কুতুবদিয়ার বাতিঘর, যা যা দেখলাম
ইরানে আমেরিকা–ইসরায়েলের হামলার জেরে বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে যে অস্থিরতা চলছে, তার ভেতরেই জাতীয় কবি কাজী নজরুলের গানের মতো রমজানের ওই রোজার শেষে এসেছিল খুশির ঈদ।
বছরের দুই ঈদ ঘিরে আমাদের মধ্যে যে আনন্দ আয়োজন; কখনো গাড়ি, ট্রেন কিংবা লঞ্চে থেঁতলে গিয়ে গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপনের মতো কারও স্বপ্ন আর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছায় না, পথেই জীবন নেই হয়ে যায়। দৌলতদিয়া ঘাটে নদীতে পড়ে মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনার দৃশ্য দেখে মনে বিয়োগান্ত ঝড় শুরু হয়। সেই মন খারাপের দিনে আমাদের ভ্রমণ গ্রুপ লাঠিয়াল থেকে প্রতিবারের মতো পরিকল্পনা করে কোনো ভ্রমণের ঘোষণা আসেনি।
হঠাৎ পরিকল্পনায় ২৬ মার্চ তারিখে একজনমাত্র সফরসঙ্গী নিয়ে বের হয়ে পড়ি।
সকাল সাড়ে আটটায় পতেঙ্গার ১৫ নম্বর ঘাট দিয়ে কর্ণফুলী নদী পার হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে আনোয়ারার চাতরী চৌমুহনী বাজারে গিয়ে নামি। হালকা নাশতা সেরে এস আলমের বাসে উঠে বসি। বাস আনোয়ারার পর বাঁশখালী পেরিয়ে দুপুর ১২টায় পেকুয়া চৌমুহনী নামিয়ে দেয়। আবার টমটম গাড়িতে করে মগনামা ঘাটে পৌঁছাই।
ঘাটে ঈদ শেষে বাড়ি ছেড়ে শহরমুখী মানুষের প্রচুর ভিড়। অনেক কষ্টে আমরা দরবার ঘাটে যাওয়ার জন্য বোটে উঠে বসি। প্রায় ২৫ মিনিটের নদীপথ পার হয়ে দরবার ঘাট থেকে লেগুনা গাড়িতে চড়ে হজরত মালেক শাহ (রহ.)–এর দরবারে যখন পৌঁছাই, তখন জোহরের নামাজ আরম্ভ হচ্ছে। আমরা নামাজ ও জিয়ারত শেষে দরবারের তবারক খেয়ে হুজুরের ছেলেকে রাতে থাকার কথা জানিয়ে বের হয়ে পড়ি। এবার টমটমচালককে জানিয়ে দিলাম গন্তব্য, বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার এই কুতুবদিয়া দ্বীপে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও সুপরিচিত স্থাপনা কুতুবদিয়া বাতিঘর। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই বাতিঘর বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য ১৮৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন হেয়ার এবং ইঞ্জিনিয়ার জে এইচ টু গুড এটা প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের একমাত্র দ্বীপভিত্তিক বাতিঘর, যা লোনাপানির ক্ষয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কয়েকবার স্থানান্তরিত ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
বাতিঘর এবং পশ্চিম সৈকতে কিছুক্ষণ ঘুরে আমরা আবারও টমটমে করে গ্রামের আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথ, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লবণের মাঠ দেখতে দেখতে বড়ঘোপ বাজার কুতুবদিয়া সমুদ্রসৈকতে গিয়ে নামি। সৈকতে প্রবেশ করতেই পাশে বিশাল মাঠে চলছে ফুটবল টুর্নামেন্ট। গ্রামের মানুষ এসব টুর্নামেন্টগুলো খুবই গুরুত্ব দেয়। ছোট থেকে বৃদ্ধ—হাজারো মানুষ চতুর্দিকে আগ্রহভরে খেলা দেখছেন। এই সৈকতে প্রচুর পর্যটকও দেখা যাচ্ছে। কেউ সমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে কেউ–বা গোসলে মেতে উঠেছেন। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে রক্তিম আকার ধারণ করেছে। প্রকৃতির সে মনোরম পরিবেশে চীনা দার্শনিক লাওৎসের সে উক্তি মনে পড়ে, ‘প্রকৃতির সঙ্গে মিললেই প্রকৃত শান্তি পাওয়া যায়।’
পৃথিবীতে অন্যতম সুন্দর দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে সমুদ্রপাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা। আমি আর সাজিদ ফারুক হাঁটতে হাঁটতে দক্ষিণ সৈকতের শুঁটকিপল্লিতে প্রবেশ করলাম। নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করছেন। তাঁদের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলাম, এখন শুঁটকি উৎপাদনের মৌসুম প্রায় শেষ। তাঁরা ছোট্ট কাকড়া আর ইছা মাছ মেশানো যে শুঁটকি তুলছেন, তা মূলত মুরগি ও মাছের খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
