ব্রাসেলস থেকে প্যারিস হয়ে পোর্টসমাউথের ভ্রমণস্মৃতি
প্যারিস যাদের শহর, সেই ফরাসিরা বলে প্যারি, কিন্তু প্যারির ‘র’ উচ্চারণ করতে গিয়ে ওরা জিহ্বার শেষভাগ আর কণ্ঠ দিয়ে এমন কসরত করে যে সেই উচ্চারণটিকে লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্যারিস সুন্দরীকে দেখার ইচ্ছা অনেক দিনের। দেশে থাকতে ওর রূপের বর্ণনা অনেক পড়েছি। সিদ্ধান্ত নিই, এবারের খ্রিষ্টীয় পব ইস্টারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ দিনের ছুটিতে ওকে দেখতে যাব।
তখনো ইউরোপের দেশগুলোর সীমান্ত হাট করে খুলে দেওয়া হয়নি। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে সীমান্তচৌকিতে ভিসা দেখাতে হতো।
ফরাসি দূতাবাসের তোরণ খুলবে সকাল ৯টায় কিন্তু ভিসাপ্রার্থীদের লাইনের প্রথম দিকে দাঁড়ানোর জন্য সকাল আটটাতেই চলে আসি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের ফরাসি দূতাবাসে। এত সকালে এসেও দেখি, দূতাবাসের সামনের ফুটপাতে ভিসাপ্রার্থীদের দীর্ঘ লাইন পড়ে গেছে। কী আর করা, লাইনের পেছনে গিয়ে দাঁড়াই। প্রতিক্ষণেই আমার পেছনে লাইনটা দীর্ঘ হতে থাকে।
মার্চের সকাল। তাপমাত্রা শূন্যের নিচে ১২–১৩ ডিগ্রি হবে। আকাশ থেকে তুষার ঝরছে হেলেদুলে। রাস্তায়, ফুটপাতের ওপর কম করেও এক ফুট নরম বরফ জমে আছে। থারমাল ইনার, দুটো সোয়েটার, তার ওপর মোটা জ্যাকেট পরেও হাড়গুলোতে যেন কাঁপন লেগে যাবে।
সকাল ৯টায় দূতাবাসের দরজা খুললে লাইন ধীর পায়ে এগোতে থাকে। ঘণ্টাখানেক পর দূতাবাসের ভেতরে ঢোকার সুযোগ পাই। এবার লাইনের সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে হবে। দোতলাতেই ভিসা দেওয়া হচ্ছে।
সিঁড়িঘরের দেয়ালে দেখি বিশাল এক সাইনবোর্ড ঝোলানো। তাতে লেখা, আমরা ১৪টি দেশকে ভিসা দিই না। দেশগুলো হচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, ঘানা ইত্যাদি। একবার ভাবি, আমাকে ভিসা যখন দেবেই না, চলে যাওয়াই ভালো। আবার ভাবি, এই কনকনে শীতে দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে এত দূর যখন এসেছি, ভাগ্যটা পরখ করে দেখি। আমার সামনেই দাঁড়িয়েছে দুই পাকিস্তানি তরুণ-তরুণী। তারাও নোটিশটা দেখে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে লাইনে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
লাইনের সঙ্গে এক ধাপ, দুই ধাপ করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে আসি। দোতলায় বারান্দার পরই একটি কক্ষে চেয়ার-টেবিল পেতে বসে ভিসা অফিসার পাসপোর্টে ভিসার স্টিকার লাগিয়ে দিচ্ছেন। সেই কক্ষে ঢুকে দেখি, ভিসা অফিসারের পেছনের দেয়ালেও সিঁড়িঘরের সেই নোটিশটি টাঙানো, ‘আমরা ১৪টি দেশকে ভিসা দিই না…।’ নোটিশটি দেখেও না দেখার ভান করি। পাকিস্তানি ছেলে-মেয়ে দুটি তাদের পালা এলে ভিসা অফিসারকে পাসপোর্ট এগিয়ে দেয়। তিনি পাসপোর্ট দুটো হাতে নিয়ে ওদেরকে পেছনের দেয়ালের নোটিশটা দেখিয়ে বলেন, ‘ওই দেখো, আমরা পাকিস্তানিদের ভিসা দিই না; তার ওপর তোমরা ছাত্র, ভিসা তো পাবে না।’
