দিয়ে রান্না করা ডাল। সাধারণ অথচ পরম আন্তরিকতায় পরিবেশিত সেই খাবারের স্বাদ ভোলার নয়। মনে হচ্ছিল, শুধু খাবার নয়, মানুষের সৌহার্দ্যও যেন আমাদের সামনে পরিবেশন করা হচ্ছে।
মন্দিরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি ভাবছিলাম, ধর্মকে বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হয়তো মানুষের জীবনযাপন। শ্রী ডালাডা মালিগাওয়ার ইতিহাসে যেমন আছে রাজ্য, যুদ্ধ, ক্ষমতা ও উত্তরাধিকারের গল্প, তেমনি ভেসাকের আলোয় দেখা যায় বুদ্ধের সেই সহজ বাণী—লোভের বদলে দান, বিভেদের বদলে সহমর্মিতা, আর অন্ধকারের বদলে আলো।
৫.
ক্যান্ডির পাহাড় পেরিয়ে নুয়ারা এলিয়ার পথে এগোতেই গরম আবহাওয়া একটু একটু করে শীতল হচ্ছিল। রাস্তার দুপাশে অনন্ত সবুজ চা-বাগান, পাহাড়ের গায়ে ভেসে থাকা কুয়াশা আর দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা ঔপনিবেশিক আমলের বাড়িগুলো দেখে সহজেই বোঝা যায় কেন নুয়ারা এলিয়াকে ‘লিটল লন্ডন’ বলা হয়। ব্রিটিশরা উনিশ শতকে গরম থেকে বাঁচতে এই পাহাড়ি শহরকে তাদের অবকাশকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিল। আজও সেই উত্তরাধিকার রয়ে গেছে লাল ছাদের বাংলো, পরিচ্ছন্ন বাগান, গলফ কোর্স আর ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যে।
নুয়ারা এলিয়ায় আমাদের সবচেয়ে স্মরণীয় সময় কেটেছে ব্লুফিল্ড চা-বাগানে। পাহাড়ের ঢালে ঢালে সাজানো চা-গাছের সারি, দূর থেকে দেখতে যেন সবুজ মখমলের কারুকাজ। সেখানে অনেকক্ষণ কাটিয়েছি। চা কীভাবে পাতা থেকে কাপ পর্যন্ত পৌঁছায়, সেই প্রক্রিয়া দেখেছি, বিভিন্ন ধরনের সিলন চায়ের স্বাদ নিয়েছি। একেক কাপ চায়ের স্বাদে একেক রকম সুবাস—কোথাও ফুলের আভাস, কোথাও মধুর কোমলতা, কোথাও আবার পাহাড়ি মাটির গভীর গন্ধ। শেষ পর্যন্ত কিছু চা সংগ্রহও করলাম, মনে হচ্ছিল পাহাড়ি সকালগুলোর খানিকটা সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া দরকার।
নুয়ারা এলিয়া থেকে এলা, সে এক দীর্ঘ যাত্রা। পথে যেতে যেতে পাহাড় আরও বুনো হয়ে ওঠে, উপত্যকা আরও গভীর। এলা শহরটি ছোট, তবে সৌন্দর্য অসাধারণ। প্রকৃতি এখানে একটু উদার হাতেই রং ছড়িয়েছে। দূরে পাহাড়ের সারি, মেঘের চলাফেরা, চা-বাগানের ঢেউ আর নাইন আর্চেস ব্রিজ—সব মিলিয়ে এলার মধ্যে একধরনের নিরুদ্বেগ সৌন্দর্য আছে। নাইন আর্চেস ব্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝলাম, কেন একে শ্রীলঙ্কার পোস্টকার্ড বলা হয়। শত বছরেরও বেশি পুরোনো এই রেলসেতু ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হয়েছিল পাহাড়ি অঞ্চলের সঙ্গে কলম্বোর যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইস্পাত–সংকট দেখা দেওয়ায় স্থানীয় কারিগরদের হাতেই মূলত ইট, পাথর আর সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হয় সেতুটি। নয়টি খিলানের এই স্থাপনা আজও চা-বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অবিচল। দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছিল, আর আমি ভাবছিলাম—কত মানুষ, কত সময়, কত ইতিহাস এই খিলানগুলোর ভেতর দিয়ে পার হয়ে গেছে।
পাহাড় ছেড়ে এবার নেমে এলাম সমুদ্রে। মিরিসায় যখন পৌঁছলাম মনে হলো—কয়েক দিনের মধ্যে যেন কয়েকটি ভিন্ন দেশ ঘুরে ফেলেছি। একদিকে নুয়ারা এলিয়ার ঠান্ডা কুয়াশা, অন্যদিকে মিরিসার উষ্ণ লোনা বাতাস। ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি, তালগাছের সারি আর অবিরাম ঢেউয়ের শব্দ মিরিসাকে ঢেলে সাজিয়েছে।
প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ মাছ ধরা, দারুচিনি ও অন্যান্য মসলা সংগ্রহের পাশাপাশি উপকূলীয় বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। দক্ষিণ উপকূলের অন্যান্য জনপদের মতো মিরিসাও পর্তুগিজ, ডাচ ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব দেখেছে। তবে মজার বিষয় হলো এখানে বন্দরনগরী হয়ে ওঠেনি, নির্জন মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের আবাসই রয়ে গেছে। বর্তমানে মিরিসার পরিচয়ের বড় অংশজুড়ে আছে তিমি ও ডলফিন পর্যবেক্ষণ। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে নীল তিমি দেখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা এখানে আসেন।
বিকেলের দিকে সমুদ্রতটের রং বদলাতে থাকে—নীল থেকে সোনালি, তারপর কমলা। সূর্য ডোবার সময় বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে মনে হলো, শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কোনো একক স্থান নয়; কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পাহাড় থেকে সমতল, বন থেকে সমুদ্র—ভিন্ন ভিন্ন ভূদৃশ্যের মধ্যে অবলীলায় পৌঁছবার সুযোগ। ছোট্ট এই দ্বীপটি যেন ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অনন্ত ভ্রমণপাঠ।