সৈকত থেকে রাস্তায় উঠতেই মাগরিবের আজান হচ্ছে। পুরোনো মসজিদের পাশে তৈরি হচ্ছে সরকারি মডেল মসজিদ। আমরা মসজিদে মাগরিবের নামাজ শেষে বড়ঘোপ বাজারে প্রবেশ করি। বিশাল এলাকাজুড়ে বড়ঘোপ বাজারকে কুতুবদিয়ার রাজধানী বলা যায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু পাওয়া যায়। পর্যটকের থাকার জন্য হোটেলের ব্যবস্থাও আছে এই বাজারে। বাজার ঘুরে দেখে নুর হোটেলে নাশতা সেরে আমরা টমটম গাড়িতে বড়ঘোপ বাজার ঘাট দেখতে যাই। কুতুবদিয়ার ব্যস্ততম দুটি ঘাট—একটি দরবার ঘাট অন্যটি এই বড়ঘোপ বাজার ঘাট। শহর থেকে বড় ট্রলারে করে এসে চাল, ডাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্য এই ঘাটে আনলোড করা হচ্ছে। সদ্য চালু হওয়া যাত্রীবাহী শিপ পেকুয়ার মগনামা ঘাট থেকে এসে এই ঘাটে ভিড়তে শুরু করেছে। আমরা আবার টমটম গাড়িতে চড়ে দরবারের দিকে যাত্রা করি। গ্রামের এক পুরোনো ঐতিহ্য এখানে চোখে পড়ে, সারা দিনের কাজের শেষে সন্ধ্যায় সবাই বাজারে বা চায়ের দোকানে বসে টিভি দেখা বা আড্ডা দেওয়া। আমাদের ড্রাইভারের সঙ্গে আলাপকালে জানতে পারলাম, শেখ হাসিনার আমলে করা কাজের মধ্যে নদীর তল দিয়ে বিদ্যুৎ–সংযোগ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, মডেল মসজিদ এবং কুতুবদিয়া পলিটেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ উল্লেখযোগ্য।
আমরা যখন দরবারে এসে পৌঁছাই, তখন রাত আটটা। এশার নামাজ আদায়ের পর আমরা আবার সেই মাজারের তবারক খেয়ে নিলাম। তারপর মেহমানখানায় গিয়ে রাত্রিযাপনের জন্য নিজেদের স্থান করে নিলাম। কুতুবদিয়ার ঐতিহ্যবাহী বাতিঘর শুধু সমুদ্রের জাহাজের দিকনিদের্শনা দিয়ে থাকলেও এখানে কুতুবদিয়ার আসল বাতিঘর হচ্ছে হজরত মালেক শাহ রহমাতুল্লাহ আলাইহির এই দরবার। প্রতিদিন শহর থেকে হাজারো মানুষ কুতুবদিয়ায় আসেন শুধু মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে। কুতুবদিয়ায় কোনো ইন্ডাস্ট্রি নেই। চতুর্দিকে শুধু লবণের মাঠ। মাঠে লবণ উৎপাদন এবং গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারই এখানকার প্রধান কাজ। কর্মসংস্থান না থাকায় এখানের অধিকাংশ মানুষ শহরে থাকেন। বছরের ছয় মাস যা লবণ উৎপন্ন হয়, তার সঠিক মূল্য শ্রমিকেরা পান না। এক মণ লবণ দুই থেকে চার শ টাকায় বিক্রি হয়। চায়ের দোকানের আড্ডায় একজন বললেন, লাভের আশায় লবণ উৎপাদনে পরপর তিন বছর লোকসান গুনতেছি। এখানে লবণ উৎপাদন, সমুদ্রের মাছ এবং শুঁটকি উৎপাদনের প্রচুর সম্ভাবনা আছে। সরকারিভাবে পদক্ষেপ নিলে এই খাতে দেশে–বিদেশে রপ্তানি করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব।
রাতে আমাদের দরবারের মেহমানখানায় দায়িত্বরত বৃদ্ধ লোকটি ছিলেন আইনে খুব কড়া। মোবাইল ও লাইট বন্ধ করে সবাইকে ঘুমের নির্দেশ দেন, আবার ভোর পাঁচটায় আজানের সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে নামাজের জন্য জাগিয়ে দিলেন। ফজরের নামাজ শেষে ব্যাগ নিয়ে দাওয়াতখানা থেকে বিদায় নিয়ে পাশের হোটেলে সকালের নাশতা সেরে নিলাম। ইতিমধ্যে গতকাল থেকে ফোনে নির্দেশনা দেওয়া ফারুক ভাইয়ের পূর্বপরিচিত স্থানীয় ইসমাইল ভাই এসে তাঁদের বাড়িতে নেওয়ার জন্য হাজির। নিজেদের প্রয়োজনে তাঁকে হতাশ করলাম। আমরা তাঁর বাড়িতে না গিয়ে দরবার ঘাটে চলে আসি। আবার আসার প্রতিজ্ঞা নিয়ে আমাদের বোটে তুলে দেন তিনি। নদী পার হয়ে আবার বাসে চড়ে প্রাণের শহরে ফেরার জন্য রওনা হই।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]