পাকিস্তানি ছেলে-মেয়ে দুটো কিছুক্ষণ অনুনয়-বিনয় করে ব্যর্থ হয়ে চলে যায়। এবার আমার পালা। আমার দেশের নামও ওই নোটিশ বোর্ডে বিদেশে দেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তির মতো জ্বলজ্বল করছে এবং আমিও ছাত্র। অতএব আমাকেও ভিসা দেবে না। তারপরও ‘যা থাকে কপালে’ ভেবে পাসপোর্টটা এগিয়ে দিই ভিসা অফিসারের দিকে। তিনি আমার সবুজ পাসপোর্টটার কয়েক পাতা উল্টিয়ে দেখে, তাঁর ডান হাতের তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল দুটো কয়েকবার সোজা বাঁকা করে বলেন, ‘দ্যোঁ ছঁ ফ্রঁ, দ্যোঁ ছঁ ফ্রঁ’ অর্থাৎ তিনি আমার কাছে দুই শ ফ্রাঙ্ক ভিসা ফি চাইছেন (ফ্রঁ/ফ্রাঙ্ক বেলজিয়ামের মুদ্রার নাম)। আমি ছোঁ মেরে পকেট থেকে দুই শ ফ্রাঙ্ক বের করে দিই, যেন তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টানোর সময় না পান। টাকাটা ড্রয়ারে রেখে তিনি আমার পাসপোর্টের পাতায় ভিসা স্টিকার লাগিয়ে দেন।
আমি ‘মেক্সি বুকু’ (অনেক ধন্যবাদ) বলে পাসপোর্টটা নিয়ে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে যাই, যেন পেছন থেকে আমাকে ডেকে ভিসাটা বাতিল করে দিতে না পারে।
ব্রাসেলস থেকে প্যারিসে বাসে ও ট্রেনে, দুভাবেই যাওয়া যায়। সময় নেয় সাড়ে তিন ঘণ্টা। বাসে ভাড়া কম, তাই টাকা বাঁচাতে বাসের টিকিট কাটি। পর দিন সকাল আটটায় বাস ছাড়বে। আমি সকাল সাতটায় আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসের রুম থেকে কাঁধে লাল ব্যাগটা নিয়ে বের হতেই চীনা মেয়েটার সঙ্গে দেখা। সে আমার কাঁধে লাল ব্যাগটা দেখে হেসে জিজ্ঞেস করে, ‘এবার কোন দেশ?’ ইস্টার বা গ্রীষ্মের ছুটিতে আমি লাল ব্যাগটা নিয়ে দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি, এ কথা ছাত্রাবাসের মোটামুটি সবারই জানা। তাই আমার কাঁধে লাল ব্যাগ দেখলে ধরে নেয় ওরা, আমি অন্য কোনো দেশে যাচ্ছি।
সকাল আটটায় ব্রাসেলস আন্তর্জাতিক বাস টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের চাকা ঘুরতে শুরু করে এবং আধ ঘণ্টার মধ্যেই শহরের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে গ্রামের পথে চলে আসে। এবার পথের দুপাশে যত দূর চোখ যায় ধু ধু খোলা মাঠ। মাঠের ওপর কম করেও দু–তিন ফুট বরফ জমে আছে; চোখ যেন ধাঁধিয়ে দেবে। গ্রীষ্মে বরফ গলে গেলে এই মাঠে গম, চেরি, আঙুরের চাষ হবে।
দিগন্তবিস্তৃত দুপাশের মাঠের এখানে–ওখানে দু–একটা ন্যাড়া মাথা গাছ বরফের আবরণ পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মে মাসে গ্রীষ্মের আগমনবার্তা শোনা গেলে এই গাছগুলোর ডালপালায় পাতার কুঁড়ি দেখা দেবে। জুন মাসে গাছগুলো সব ঝাঁকড়া মাথা হয়ে যাবে। নভেম্বরের শীতে পাতা ঝরে গিয়ে আবার ন্যাড়া হয়ে যাবে।
