জার্মানি ভ্রমণ: উলম শহর-আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মস্থানে যা যা দেখলাম

ছবি: লেখক

মিউনিখে তিন দিনের ভ্রমণ শেষে ১১ নভেম্বর ২০২৫ আমরা হিলটন হোটেল থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে উলম (ULM) শহরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। সকাল ৯টায় হোটেলের শতাধিক আইটেম থেকে পছন্দমতো বুফে নাশতা করলাম। ঠান্ডা আবহাওয়া, নরম আলো—সব মিলিয়ে যেন দিনের সঙ্গে আমাদেরও নতুন অভিযানের সূচনা। গাড়িতে আমাদের সঙ্গে ছোট্ট শিশু রূপকথা, স্টিয়ারিং হাতে অনিত। অনিতের চোখে ছিল উচ্ছ্বাস। আর রাস্তায় তার দক্ষ দখল আমাদের যাত্রা সহজ ও নিরাপদ করে তুলেছিল।

গাড়ি যখন অটোবানে উঠল, শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে আমরা এগোচ্ছিলাম, তখন মিউনিখের আধুনিক নগরচিত্র ধীরে ধীরে সরিয়ে নিল জার্মানির স্বপ্নময় সবুজ প্রকৃতি। হাইওয়ে যেমন মসৃণ, তেমনই নিস্তব্ধ। জানালার বাইরে দেখা যাচ্ছিল বিশাল সবুজ ফসলের মাঠ, দূরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা বন। মাঝে মাঝে রাস্তার মোড়ে দেখা মিলছিল পুরোনো কাঠের বাড়ি, লাল টাইলসের ছাদ—মনে হচ্ছিল এসব দৃশ্য যেন সরাসরি সিনেমা থেকে নেওয়া। প্রায় দুই ঘণ্টার যাত্রা শেষে ১৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হাইওয়েতে উলম শহরের সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। মনে হলো আমরা এক নতুন গল্পের শুরুতে আবার পৌঁছে গেছি।

শহরের দিকে এগোতেই দেখা গেল উলম মিনস্টার, বিশ্বের সর্বোচ্চ গির্জার চূড়া। তথ্যসূত্রে জানা যায়, গির্জাটি নির্মাণে কয়েক বছর নয়, লেগেছিল পাঁচ শতাব্দীর বেশি সময়। এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ১৩৭৭ সালে এবং সম্পন্ন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক পরিবর্তন, ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন এবং বিভিন্ন সামাজিক অস্থিরতার কারণে নির্মাণকাজ বহুবার থেমে যায়। একসময় মনে হয়েছিল, হয়তো এই বিশাল স্বপ্ন কখনো পূরণ হবে না। এই গির্জার উচ্চতা ১৬১.৫ মিটার, উলম শহরের যেখানেই দাঁড়ানো হোক না কেন, দূর আকাশের দিকে উঠে যাওয়া মিনস্টারের সুউচ্চ চূড়া চোখে পড়ে। মনে হয়, পাথর আর ইট দিয়ে নির্মিত কোনো স্থাপনা নয়; বরং মানুষের প্রার্থনা ও স্বপ্ন আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উলম শহর ভয়াবহ বোমা হামলার শিকার হয়। শহরের অধিকাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে যায়। আগুনে পুড়ে যায় শতাব্দীপ্রাচীন বহু স্থাপনা। কিন্তু সেই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও উলম মিনস্টার দাঁড়িয়ে ছিল।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বিশ্বের সর্বোচ্চ গির্জা হিসেবে মানুষের হৃদয়ে এর উচ্চতা ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি উলমের আকাশে দাঁড়িয়ে আছে—এক নীরব কবিতার মতো, যা বিশ্বাস, সৌন্দর্য ও মানবিক মহত্ত্বের গল্প বলে চলে।

বলা বাহুল্য, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্পেনের বার্সেলোনা শহরে অবস্থিত দেড় শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা স্থপতি গাউদির জটিল নকশায় নির্মিত লা’ সাগরাদা ফ্যামিলিয়া চার্চ, যার উচ্চতা ১৭২.৫ মিটার। এই চার্চের মূল নির্মাণকাজের কেবল সমাপ্তি হয়েছে। সাগরাদা ফ্যামিলিয়া চার্চ উলম মিনস্টার চার্চের উচ্চতাকে (১৬১.৫ মিটার) ছাড়িয়ে এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ চার্চ।

আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মস্থান

জার্মানির উলম সেই শহর, যেখানে বিশ্ববিখ্যাত আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein), ১৪ মার্চ ১৮৭৯ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জন্মের কয়েক মাস পর তাঁর পরিবার মিউনিখে চলে যায়। আইনস্টাইনের জন্মস্থানটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে সেখানে কেবল একটি স্মৃতিচিহ্ন ও ব্রোঞ্জ ফলক আছে, যা তাঁর জন্মস্থানকে নির্দেশ করে, তবে বৃষ্টির কারণে আমরা খুব ভালো করে দেখতে পারিনি।

আইনস্টাইন ছিলেন একজন ইহুদি। ১৯৩৩ সালে নাৎসি শাসনের সময়, তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফরে থাকা অবস্থায় বুঝলেন, জার্মানিতে তার কোনো নিরাপত্তা নেই। নাৎসি পুলিশ তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালায়, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। তাই মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে ২৮ মার্চ ১৯৩৩ সালে তিনি বেলজিয়ামে জার্মান নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। এর পর থেকে তিনি স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন। আইনস্টাইন কেবল নিজের নিরাপত্তার জন্য নয়, এমন সমাজে থাকতে চাননি যেখানে বর্ণবৈষম্য, মতপ্রকাশের দমন এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন চলছে।

আইনস্টাইনের গবেষণা সময়, স্থান, শক্তি ও পদার্থের মৌলিক প্রকৃতির প্রতি মানুষের ধারণা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। তিনি ব্যক্তিপূজা ও বিলাসিতার প্রতি প্রতিকূল ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের তাঁর অফিসে একটি পুরোনো টেবিল, চেয়ার আর পাইপই ছিল তাঁর একমাত্র ‘স্মারক’। কারণ, তিনি বলতেন: My work is my monument.

আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন সেই বিজ্ঞানী, যিনি বিশ্ব-সময়ের ধারণা বদলে দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে কখনো ভুলে যাননি। জীবনভর বিজ্ঞান ও মানবাধিকারের জন্য লড়াই করে ১৮ এপ্রিল ১৯৫৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

ছবি: লেখক

আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মস্থানের স্মৃতিটুকু দেখে বৃষ্টি আর ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে আমরা আনিকার বড় ভাই মুস্তাফা আহমেদ ও নাফিসাদের বাসায় এলাম। এ দেশে যেখানে–সেখানে গাড়ি পার্কিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তাই বৃষ্টির মধ্যেও অনিতকে বাসা থেকে বেশ দূরে গাড়ি পার্ক করতে হয়েছে। মুস্তাফারা বেশ কয়েক বছর ধরে এই শহরে বসবাস করছে। দুজনই ভালো চাকরি করে। ওদের ছোট্ট একটি পুত্রসন্তান। বেশ কিছু সময় আমরা আড্ডার মাঝে ছিলাম। এরপর খাবারের টেবিলে বাংলার বেগুনভর্তা, শুঁটকিভর্তা থেকে শুরু করে হরেক রকমের খাবারের আয়োজন। নৈশভোজ শেষে আবার আমাদের হেলেনবাড, স্টুটগার্ট যাত্রা।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে স্টুটগার্টের কাছাকাছি একটি তুরস্কের গ্রোসারিতে যাত্রাবিরতি। গ্রোসারিটি বেশ প্রসিদ্ধ। অনিত, আনিকাকে নিয়ে বিভিন্ন রকমের গরুর মাংস কিনে চার দিন ভ্রমণ শেষে রাত একটায় ফিরে এলাম হেলেনবাডের বাসায়। বেশ লম্বা ও উপভোগ্য যাত্রা শেষে সবাই আমরা ক্লান্ত।

উলম শহর থেকে ফেরার পথে মনে হয়েছিল, জার্মানি আইনস্টাইনকে তাড়িয়ে দিয়েছিল; কিন্তু পৃথিবী তাঁকে আপন করে নিয়েছিল। আইনস্টাইন শুধু একজন বিজ্ঞানীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বাধীনতা, বিবেক ও মানব মর্যাদার এক চিরন্তন প্রতীক।

বি. দ্র.: ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর ভ্রমণোত্তর ইতিহাস, সংগৃহীত তথ্য এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই লেখা।

*লেখক: শাহ জালাল ফিরোজ, বনানী, ঢাকা