রাতের চন্দ্রালোকে তাজমহল দেখা, নেই কোনো ছবি, আছে শুধু স্মৃতি ও অনুভূতি

তাজমহলের সামনে লেখকছবি: জাহিদ হোসাইন খান

ঘুরতে আমার দারুণ লাগে। সময় সুযোগ মতো এ বছরের আগস্টে গিয়েছিলাম বিশ্বখ্যাত তাজমহল দেখতে। দিল্লি থেকে আগ্রার পথে রওনা হওয়ার সময় আমার মনে ছিল একটি বহুদিনের ইচ্ছা তাজমহল নিজের চোখে দেখব। কিন্তু দিন শেষে বুঝেছিলাম, আমি যে তাজমহল দেখতে গিয়েছিলাম, তার চেয়েও অন্য এক তাজমহল আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমার সামনে চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা, নীরব, ধীর, প্রায় স্বপ্নের মতো এক তাজমহল এসে হাজির হয়। সেই অভিজ্ঞতা ছিল দারুণ।

আগ্রায় পৌঁছানোর পর একজন নতুন পর্যটক হিসেবে দ্রুতই নানা পরামর্শ আর সাহায্যের আহ্বানে ঘিরে পড়েছিলাম। কেউ গাইড হতে চাইলেন, কেউ টিকিট বা যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বললেন। আবার কারও কথাবার্তায় মনে হলো, পর্যটকের অপরিচিত অবস্থার সুযোগ নিয়ে বাড়তি অর্থ আদায়ের চেষ্টা আছে। আগ্রা পুলিশ ও পর্যটন পুলিশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেয়ে পরে স্বস্তি পেয়েছি। অচেনা শহরে দায়িত্বশীল কারও স্পষ্ট নির্দেশনা যে কতখানি আশ্বাস দিতে পারে, সেদিন তা উপলব্ধি করেছি। যারা প্রথমবার আসবেন তারা একটু খেয়াল রাখবেন। সরকারি ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ, পুলিশের সহায়তা নিলে ঝামেলা কম।

প্রথম দর্শনে তাজমহল সত্যিই আমাকে থামিয়ে দিয়েছে। সাদা সফেদ মার্বেলের বিশাল কাঠামো তাজকে ছবিতে দেখেছি অসংখ্যবার। তাজের বিশাল প্রাঙ্গণের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে যেন নতুন করে চিনতে হয়। সাদা মার্বেলের বিশাল শরীর, নিখুঁত সামঞ্জস্য, সামনে জলে পড়া প্রতিবিম্ব, চারপাশে মানুষের ভিড় থাকলেও স্থাপনাটির মধ্যে একধরনের নিজস্ব নীরবতা আছে। কাছে গেলে তার সূক্ষ্ম কাজ আরও বিস্মিত করে। পাথরের কারুকাজ, ক্যালিগ্রাফি, মার্বেলের ওপর আলোর খেলা, সব মিলিয়ে মনে হয় সৌন্দর্য এখানে শুধু বড়ত্বে নয়, সূক্ষ্মতাতেও।

দিনের আলোয় তাজমহলকে দেখে রবীন্দ্রনাথের সেই পরিচিত পঙ্‌ক্তি মনে পড়ে, একবিন্দু নয়নের জল/কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল/ এ তাজমহল। ইতিহাস বলছে, ১৬৩১ সালে সম্রাট শাহজাহানের প্রিয় স্ত্রী মমতাজ মহল জন্ম দেওয়ার সময় মারা যান। স্ত্রীর মৃত্যুর পর শাহজাহান গভীর শোকে ভেঙে পড়েন। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি মনোরম সমাধিসৌধ তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। ১৬৩২ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় আর ১৬৫৩ সালে তা সম্পূর্ণ হয়। এই বিশাল স্থাপনা তৈরিতে প্রায় ২২ বছর সময় লেগেছিল। প্রায় ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক ও কারিগর কাজ করেছিলেন। এর মূল স্থপতি ছিলেন উস্তাদ আহমেদ লাহৌরি। তাজমহল সম্পূর্ণ সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি। এর মধ্যে পারস্য, ইসলামিক ও মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। এর চারকোণায় চারটি মিনার এবং ভেতরে মমতাজ মহল ও শাহজাহানের কবর রয়েছে। যমুনা নদীর তীরে এর অবস্থান এই সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্রাট শাহজাহানের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ মমতাজ মহলের পাশেই সমাহিত করা হয়। ১৯৮৩ সালে তাজমহল ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

চাঁদনী রাতে তাজমহল দেখার বিরল অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন লেখক। দিনের তাজমহল উজ্জ্বল, কিন্তু পূর্ণিমার রাতে তাকে ভিন্নভাবে অনুভব করেন। রাতের দর্শনে ক্যামেরা নিষিদ্ধ; বিশেষ টিকিটে সীমিতসংখ্যক দর্শনার্থী তাজ দেখেন। নিস্তব্ধ জ্যোৎস্নায় তাজমহল প্রেম-বিচ্ছেদের স্মারক হয়ে ধরা দেয়। সেই রাতের কোনো ছবি নেই, কেবল স্মৃতি ও অনুভূতি রয়ে গেছে।