বাসটা মসৃণ পথ বেয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা চলার পর দূরে অপূর্ব সুন্দর তোরণের মতো একটা কিছু চোখে পড়ে। ভেবে পাই না, দিগন্তজুড়ে এই ফাঁকা মাঠে হঠাৎ করে মাথা তুলে দাঁড়ানো ওটা কী হতে পারে! মিনিট দশেকের মধ্যে বাসটা তোরণ পেরিয়ে একটি অফিস ঘরের সামনে এসে থামে। অফিস ঘরটি দুদেশের সীমান্তে ফ্রান্সের ইমিগ্রেশন ও কাস্টম হাউস। এই প্রথম ফরাসিদের সৌন্দর্যজ্ঞান সরাসরি দুচোখে দেখতে পেলাম, এত দিন যা কেবল বইয়ে পড়েছি।
ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস শেষে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বাসটা প্যারিসের আন্তর্জাতিক বাস টার্মিনালে এসে থামে। টার্মিনাল ভবনে ইনফরমেশন ডেস্কে বসা ফরাসি তরুণীকে বলি, ‘এসকে ভু পারলে লং লে (তুমি কি ইংরেজি বলো)?’ ফরাসি, জার্মানদের সঙ্গে সরাসরি ইংরেজিতে কথা বলতে শুরু করলে ওরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাই আগে থেকে এভাবে অনুমতি নিতে হয়।
মেয়েটি বলে, ‘উয়ি, আম্পিউ।’ (হ্যাঁ, যৎসামান্য)
ইংরেজি বলার অনুমতি পেয়ে বলি, ‘আমাকে দুই রাতের জন্য সস্তায় থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারো?’
তরুণীটি বলে, ‘ইয়ুথ হোস্টেলে থাকবে? প্রতি রাত পাঁচ ডলার, সঙ্গে প্রাতরাশ বিনে পয়সায়। তবে এক রুমে অনেকের সঙ্গে থাকতে হবে।’
আমি বলি, ‘তাতেই সই।’
মেয়েটা কোথায় যেন ফোন করে। তারপর ফোন রেখে বলে, ‘কাছেই একটা ইয়ুথ হোস্টেলে বেড খালি আছে, ওখানে চলে যাও, তোমার জন্য বুকিং দিয়েছি।’
মেয়েটা এবার এক টুকরা কাগজে ফরাসি ভাষায় কিছু একটা লিখে আমাকে দিয়ে বলে, ‘টার্মিনাল ভবন থেকে বের হয়ে ডানে ঘুরে দশ মিনিট হাঁটলেই ইয়ুথ হোস্টেলটা দেখতে পাবে। রিসিপশনে এই কাগজটা দিয়ো।’
কাগজটা আর ইনফরমেশন কাউন্টারে রাখা প্যারিস শহরের একটা ম্যাপ তুলে নিয়ে দশ মিনিটের মতো হেঁটে ইয়ুথ হোস্টেলে এসে পড়ি। রিসেপশনে দাঁড়ানো যুবককে মেয়েটার দেওয়া কাগজটা দিলে ও বলে, ‘তোমার পাসপোর্টটা দাও।’
পাসপোর্টটা দিলে ও কম্পিউটারে আমার নাম, ঠিকানা টুকে দুই রাতের জন্য দশ ডলার নিয়ে বলে, ‘১৩৫ নম্বর বেড তোমার। রুমের পেছন দিকটায় রাখা লকারে তোমার ব্যাগটা রেখে লক করে চাবিটা নিয়ে নেবে।’
রুমে ঢুকে দেখি, বিশাল রুমটাতে চার সারিতে কম করে পাঁচ শ বেড রয়েছে। দুই সারি রুমের দুপাশের দেয়াল ঘেঁষে, বাকি দুই সারি রুমের মাঝ বরাবর আড়াআড়ি করে পাতা। বেডগুলো আবার তিনতলা অর্থাৎ মেঝের ওপর নিচের বেডটার চার ফুট ওপরে দোতলার বেড, তার চার ফুট ওপরে তিনতলার বেড। লোহার সরু, খাড়া স্টিলের মই বেয়ে দোতলা, তিনতলা বেডে উঠতে হয়। রুমের মধ্যে খুব একটা ছেলে-মেয়ে নেই। নিজের বেডটা খুঁজতে গিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে চোখাচোখি হয়। কয়েকজন চোখের হাসিতে আমাকে স্বাগত জানায়। আমার ১৩৫ নম্বর বেডটা খুঁজে পাই। দোতলা বেড, মই বেয়ে উঠতে হবে।
বেডটা খুঁজে পাওয়ার পর লকারে ব্যাগ রেখে বেরিয়ে পড়ি প্যারিস সুন্দরীকে দেখতে। ফিশ বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দিয়ে ম্যাগডোনালসে স্বল্প খরচে ‘মধ্যাহ্নভোজ’ শেষে প্যারিসের এ রাস্তা, ও রাস্তা, এ গলি, ও গলি ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে থাকি। কোনো নতুন শহরে এলে আমি কোনো ট্যুরিস্ট দলের সঙ্গে ট্যুরিস্ট বাসে করে শহরের দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘুরে না বেড়িয়ে হেঁটে ঘুরে ঘুরে শহরটাকে দেখতে থাকি। প্রতিটি শহরের রয়েছে নিজস্ব রূপ, রস, গন্ধ। শহরের মানুষের নিজস্ব কথা বলার ভঙ্গিমা, চোখের চাহনি। বাড়িঘরগুলোর অনন্য গড়ন ও স্থাপত্য। হেঁটে বেড়িয়ে না দেখলে সেই রূপ, রস, গন্ধ, ভঙ্গিমা, স্থাপত্য পুরোটা ‘চেখে’ দেখা যায় না।
প্যারিসের ফুটপাত ধরে হাঁটার সময় কিছুদূর পরপরই সড়কদ্বীপে একই নকশার অপূর্ব সুন্দর একটি সাদাটে একতলা ঘর চোখে পড়ে। কী হতে পারে ওই অপূর্ব একতলা ঘরটি! কিছুদূর পরপরই কেন ওগুলো তৈরি করা হয়েছে, তা–ও আবার সড়কদ্বীপের মাঝে? নিজের অদম্য কৌতূহল মেটাতে শেষ পর্যন্ত এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করি, ‘এস্কুজে মোয়া মশিয়ুঁ, কে-এস কে ছা?’ (ক্ষমা করবেন জনাব, ওটা কী?)। তিনি বলেন, ‘পাবলিক টয়লেট।’ যে জাতি পাবলিক টয়লেটও অমন সুন্দর করে গড়তে পারে, তার সৌন্দর্যজ্ঞানের প্রশংসা জগৎজোড়া হওয়াটাই স্বাভাবিক।
রাত সাড়ে ৯টায় ইয়ুথ হোস্টেলে ফিরে আসি। রুমে ঢুকে দেখি সব কটি বেডে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী। কেউবা সারা দিন শহর ঘুরে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। কেউবা ডায়েরিতে কিছু লিখছে বা ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত। কেউ মাথার ওপরের স্পটলাইট জ্বালিয়ে বই পড়ছে। রুমের ভেতর সবাই শ্বেতাঙ্গ, কেবল আমিই বাদামি ত্বকের। এক রুমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এত যে ছেলে-মেয়ে, তারপরও কোনো কোলাহল নেই, এমনকি নেই মৃদু গুঞ্জনও। যাদের টুকটাক কথা বলা প্রয়োজন, নিচু কণ্ঠে বলছে। কারও মধ্যে হামবড়া ভাব নেই; নিজেকে জাহির করার প্রচেষ্টা নেই। আমাদের দেশ হলে হাটের কোলাহলে রুমটা ভরে থাকত।
আমি মই বেয়ে নিজের বেডে উঠে শুয়ে পড়ি। আমার ওপরের বেডের তরুণী মাথার ওপর ছোট্ট স্পটলাইটটা জ্বালিয়ে বই পড়ছে। নিচের বেডের ছেলেটা ঘুমিয়ে আছে। চোখ বন্ধ করে থাকি। সারা দিন পথে পথে হেঁটে বেড়ানো ক্লান্ত শরীরেও রুমের আলোয় আমার ঘুম আসে না। রাত দশটা বাজতেই রুমের ভেতর একে একে সব বাতি নিভে যেতে থাকে। ওপরের বেডের তরুণী নিচে ঝুঁকে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আমি যদি স্পটলাইট জ্বালিয়ে বই পড়ি, আলোতে কী তোমার অসুবিধা হবে?’