সত্যিই যেন সময়ের মুখে জমে থাকা এক অশ্রুবিন্দু। কিন্তু তখনো জানতাম না, এই উপমার গভীরতা আমি রাতে আরও বেশি অনুভব করব। তাজমহলে যাওয়ার আগেই যখন দেখলাম, আমার সফরের সময়টি পূর্ণিমার রাতের দর্শনের সময়সীমার সঙ্গে মিলে গেছে, তখনই মুন ভিউ বা চন্দ্রালোকে তাজ দেখার জন্য টিকিট কেটে রেখেছিলাম। দিনের আলোয় তাজমহল দেখব এটাই ছিল বহুদিনের ইচ্ছা। কিন্তু জ্যোৎস্নায় সেই একই তাজমহলকে দেখার সুযোগ যখন সামনে এসে দাঁড়াল, মনে হলো এ যেন ভ্রমণের ভেতর আরেকটি বিরল ভ্রমণ।

দিনে তাজমহল দেখতে যাওয়ার মধ্যে ছিল পর্যটকের উত্তেজনা। রাতে আবার যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, যেন পরিচিত কারও সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা করতে যাচ্ছি কিন্তু এবার তাকে অন্য আলোয়, অন্য রূপে দেখব। রাতের দর্শনে নিরাপত্তা কঠোর। মুঠোফোন, ক্যামেরা সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ নেই। রাতের তাজ দেখার জন্য বিশেষ টিকিট কেটে নিতে হয়। সন্ধ্যার পরে বিশেষভাবে প্রতি ৩০ মিনিটের জন্য ৫০ জন অতিথি রাত ৮টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে তাজ দেখার সুযোগ পান।

তাজমহল প্রাঙ্গণ
ছবি: জাহিদ হোসাইন খান

ভিন্ন রকম আর ভিন্নভাবে তাজমহল দেখাই ছিল সেই রাতের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। আমার সামনে ছিল তাজ আর পেছনের আকাশে ছিল বিশাল চাঁদ আর রাত। অন্ধকারের ভেতর সাদা মার্বেলের অবয়ব যখন চোখে পড়ে, তখন আমি কয়েক মিনিট বাক্‌রুদ্ধ হয়ে যাই। বিশালত্বের সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা হেরে যায়। দিনে দেখা তাজমহলের সঙ্গে এই তাজমহলের যেন কোনো মিল নেই। দিনের তাজমহল নিজেকে প্রকাশ করে উজ্জ্বল, স্পষ্ট, মহিমান্বিত। চাঁদের আলোয় তাজমহল যেন নিজেকে আড়াল করে রাখে। তাকে দেখতে হয় ধীরে। চোখকে অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। তারপর একটু একটু করে সাদা অবয়বটি ফুটে ওঠে। চাঁদের নরম আলো মার্বেলের গায়ে এসে পড়ছে। সেই আলো দিনের সূর্যের মতো তীব্র নয়; যেন কাউকে জাগিয়ে না দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর সেই মৃদু আলোতেই তাজমহলকে আমার সবচেয়ে জীবন্ত মনে হয়েছিল। অদ্ভুতভাবে, সেই রাতে তাজের বিশাল স্থাপনাকে একটি বিশাল সৌধের চেয়ে মনে হচ্ছিল একটি স্মৃতির মতো বিভ্রম। একটি ভালোবাসা, একটি বিচ্ছেদ, একটি দীর্ঘশ্বাস সব যেন পাথরের শরীর নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে তাজমহল। দিনের ভিড়ে আমরা তাজমহলের স্থাপত্য দেখি। রাতের নিস্তব্ধতায় যেন তার গল্পটি শুনতে পাই।

চাঁদের আলোয় তাজমহল শুধু প্রেমের স্মারক বলে মনে হয় না; মনে হয় বিচ্ছেদেরও স্মারক। মানুষ চলে যায়, সময় চলে যায়, সাম্রাজ্য চলে যায় কিন্তু কোনো কোনো অনুভূতি পাথরের শরীর নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো সে কারণেই দিনের তাজমহল আমাকে বিস্মিত করেছে, কিন্তু রাতের তাজমহল আমাকে স্পর্শ করেছে।

সেই রাতের তাজমহলের কোনো ছবি নেই, শুধু এক টুকরো জ্যোৎস্না আজও আমার স্মৃতির সাদা পাথরে লেগে আছে।

*লেখক: জয়শ্রী দাশ, সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মাসি বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং (ইউএসটিসি), চট্টগ্রাম

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]