আমি বলি, ‘দুঃখিত, হবে।’ সঙ্গে সঙ্গে সে বাতিটা নিভিয়ে দেয়। অন্ধকারে ঢেকে থাকা রুমে এখন পূর্ণ নীরবতা। ঘুমিয়ে পড়তে দেরি হয় না।
সকালে উঠে আইফেল টাওয়ার আর মিরাবো সেতু দেখতে যাওয়া প্রস্তুতি নিই। আইফেল টাওয়ার যাদের, সেই ফরাসিরা বলে ‘ত্যুর দ্যু ইফেল’ অর্থাৎ ইফেলের টাওয়ার। ইফেল টাওয়ারটি নির্মাতার নাম।
রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার আগে প্রাতরাশটা সেরে নিতে হবে। ধারণা ছিল, বিনে পয়সার প্রাতরাশ, তাই পাউরুটির সঙ্গে মাখন, জ্যাম, জেলি, একটা কলা, সেদ্ধ ডিম, চা আর কফি থাকবে। ডাইনিং হলে ঢুকে দুই চোখ বড় হয়ে যায়। দেয়ালঘেঁষা লম্বা টেবিলের ওপর পাহাড়ের মতো উঁচু করে নানা ধরনের খাবার, ফল, ফলের রস, ডিম, দুধ সাজানো রয়েছে; যত ইচ্ছা খাও, সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবে না।
আমি স্বল্পাহারী, তাই অল্পতেই তুষ্ট হয়ে বেরিয়ে পড়ি। ম্যাপ দেখে কাছের মেট্রোরেলের স্টেশনটা খুঁজে নিই। প্যারিসের মেট্রোরেল মূলত পাতাল রেল, কদাচিৎ মাটির ওপর উঠে আসে। মেট্রোকে ওরা উচ্চারণ করে ‘মেৎখ’। ‘খ’টা বলার সময় সেই জিহ্বার ভেতর অংশের কসরত। অক্ষরে লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
মেট্রোরেল থেকে নেমে প্রথম যখন আইফেল টাওয়ারটা চোখে পড়ে, মনে হয় এ তো দেখতে অনেকটা আমাদের দেশে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাইভোল্টেজ বিদ্যুতের খুঁটির মতো; আর এরই কি না বিশ্বজুড়ে এমন নামডাক। কিন্তু যতই ওর কাছে যেতে থাকি, আমার মনোভাবটা পাল্টাতে থাকে। শেষে যখন ওর নিচে গিয়ে দাঁড়াই, মাথা নিচু করে নিজের ক্ষুদ্রত্ব অনুভব করি।
আইফেল টাওয়ারের ওপরে লিফট দিয়ে বা সিঁড়ি ভেঙে ওঠা যায়। লিফট দিয়ে উঠতে গেলে পয়সা দিতে হয়। পয়সা বাঁচাতে সিঁড়ি বাইতে শুরু করি। উঁচু উঁচু পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠার অভ্যাস আছে। সেই অভ্যাসে ভর করে অনেকখানি উঠে এসে এপাশে ওপাশে গিয়ে প্যারিস শহরটাকে দেখতে থাকি। এ সময় দূরে একটা পাহাড়ের চূড়ায় ধবধবে সাদা অতিসুন্দর একটা ভবন চোখে পড়ে; মনে হয় যেন সদ্য স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে। ম্যাপে দেখি ওর নাম ‘স্যাক্রে ক্যুর’ (পবিত্র হৃদয়)। কিন্তু ওর কাছে যাওয়ার আগে মিরাবো সেতুটাকে দেখতে হবে। আইফেল টাওয়ারের কাছেই সেতুটা।
প্যারিসের ভেতর দিয়ে দুই পাড় কংক্রিটে বাঁধানো সিন নদী বয়ে গেছে। এই নদীর ওপর খানিক পরপর একেকটা সেতু দুই পাড়ের সেতুবন্ধ গড়েছে। এমনই একটা সেতু হচ্ছে মিরাবো সেতু, ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম নায়ক মিরাবোর নামে নাম। দেশে থাকতে বিখ্যাত ফরাসি কবি হেনরি মারিয়া রিলকের লেখা ‘মিরাবো সেতু’ কবিতাটির বাংলা অনুবাদ পড়েছিলাম। অনুবাদ করেছিলেন প্রয়াত কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ। সেই অপূর্ব অনুবাদের প্রথম কটি লাইন,
‘মিরাবো সেতুর তলে বয়ে যায় সীন
আর আমাদের ভালোবাসা।
মনে পরবে কি সেই সব কথা,
হরষের পড়ে বিষাদ এসেছে রোজ।’
কবিতাটি পড়ার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কখনো প্যারিসে যাওয়ার সুযোগ হলে মিরাবো সেতুটি দেখতে যেতেই হবে।
ম্যাপ দেখে মিরাবো সেতুর কাছে আসি। হাত দিয়ে ওকে স্পর্শ করি, ওপরে কিছুটা দূর হেঁটে যাই। শান্ত হয়ে বয়ে যাওয়া সিন নদীটাকে দেখি। বহমান নদীতে কবির ভালোবাসাকে খুঁজে পেতে চেষ্টা করি।
ম্যাপ দেখিয়ে দেয়, কোন পথ ধরে পবিত্র হৃদয়ে যাব। সেই পথটা ধরে এগোতে গিয়ে এক বড়সড় বাজারে এসে পড়ি। বাজারের নারী-পুরুষ সব আরবি পোশাক পরা। আমার কাছে মনে হয়, এ যেন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো বাজার। এরা আলজেরীয় আরব। ফ্রান্স, আলজেরিয়া দখল করে নেওয়ার পর আলজেরীয়রা ফরাসিদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু করে। সৌন্দর্যের পূজারি ফরাসিরা সে যুদ্ধে স্বাধীনতাকামীদের রক্তে সে দেশের মাটি সিক্ত করে দেয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। আট বছর যুদ্ধের পর দেশটি ছেড়ে চলে আসতে হয় তাদের। সে যুদ্ধে যেসব আলজেরীয়, ফরাসিদের সহযোগিতা করেছিল, তারা প্রাণভয়ে ফ্রান্সে পালিয়ে আসে। ফ্রান্সে আজকের আলজেরীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকেরা মূলত তাদেরই বংশধর।
দূরের বাঁশি শুনতে মধুর, কাছের বাঁশি তেমনটা নয়। কিন্তু দূর থেকে স্যাক্রে ক্যুরের যে রূপটা দেখেছিলাম, কাছে এসে দেখি রূপটা ওর আরো মোহনীয়, মোমের আলোর মতো নরম রূপ।
স্যাক্রে ক্যুর থেকে মোনালিসার ল্যুভর মিউজিয়ামে চলে আসি। তখনো পৃথিবীতে সেলফি যুগের শুরু হয়নি। আমাকে দেখে একজন ফরাসি জিজ্ঞেস না করেই ছবি তুলতে শুরু করেন। অনুমতি না নিয়ে ছবি তোলার জন্য বিরক্ত হই। ছবি তুলে লোকটা বলেন, ‘ছবি নেওয়ার জন্য ১০০ ফ্রাঙ্ক দাও।’ আমি বলি, ‘তোমাকে কি আমি ছবি তুলতে বলেছি?’ লোকটা সুবিধা হবে না দেখে সরে গিয়ে আরেকজনের ছবি তুলতে শুরু করে।
দুদিন পর সন্ধ্যার ট্রেন ধরে রাত ৯টার দিকে ল্য হারবে বন্দরে চলে আসি। এখান থেকে ফেরি জাহাজে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথে যাব। সেখান থেকে ট্রেনে করে লন্ডন। কিছুক্ষণ আগে অঝোর ধারায় তুষারপাত হয়েছে। এখনো ঝরছে গা–ছাড়া ভাব নিয়ে। পুরোটা বন্দর পুরু তুষারের স্তরে ঢেকে গেছে।
যখন যে বন্দর থেকেই ফেরি জাহাজ ধরেছি, বন্দরে আসার পর সঙ্গে সঙ্গেই জাহাজে উঠেছি। আজ কাউকে জাহাজে উঠতে দিচ্ছে না। বরফের মধ্যেই যাত্রীরা সবাই দুই লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে, অনুমতি পেলে জাহাজে ওঠার জন্য। আমার কয়েকজন সামনে তিনজন আফ্রিকান যুবক দাঁড়িয়েছে। তিনজনেরই গায়ে কালো চামড়ার জ্যাকেট; হাড়কাঁপানো শীতের জন্য মোক্ষম। ওরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসিতে মেতে আছে।
কিছুক্ষণ পর দুটো গাড়ি করে কালো পোশাকধারী ৮-১০ জন পুলিশ আসে। ফরাসি ঝান্ডামেয়ার পুলিশের কোমরে থাকে পিস্তল। কোমরের বেল্ট থেকে ঝোলানো থাকে, দেড় ফুটের মতো লম্বা কালো ব্যাটন, হাতকড়া, সেই সঙ্গে একগুচ্ছ পাকানো দড়ি। একজন পুলিশ আফ্রিকান যুবকদের কাছে এগিয়ে গিয়ে তর্জনী বাঁকিয়ে লাইন থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত করে বলেন, ‘তোয়া, তোয়া, তোয়া।’ (তুমি, তুমি, তুমি)। যুবক তিনটি লাইন থেকে দুই পা বেরিয়ে এলে, পুলিশটি তাঁর হাতে রাখা ড্যাগারের ছুঁচালো মাথাটা একজন যুবকের বুকের কাছে জ্যাকেটের ওপর ধরে সজোরে নিচের দিকে টান দেন। আমি ভাবি, ‘এ কী করল! অমন সুন্দর জ্যাকেটটা এই শীতে ফেঁড়ে দিল!’ কিন্তু পরক্ষণেই দেখি, জ্যাকেটের ভেতর থেকে তিনটি পলিথিনে মোড়া হেরোইনের প্যাকেট বেরিয়ে এসেছে। অপর দুটি যুবকের জ্যাকেটেরও একই দশা হয়। ওদেরকে হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তোলার পর আমাদের জাহাজে ওঠার অনুমতি মেলে।
রাত ১২টায় জাহাজ ছাড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ল্য হারবে বন্দরের আলো দূরে মিলিয়ে যায়। অন্ধকার সমুদ্রে জাহাজটি এখন সম্পূর্ণ একাকী। সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে ওপারে পৌঁছে যাব। প্রথমে ভাবি, জাহাজের ভেতর সিনেমা হলটায় ঢুকে সিনেমা দেখে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে দেব; পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে লাউঞ্জে এসে বসি। ভোর চারটার দিকে কালো দিগন্তে পোর্টসমাউথ বন্দরের আলো দেখা দেয়। আমি ভিসা নেওয়ার জন্য সবুজ পাসপোর্ট হাতে জাহাজের ভিতরে ইমিগ্রেশন ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। তখনো বাংলাদেশিরা পোর্ট এন্ট্রি ভিসা নিয়ে ইংল্যান্ডে ঢুকতে পারত। তবে এ ভিসা না পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রখর। আমাকে দেখে ইমিগ্রেশন অফিসার চেয়ারে এসে বসেন। আমি পাসপোর্ট এগিয়ে দিই। তিনি আমার পাসপোর্টের পাতাগুলো দেখে নিয়ে বলেন, ‘কদিনের ভিসা চাই?’
‘পনেরো দিনের।’
‘প্রতিবারই তো ইংল্যান্ড গিয়ে ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছ। এবারও কি বাড়াবে?’
বলি, ‘এবার বাড়ানোর কোনো কারণ নেই।’
তিনি আমাকে এক মাসের ভিসা দিয়ে পাসপোর্টটা ফেরত দেন। জাহাজ আলোঝলমলে পোর্টসমাউথ বন্দরে ভিড়ে নোঙর ফেলে।
লেখক: ফারুক হাসান, বেলজিয়ামের ভ্রিয়ে ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলস থেকে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড লোকেশন’ বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন